ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 June 2018, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ট্রাম্প-কিম শীর্ষ বৈঠক

অনেক জল্পনা-কল্পনা এবং উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত এ শীর্ষ বৈঠকে উভয় নেতাই যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা এড়িয়ে শান্তির পথে এগোনোর অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন।
দু’জনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও যৌথ ঘোষণায় তো বটেই, বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও দুই প্রেসিডেন্ট শান্তিমুখী বিভিন্ন অঙ্গীকার ও অবস্থানের কথা পুনরাবৃত্তি করেছেন। বলেছেন, কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকিমুক্ত রাখা হবে। এ উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘ দিনের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ায় সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া চালানো স্থগিত করবে, যা উত্তর কোরিয়াকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয় এবং ওই অঞ্চলে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পর্যায়ক্রমে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়া হবে বলেও ঘোষণা করেছেন প্রসিডেন্ট ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, দ্রুতই কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটানো হবে।
জবাবে প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন ঘোষণা করেছেন, তার দেশ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দেবে। কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ং স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করে ফেলবে। এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার একটি বড় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন খবরে জানা গেছে। কথাটা প্রেসিডেন্ট কিম নিজেও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য ও মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রেসিডেন্ট কিম বলেছেন, তারা সফলভাবেই পথ পরিবর্তন করেছেন। জয় করেছেন সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা ও চ্যালেঞ্জ এলেও তিনি শান্তির জন্য কাজ এগিয়ে নিতে অত্যন্ত আগ্রহী বলেও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট কিম।
দুই প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং এক সঙ্গে দুপুরের খাওয়া ও হালকা কথাবার্তার ফাঁকে মাঝখানের সময়টুকুতে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছেন। দুই প্রেসিডেন্টও সেগুলোকে অনুমোদন দিয়েছেন এবং নিজেরাও চুক্তি ও যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন। সব মিলিয়েই সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। ওদিকে যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিত করার ঘোষণাসহ কিছু বিষয়ে উদ্বিগ্ন হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন ট্রাম্প-কিম শীর্ষ বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছেন। চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশও দুই প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ট্রাম্প-কিম শীর্ষ বৈঠকের ফলে কোরীয় উপদ্বীপসহ এশিয়া এবং সমগ্র বিশ্বও পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
আমরাও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট কিম জং-উনের শীর্ষ বৈঠককে স্বাগত জানাই এবং মনে করি, এর মধ্য দিয়ে এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বই বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত হতে পারবে। বলা দরকার, এ দুই প্রেসিডেন্টের শীর্ষ বৈঠক কোনো সাধারণ বিষয় নয় বরং সকল বিচারে এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কারণ, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সা¤্রাজ্যবাদী দুনিয়ার প্রধান নেতা হিসেবে বর্ণিত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকের প্রথম থেকে। জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া স্বাধীনতা অর্জন ও দেশটিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।
উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নেতা কিম ইল সুং ছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট কিম জং-উনের পিতার পিতা অর্থাৎ পিতামহ। কিম ইল সুং-এর সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এসব দেশের বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়াকে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে কমিউনিস্ট দুনিয়ার প্রধান রাষ্ট্র গণচীন। চীনের সাহায্যেই উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। শুধু তা-ই নয়, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র বিশ্বকেও সাফল্যের সঙ্গে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর পেছনে প্রধান একটি কারণ হিসেবে ভূমিকা পালন করে চলেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এই দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় কমিউনিস্ট কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে এসেছে।
মূলত মার্কিন সমর্থন ও উসকানির কারণে কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। মাত্র মাস কয়েক আগেও যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছিল। সে সময় দুই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কিম জং-উনের তীব্র বাগযুদ্ধ সমগ্র বিশ্বেই প্রবল আতংক সৃষ্টি করেছিল। দু’জনই হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বাটন বা বোতাম তাদের সামনের টেবিলে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে তারা অথবা দু’জনের যে কোনো একজন ওই বোতামে চাপ দেবেন। অর্থাৎ বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। বাগযুদ্ধের সময় দুই প্রেসিডেন্ট সুচিন্তিত ব্যঙ্গ-তামাশাও যথেষ্টই করেছিলেন। যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, কিম একজন ‘রকেট মানব’। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একজন ‘বিকারগ্রস্ত বৃদ্ধ’ বলে তামাশা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন।
আপাতঃদৃষ্টিতে ব্যঙ্গ-তামাশা মনে হলেও ওই দিনগুলোতে সমগ্র বিশ্বেই প্রচন্ড আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। আশংকা করা হচ্ছিল, যে কোনো সময় কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। আর একবার শুরু হলে সেটা আর প্রথাগত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অনিবার্য করবে পারমাণবিক যুদ্ধকেও। ঘটনাপ্রবাহে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর আশারই অবশ্য জয় হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশাপাশি বয়সে তরুণ প্রেসিডেন্ট কিম জং-উনও যথেষ্ট ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। দেখিয়েছেন উচ্চ রাজনৈতিক পরিপক্বতাও। সে কারণে প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠলেও যুদ্ধ আর শুরু হয়নি।
বাস্তবে বরং মাস কয়েকের মধ্যে ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ঘটনা। যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখানো সত্ত্বেও দুই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কিম সিঙ্গাপুরে শান্তির লক্ষ্যাভিসারী শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। উদ্বিগ্ন বিশ্ববাসীর কাছেও তারা শান্তির বারতা পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা আশা করতে চাই, ট্রাম্প-কিম ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে শান্তির যে চমৎকার সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে তাকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কোনো পক্ষই কোনো ত্রুটি করবে না এবং বিশ্ব মুক্ত হবে পারমাণবিক যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ