ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 June 2018, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের যৌথ ঘোষণা কেবলই প্রতিশ্রুতি?

১৩ জুন, রয়টার্স : সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-কিম ঐতিহাসিক বৈঠক শেষে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচ্য। সমঝোতার যৌথ ঘোষণায় কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন দুই দেশের শীর্ষ নেতা। পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের শর্তে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যৌথ ঘোষণাকে অস্পষ্ট ও অনিন্দিষ্ট আখ্যা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যৌথ ঘোষণায় নতুন কিছু নেই। তারা ইতিহাস থেকে তুলে এনেছেন ২০০৭ সালের স্মৃতি। সে সময় ৫ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তর কোরিয়া নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হলেও বাস্তবে পরমাণু পরীক্ষা বন্ধ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের যৌথ ঘোষণা থেকেও ১০ বছর আগের সেই ঘটনার চেয়ে বেশি কিছু আশা করার বাস্তবতা নেই। ট্রাম্প-কিম যৌথ ঘোষণাকে নিছক প্রতিশ্রুতি আকারেই দেখছেন তারা। গত মঙ্গলবার দুই পর্বের বৈঠকের পর সমঝোতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে ৪টি বিষয়ে সমঝোতা অর্জিত হয়। সেগুলো হলো: ১ দুই দেশের জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুন ধারার সম্পর্কের সূচনা করবে। ২ কোরীয় উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে দুই দেশ। ৩ ২৭ এপ্রিলের পানজামুন ঘোষণা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে দুই দেশ। ৪ যুদ্ধবন্দিদের উদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে যাদের শনাক্ত করা গেছে তাদের নিজ নিজ দেশে শিগগিরই প্রত্যাবাসন করা হবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ এর দশকে ৩ বছরের কোরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল উত্তর কোরিয়ার বিপরীতে। এক হিসেবে লাখ লাখ মানুষের রক্তে রঞ্জিত সেই যুদ্ধ শেষে এখনও পর্যন্ত কোনও শান্তিচুক্তি হয়নি। একটি যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়েই যুদ্ধটি স্থগিত করা হয়েছিল। চূড়ান্ত অর্থে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষিত হয়নি। স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে কিছু বলা নেই। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও কোনও চুক্তি হয়নি। ওয়াশিংটনভিত্তিক উইলসন সেন্টারের গবেষক আব্রাহাম ডেনমার্ক তার টুইটার মন্তব্যে বলেছেন, একে কিমের বড় ধরনের প্রচারণামূলক বিজয় আকারে দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যে সাফল্যের কথা বলছে তাতে নতুন তেমন কিছু নেই। অবশ্য তিনি মনে করেন, কূটনীতি চলমান থাকলে আশা থাকে। সেদিক থেকে এই বৈঠকের একটা গুরুত্ব আছে।২০০২ থেকে ২০০৩ সালে এনপিটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে পিয়ংইয়ং। একইসঙ্গে গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নেয়। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৫ পর্বে দুই কোরিয়া, চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ছয় জাতি বৈঠক হয়; কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতিবাচক মনোভাবের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। ২০০৬ সালে সবাইকে অবাক করে উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ২০০৭ সালে জ্বালানি তেল প্রাপ্তি আর যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের সঙ্গে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সম্পর্কে ফেরার শর্তে পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে প্রতিশ্রুতি দেয় পিয়ংইয়ং। তবে উত্তর কোরিয়ার বিপরীতে থাকা ৫ দেশও প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলে পরমাণু পরীক্ষা অব্যাহত রাখে পিয়ংইয়ং।ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস-এর সিনিয়র ফেলো অ্যান্থনি রুগিয়েরো বলেছেন, ১০ বছর আগে যে সমঝোতা হয়েছিল, এটা তারই পুনরোক্তি। পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই সমঝোতা কোনও কাজে আসবে কিনা, তা একেবারেই স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ননপ্রোলাইফেরেশন স্টাডিজ-এর গবেষক মেলিসা হ্যানহাম তার টুইটার বার্তায় বলেছেন, সমঝোতায় যা আছে, তেমন কথা উত্তর কোরিয়া আগেও অনেকবার বলেছে। তিনি আরও বলেন, সত্যিকারের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বলতে যা বোঝায়, দুই পক্ষ এখনও তাতে সম্মত হয়নি। গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বলতে কী বোঝায়, যৌথ ঘোষণা তা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন চায় উত্তর কোরিয়ার পূর্ণাঙ্গ-পরীক্ষণযোগ্য এবং চিরস্থায়ী নিরস্ত্রীকরণ। তবে যৌথ ঘোষণায় কিমের পুরনো অবস্থানই বজায় রয়েছে।যৌথ ঘোষণায় ট্রাম্প আর কিম স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। সুনিন্দিষ্ট করে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণের শর্তে কিমের শাসনকে নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে সুনিন্দিষ্ট কোনও পদক্ষেপের কথা নেই ওই ঘোষণায়। আল-জাজিরায় লেখা নিবন্ধে রিচার্ড জাভার্ড বলছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে ওয়াশিংটনের যে মূল দাবি, যৌথ ঘোষণায় তার প্রতিফলন নেই। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রশ্নটিও স্পষ্ট নয়। তিনি লিখেছেন, ‘ওয়াশিংটনের মূল দাবি পূর্ণাঙ্গ-পরীক্ষণযোগ্য এবং চিরস্থায়ী নিরস্ত্রীকরণ, যৌথ ঘোষণায় যার উল্লেখ নেই। পিয়ংইয়ংকে ট্রাম্প যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটা নিয়েও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ