ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমাদের ঈদ

মাহবুবুল হক : ঈদের কথা আমাদের বলতেই হয় লিখতেই হয় কারণ ঈদ আমাদের জীবনের একটি বড় উৎসব। এই উৎসব আনন্দে ছোটবেলা থেকেই। জীবনের সকল পর্যায়ে ঈদের উৎসব ও আনন্দ ছিল আমাদের জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ। এখন আমার বয়স ৭০ বছর অর্থাৎ আমি এই জীবনের ১৪০ টি ঈদ উৎসব পালন করেছি। কারণ প্রতিবছরই দুইটি ঈদ আমাকে উদযাপন করতে হয়েছে। একদম ছোট্টকালের ঈদের কথা মনে না থাকলেও ৪ থেকে ৫ বছর বয়স থেকে ঈদের আনন্দ আমি দারুণভাবে উপভোগ করছি। ১৯৫৫ সাল আমি তখন দিনাজপুর জেলার দেবিগঞ্জ থানার প্রাইমারি স্কুলে ২য় শ্রেণীতে পড়ি। রোজার মাস শুরু হতেই স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে। আমাদের বাসার পাশে ছিল সত্যেন্দ্রর বাসা। সত্যেন্দ্র এবং আমি একই শ্রেণীতে লেখাপড়া করতাম। ঈদের কয়েকদিন আগে আব্বা আমাদের সব ভাই-বোনদের জন্যে নতুন জামা-কাপড় কিনে এনেছে। সত্যেন্দ্রের সাথে আমি প্রতিদিনই বিকালবেলা খেলাধুলা করতাম। সে বাসায় এসে আমাদের নতুন জামা-কাপড় দেখে ফেলে এবং বলে তোর আব্বা কত ভালো। তোদের জন্যে নতুন জামা-কাপড় কিনেছে। অথচ আমাদের বাবা আমাদের জন্যে কিছুই কিনে নাই। আমার বড় ভাইয়ের নাম ছিল মাসুদ। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে ৫ বছরের বড়। তিনি বললেন মন খারাপ করনা। তোমরা তো মুসলমান নও। ঈদের সময় তোমাদের জন্যে তো নতুন জামা-কাপড় কেনা হয় না। আমাদের জন্যে নতুন জামা-কাপড় ঈদের সময় কেনা হয়। তোমাদের জন্যে নতুন জামা-কাপড় কেনা হবে পূঁজার সময়। ঈদ গেলেই পূঁজা শুরু হবে। তখনই তো তোমাদের বাবা তোমাদের জন্যে নতুন জামা কাপড় দিনে দিবে। সত্যেন্দ্র কিছু বলল না। কিন্তু আমার মনে আছে সেদিন সে মন লাগিয়ে খেলাধুলা করেনি। সে চুপচাপ ছিল। সন্ধ্যার পর আমরা যে যার বাসায় চলে যাই। সত্যেন্দ্রের বাবা জিতেন কাকা বাবু আমাদের বাসায় এসে হাজির। বৈঠকখানায় বসে হাসতে হাসতে আব্বাকে বললেন, ঈদের জামা পায়নি বলে সত্যেন্দ্র খুব কান্নাকাটি করছে। তাকে তো এখন ঈদের জামা দিতে হবে। আব্বা বললেন, ঠিক আছে আমি কালই ব্যবস্থা করছি। জিতেন কাকা বললেন না তা হবে না। এখনই বাজারে যেতে হবে। ওকে আমি কথা দিয়েছি ঈদের জামা আমি নিয়ে আসব। চলুন বাজারে যাই। দেরি হলে দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যাবে। আব্বা কাকা বাবুকে চা খেতে বললেন কাকা বাবু বললেন ফিরে এসে খাব।

মনে আছে ঘন্টাখানেক পরেই আব্বা ও কাকা বাবু সত্যেন্দ্র ও তার বোনের জন্যে নতুন জামা কিনে নিয়ে আসলেন। এবং ঐ রাতেই তারা সত্যেন্দ্রের বাড়িতে গেলেন। নতুন জামা দু’টো আব্বা ওদেরকে গিফ্ট দিয়েছেন। 

ঈদের পরে পূঁজার উৎসব ছিল। কাকা বাবু আমাদের ভাই বোনদের জন্য পূঁজার জামা কিনে দিয়েছিল।

ছোটকালের ঈদের স্মৃতি আমার অনেক। আব্বার বদলির চাকরি ছিল বলে বহু জায়গায় গিয়েছি বহু রকমভাবে ঈদ উদযাপন করেছি। আব্বা ও আম্মা চাইতেন নানাভাবে ঈদ উদযাপন করতে। তখন আমরা ঠাকুরগাঁয়ে থাকি। আব্বা ঠিক করলেন এবার অফিসের সকল কর্মচারীদের নিয়ে একসাথে ঈদ উদযাপন করবে। সম্ভাবত: ১৯৫৬ সালের ঘটনা।

আব্বাসহ আব্বার অফিসের কর্মচারীদের সংখ্যা ছিল ১০ জন। এই ১০ জনের মোট ছেলে মেয়ে ছিল ৪০ জন। তার মধ্যে আমরা ছেলেরা ছিলাম ২৬ জন। আর মেয়েরা ১৪ জন। এই ২৬ জন ছেলেকে দেওয়া হলো এক ধরনের কাপড়। আর ১৪ জন মেয়েদের দেওয়া হলো আরেক ধরনের কাপড়। ঈদের দিন বাবা-মা সহ সবাই আমাদের বাসায় হাজির।

কেউ কিন্তু খালি এলো না। প্রত্যেকে তিন চার রকম এর খাবার নিয়ে আসে। দুপুরবেলা আমরা সবাই মিলে একসাথে খেলাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা একসাথেই খেলাধুলা করলাম। আমাদের বাসার ভিতর ও বাইরে অনেক জায়গা ছিল। মনে পড়ে আমরা সবাই খুব আনন্দ করেছিলাম। একসাথে বসে এতো বিচিত্র খাবার আর কোনদিন খেয়েছি কিনা আমার মনে পড়ে না।

এখনতো ঈদের চাঁদ দেখা যায় না। চাঁদ উঠেছে কি উঠেনি সরকারের পক্ষ থেকে তা জানান দেওয়া হয়। তখন আমরা বাড়ির ছাদে বা উঁচু জায়গায় ওঠে নতুন চাঁদ দেখার চেষ্টা করতাম। যে প্রথম নতুন চাঁদ দেখতো তাকে পুরস্কৃত করা হতো। তাকে ভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবান বলে মনে করা হতো। মনে পড়ে একবার আমিও নতুন চাঁদ দেখেছিলাম।

ছোটকালে ঈদ উদযাপন করেছি মূলত ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর শহরে এবং নোয়াখালি জেলার বিভিন্ন স্থানে। একই দেশের মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ঈদ উদযাপনের বিষয়টি ছিল ভিন্ন ভিন্ন।

ঈদ উৎসবের সাধও ছিল আলাদা, আলাদা। ঈদের খানাপিনায় তখন ঝোলের বিষয় অনুসঙ্গ ছিল না। রোজার ঈদে সাধারণত হাতে বা মেশিনে বানানো সেমাই, সুজি ফিরনি, পায়েশ নানা পদের সেমাই পাক করা হতো। শুকনো ফরফরে সেমাই আবার ঘন দুধ মেশানো সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, রান্না করা হতো।

উত্তরবঙ্গের কোন কোন জায়গায় বরফি, নাড়– ইত্যাদিও তৈরি করা হতো। তবে সবসময় উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে রকমফের থাকতো। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকজনেরা বেশি খরচ করতে পারত না বলে বেশি খাবারের আইটেম করতে পারত না। তবে গরীবরা বঞ্চিত হতো না। পাড়া প্রতিবেশীদের থেকে তারা খাবার দাবার বা সহানুভূতি পেত। এখন হয়ত আর আগের মতন নেই। সেসব সময় ছিল একান্নবর্তী পরিবার। একেক একেক পরিবারের ৫০-৬০ জন সদস্য থাকত। সেকালে সবাই আনন্দ উৎসব যেমন ভাগাভাগি করে নিতো। অনেক দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করে নিত। আত্মীয়তার বন্ধন ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তখনকার দিনে চাচাতো ভাই চাচাতো বোনদের সাথে যে ধরনের সম্পর্ক ছিল এখন আপন ভাই-বোনদের তেমন সম্পর্ক নাই।

উত্তরবঙ্গের ঈদের জামাত হতো মাঠে-ময়দানে। দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি বাদল বা ঝড়-বন্যার জন্যে মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন মাঠে ও মসজিদে সবখানেই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদে ঈদের নামাজে তেমন আনন্দ পাওয়া যেত না। মাঠের নামাজে খুব আনন্দ পেতাম। নানা রকম রঙিন কাগজ দিয়ে ঈদগাহ্ সাজানো হতো। মাঠের কিছুটা অংশে সামিয়ানাও টাঙ্গানো হতো। সামিয়ানাগুলো দেখে আমরা খুবই আনন্দ পেতাম। ঈদগাহে শুধু নামাজের ব্যবস্থাই থাকত না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যে খেলনা-পুতুল, লজেন্স চকলেট, বাদাম, বিস্কুট, সস্তা পানি ও সরবত থেকে শুরু করে নানান ধরনের খাবার থাকত। বেলুন কেনা ছিল একটা কমন আইটেম। বায়োস্কোপ দেখা, দোলনায় চড়া, এসবেরও নানান ব্যবস্থা ছিল। এখনও তার কিছু কিছু রয়েছে।

বড়দের জন্যে চা-পান, সিগারেটের ব্যবস্থা থাকত। নামাজ শেষে খুতবার পর সবাই কোলাকুলি করত। তারপর বড়রা গল্প-গুজবে মেতে উঠত। আর ছোটরা মনের আনন্দে খেলাধুলা করত। বাড়িতে ফেরার সময় প্রায় সবশিশুই প্লেন জাতীয় জিনিস দিয়ে খেলতো। এরপরে তারা দলবেঁধে ঈদের বকশিস আদায়ের জন্যে দাদা-দাদী, নানা-নানী, মামা-মামী, চাচা-চাচী, খালা-খালু, ফুফু-ফুপা, বড় বোন, দুলাইভাই, বড়ভাই, ভাবী, সবার কাছে যেত। ৫০ বছর আগে পেত দু’চার আনা। এরপর একটাকা দু’টাকা এখন তো ঈদের এই বকশিস প্রায় ৫০-৫০০ টাকা। এই বকশিসের নানা রকম নাম আছে। এখন আর মনে নেই। তবে সালামি ও ঈদি এই দুইটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। ঈদি বা  এই সালামিকে মুরুব্বিরা কেউ বিরক্ত হতেন না। অনেকেই এই ঈদের টাকা পূর্বেই সংগ্রহ করে রাখতেন। আর বাচ্চারা সাধারণত নতুন টাকা চাইতো। পুরনো টাকা দিলে তারা বেজার হয়ে যেত। ঈদের এই পর্ব বা ইভেন্ট দারুন মজার। কখনো কখনো বয়স্করাও ঈদের লেনদেন করে থাকত এবং এখনো করেন। যেমন শ্বশুর-শাশুড়িরা নিজের ছেলে-মেয়েদের ঈদি দেওয়ার সাথে সাথে বউমা ও জামাইকে ঈদি প্রদান করে। তেমনি বয়স্ক বড় ভাইরা ও বড় বোনরাও ছোট ভাই বোনদের ঈদি প্রদান করে।

আমরা এখানে রমজানের ঈদ সম্পর্কে আলাপ করছি। কারণ রমজানের ঈদ আর কুরবানীর ঈদের বৈশিষ্ট্যই আলাদা। আমাদের ছোটবেলায় রমজানের ঈদেই নতুন জামা-কাপড় দেয়া হতো। কুরবানীর ঈদে দেয়া হতো না। এখনতো শহর ও নগরে কুরবানীর ঈদেও নতুন জামা-কাপড় অনেকেই আশা করে।

কিশোরকালে যারা বিড়ি-সিগারেট ও পান খাওয়া শিখে, আমার ধারণা এসব বিষয়ে তাদের হাতে খড়ি হয় রমজানের ঈদে। আনন্দের আতিশয্যে অনেকে এসবের সবক নেয় তখন। এর পরিনাম সম্পর্কে তখন তাদের কোন ধারণা থাকে না। গ্রামবাংলায় বা মফঃস্বলে তখন আনন্দের অনেক আইটেম ছিলো না। একটু খেলা-ধুলা, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ঘোরা-ফেরা এবং দলবেঁধে শহরে গিয়ে সিনেমা দেখা এই সবইতো ছিলো আনন্দের উৎস।

আনন্দের আরো একটা বড় উৎস ছিলো যারা শহরে বন্দরে চাকরি বা ব্যবসা সূত্রে অবস্থান করতেন, তারা গাঁয়ে-গ্রামে ফিরে আসতেন। কেউ ফিরে আসে বাবা-মা, দাদা-দাদীর কাছে, কেউ ফিরে আসে স্ত্রী-সন্তানদের কাছে। এই ধরনের পরিবারগুলোতে ঈদের সময় আনন্দের বান ডাকতো। অনেকে আবার গোটা পরিবার শহর থেকে গ্রামে নিয়ে আসতো, ঈদ উৎসব শেষে তারা আবার ফিরে যেতো। এখনও এসব হয়। আরো বিপুলভাবে হয়। আনন্দের এই বিপুলতা লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। কারণ এই অঞ্চলের পেশাজীবীরাই ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলে চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। ঈদের সময় তারা নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে আপনজনদের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতো।

উত্তরবঙ্গে এই চাল-চিত্র তেমন একটা দেখা যেত না কারণ আমাদের ছেলেবেলার উত্তরবঙ্গের মানুষ বিদেশে বা শহরে-বন্দরে গিয়ে চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য খুব একটা করতো না। তারা কৃষি কাজ ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে রাখতো।

এখন, কী উত্তরবঙ্গ আর কী দক্ষিণবঙ্গ সকল অঞ্চলের মানুষই শহর-বন্দরে গিয়ে চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করে। ঈদের সময় তারা গ্রামে আসে। এ কারণে গোটা বাংলাদেশে ঈদের সময় পরিবহন ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে, অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে। বহু মানুষ হতাহত হয়। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার ইত্যাদিতে বহু মানুষ হতাহত হয়।

বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে লঞ্চ ডুবিতে প্রায় প্রতিবছরই বহু মানুষের সলিল-সমাধি ঘটে। যেসব পরিবারে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে সেসব পরিবারে আনন্দের পরিবর্তে মহাবিষাদের কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। যতই দিন যাচ্ছে ঈদের সময় যাতায়াতের দুর্ভোগ ততই যেনো বাড়ছে। কোনোভাবেই এর কোনো সমাধান মিলছে না।

ঈদের সময় বিয়ে-সাদিরও চাল-চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। নিকটাত্মীয়দের সহজে পাওয়া যায় বলে, ঈদের সময় বা একটু পরে বাংলাদেশের প্রায় অঞ্চলে আগেও বিয়ে-সাদি, হতো, এখনও হয়। ঈদের আনন্দ তখন প্রলম্বিত হয়।

ঈদের সময় এখন অবশ্য কিছু মানুষ পর্যটনের ঝোঁকে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, কুয়াকাটা, জাফলং মাধবকু- ইত্যাদি স্থানে ভ্রমণ করে। তরুণরাই ইদানীং এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। কিছু কিছু তরুণ পরিবারও এসবে সামিল হচ্ছে। এসবকে ঐত্যিহ্যের বাইরে বা মননের বাইরে বলে উপেক্ষাও করা যায় না। কারণ সবার জীবন বা সবার পারিবারিক গঠন এরকম নয়। যাদের গ্রামে-গঞ্জে বৃদ্ধ মাতা-পিতা বা নিকটাত্মীয়জন খুব একটা নেই বা যারা বছরের অন্য সময়ে লম্বা ছুটি পান না বা লম্বা ছুটির ব্যবস্থা করতে পারেন না তারাই হয়তো এই ধরনের উদ্যোগ নেয়। এই ধরনের আনন্দকে বাংলাদেশী বা বাঙালীদের নবতর অনুষঙ্গ।

গত দু’দশকে বাংলাদেশে বেশ ভালো একটা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ রওনক জাহান বলেছিলেন “বাংলাদেশে একটা নিও ভার্নাকুওলার এলিট শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে।” এখন আমরা সেই অবস্থানে নেই। এখন সৃষ্টি হয়েছে বলতে গেলে একটা ‘নিও ভার্নাকুওলার রিচ ক্লাস। এরা ঈদের বাজার বাংলাদেশে করে না। ভারতেও করেনা। ভারতে করে এদের থেকে নিচু শ্রেণির আরেকটি ক্লাস। ‘রিচ ক্লাসটি’ ঈদের বাজার করে থাইল্যান্ড, সিংগাপুর এবং মালয়শিয়ায়। মধ্যবিত্তের জন্য ভারত থেকে প্রচুর পোশাক আসে, আসে খাটো ও টাইট পাঞ্জাবী, ধুতির মতো সালোয়ার, আসে গলায় পরার জন্য উত্তরীয়। মেয়েদের জন্য শাড়ী, খাটো সালোয়ার কামিজ ও মাটি চুম্বিত লেহেঙ্গা। থ্রি-পিচ এর জায়গায় টু-পিচ এবং নানাবাহারী টি-শার্ট ও প্যান্ট। আগে ভারত থেকে টুপি, তসবিহ রুমাল ও আতর সুরমা আসতো এখন আর আসে না। আতরের বদলে আবাল বৃদ্ধবনিতা এখন ‘সেন্ট’ ব্যবহার করে। সেন্টে ‘এলকোহল’ আছে এখন এসব নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় না। মুসলমান দেশে মুফতীর অভাব নেই, যে অযু করতে জানে না সেও ফতোয়া দেয়।

পূর্বে বিয়ের সময় মেয়েদের সাজানো হতো। সাজাতেন এলাকার বর্ধিষু পরিবারের পৌঢ় ও অভিজ্ঞ মহিলারা। ঘরে কোণে চুপিসারে ও অতি সংগোপনে এ কাজটি করা হতো। এখন তো ঈদের সময় কিশোরী, তরুণী, যুবতী থেকে প্রৌঢ় মহিলারাও সাজ-গোছ করার জন্য বিউটি পারলারে যায়। অনেক টাকার প্রয়োজন হয় এসব সাজ-গোজের। এসব নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। যিনি পর্দা করছেন বা হিজাব ব্যবহার করছেন তিনিও যাচ্ছেন। চিন্তা করছেন না, কেন যাচ্ছেন কার জন্য যাচ্ছেন। ঈদ বলে কথা!

ঈদে বাঙালী মেয়ে বা মহিলারা পর্দা সরিয়ে ফেলে। যে মেয়ে বা মহিলা সারা বছর দুলাভাই, মামাতো ভাই, খালোতা ভাই, চাচাতো ভাই, ফুপাতো ভাই এবং দেবরসহ বেগানা পুরুষের সাথে দেখা করে না। ঈদের দিনে তিনি ‘লিবারেল’ বা ‘মডারেট’ হয়ে যায়। আরে একসাথে একটু না খেলে, একটু গল্প-স্বল্প না করলে বা একটু দাবা, লুডু না খেললে ঈদ কী হয়! ঈদের আনন্দতো এসবেই।

সিনেমা দেখার সঙ্গী হচ্ছে, দেবর-ভাবী, শালী-দুলাভাই এবং নানা ধরনের কাজিন। অনেক সময় মায়েরা গৃহশিক্ষক বা বয়স্ক কাজিনদেরও অনুরোধ করে ‘আমার মেয়েকে একটু সিনেমা দেখিয়ে আনো না। মেয়েটা ঈদের আনন্দই করতে পারলো না।’ এই অনুরোধ কেউ রক্ষা করে, কেউ করে না। এভাবেই ঈদের সময় ধর্ম থেকে সংস্কৃতি আলাদা হয়ে যায়। ধর্মহীন সংস্কৃতির বেড়াজালে বাঙালী মুসলমান আছড়ে মরে।

মধ্যবিত্ত বাঙালী মুসলমানের ঘরে রক্ষিত আতরদানী, সুরমাদানী, গোলাপজলদানী ও ধুপদানী ঈদের আগেই বের হতো। বসার ঘরের টেবিলে এসব সাজানো হতো। আতর, গোলাপজল ও ধুপকাঠিতে ঈদের দিন ঘরটি গন্ধে মৌ মৌ করতো। এখন আর এসবের বালাই নেই। ‘গতসঃ সূচনা নাস্তি!’

মনে আছে ১৯৯৯ সালে ৯৬ বছরে আব্বাজান ইনতেকাল করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ঈদের দিনে তিনি নিজে সুরমা ব্যবহার করতেন এবং আমাদের সাত ভাই ও ভাতিজাদের সুরমা পরাতেন! এখন আর কেউ সুরমা ব্যবহার করেন না। অনেকেই বলেন, এসব চোখের জন্য ভালো নয়। চোখে ধুলো-বালি ঢোকানো উচিৎ নয়! অথচ রাস্তার ধুলা-বালুতে চোখ আমাদের অন্ধ হওয়ার উপক্রম! ঈদ এলেই আব্বার সুরমাদানীর কথা মনে পড়ে!

রাজধানী ঢাকায় ঈদ উদযাপন করছি ১৯৬৯ সাল থেকে। অনেক কালের কথা! তবে ঈদ বলতে আমি রমজানের ঈদই উদযাপন করেছি ঢাকায়। তাও সবগুলো নয়। ঈদের নামাজ পড়ে গ্রামের পথে ছুটে গেছি বহুবার! পরের গাড়িতে বা নিজের গাড়িতে। একা ভ্রমণ করেছি বলে মনে পড়ে না। কেউ না কেউ জুটে গেছে। স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি সমভিব্যাহারেও গেছি বহুবার। সেসব এখন শুধু সুখ স্মৃতি।

ঢাকার প্রধান ঈদগাহে নামাজ পড়ার মজাই আলাদা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররামের প্রধান খতিবই এখানে ঈদের নামাজ পড়ান। মুফতি আমিমুল এহসান-এর পেছনে অনেকবার নামাজ পড়েছি। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা? মানুষটি ছিলেন ছোট-খাট। কিন্তু গলাটা ছিল সুমধুর! হারমোনিয়ামের প্রাঞ্জল বা সুষমাময় বিট অথবা অমিয় সুর-বুনি! একটা মায়াময় ঐন্দ্রজালিক পরিবেশে আমরা নামাজ পড়তাম। সুনসান সেই পরিবেশটা এখনও আমাকে টানে। তাঁর কথা আমাদেরকে স্পর্শ করতো। আমরা কাঁদতাম। চোখের পানিতে আমাদের পাঞ্জাবী ভিজে যেতো।

ঢাকা বহুমাত্রিক মেট্রোপলিটান সিটি। এখানকার ঈদ উদযাপন তো নানারকম।  ‘ঢাকাইয়া’ ছাড়া  অন্য সকল শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন জেলার। প্রতিটি পরিবার নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করে। তবে মজার বিষয় হলো ধার্মিক-অধার্মিক সকলেই ঈদ উদযাপন করে। যদিও ঈদ উদযাপনের সাথে ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থার একটা শক্ত সম্পর্ক আছে। ধর্মীয় বিধানের মূল বিবেচনা হলো, যারা পরিশুদ্ধভাবে সিয়াম পালন করেনি, তাদের আবার ঈদ কিসের? ঈদের একটি বাণী হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কৃতজ্ঞতার কারণে আনন্দ প্রকাশ করা। শুকর করা। শোকরিয়া প্রকাশ করা। ‘নফসে মুত্মাইন্না’ হয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আমার ওপর কিছু নির্দেশ ছিলো। কিছু আদেশ ছিলো। আবার কিছু নিষেধও ছিলো। ‘ডু’ এবং ‘নট টু ডু’ ছিলো। আমি নিষ্ঠাবান হয়ে আন্তরিকতার সাথে সব কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ। এখানেই ঈদ আনন্দের উৎস। প্রশান্ত আত্মা ও প্রশান্ত মনের ‘রিফ্লেকশনই’ আনন্দ। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দ প্রকাশ করবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। কষ্টকর সিয়াম সাধনার পর ঈদ। মজার ঈদ। অনুভবের ঈদ। উপলব্ধির ঈদ।

যিনি বা যারা রমজান মাসে সিয়াম সাধনা করলেন না মূল বিষয়টিকে উপেক্ষা করলেন, অবজ্ঞা করলেন বা এড়িয়ে গেলেন, তিনি কি সত্যি সত্যি ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন? দুঃখিত হৃদয় কি আনন্দ করতে পারে? অনুতপ্ত হৃদয় কি ঈদের আনন্দে গা ভাসাতে পারে? পারে না। তবু এ ধরনের মানুষও লৌকিকতার কারণে ঈদ উদযাপন করে, আনন্দ না পেলেও আনন্দের ভান করে। সামাজিকতা বলে কথা। এই সামাজিকতাই সংস্কৃতি। ঈদের সর্বজনীনতা এখানেই।

মসজিদের শহর ঢাকার ‘ঢাকাইয়ারা’ শাবান মাস থেকেই ঈদ উদযাপন করে। যারা সারা বছর নামাজ পড়ে না, তারা নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। জামা-কাপড় ঠিক-ঠাক করে। কুরআন পড়ার প্রস্তুতি নেয়। ইফতারে এবার কি কি আইটেম থাকবে, সাহরিতে কি কি অনুষ্ঠান হবে এবং খাওয়ার মেনু কী হবে সবই আগে-ভাগে অর্থাৎ শাবান মাসেই ঠিক হয়ে যায়। গৃহাভ্যন্তরে মেয়ে বা মহিলারা ঘর, দুয়ার থেকে শুরু করে আবাস স্থলের সকল কিছু পরিচ্ছন্নতার অভিযান শুরু করে শাবান মাস থেকে। রমজান মাসে মহিলারা ঘুমের সময় খুব একটা পাননা। এ মাসে ঢাকাইয়া মহিলাদের ঘুমের সময় হলো ফজরের পর থেকে সকাল এগারটা। রাতে বড় জোর ১টা থেকে ৩টা। রান্না-বান্না, মেহমানদারী, মসজিদে ইফতারী দেয়া, ইমাম-মুয়াজ্জিন-হাফিজ সাহেবদের জন্য বিশেষ খাবার তৈরি এবং ওয়াক্তিয়া নামাজ, তারাবিহ, তাহাজ্জদ, কুরআন পাঠে তাদের সমস্ত সময় কেটে যায়। পুরান টাউনে যেনো শাবান মাস থেকেই ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায়। স্বামীবাগ, নারিন্দা, সূত্রাপুর লক্ষ্মীবাজার, কলতাবাজার, বাংলাবাজার, তাঁতিবাজার, নয়াবাজার এবং উয়ারী রেঙ্কিন স্ট্রিট এলাকায় বহুবছর বসবাস করেছিলাম। দেখেছি, ঈদে ঢাকাইয়ারা কী উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রাণের জোয়ারে কাঁপতে থাকে পুরো দক্ষিণ ঢাকা। সারা বছর যে তরুণরা নামাজ পড়েনা তারাই দলবেঁধে ২০ রাকাতের তারাবিহ পড়ে মহা উচ্ছ্বাসে এবং মহাআনন্দে। সাহারির সময় জাগানিয়া গান নিয়ে এখনও তারা মেতে আছে। তারা দরুণ ঐতিহ্যিক। বাপ-দাদার আমল অনুষ্ঠানকে তারা ভোলে না। ভুলতে দেয় না। এসবেই তারা নিজেদের পরিচয় খোঁজে। নিজেদের ঠিকানা খোঁজে। এখানে পরিবর্তন আসে ধীরে। ধীরে বহে বুড়িগঙ্গার মতো।

ছোটকালে পঞ্চাশ দশকে দেবীগঞ্জে হিন্দু-সাথীর গায়ে ঈদ জামা চড়িয়ে যেভাবে ঈদের গল্প শুরু করেছিলাম, আশির দশকে ঢাকার নয়াপল্টনে বসবাসকালে ঠিক একই ধরনের ঈদ ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমার ছেলে বান্নার বন্ধু জয়ও ঈদ জামার জন্য মন খারাপ করেছিলো। সে যাত্রাতেও একই সমাধান খুঁজতে হয়েছিলো। জয়কে ঈদ জামা না দিয়ে পারা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার হৃষিকেশ বাবু জয়কে বোঝাতে পারেননিÑ ‘ঈদ আমাদের উৎসব নয়।’ ঈদ আসলেই বাংলাদেশে সার্বজনীন উৎসব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ