ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

লাল পাঞ্জাবি

আসমা আফরিন : ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নিশান ঈদের কেনাকাটার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাবাকে বারবার তাগাদাও দিচ্ছে। এবার ঈদে সে লাল টুকটুকে একটি পাঞ্জাবি কিনবে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবে তারপর সবার আগেই ঈদগাহে যাবে। এই সব কত কথা আঁকিবুকি খেলছে তার মনে।

পড়ন্ত বিকেল । ঝিরঝির হাওয়া বইছে। দুষ্টু ছেলেরা মাঠে খেলায় ব্যস্ত। নিশান বাবার সাথে মার্কেটে যাবে। বাবা একটু দ্রুত চলনা, ওরা তো সব ভালোগুলো কিনে ফেলবে -নিশান বলল ।  বাবা ওকে শান্তনা দেয়, কোন সমস্যা হবে না। দেখবে, তোমাকে আমি মার্কেটের সব থেকে সুন্দর জামাটিই কিনে দেব।

অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে বাবা ওকে খুব সুন্দর একটি লাল টুকটুকে পাঞ্জাবি কিনে দিল। পাঞ্জাবিটা নিশানের খুব পছন্দ হয়েছে। মাঝে মাঝে ব্যাগ খুলে দেখে আর আনন্দে হাসে। ওর বাবা অন্য কিছু কেনাকাটা করছে। নিশান রাস্তার লোকদের দেখছিল। কোত্থেকে ওর বয়সি একটা ছেলে ময়লা ছেড়া জামা পরে নিশানের পাশে এসে দাঁড়ালো। হাতে ছিল একটা খেলনা। নিশান জিজ্ঞাসা করল-

কি নাম তোমার? 

-আরমান। 

তুমি ঈদে কেনা-কাটা করেছো? দেখ, এটা আমার জামা।

হ্যাঁ মা বলেছে আমাকেও খুব সুন্দর জামা কিনে দেবে। আর আমার জামা-ই হবে বাজারের সব চেয়ে সুন্দর জামা- 

মুখে এক পশলা হাসি নিয়ে বলল আরমান।

-তাই নাকি? কোথায় তোমার বাসা?

ঐ..যে বস্তি দেখা যাচ্ছে ওখানে আমরা থাকি, আরমান আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখালো। 

তাহলে তো তোমরা আমাদের বাসার পাশেই থাকো। তুমি প্রতিদিন আমাদের বাসার সামনে এসো, আমরা দু’জন মিলে খেলা করব। আমাদের বাসা ঐ....... যে গাছটা দেখছ, তার ঠিক পিছনে। আসবে তো? নিশান অনুনয় করল। আরমান রাজি হয়ে গেল। 

এর মধেই নিশানের বাবা চলে এসেছে। একটু ধমকের সুরে বলল, সবার সাথে মিশতে নেই। ওরা বস্তির ছেলে, চোর ছ্যাচড়া হয়। বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করল। নিশান কিছু না বলে চুপচাপ বাবার পিছে হঁাঁটতে থাকলো। মনে মনে খুব খারাপ লাগলো। আরমানকে ওর খুব ভালো লেগেছে।

 

ঈদের আর মাত্র একদিন বাকি। প্রতিদিনের মতো আরমান খেলতে এসেছে নিশানের সাথে। নিশান বলল, তোমার জামাটা তো আমাকে দেখালে না? 

আরমান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ভালো জামা আছে। হয়তো পুরাতন, তাতে কি হয়েছে? ঐ পুরাতনটা পরেই আমি ঈদে যাব। 

নিশান বললো-  কেন, নতুন জামা কেনো নাই?

-না। 

-কেন ? 

-ক’দিন থেকে মা খুব অসুস্থ। কোন কাজ করতে পারছে না। বাবাকেও আমি কোনদিন দেখিনি। এখন আমাদের তিন বেলা খাওয়া জুটানোও কষ্ট হচ্ছে। তবে মা বলেছে, ঈদের পরে জামার দাম কমে যাবে, তখন আমাকে রাজ-রাজড়াদের পাঞ্জাবি কিনে দেবে।

আরমানের কথা শুনে নিশানের চোখ দুটি ছলছল করে উঠলো। বয়সে ছোট্ট হলেও নিশান বুঝতে পারছে ওটা ওর মায়ের মিথ্যা আশ্বাস।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, সারাদিনের কর্মব্যস্ত মানুষগুলো ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে। নিশানের মা বাড়ি থেকে ডাকছে নিশান, নিশান বাসায় এসো। সবাই চলে গেল যার যার বাড়িতে। 

ঈদের দিন সকাল। যেন নতুন আলোয় ঝলমল করছে পুরো আকাশ। সেমাই ফিরনির গন্ধে মৌ মৌ করছে চারদিক। ছোট-বড় সকলের মাঝে খুশির জোয়ার। বাড়ির সকলেই তৈরি হচ্ছে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য।

নিশান জলদি বের হও, দেরি হয়ে যাচ্ছে- নিশানের বাবা ডাকছে। নিশান তখন রুম থেকে বের হল। শান্ত ভাবে বলল, হ্যাঁ বাবা চল।

বাড়ির সকলেই তাকিয়ে আছে নিশানের দিকে। বাবা বলল, কি হয়েছে তোমার? তুমি কি নতুন জামা পরতে ভুলে গেছো? পুরাতন পাঞ্জাবি পরেছ কেন?

 

নিশান ভয়ে ভয়ে মুখ নিচু করে বলল, বাবা নতুন পাঞ্জাবিটা আমি আরমানকে দিয়েছি। ওর ঈদগাহে যাওয়ার মতো কোন জামা নেই। আমার তো প্রায় সবগুলোই নতুন......

প্লিজ বাবা, তুমি আমাকে বকা দিওনা।

কিছুক্ষণের জন্য যেন ওর বাবা পাথর হয়ে গেল। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। একি তারই ছেলে? এবার নিশানকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বাবা তুই অনেক বড় হবি.......... অনেক বড়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ