ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবিতা

দ্বন্দ্বে ছন্দে দূরবর্তী

হাসান হাফিজ                                        

 

নিদ্রা আর জাগরণ একাকার

রাত্রি দিনও এক লপ্তে একাকার

কিন্তু কেন বিরহ-মিলন দুয়ে দূরবর্তী রয়?

বুঝে পাই না জেগে থাকে  অলক্ষ্য সংশয়

তাহলে প্রাপ্তির লোভ সত্য কিছু নয়?

জাগরূক ঝাউপাতা রাতচরা পাখির প্রণয়

সন্দেহের প্রবণতা জেগে থাকে এবং খোঁচায়

মিলনের পথ চেয়ে বিরহের বুক ভেঙে যায়

মিলন কেন যে এত বিরহকে বেহুদা ডরায়

বুঝি না সে কেন ছোটে অন্য দিকে ভিন্ন ঠিকানায়...

 

মেগাসিটি ঢাকার দুর্ভোগ

শেখ এনামুল হক

 

 যানজটে নাকাল ঢাকাবাসী

কোন সমাধান নেই

দিল্লীর মত গাড়ীর চলাচলে

জোড় বেজোড় সংখ্যার

হলেও কিছুটা বাঁচা যেতো

ঢাকার খালগুলো সব

প্রভাবশালীদের কব্জায়

এদের ক্ষমতার দাপটে

সরকারও অসহায়!

একটু বৃষ্টি হলে ঢাকা শহরে

পানি থৈথৈ করে

নৌকা চলে সড়কে

জনজীবন হয়ে যায় স্থবির

কোমর পানিতে বাস-ট্রাক অচল

গাড়ি আর রিক্সা একাকার পানিতে।

সুনীল আকাশে মেঘের ভেলা

এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে

ঘুরে বেড়ায় শঙ্কাহীন জীবন।

হিজল বনে পাখীদের নিঃশঙ্ক অধিবাস

সুন্দরবনে বাঘ-ভল্লুকের

জীবনেও শঙ্কা নেই

অথচ ঢাকাবাসীর জীবনে

এন্তার দুর্ভোগ

শেষ হবে কবে?

 

সিয়ামের সৌরভ

হাসান আলীম

 

মাহে রমজানে সিয়ামের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে

ঘরে ঘরে মা বোনেরা ইফতারি তৈরীতে ব্যস্ত,

বাহারী শরবত পেয়াজু, আলুর বড়া, বেগুনী, ঘুঘনী

হরেক রকম ফল ফলারীতে ট্রে সাজিয়ে রাখছে ডাইনিং টেবিলে।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেউবা তছবি তাহলীল করছেন।

ঘরে ঘরে পাড়া মহল্লা, হাট বাজার বিপণী বিতানে

বাহারী ইফতারির পশরা বসেছে।

 

পুরোন ঢাকা, মোগলটুলী, শাখারী বাজার,

বৌ বাজার, মৌলভী বাজার, শাহবাগ, বেইলীরোডের নাটকপাড়া,

মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে

রাস্তার দু পাড়ে চলছে বাহারী ইফতারীর আয়োজন।

আস্ত মুরগীর মুসাল্লাম, খাসীর ভাজা রান, কাবাব, কালিয়া, কোপ্তা

আরো নানান বাহারী ইফতারি সাজিয়ে নবাব বাড়ির দেউড়ী থেকে

ডাক উঠছে বড় বাপের পোলায় খায়।

 

হোটেল, রেস্তোরা, র্পাক, এভিনিউ, সংসদ ভবন,

সর্বত্র চলছে ইফতার পার্টির জাকজমক আয়োজন।

রমজানে পুরো ঢাকা শহর যেন

উৎলানো দুধের কড়াই।

রোজাদার শুধু নয় সবাই বসেছে ইফতার মাহফিলে

সর্বজনীন আনন্দভোজ।

 

সবাই অপেক্ষা করছে

রোজার বয়ান শুনছে কখন আযান হবে

হাইযা আলাল ফালাহ্

শুরু হবে শরবত মুখে দেয়া

আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ইফতারতুৃৃৃ

 

কি মধুর দৃশ্য জ্যামঘন ঢাকার দৃশ্যপট পাল্টে যায়

ইফতারির পূর্ব মুহূর্তে-শুনশান ফাঁকা, গাড়ীহীন রাজপথ

যেন এক গভীর হরতাল নেসমছে

কোন এক মহান নেতার আহবানে।

 

পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে অন্নহীন দরিদ্রভূখার মিছিল

প্রলম্ব হচ্ছে,

হররোজ রোজা তাদের, দুমুঠো খাবার নেই-

তদুপরি ঘাতকের ছুরি, বন্দুকের গুলি

তাদের বক্ষ ঝাঝারা করে দিচ্ছে-

তারাও অপেক্ষা করছে পরম এক সিয়ামের

কখন আযান হবে-

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।

 

গোরস্তানের কবিতা

সায়ীদ আবুবকর

 

ভাঙা গোরস্তানের পাশে

 

এ কেমন গোরস্তান, নেই সাজগোজÑ 

উঠেছে জঙ্গল জেগে বুকের উপর;

এখানে দিবস আসে রাত্রি হয়ে রোজ,

রাত্রি এলে ত্রিভুবন কাঁপে থরথর

 

কবরের বাসিন্দারা ছিলো রাজহালে,

ছিলো কত বিদ্যা, বুদ্ধি, শৌর্য, শিল্পবোধ;

তারাই নায়ক ছিলো তাহাদের কালে,

চমকাতো চতুর্দিকে সাফল্যের রোদ

 

তাদেরই কবর আজ পড়েছে যে ধসে,

উঠেছে জঙ্গল জেগেÑএ-কি পরিহাস!

কালের ট্রাক্টর গেল এ-জীবন চষে,

দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেল দুর্ভাগ্যের লাশ

 

কোথাও দেখি না আজ জীবনের চিহ্ন 

কালের করাল গ্রাসে সবই ছিন্নভিন্ন

 

 

জনৈক কবরবাসী

 

চামড়ার চক্ষু দিয়ে, হে পথিকবর,

কেবলি দেখলে নগ্ন ধ্বংসের স্তূপ

দেখতে পাও না ভাঙা সমাধির ’পর 

ঝলসে উঠেছে হুরে আয়নার রূপ 

 

কত দূর দেখা যায় চামড়ার চোখে!

সপ্ত আকাশের পরে আছে যে জগত.

যে-জগত ঘিরে আছে অপার সত্যকে,Ñ

পাঁক খায় তার মধ্যে মহাকাল ¯্রােত

 

এ আঁধারে জ্বলে নেভে অনন্তের দীপ,

হাড়ে এসে লাগে শুধু সুগন্ধি হাওয়া

গোরে শুয়ে জীবনকে করো না জরিপ

অর্থহীন হয়ে যাবে সব চাওয়া পাওয়া

 

দুচোখে যা দ্যাখো তা-ই শেষ সত্য নয়

চোখের আড়ালে আছে অপার বিস্ময়।

 

কমলাপুর জংশন

নয়ন আহমেদ

 

কমলাপুর জেগে আছে কমলাপুরের ভেতর।

গভীর গল্প নিয়ে

মনোযোগ বুকে নিয়ে

পথ কোলে নিয়ে

চাকার হৃদয় নিয়ে

উৎসুক হয়ে আছে কমলাপুর।

একটা কমলাপুর থেকে একশো কমলাপুর;

একশো থেকে একশো হাজার।

জনস্রোতের হৃৎপি- থেকে

ছড়িয়ে পড়ছে উপাখ্যান।

ঘরগেরস্থালির রূপরেখা

দেখা দিচ্ছে স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা বাস্তবের মতো।

একাই সব মনোযোগ বহন করছে কমলাপুর।

একাই ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্রের ভেতর।

 

বলি,কমলাপুর হও।

কমলাপুর হও।

কমলাপুরের ভেতর আছে সহস্র বাড়ি;

সহস্র চুল্লির ব্রতকথা;

রান্নাঘর সংলগ্ন কাহিনি।

চায়ের ধোঁয়ার যৌবন

কিংবা কোমল প্রতিযোগিতার সমূহ কম্পন।

আছে একটা নিবিড় বাংলাদেশ;

চিরায়ত লোকালয়।

 

একবার কি কমলাপুর হবে?

হবে না কি একটা পরিপূর্ণ কমলাপুর জংশন?

 

দোকানীর নাটাই  

কামাল আহসান

 

আগুনের হাত দিয়ে ইশারা ছড়ায় জানি

কতজনের যাওয়া হয় না আর হাটখলা,

চৌরাস্তার মোড়ের দোকানী; অভাগিনী,

বহুবিক্রির মাঝঘরে কাঁদছে সারাবেলা।

 

হাটে ওঠা বড়ই কঠিন, সব পায়েরা চেনে না পথ;

দোকানির নাম রাখা নিজ নামে 

তবু ভুলে যায় সব,

কারখানার ছাদের পানি বিপ্লব শেখায়, 

শেখায় সপথ। 

 

এরপর জেগে থাকে চৌদিকে নজর;

নিজের ঘুড়ির নাটাই ঘোরানোর স্বর।

 

কানের ফুল

মাসুম মীকাঈল

 

ভুলে গেছি আমার দেখা বিগত বছর

ভুলে গেছি শাশ্বত ভুল

তোমায় দিতে পারিনি তোমার কানের দুল

হায়রে! কানের ফুল

এক আনা সোনায় হয়তো পেতাম

দু-তিন-পাঁচ আনায় 

পকেট শূন্য কয়েক বছর জীবন দো-টানায়

দোলাতে পারিনি দুল হায়রে কানের ফুল

চলে গেল দিন বছর পাঁচেক তিন

বেড়ে গেল ঋণ মনের খাতায়

এক জোড়া দুল জোটে ক’টাকায়

হায়! আফসোস কর্ণলতায়

দোলাতে পারিনি দুল

হায় রে! কানের ফুল॥

 

 

ঈদ কথা

পঞ্চানন মল্লিক

 

হে

পাক

পারওয়ার

দিগার

আহালান

সাহালান

শেষ হলে

মাহে রমজান

খুশির সওগাত

তুমি এনে দিলে

ফিরে পেয়ে হিরে রং

নুরময় এক ফালি চাঁদ

পয়গাম নিয়ে ঈদের মাঠে যাই

ফের ফিরে আসি নুরের আলো পেয়ে

চন্দ্রমুখিরা হেসে খেলে চায় চন্দ্রের পানে

ত্যাগের মাহাত্ম্য কথা জেগে থাকে অম্বুর গায়

এমন শুভক্ষণ এলে আমরাও যে উৎসবে মাতি

আমাদের ঈদখোলা ভরে ওঠে হৃদ মেলা গানে

বিভূঁই বিদেশ থেকে স্বজনেরা এলে ফিরে সবে

আমাদের গাঁও ভরি মেতে উঠি ভ্রাতৃত্বের প্রেমে

আহা ঈদ এলে মিলি সবে আবার পরাণে পরাণে।

 

কবিতার ডোমঘর

শাহিদ উল ইসলাম

 

ফেলতে যেয়েও পারি না ফেলতে

কবিতার খসড়া পাতাটি

কেমন এক মায়াজাল যেন

আচ্ছন্ন করে রাখে মন।

কত যে কবিতা লাশ হয়ে

আছে পড়ে কবিতার ডোমঘরে!

কত যে কাটাছেড়া আর জোড়াতালি

তবুও উঠে দাঁড়ায় না সে! 

এ ব্যর্থতা ভেবে ভেবে একদিন

বৃষ্টিতে ভিজেছি খুব

এবং সেদিন নয়ন জলে

ধুয়ে দিয়েছি বৃষ্টির জল।

বেদনার বালুকণা যেভাবে

ঝিনুকবুকে মুক্তা গড়ে

তেমনি কবিতা তুমি

আমার মনে দুঃখ হয়ে রক্ত ঝরাও;

তবু তোমাকে ভালবাসি

এবং ভালবেসে বেসে অনাথ হয়ে যাই

কেননা তুমি কেবলি লাশ হও

আর থাকো পড়ে কবিতার ডোমঘরে!

 

একলা দুপুর অথবা খুব নিশিথে

রাজু ইসলাম

 

আমার কেবল মন পরে থাকে নদীর ধারে

ইছামতির সেই ইট বাঁধানো পাড়

বালি আড়ি ভেঙে ভেঙে পরা সেই বিকেল

বাতাসের ঝাপটায় জলের বিন্দুগুলো

উড়ে উড়ে আসতো আমাদের কোলের কাছে

পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থাকা বটের শিকড়

আমাকে ডাকে ওরা, কি নিশিথে কি দুপুর

প্রতিটি নিঃসঙ্গতায় প্রতিটি মৌনতায়।

বাতাসের আন্দোলনে উঠোনের টিলার মতো

প্রতিটি ছোট ছোট ঢেউয়ের ভাঁজে

মিশে থাকা নিঃসঙ্গতা মাথাচারা দিয়ে ওঠে

এই সব একলা দুপুর কিংবা খুব নিশিথে।

সবুজ ঘাসের ডগায় পিঁপড়েদের হেলান দেয়া দেখে

হঠাৎ আমারও সাধ জাগে তোমার পেলব জানুতে

মাথা রেখে দেখি পাখিদের আকাশ আকাশ খেলা।

 

 

রুবাইয়াৎ

শাহীন সৈকত

১.

অভিনয়ে পাকা তিনি মিথ্যা কথায় ঝানু

সবাই মিলে নাম দিয়েছে তাই বুঝি কি শানু

পুষ্প প্রেমে মত্ত থেকে কালো গোলাপ খোঁজা

চারপাশে আজ দেখছি আমার ঘুরছে সবাই রানু।

 

২.

মিথ্যা বলা পাপের মধ্যে অনেক বড় জানি

বাদ দিতে কি মিথ্যা বলা আমরা সেটা মানি?

সামনে এলে খুলে যেত মুখোশ খানি তার

পারলে সে যে হয়েই যেত সবার প্রিয় রাণী।

 

৩.

বনের গুল্ম বনেই বেড়ে ওঠে লতা'রাও থাকে পাশে

বৃষ্টির ছোঁয়ায় পত্র-পল্লবে পুষ্পেরা সব হাসে

লতানো গুল্মের মায়ায় পরে তুমি যদি সব ছাড়ো

দেখবে তুমি তোমার হৃদয় পদ্মপুকুরে ভাসে।

 

আয়োজন

হাসান নাজমুল

 

সুদক্ষ মিস্ত্রির মতো যে-ঘর গড়েছি আমি

সে-ঘরে আয়েশে বসে আছো, আবার কখনো

চোখে স্বপ্নজাল বুনে বুনে ঘুমিয়ে পড়ছো,

তোমাদের স্বপ্ন দ্যাখা ফুরোবে না কখনও,

স্বপ্নের ভেতরে জেগে জেগে হাঁটছো তোমরা-

আরেক স্বপ্নের বিশ্বে; যে-বিশ্বে নিঃস্ব নেই;

যে-বিশ্ব সাজানো আছে কিশোরীর কল্পনায়,

যে-বিশ্ব সবুজে ভরা, মায়াবী-মায়ায় ঘেরা;

তোমরা প্রত্যহ শুধু দেখছো সুখের স্বপ্ন,

অথচ অনিদ্রা নিয়ে রাতের বাসরে আমি-

পড়ে আছি শুধু একা; আমিই তো আয়োজন-

করেছিলাম এসব অনাবিল আনন্দের!

এখন দ্বন্দ্বের সাথে আমার কাটছে কাল,

আমার শৈল্পিক হাতে গড়া ঘরের ভেতর

তোমরা আটকে আছো স্বপ্নিল জালের সাথে,

শুধু আমারই ভেঙে গেছে সব আয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ