ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আধুনিক রাষ্ট্র ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সংঘবদ্ধ  ও সুশৃঙ্খল জীবন, সকল নাগরিকের  অধিকার নিশ্চিতকরণসহ জনজীবনে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা  রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এমন ধারণা থেকেই রাষ্ট্রচিন্তার উন্মেষ ঘটে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকগণ বিষয়টির আরও সাবলীল ও গতিশীল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়ে উঠেছে জনবান্ধব, সৃজনশীল ও কল্যাণমুখী। একথা অনস্বীকার্য যে,  গণমানুষের প্রয়োজনেই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে। কালের  বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে এই কাঠামোতে ক্রমবিবর্তন, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও  পরিবর্ধন ঘটেছে। বস্তুত মানব জীবনের সামগ্রিক কল্যাণই রাষ্ট্রের কাজ এতে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই। 

আধুনিককালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র প্রধানত দু’ ধরনের ভূমিকা পালন করে।  নিয়ন্ত্রণমূলক ও কল্যাণমূলক। এ দু’ ধরনের ভূমিকার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্রের কার্যাবলীকে দ’ুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন, অপরিহার্য বা মুখ্য কার্যাবলী এবং কল্যাণমূলক বা ঐচ্ছিক কার্যাবলী। সার্বিক বিবেচনায় রাষ্ট্র কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান যার ব্যাপ্তি ও পরিসর সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ নয় বরং সর্বব্যাপী ও সর্বজনীন। তাই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শ্রেণি তোষণ ও গোষ্ঠী তোষণের কোন সুযোগ নেই। মূলত রাষ্ট্র একটি বৃহদায়তন সংগঠন। এর কার্যাবলীও বৃহৎ পরিসরের। আর আইনশৃঙ্খলা প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রাণ।

যাহোক রাষ্ট্রের প্রধান কাজই হলো ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’ করা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সর্বোপরি  নাগরিকরা যাতে তাদের সকল মৌলিক অধিকার নির্বিঘেœ ভোগ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্র যদি এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তবে সে রাষ্ট্রকে সফল বলার কোন সুযোগ থাকে না। মূলত রাষ্ট্রকে পুরোপুরি সফল করার দায়িত্ব সরকারের। তাই রাষ্ট্রের সফলতার সাথে সরকারের সফলতার বিষয়টিও ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। অবশ্য সরকারের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও কর্মদক্ষতার ওপরই নির্ভর করে প্রতিটি রাষ্ট্রের সাফল্য-ব্যর্থতা। 

তাই প্রতিটি রাষ্ট্রেই যেমন নিয়মতান্ত্রিক, প্রতিশ্রুতিশীল ও কর্মতৎপর সরকার থাকা প্রয়োজন, ঠিক তেমনিভাবে সে সরকারের স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক রাজনীতির ধারাবাহিকতাও  জরুরি। আর সরকার ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে গেলে দেশে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার বিষয়টিও অস্বীকার করার অবকাশ নেই। এককথায় রাষ্ট্রের সরকার গঠন ও পরিবর্তনে নিয়মতান্ত্রিকতা ও সুশৃঙ্খল হওয়াও দরকার। আর তা নিশ্চিত করা গেলেই রাষ্ট্র হয়ে ওঠে কল্যাণকামী ও গণমুখী। অন্যথায় রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পেতে বাধ্য।

বস্তুত বর্তমান বিশ^ গণতন্ত্রায়নের বিশ^। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেয় গণতান্ত্রিক ভাবধারার সরকার প্রতিষ্ঠিত আছে। যদিও সব দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি সংকট ও ত্রুটিমুক্ত নয়। সঙ্গত কারণেই একেবারে ত্রুটিমুক্ত গণতান্ত্রিক বিশ্ব আজও গড়ে উঠতে পারেনি। তবে আশার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি জোরালো আলোচনা-সমালোচনা শুরু হচ্ছে। হয়তো অদূর অভিষ্যতে এই সংকট সহনীয় পর্যায়ে আসতেও পারে। বস্তুত রাষ্ট্রকে সফল করতে হলে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাও অন্যতম পূর্বশর্ত। কারণ, সরকার প্রতিষ্ঠায় যদি গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও  জনমতের প্রতিফলন না ঘটে এবং জনগণকে রাজনীতি সচেতন করে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা না যায় তাহলে জনগণ রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন হতে বাধ্য।  তাই কোন উদাসীন ও রাজনীতিবিমুখ জাতিকে নিয়ে কোনভাবেই বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না। আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন রূঢ় বাস্তবতায় আমাদেরকে রীতিমত ভোগাচ্ছে। আর এ সমস্যা সমাধানে আমাদের ভূমিকাও অনেকটা দায়সারা গোছের। 

বস্তুত কোন দেশে যদি সরকার গঠন ও সরকার পরিবর্তনে কোন নিয়মতান্ত্রিকতা না থাকে সে রাষ্ট্র কোনভাবেই সফল ও সার্থক হবে না বরং জনমত উপেক্ষিত হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রীয় জীবনে নানাবিধ উপসর্গ দেখা দেবে। সরকার যদি অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় আসে তাহলে সে সরকারের পক্ষে জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ, এ ধরনের সরকার মানসিক ও নৈতিকভাবে দুর্বল থাকে এবং তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর একটা উৎকন্ঠা সব সময় কাজ করে। মূলত দুর্বল ও ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সব সময় বিভিন্ন অশুভ শক্তির সাথে সমঝোতা করেই চলতে হয়। 

নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য অনেক সময় অনধিকার ও অনৈতিক পন্থাও অবলম্বেনের আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর এসব কর্মকান্ড পরিচালিত হয় জনগণের বিরুদ্ধে। কারণ, এক্ষেত্রে জনগণকেই প্রতিপক্ষ ভাবা হয়। জনগণ সব সময়ই থাকে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ । তাই এই বিক্ষুব্ধ জনগণের ওপর শাসনকার্য পরিচালনা করা প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিকভাবে সম্ভব হয় না। ফলে সরকারকে প্রচলিত ধারার বাইরে যেতে হয়। আর বিপত্তিটা ঘটে সেখানেই। নাগরিকরা রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে স্বাভাবিকভাবে বঞ্চিত হন এবং তারা বীতশ্রদ্ধ হতে থাকেন। যা এক সময় জাতিসত্তাকেই অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। 

রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ক্ষমতা রক্ষা ও আত্মপূজা যখন রাজনীতির ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠে তখন তাদের পক্ষে জনগণের জন্য সুশাসন উপহার দেয়া সম্ভব হয় না বরং সেখানে স্থান করে নেয় অপশাসন ও দুঃশাসন। নাগরিকরা প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক শাসন থেকে বঞ্চিত হন। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা রক্ষার জন্য এসবকে শুধু বৈধই মনে করে না বরং তা তাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। আর আমাদের চারপাশে এমন অনাকাক্সিক্ষত দৃশ্যই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই আমাদের দেশে সুশাসনের সূচকটা বেশ নি¤œগামী হয়েছে। দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের দুর্বলতা জনজীবনকে একেবারে দুর্বিষহ করে তুলেছে। হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ ও গুপ্তহত্যা এখন অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ফলে দেশের মানুষ রাষ্ট্রের ওপর ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছেন। একথা অজানা আতঙ্ক নাগরিকদের সব সময় তাড়া করছে। এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড। যা শুধু দেশে নয় বরং বহির্বিশ্বেও আমাদের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। যা দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

 দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অনেক আলোচনা-সমালোচনা থাকলে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না এবং সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণেই তা এখন রীতিমত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জাতীয় একটি   দৈনিকের  অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে চলতি এপ্রিল মাসের ১১ তারিখ পর্যন্ত ৪৮ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। বছরের প্রথম ৩ মাসেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৪২ জন মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার জানায় ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড হয়েছে ৪৪টি। যার বেশীরভাগকেই বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। অন্যদিকে আরেক মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্র’ সূত্রে জানা গেছে ৩ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৪৬ জন মানুষ। যার মধ্যে ১৩ জন আটক হওয়ার পর নির্যাতনের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে প্রতি দ’ুদিনে একজন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছেন। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই হারেই এই ভয়ঙ্কর অপকর্মটি সংঘঠিত হচ্ছে। মূলত এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটনার পরেও আইনশৃংখলা বাহিনীগুলোকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না বা এই বিষয়ে তাদের কোন জবাবদিহিতা নেই যা তাদেরকে আরো বেপরোয়া করে দিয়েছে। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না বরং মহল বিশেষের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এমন সব গর্হিত কাজ বন্ধ হচ্ছে না বরং ক্রমেই তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। আসলে যারা এইসব হত্যাকা-ের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে তারাই যে এই অপকর্মের নেপথ্যের শক্তি এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।

মানবাধিকার কমিশন অবশ্য ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ধরনের প্রতিটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে তদন্ত করার জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করেছিলো। তৎকালীন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আমীরুল কবির সেই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন “প্রতিটি ঘটনাই অন্তত ৩ সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি দিয়ে তদন্ত করা উচিত। এই ৩ জন সদস্যের একজন ন্যূনতম উপসচিব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা হওয়া বাঞ্ছনীয়। আরেক সদস্য হবেন পুলিশের এসপি সমমর্যাদার এবং তৃতীয় সদস্য হবেন সিভিল সোসাইটির কোন প্রতিনিধি যাকে ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা পছন্দ করে দেবেন। আজও পর্যন্ত অবশ্য সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। 

অন্যদিকে ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত হাইকোর্ট এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়ে ৩ দফা রুল ইস্যু করেছিলো যা অদ্যাবধি মীমাংসিত হয়নি। বেশ কয়েকদফা মহামান্য হাইকোর্ট সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং র‌্যাবকে কারণ দর্শাতে বলেছিলেন যে কেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে তারা অবৈধ ঘোষণা করবেন না। কিন্তু এগুলোর কোনটা দিয়েই আসলে কোন কাজ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। রকিব হাওলাদার নামের ১৫ বছরের একটি বালকও সম্প্রতি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পুলিশ রকিবকে ছিনতাইকারী হিসেবে আখ্যা দিলেও ১৫ বছরের একটি বালকের এরকম নির্মম হত্যাকান্ডে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কিন্তু ১৫ বছরের একজন কথিত ছিনতাইকারী কিভাবে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটালো তাও রীতিমত রহস্যজনক। বিষয়টি কোন মহলেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য নানাবিধ কসরত অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমাদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব যে হুমকীর মুখোমুখি পড়বে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

মূলত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে কার্যাবলী ও দায়িত্ব বেশ বিস্তৃত। কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তকগণ আধুনিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। কারণ, আইনশৃঙ্খলাই প্রতিটি রাষ্ট্রের সাফল্যের মাপকাঠি। আর এম ম্যাকাইভার তার ‘ঞযব গড়ফবৎহ ঝঃধঃব’ গ্রন্থে বলেছেন,”আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ বা দায়িত্ব।” নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার নিশ্চয়তা থেকে রাষ্ট্র নামক সংগঠনের সৃষ্টি হয়। জনসাধারণকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করা, আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তির বিধান করা এবং সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা রাষ্ট্রের প্রধান কাজ। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্র স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে থাকে।  

শুধু দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই রাষ্ট্রের একমাত্র কাজ নয় বরং এর সাথে আরও অনেক কিছুই জড়িত। কিন্তু সবকিছুর সাথে আইনশৃঙ্খলার যোগসূত্রটা বেশ জোরালো। মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকে পরিচিত করা, রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডে অবস্থিত সম্পদের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠিত করা, অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন, আঞ্চলিক কোর্ট গঠন, বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক বাজার সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ, বিদেশে অবস্থানরত দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সেবা প্রদান হচ্ছে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিষয়ক অপরিহার্য কাজ। রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রত্যেক রাষ্ট্রের  প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, তাদের কর্ম বণ্টন ও নির্দেশ, কাজ তদারক এবং পরিচালনা রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অর্থ ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের একটি মুখ্য কাজ। 

রাষ্ট্রের অধীন বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মালিকানার উপর খাজনা ও কর নির্ধারণ, আদায় এবং সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করা, রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রা প্রবর্তন ও বিনিয়োগ, গণনা ও পরিমাপের একক নির্ধারণ  এবং মূল্য নির্ধারণ, অর্থনৈতিক পরিচালনা, মুদ্রাস্ফীতি রোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এগুলোও রাষ্টের মুখ্য কার্যাবলী। এসব কার্যাবলীকে সার্থক ও সর্বাঙ্গসুন্দর করার জন্য সবার আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ ও অভ্যন্তরীণ শান্তি-প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এর ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্র রাষ্ট্রের কোন বিভাগেই সফলতা অর্জন করতে পারবে না। আর যেদেশে জনগণের জানমাল নিরাপদ নয় সে কোন সাফল্যকে সাফল্য বলার কোন সুযোগ থাকে না।

সকল রাষ্ট্র আইন ও সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই কোন রাষ্ট্রের পক্ষে স্বেচ্ছাচারি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর কথিত বন্দুক যুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, সকল রাষ্ট্রই সংবিধিবদ্ধ আইন দিয়েই পরিচালিত হয়। তাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ যেকোন আইনবহির্ভূত কাজ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে এবং রাষ্ট্রের উপস্থিতিকে অস্বীকার করে। কারণ, সার্বভৌমত্বও আইন ও সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে উড্রো উইলসন (ডড়ড়ফৎড়ি ডরষংড়হ) বলেন, ‘অ ংঃধঃব রং ধ ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ৎমধহরুবফ ভড়ৎ ষধি রিঃযরহ ধ ফবভরহরঃব ঃবৎৎরঃড়ৎু.’ অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট ভূ-ভাগের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমূহকে রাষ্ট্র বলে’। তাই রাষ্ট্রকে সফল ও সার্থক করতে হলে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের কোন বিকল্প নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ