ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সদাকাতুল ফিতরের বিধান

ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান : [দুই] * ‘‘ফিতরা’’ টাকা দ্বারা আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। তার দলীল-

*   রাসূল (সা.) এর যুগে যাকাত ‘‘ফিতরা’’  ইত্যাদি টাকা দ্বারা আদায় করা হতো। তার কিছু প্রমাণ নি¤েœ -

১. যখন রাসূলে কারীম (সা.) হযরত মুয়াজ (রা.) কে ইয়ামেনে পাঠান, তখন তিনি সেখানে সাদকাতুল ফিতর গম আদায় করার পরিবর্তে কাপড় আদায় করেছেন, তিনি বলেন এটি আদায় করা তোমাদের জন্য সহজ। তাছাড়াও রাসূল (সা.) মহিলাদেরকে তাদের অলঙ্কার দিয়ে হলেও সাদকা আদায় করতে বলেছেন। (সহীহ বুখারী-২/১১৬)

২. সাদাকায়ে ফিতর টাকা দ্বারা আদায় করা যাবে এটি ইমাম বুখারী (রহ.) এরও  নিজস্ব অভিমত- তাই তিনি এ ব্যাপারে আলাদা অধ্যায় উল্লেখ করেছেন-

“আল্লামা ইবনু রাশীদ (রহ.) বলেন, উক্ত মাসয়ালাটির মাঝে ইমাম বুখারী (রহ.) হানাফীদের সহমত পোষণ করেছেন। (ফাতহুল বারী লি ইবনে হাজার-৩/৩১২)” 

অর্থ : হযরত যুহাইর (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ ইসহাক (রহ.) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, আমি সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কে এই অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা রমজানে সাদাকায়ে ফিতর খাবারের বিনিময়ে টাকা দ্বারা আদায় করতেন। (ইবনে আবি শায়বা-২/৩৯৮, হাদীস-১০৩৭১) এটির সনদ সম্পূর্ণ সহীহ ।

৪. হযরত হাসান বসরী (রহ.) এর বর্ণণা-

অর্থ : হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, টাকা দ্বারা সাদাকায়ে ফিতর আদায় করার দ্বারা কোন সমস্যা নেই। (ইবনে আবি শায়বা-২/৩৯৮, হাদীস-১০৩৭০)

৫. এ বিষয়ে হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ.) এর চিঠি-

ওয়াকি (রহ.) বলেন: আমাদের কাছে  উমার ইবনে আব্দুল আযীযের চিঠি পাঠিয়েছেন যে, সাদকাতুল ফিতরের পরিমাণ হলো প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আধা সা‘ গম বা তার মূল্য আধা দিরহাম। (ইবনে আবি শায়বা-২/৩৯৮, হাদীস-১০৩৬৯)

৬. এছাড়াও বিখ্যাত ইমাম-ইমাম ইবনে আবী শায়বা তার রচিত কিতাব ইবনে আবি শায়বা-২/৩৯৮ এর মাঝে এই ভাবে অনুচ্ছেদ স্থাপন করেন যে- অর্থাৎ সাদাকায়ে ফিতর টাকা দ্বারা আদায় করার (বৈধতা) সম্পর্কে।

৭. আর ইমাম বায়হাকী (রহ.) তার রচিত কিতাব সুনানুল কুবরা-৪/১৮৯ এর মাঝে এই ভাবে অনুচ্ছেদ স্থাপন করেন যে এই অনুচ্ছেদ হলো টাকা দ্বারা যাকাত আদায় করা অনুমোদিত।

এ বিষয়ে আহমদ আল গুমারী (রহ.) এর আরবী ভাষায় ১৫০ পৃষ্ঠায়  নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা রচনা করেছেন। যা সকলকে পড়ে রাখা আবশ্যক। এ বিষয়ে আরো দেখুন- বাদায়েউস সানায়ে-২/৯৬৯, আল মাবসুত লিসসারাখসী : ৩/১১৩ ইত্যাদি।

যাকাতুল ফিতরের জন্য খাদ্য দ্রব্য বৈধ কি ?

আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসুল (সা.) এর যুগে ঈদুল ফিতরের দিন আমরা এক সা’ খাদ্য ফিতরা দিতাম। তখন আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিসমিস, পনীর ও খেজুর। (বুখারী/১৫০৬; মুসলিম/৯৮৫; আবু দাউদ/১৬১৬)

সুতরাং দেশের প্রধান খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে উপরোক্ত হাদিসে যে খাদ্য দ্রব্যের কথা বলা হয়েছে তা সে দেশের প্রধান ও প্রচলিত খাদ্য দ্রব্য ছিল। তাই তা থেকে তারা যাকাতুল ফিতর প্রদান করতেন ঐ সকল খাদ্য দ্রব্য দিয়ে । হাদীসে বর্ণিত খাদ্য দ্রব্যের যে উল্লেখ রয়েছে তা উদাহরণ হিসাবে নির্ধারণ হিসেবে নয়। তাই দেশের প্রধান ও প্রচলিত খাদ্য দ্রব্য দিয়ে ফিতরা প্রদান করতে হবে ।

ধানের ফিতরা আদায় করা যাবে কি?

ধান কিংবা চাল দ্বারা ফিতরা দেওয়ার প্রমাণ হাদীসের সেই শব্দটি, যেখানে সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেছেন:

“আমরা খাদ্য দ্রব্যের মধ্য হতে এক সা যাকাতুল ফিত্র বের করতাম। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী আরও বলেন: “সেকালে আমাদের খাদ্য দ্রব্য ছিল: যব, কিশমিশ, পনীর এবং খেজুর”। [বুখারী, অধ্যায়: যাকাত নং ১৫১০]

আমরা আমাদের দেশে প্রধানতঃ খাদ্য হিসেবে চালের ব্যবহার করে থাকি কারণ ধান আমাদের প্রধান খাদ্য নয় এবং সরাসরি আহার্য বস্তু নয়। আমরা বাস্তব ক্ষেত্রে চালের ব্যবহার করি এবং ব্যবহার হতে দেখি, যেমন; 

১. মিড ডে মিল প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে সরকার চাল সরবরাহ করে থাকে, কোনো বিদ্যালয়ে ধান দেওয়া হয় না ।

২. সরকার বা বহিরাগত দেশ থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সাহায্য হিসেবে চাল ও গম ছাড়া কোনো দিন ধান আসতে দেখিনি ।

৩. বি.পি.এল কার্ডধারী দুঃস্থ লোকেদের সরকার খুব সস্তায় চাল ও গম দেয় ।

সুতরাং বাঙালীদের প্রধান খাদ্য চালের ফিতরা আদায় করতে হবে। 

তাছাড়া নিম্নোক্ত আলেমগণ চালের ফিতরার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন : ১. ইবনুল কাইউম (রহ) ইলামুল মুয়াক্কেয়ীন ২/১৮ পৃষ্ঠা, আল্লামা ইবনু বায- মাযমু’আ ফাতাওয়া উষাইমীন ১৪/২০৭ পৃষ্ঠা, আল্লামা উষাইমীন (রহ) মাযমু’আ ফাতাওয়া উষাইমীন ১৮/২৮৭ পৃষ্ঠা, আল্লাম সলেহ বিন ফাওযান আল মুলাখ খাসুল ফিখহী ১/৩৫৩ পৃষ্ঠা, হাফিয আইনুল বারী সিয়াম ও রমযান ১০১ পৃষ্ঠা

সাদাকাতুল ফিতর পাওয়ার হকদার কারা বা কাকে দেয়া হবে ?

সাদাকাতুল ফিতর পাওয়ার উপযুক্ত তারাই, যারা যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। তবে সমাজের দরিদ্র-অনাথ এবং নিজের গরীব আত্মীয় ও প্রতিবেশীকে দেয়াটাই অধিক উত্তম। কেননা হাদীসে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, দরিদ্রের খাবারের ব্যবস্থা করা। অতএব সাদাকাতুল ফিতর একমাত্র দরিদ্র-অনাথকে দিয়ে ঈদের আনন্দে তাদের শামিল করবে এবং নিজের রোজাকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পরিচ্ছন্ন করবে- এটাই হবে সাদাকাতুল ফিতরের লক্ষ্য।

ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্নিত হাদিসে রাসুল (সা.) শুধু মাত্র ফকীর ও মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং ফকীর ও মিশকিনরা শুধু মাত্র ফিতরা পাওয়ার অধিকারি। (আবু দাউদ/১৬০৯; ইবনু মাজাহ/১৮২৭)

ফিতরা কাদের দেয়া যাবে না? : যাকাতের ন্যায় ফিতরাও কোন হকদারকে মালিক বানিয়ে দিতে হবে। তবে যাদেরকে যাকাত দেয়া বৈধ নয় ১. কোনো ধনী ব্যক্তিকে, ২. ইসলামের দুশমনকে, ৩. কাফিরকে, ৪. মুরতাদকে, ৫. ফাসিককে, ৬. ব্যভিচারী বা ব্যাভিচারিনীকে, ৭. রোজগার করার ক্ষমতা রাখে এমন ব্যক্তিকে, ৮. জিম্মি ব্যক্তিকে, ৯. নিজের স্বামীকে, ১০. নিজের স্ত্রীকে, ১১. নিজের পিতাকে এবং সন্তান সন্ততিকে, ১২. কুরাইশ বংশের হাশিম বংশধরদের, ১৩. মসজিদ নির্মানে বা জনকল্যাণমূলক কাজে ফিতরা দেয়া যাবে না। 

ফিতরার মাল এক জায়গায় জমা করা যায় কি না ?

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত, ইদুল ফিতরের একদিন কিংবা দু দিন পূর্বে আদায়কারী বা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিকট তা জমা দিতেন। তিনি আরও বলেন, সাহাবীরা ঐ ব্যক্তির নিকট জমা দিতেন, সরাসরি ফকির মিসকীনদের দিতেন না। (বুখারি/২০৫ পৃষ্টা; আবু দাউদ ১ম খন্ড ২২৭ পৃষ্ঠা) সুতরাং ফিতরার দ্রব্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে বন্টনের জন্য জমা করা যেতেই পারে ।

কাদের উপর বা কি পরিমাণ সম্পদ থাকলে ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হয়?

ঈদের দিন যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি তার ও তার পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবারের চেয়ে অতিরিক্ত আরো ২ কেজি ৪০ গ্রাম পরিমাণ নির্দিষ্ট খাবার মওজুদ থাকে তাহলে ঐ ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গের সকল সদস্যদের উপর ফিতরা প্রদান ওয়াজিব হয়ে যাবে।

ইবনু উমার (রা) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা) যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন প্রত্যেক স্বাধীন বা গোলাম, পুরুষ কিংবা নারী নির্বিশেষে সকল মুসলিমের উপর মাথা পিছু এক সা’ খেজুর বা যব রমজানের ফিতরা আদায় করা। (বুখারী,হা/১৫০৩; মুসলিম, হা/৯৮৪)

তবে ইমাম আবু হানীফার  (রা.) মতে ঈদের দিন যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে অর্থাৎ ঐদিন ভোরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিসেবে যার ঘরে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ থাকবে শুধু ঐ পরিবারের উপর ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হবে।

১- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাধীন, কৃতদাস, নারী, পুরুষ, ছোট-বড় প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি রমাযানের সিয়ামের কারণে এক সা খেজুর বা এক সা যব ফিতরা হিসেবে ফরয করে দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

২-সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদের একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, 

প্রত্যেক স্বাধীন, পরাধীন, নারী, পুরুষ, ছোট- বড়, ফকীর-ধনী প্রত্যেকের উপর জনপ্রতি এক সা ২ কেজি ৪০ গ্রাম পরিমাণ খেজুর ফিতরা হিসেবে দান করা ওয়াজিব। (সহীহ মুসলিম : ২২৮১)

ভাববার বিষয় : [এখানে অনেকে ফিতরার নিসাব নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন যে, সাড়ে সাত ভরি সোনা কিংবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা বা সমপরিমাণ অর্থ থাকলে ফিতরা ওয়াজিব, এমন দলিল কিন্তু হাদীসে পাওয়া যায় না। ফিতরা যেহেতু রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করার জন্য ফরয করা হয়েছে, সুতরাং এই ফিতরা ধনি-গরীব সকলকেই দিতে হবে। গরীবদেরও তো রোযায় ভুল হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো গরীব লোকেরা পাবে কোথায়? তার উত্তর হলো: তারা ধনীদের কাছ থেকে ফিতরা গ্রহণ করে আবার নিজের পক্ষ থেকে অন্যকে দিবে।]

শেষ কথা : সদাকাতুল ফিতর, যাকাতুল ফিতর বা ফিতরাহ ইসলামী শরীয়তে ওয়াজিব বিধান। দেশ, স্থান, কাল, পাত্র ও পরিস্থিতি ভেদে শরীয়তের মূল দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে গরীব মিসকিনের অধিক উপকার হয়। উপকার হয় সে বস্তু দিয়ে ফিতরাহ আদায় করাই শরীয়তের মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ফেৎনা সৃষ্টি না করে সঠিক দ্বীন বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমাদের সকল ইবাদতকে কবুল কুরুন। বরকত দিন। আমীন।

 লেখক: ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। [সমাপ্ত] 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ