ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভ্যাটের স্তর কমানোর চাপ মধ্যবিত্তের ঘাড়ে

এইচ এম আকতার: প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা। মূল্য সংযোজন কর(মূসক) বা ভ্যাটের স্তর কমানোর চাপ মধ্যবিত্তের ঘাড়ে। এরই মধ্যে  পোশাক, ফার্নিচারসহ কিছু পণ্যে গুণতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। এ কারণে ঈদের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দাবি ব্যবসায়ীদের। আর অগ্রিম ভ্যাট বাড়ানোয় দাম বাড়বে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানি করা পণ্যের। একইভাবে পাঠাও-উবারে ভ্যাটারোপ করায় খরচের খাত আরও দীর্ঘ হবে। কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারন কৃষকরাও। সব মিলিয়ে বাজেট মধ্য আয়ের লোকদের জন্য কোন সুখবর নেই।

মধ্যবিত্তের চাহিদায় দেশে গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাকের অনেক প্রতিষ্ঠান। এতোদিন এসব পোশাক কেনায় সংকুচিত হারে একশ টাকায় চার টাকা ভ্যাট আদায় করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এই ভ্যাট এক শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, নিজস্ব ব্র্যান্ড নয় এমন তৈরি পোশাকেও এখন সমান হারে ভ্যাট দিতে হবে।

ঘর সাজাতে যারা আসবাবপত্র কেনার কথা ভাবছেন, এবারের বাজেট তাদেরও দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ প্রস্তাবিত বাজেটে উৎপাদন ও বিক্রি দুই পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে এক শতাংশ করে।

দশমিক পাঁচ শতাংশ ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে ছোট ফ্ল্যাট ও তথ্য প্রযুক্তি সেবায়। আমদানিতে অগ্রীম ভ্যাট এক শতাংশ বাড়ানোয় দামও বাড়বে অনেক নিত্যপণ্যের। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভ্যাট স্তরের এই পুনর্গঠন চাপ বাড়বে মধ্যবিত্তের। 

সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে দাম বাড়বে আমদানি করা কফি, মধু, বাদাম, গ্রিন টি, চকলেট, ওটস, ইউপিএস, আইপিএস, আমদানি করা মোবাইল ফোন, ব্যাটারি-চার্জার ও বিদেশি প্রসাধনীর। পরিবহন সেবায় উবার, পাঠাওয়ের মতো অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপরও ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

সাধারন জনগনের করের টাকার সমষ্টি হলো জাতীয় বাজেট। কিন্তু সেই বাজেটের টাকায় সরকার সাধারনে জনগনের স্বার্থে ব্যয় কম করে দুনীতিবাজদের পুনূবাসনের জন্য ব্যয় করছে। এতে করে জনগনের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব পন্য কিংবা সেবার ওপর করের পরিমান বাড়িয়েছ্ েঅথবা নতুন করে করারোপ করা হয়েছে তা সবই সাধারন জনগনের সাথে সম্পৃক্ত। একইভাবে বাজেটে ধনীদের আরও বেশি সুবিধা দেয়া হয়েছে। এতে করে ধনীরা আরও ধনী হবে আর গরিবরা আরও গরিব হবে। আর এ কারনেই দেশের রাজনীতিবিদরা বলছেন,এটি গরিব মারার বাজেটে। এতে সাধারন জনগনের কোন কল্যান নেই। একইভাবে এ বাজেটে সবচেয়ে আক্রান্ত হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা।

পাঠাও-উবারের মতো অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সার্ভিসকে করের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাইড শেয়ারিং সেবায় মোটরযান সেবা প্রদানকারীদের রিটার্ন দাখিল এবং ১২ ডিজিটের এনআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে এবার থেকে নতুন করের আওতায় আসল রাইড শেয়ারিং সেবা। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোন অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনের রাইড শেয়ারিং সেবার ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার কেনাবেচা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পণ্য বা সেবার পরিসরকে আরও বাড়াতে ভার্চুয়াল বিজনেস নামে একটি সেবার সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকেনো পণ্য বা সেবার কেনাবেচা বা হস্তান্তরকে এ সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। তাই এটিকে ভার্চুয়াল বিজনেস সেবার আওতায় এনে ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং কোম্পানি মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিবহন মালিক বা চালকদের নিয়োগ করে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যাত্রীপরিবহন সেবা দিচ্ছে। মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক এ সেবার বিপরীতে যাত্রী নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর পর চালককে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া পরিশোধ করে থাকে। এ সেবা মূল্যের বা ভাড়ার একটা অংশ মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে। 

সাধারণ মধ্য আয়ের মানুষরা যাতায়তে উবার-পাঠাও ব্যবহার করে থাকেন। যাদের আসলেইগাড়ি কেনার সামর্থ নেই। পরিবার পরিজন নিয়ে বের হতে চাইলে পাবলিক পরিবহনের কোন উপায় নেই। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর কেন ভ্যাটারোপ করা হলো তা বোধগম্য নয়।

জানা গেছে,পুরাতন গাড়িতে এবার নতুন করের করের আওতায় আনা হয়েছে। সিসি ভেদে ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু হাইব্রিড গাড়িতে কোন ধরনের করারোপ নেই। একজন মধ্য ভিত্তি ব্যক্তি সাধারন পুরাতন গাড়ি ক্রয় করে চলাফেরা করেন। কিন্তু এই করারোপের ফলে গরিবরা গাড়ি ক্রয়ে উৎসাহ হারাবে।

 প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ছোট ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এর ফলে ছোট ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি বাড়বে দশমিক ৫ শতাংশ। আর মাঝারি ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি কমবে দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে ছোট ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ১ দশমিক ৫ শতাংশ আর মাঝারি ফ্ল্যাট ভ্যাটের হার রয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

একই সঙ্গে যারা পুরনো ফ্ল্যাট কিনবেন তাদেরও খরচ বাড়তে পারে। কারণ নতুন অর্থবছরে পুরনো ফ্ল্যাট পুনঃনিবন্ধনে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হ”েছ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছর থেকে ছোট ফ্ল্যাট (১ থেকে ১১০০ বর্গফুট) কেনায় খরচ বাড়তে পারে। আর মাঝারি (১১০১ থেকে ১৬০০ বর্গফুট) ফ্ল্যাট কেনার খরচ কমতে পারে। কেননা বর্তমানে ১ থেকে ১১০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ১ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। আর ১১০১ থেকে ১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ভ্যাটের হার রয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বড় ফ্ল্যাট (১৬০১ থেকে বেশি) নিবন্ধনের ভ্যাট হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে।

এখানেও মাঝারি ফ্লাটের করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এতে করে মধ্য শ্রেনীর মানুষ ফ্ল্যাট ক্রয়ে ব্যয় বাড়বে। সরকার বড় ফ্ল্যাটে করের পরিমান না বাড়িয়ে কেন ছোট ফ্ল্যাটের দাম বাড়লেন তা কারো বোধগম্য নয়। এতে করে ধনীদের আর বেশি সুবিধা দেয়া হয়েছে।

অনলাইনভিত্তিক পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর সেবার উপর ৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয়ের পরিসর বাড়াতে ‘ভার্চুয়াল বিজনেস’ নামে একটি নতুন সেবার সংজ্ঞা সংযোজন করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকোন পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরকে এ সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। তাই ভার্চুয়াল বিজনেস সেবার উপর ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।

এছাড়া নতুন বাজেটে ফেইসবুক, গুগল ও ইউটিউবের মতো কোম্পানির বাংলাদেশে অর্জিত আয়ের উপর করারোপের আইনি বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

জানা গেছে,বিদেশি গিয়ে যারা প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ঈদ বাজার করেন তাদের সরকার কোনভাবেই নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছে না। কিন্তু দেশের বসে যারা পন্য কয় করছেন তাদের ওপর কেন করারোপ করা হচ্ছে তা কেউ বলতে পারছে না। এতে বুঝতে কোন কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে তিনি ধনীদের জন্যই এই বাজেট করেছেন।

তবে ভার্চুয়াল বাণিজ্যে মূসক আরোপের প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন,অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা ই-কর্মাস ও এফ-কমার্সে এ ধরণের কর আরোপ করা হলে উদীয়মান এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ খাতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

একইভাবে ফেইসবুক, ইউটিউব, গুগল ইত্যাদি প্রভৈল তিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে যে আয় করে তার ওপর করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের করের আওতা বাড়বে। এছাড়া অনলাইন কেনাকাটায় (ই-কমার্স/এফ-কমার্স) ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ করারোপের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এবং ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের কারণে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের ধরন এবং আকারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আমি ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল খাত যেমনÑ ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল ইত্যাদির বাংলাদেশে অর্জিত আয়ের ওপর করারোপের জন্য আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় আইনি বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করছি। এর ফলে আমাদের করের আওতা বাড়বে।

অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো যখনই মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, তখনই তা জনগণের করের টাকায় পূরণ করে আসছে সরকার। এসব ব্যাংকের জন্য আগামী বাজেটেও বরাদ্দ থাকছে।

বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ভুল সর্বস্ব, ফাঁপা ও অবাস্তবায়নযোগ্য। এই বাজেট সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্য আয়ের লোকেরা। বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করেছে, বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতি সুদৃঢ় করার কোনো পদক্ষেপ নেই। আয়করমুক্ত আয়ের সীমাটি আগের মতোই দুই লাখ ৫০ হাজারে রাখা ভীষণ অযৌক্তিক। সরকারি ব্যাংক থেকে বরাদ্দ দেয়া অর্থ হল জনগণের করের টাকা। সেটা বাজেটের মাধ্যমে বণ্টন করে কিছু মানুষকে লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রণোদনা পাওয়ার পরও তাদের কর্পোরেট কর ৪০ শতাংশ থেকে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা সমর্থন করা যায় না। পুঁজিবাজারে প্রায় অর্ধকোটি বিনিয়োগকারীর দুর্দশা কমাতে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে দেয়া বরাদ্দে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেটে ভ্যাট আইনের যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজেটে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মধ্যম আয়ের মানুষরা। এদের আয়ও সীমিত। কিন্তু ব্যয় হচ্ছে বেশি। তাদের আয় অনেক সীমিত। তাদের অধিকাংশই রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোটাকে আমি সমর্থন করি না। এখানে গরিব লোকজন বিনিয়োগ করে। তাদের বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। এমনিতেই বাজেটে মধ্য আয়ের লোকেরা চাপে পড়বে। এ শ্রেণীর লোকদের আয় কম ব্যয় বেশি। কিন্তু ভ্যাট আইন পরিবর্তন করায় এ শ্রেনীর ব্যয় আরও বাড়বে। এতে তাদের ওপর নতুন করে চাপের সৃষ্টি করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ