ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদের নামাজ-ঈদের শিক্ষা

মাওলানা মুফতী মোঃ ওমর ফারুক : ঈদ আরবী শব্দ এর আভিধানিক অর্থ খুশি বা আনন্দ। ঈদ বলতে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ কে বুঝায়। ঈদ শব্দটি আরবী উয়ূদ শব্দ হতে গৃহীত। এর অর্থ বারবার ফিরে আসা । যেহেতু ঈদ প্রতি বছরই ফিরে আসে এবং এলাকার লোকজন ঈদের মাঠে গিয়ে একত্রিত হয়ে কুশলাদি বিনিময় করে আনন্দ লাভ করে তাই তাকে ঈদ বলা হয়। প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহ দ’ুটি ঈদ উদযাপন করে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন যা ঈদুল ফিতর নামে পরিচিত। আর একটি যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ যা ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ হিসাবে বিশ^ মুসলিম উম্মাহর নিকট পালিত হয় যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।ঈদ মুসলমানদের আনন্দের দিন পুরস্কার প্রাপ্তির দিন দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনের পর ফলাফল বা রেজাল্ট প্রকাশের দিন। কিন্তু রেজাল্ট কাদের জন্য, যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালভাবে পরীক্ষা দিয়েছে তারাই কেবল ফলাফলের প্রত্যাশা করতে পারে কিন্তু আর্শ্চয্য জনক হলে ও সত্য যে এ দেশে মাহে রমজানের এক মাসের পরীক্ষায় অংশ গ্রহন না করে ও অনেক মুসলমান প্রথম সারির পুরস্কার নেয়ার লোভে সবার আগের কাতারে বসেন।

ঈদের নামাজের হুকুম: ছয় তাকবীরের সাথে দু’রাকাত নামাজ পড়া ওয়াজিব। এতে সকল ইমামগণ ঐক্যমত পোষন করেছেন। রাসুল (সা:) মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের পর থেকে নিয়মিত তা আদায় করেছেন। জীবনে কখনও তরক করেন নি, ছেড়ে দেন নি। 

নামাজের ওয়াক্ত বা সময়: সুর্য্যাদয় হওয়ার পর হতে সূর্য্য মধ্যে আকাশে উপনীত হওয়ার মধ্যবর্তী যে কোন সময় পড়তে হবে। সূর্য্য পশ্চিম দিকে ঢলে গেলে এ নামাজ পড়া যাবে না। কোন কারণ বশত সূর্য্য মধ্য গগণে উপনিত হওয়ার পূর্বে নামাজ আদায় করতে না পারলে ঈদুল ফিতরের নামাজ পরের দিন ও ঈদুল আজহার নামাজ ১২ই যিলহজ্ব পর্যন্ত ঐ ওয়াক্তে আদায় করা যাবে।

ঈদের নামাজের স্থান: ঈদের নামাজ ও জুম্মার নামাজের মত জামাতে পড়তে হবে। একাকি এ নামাজ আদায় করা যাবে না। জুম্মার নামাজ মসজিদেই আদায় করা হয়। ঈদের নামাজ মাঠে পড়া উত্তম ও সুন্নত। বিনা ওজরে ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় করা মাকরুহ। (ঝড়, বৃষ্টি তুফান, মাঠের ব্যবস্থা না থাকা) ইত্যাদি ওজরে ঈদের নামাজ মসজিদে পড়া যায়। 

নি¤েœ এর দলিল সমূহ উল্লেখ করা হল:

(১) রাসূল (সা:) এর জীবনে মাত্র একবার প্রবল বৃষ্টির কারণে ঈদের নামাজ মসজিদে পড়েছিলেন। আর বাকী সারা জীবনই মাঠে পড়েছেন।

(২) রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেন যে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় কর। (বুখারী শরীফ)

(৩) হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূল (সা:) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। (বুখারী শরীফ)

(৪) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল (সা:) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যেতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। যার আগে বা পরে আর কোন নামাজ পড়েননি। তিনি আরো বলেন, রাসূল (সা:) এক পথে ঈদগাহে যেতেন এবং অন্য পথে ঈদগাহ হতে বাড়ি ফিরতেন। 

(৫) হযরত জাবীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) দুই ঈদের উদ্দেশ্যে বের হতেন এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে বের হওয়ার নির্দেশ দিতেন। (মুসনাতে আহম্মদ)

(৬) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) দুই ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহের দিকে বের হতেন। এবং তাঁহার কন্যা ও স্ত্রীগণকে ও বের হতে নির্দেশ দিতেন।

(৭) হযরত আয়শা (রা:)হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুল (সা:)কে জিজ্ঞাসা করা হলো মহিলারা কি ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে যাবে? তিনি বললেন হ্যাঁ অবশ্যই। জিজ্ঞাসা করা হলো “যুবতী মেয়েরাও কি বের হবে”? তিনি বললেন হ্যাঁ। রাসূল (সা:) আরো বলেন নিজের কাপড় না থাকলেও কোন সঙ্গী সাথীর কাপড় পরে ঈদগাহে যাবে। (তিবরানী)

(৮) হযরত উম্মে আতীয়াহ (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) আমাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে যুবতী, অন্তঃপুরবাসিনী ও হায়েয সম্পন্না মহিলাদেরকে ঈদগাহের মাঠে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। (মুসনাতে আহম্মদ)

(৯) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) একবার ঈদের দুই রাকাত সালাত আদায় করেন এবং এর আগে পরে আর কোন সালাত আদায় করেন নি। তারপর তিঁনি মহিলাদের কাছে আসেন এবং তাদেরকে সদকা করার নির্দেশ দেন। তখন উপস্থিত মহিলারা নিজেদের কানের দুল, নাকের বালা ইত্যাদি দান করল, সাথে হযরত বিলাল (রা:) ও উপস্থিত ছিলেন। (বুখারী শরীফ)

(১০) ইজমা: - উল্লেখিত হাদিস ও রাসূল (সা:) এর সুন্নাহর উপরে সকল আলেম ওলামা ঐক্য মত পোষণ করেছেন যে বিনা ওজরে ঈদের সালাত মসজিদে  পড়া মাকরূহ। ঈদের মাঠ থাকা অবস্থায় ঈদের নামায মসজিদে আদায় করা যাবে না।  

(১১) হযরত বুরাইদা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) কিছু না খাওয়া পর্যন্ত ঈদগাহে বের হতেন না এবং ঈদুল আযহার দিন নামাজ না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না।

আমাদের করণীয়: উপরোক্ত হাদিসে কারীমাহ ও মাসাআয়ালার কিতাব হতে এটা পরিষ্কার যে ঈদের নামায শুধু পুরুষের জন্য নয় বরং মহিলারা ও ঈদের নামাজ আদায় করবে ঈদগাহে যাবে এটাই সুন্নত। অথচ আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক এলাকা আছে যেখানে মহিলাদের ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করা হয় আর অধিকাংশ এলাকা এবং ইমাম সাহেবগণ মনে করেন যে মহিলারা ঈদগাহে যাবে না তাদের ঈদগাহে যাওয়া কে ফিৎনা বলে এড়িয়ে চলেন। মহানবী সা: তাঁর নিজের বাস্তব আমল সাহাবায়ে আজমায়ীন, মক্কা-মদিনাসহ পৃথিবীর সকল মুসলিম রাষ্ট্রে যা নিয়মিত আমল হচ্ছে। অথচ এদেশে কিছু খোঁড়া অজুহাতে ইসলামের বড় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান লংঘন হচ্ছে।

মাসআয়ালা-০১ ঈদের নামায  মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে পড়া সুন্নত আর ঈদের মাঠ শহরের বাহরে হওয়া সুন্নত। কেননা রাসুল (সা:) আজীবন মদিনার পাশে বিশাল প্রান্তরে ঈদের নামায আদায় করেছেন। শুধু বৃষ্টির কারণে জীবনে একবার ঈদগাহে না গিয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।

মাসআয়ালা-০২ ফতোয়ার কিতাব দুররে মুখতারে রয়েছে ঈদের নামাজের জন্য বৃহৎ ময়দানে বের হওয়া সুন্নত। যদিও জামে মসজিদ থাকে এবং লোক সংকুলান হয়।

মাসআয়ালা-০৩ ঈদের নামাজের জন্য ইমাম সাহেব বিশাল প্রান্তরে বের হওয়া সুন্নত। ইমদাদুল ফতোয়া ১ম খন্ড পৃষ্ঠা নং ৬১০। দুররে মুখতার ১ম খন্ড পৃষ্ঠা নং ৭৭৬। আহসানুল ফতোয়া ৪র্থ খন্ড পৃষ্ঠা নং ১১৯। ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়াতে রয়েছে ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে পড়া সুন্নত। ঝড় বৃষ্টি অথবা অন্য কোন ওজর থাকলে মসজিদে পড়া জায়েজ। তবে রাসূলের অনুসরণের ফজীলত থেকে বঞ্চিত থাকবে। ফতোয়ায়ে মাহমুদিয় ২য় খন্ড পৃষ্ঠা নং ২৯৬। 

হযরত বকর ইবনে মোবাশ্বের আল আনসারী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার দিন আমরা রাসূল (সা:) এর সাথে ঈদগাহে যেতাম এবং রাসূল (সা:) এর সাথে নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরতাম। আবু দাউদ পৃষ্ঠা ১৬৪। 

 সর্বোপরি পবিত্র কোরআনে সুরা হাশরের ৭ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- তোমাদের জন্য রাসুল (সা:) যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহন কর এবং যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন কর ।

আরো এরশাদ হচ্ছে “হে নবী আপনি বলুন তোমরা যদি আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ কর, তাহলেই তোমরা আল্লাহর ভালবাসা পাবে, আর তিনি তোমাদের অপরাধ সমুহ ক্ষমা করে দেবেন নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াময়। (সুরা আলে ইমরান আয়াত ৩১)

শেষ কথা: গ্রামের ছোট ছোট পাঞ্জেগানার সামনে অথবা ছোট ছোট মসজিদের সামনে তো দূরের কথা স্বয়ং রাসুল (সা:) মদিনা শহরেই ঈদের নামাজ আদায় না করে শহরের সন্নিকটে মদিনার পার্শ্বে এক বিশাল মাঠে আজীবন ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। মাত্র একবার প্রবল বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।

ঈদ মুসলমানদের মহা উৎসব। যেখানে সকলে মিলে মিশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধনী গরীব, সাদা কালো, ছোট বড় রাজা প্রজা এক সারিতে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর নামের যিকিরে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলবে।

একতা ঐক্য ভ্রাতৃত্ব পরস্পর ভাই ভাই হয়ে নব উদ্দোমে ঈদের শিক্ষাকে কাজে লাগানোর প্রেরণা নিয়ে ঈদ উদযাপন করা সময়ের দাবী,আল্লাহর নির্দেশ, রাসুলের আদর্শ। তাই আসুন,ঈদের নামাজ মসজিদের মধ্যে বা মসজিদের সামনে সামান্য এক টুকরা জায়গা যা ঈদের মাঠের জন্য নির্ধারীত নয় সেখানে আদায় না করে ঈদের মাঠে বৃহৎ আকারে নারী-পুরুষ মিলে সম্মিলীতভাবে পড়ার ব্যবস্থা করা,যা সুন্নত,উত্তম এবং যুক্তিযুক্ত। ঈদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের তাই করা উচিৎ। আল্লাহ আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ