ঢাকা, শুক্রবার 15 June 2018, ১ আষাঢ় ১৪২৫, ২৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সঙ্গতি নেই তাই বাড়িতে আপনজনের সাথে নয় রাজধানীতেই ঈদ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: পবিত্র ঈদুল ফিতর দরজায় কড়া নাড়ছে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দে অনেকেই বিভোর। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ যেভাবেই হোক বাড়ি যেতে হবে। উদ্দেশ্য একটাই তাহলো ঈদের কেনা-কাটা করে পরিবারের সবার সাথে একত্রে ঈদ আনন্দ উপভোগ করা। পরিবার ছাড়া যেন ঈদ আনন্দই হয় না। এতোদিন এমনটাই হয়ে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে উল্টো চিত্র। এখন ঈদ আনন্দ যেন ধনীক শ্রেণির জন্য। আবার সরকারি চাকরিজীবীদের ঈদ আনন্দ থাকলেও নেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের। সরকারি খাতে বেতন-ভাতা, বোনাসের ব্যবস্থা হলেও বেসরকারি খাতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বেতন-বোনাস হয়নি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে শুধু বেতন হলেও বোনাস হয়নি আবার বোনাস হলেও বেতন হয়নি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার অর্ধেক বেতন দিয়েই অপারগতা প্রকাশ করছেন কর্তৃপক্ষ। আবার এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাননি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। উর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্যের বাজারে তাই সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ঈদের পোশাক কেনার সামর্থ কোথায়। আর বাড়িতে গেলেতো নিজের সম্মান বাঁচাতে পরিবারের সবার জন্য কেনা-কাটা করতে হবে। সেটা রীতিমতো দু:সাধ্য। এ লজ্জায় গ্রাম বিমুখ হচ্ছেন রাজধানীতে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবীরা। পরিবারের চাহিদা মেটাতে না পারায় রাজধানীতেই ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকেই। ফলে অন্যান্যবারের তুলনায় এবার রাজধানী থেকে বাড়ি যাওয়ার প্রবণতাও আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম।

আশরাফুল ইসলাম। চাকরি করেন একটি বেসরকারিী প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানের নাম না বলার শর্তে তিনি বলেন, গত মাসের বেতন এ মাসে পেয়েছি। প্রতিষ্ঠান অর্থের সংকটের কারণ দেখিয়ে তার আগের মাসের বেতন দেয়নি। ফলে ওই মাসে ধার করে চলতে হয়েছে। এ মাসে বেতনের টাকায় ধার পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার এ মাসও চলতে হবে। বেতন পায় আর না পায় বাড়ির মালিক তো আর সেটা শুনবে না। তার বাসা ভাড়া পরিশোধ করতেই হবে। বোনাসের টাকা দিয়েই এ মাস চলতে হবে। এখন যদি বাড়ি যায় তাহলে যারা বাড়িতে আছেন তাদেরও তো একটা প্রত্যাশ থাকে। কোথা থেকে তা পূরণ করবো। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাড়ি না যাওয়ার। বাড়িতে বার বার যেতে বলে কিন্তু কিভাবে আমার অবস্থার কথা তাদের জানাবো। এটা তো লজ্জার কথা। যে চাকরি করেও টাকা জমাতে পারছি না। না পারছি নিজেরা ভালোমতো চলতে। আর না পারছি আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করতে।  

শুধু আশরাফুল ইসলাম নয়, আরিফুল ইসলাম ও শফিকুল আলম প্রায় একই কথা বললেন। আরিফুল বলেন, আমি চাকরি করি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ফিক্সট বেতন ছাড়া অন্য কোনো আয় নেই। প্রতি বছর যে পরিমাণ বেতন বাড়ে তারচেয়ে খরচ বাড়ে দ্বিগুণ। প্রতি বছর বাসা ভাড়া বাড়ানো হয় মালিকের ইচ্ছামতো। ঢাকাতে চাকরি করে খুব বিপদে আছি। তিনি বলেন, এ মাসে বেতন পেয়েই বাড়ি ভাড়া দিতে হয়েছে। এরপর ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু ঈদের মার্কেট করেছি। নিজেদের জন্য বলার মতো তেমন কিছু কিনি নাই। এতেই বেতনের টাকা প্রায় শেষ। নিজেদের জন্য না হলেও ছেলে মেয়েদের জন্য তো ঈদের আয়োজন আছে। এরপর বাড়িতে যেতেও তো খরচ লাগবে। বাড়িতে গেলে পরিবারের জন্যও কিছু কেনা-কাটা করতে হবে। কিন্তু সে অর্থ কাছে নেই। চাকরি করে যদি  পরিবারের জন্য কিছু নিয়ে যেতে না পারি তা হলে বাড়িতে যাওয়া লজ্জা ছাড়া আর কিছু নাই। পরিবারের জন্য নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে কিন্তু সাধ্য নাই। একারণে বাড়িতে যাচ্ছি না। একই কথা শফিকুল আলমেরও।    

অনেকে বাড়িতে যাচ্ছেন না। এর সত্যতা পাওয়া গেছে রাজধানী বাস কাউন্টার, লঞ্চ টার্মিনাল ও ট্রেন স্টেশন ঘুরে। কাউন্টার মাস্টাররা জানান, অন্যবারের তুলনায় এবারের ঈদে যাত্রী চাপ অনেক কম। গতবারও যেখানে টিকিট দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে সেতুলনায় এবার যাত্রীদের চাপ তেমন নেই। অন্যবার ঈদের দশদিন আগে থেকেই যাত্রীদের ঈদ যাত্রা শুরু হতো। এ বছর ঈদের তিনদিন আগেও তেমন যাত্রী হচ্ছে না। আশানুরুপ যাত্রী না পাওয়ার কথা জানান, হানিফ, ঈগল, সোহাগ, নাবিল, জেআর, দর্শনা ডিলাক্সসহ বেশ কয়েকটি পরিবহনের কাউন্টার মাস্টাররা। জেআর-এর মাজার কাউন্টারের কাউন্টার মাস্টার মো. মিলন জানান, গত ঈদেও অনেক যাত্রীকে টিকিট সংকটের কারণে সিট দিতে পারি নাই। অন্যবার গাড়ীর টিপ বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু এবার সে তুলনায় যাত্রী চাপ অনেক কম। এবার কোনো টিকিটের সংকট নেই। আবার গাড়ীর টিপ সংখ্যাও বাড়াতে হচ্ছে না। 

গত বুধবার সরকারি ছুটির দিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় লঞ্চে যাত্রী সংখ্যা স্বাভাবিক। বাড়তি কোনো চাপ নেই। দায়িত্বরত কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, গতবারের তুলনায় এবার যাত্রীদের চাপ তুলনামূলক কম। গতবারও ঈদের ৭-৮দিন আগে থেকেই রাজধানীবাসী গ্রামের বাড়িতে যাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম। মনে হচ্ছে এবার বাড়ি যাওয়ার তেমন তাগাদা নাই। গতবারের তুলনায় ব্যবসা কম হবে বলেই মনে হয়। 

ট্রেন স্টেশনে গিয়েও যাত্রীদের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। স্টেশনে বসে থাকা হারুনুর রশিদ নামের এক যাত্রীর সাথে কথা হয়। তিনি সরকারি চাকরি করেন। তিনি জানান, গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার একদিন ছুটি নিয়ে একটু আগেই বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এজন্য স্বপরিবারে স্টেশনে এসেছি। কিন্তু গতবারের তুলনায় এবার আলাদা চিত্র। মনে হচ্ছে রাজধানীবাসীর বাড়ি যাওয়ার তেমন তাগাদা নেই। তবে হয়তো কাল অফিস করে সবাই যেতে পারেন। 

এদিকে গত ১০ জুনের মধ্যে দেশের সকল গার্মেন্টসে মে মাসের বেতন শ্রমিকদের পরিশোধের কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে ৩৫ শতাংশ গার্মেন্টসে বেতন দেয়নি মালিকপক্ষ। ৩১ মে বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সাথে ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ ইস্যুতে বৈঠককালে গার্মেন্টস শিল্পের মালিকপক্ষ ১০ জুনের মধ্যে শ্রমিদের বেতন পরিশোধ ও ১৪ জুনের মধ্যে বোনাস পরিশোধের কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কথা শেষ পর্যন্ত রাখতে পারেননি মালিকপক্ষ। তবে ১৪ জুনের মধ্যে বেতন হতে পারে বলে জানান বিজিএমইএর এক নেতা। নাম না বলাল শর্তে তিনি বলেন,  ১০ জুনের মধ্যে যদিও সব গার্মেন্টসে মে মাসের বেতন শ্রমিকদের পরিশোধের কথা ছিলো কিন্তু তা রাখা সম্ভব হয়নি। ৬৫ শতাংশ গার্মেন্টসে বেতন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি ৩৫ শতাংশ গার্মেন্টসেই ১০ জুনের মধ্যে বেতন পরিশোধ সম্ভব হয়নি। তবে ১৪ জুন বোনাসের সঙ্গে বাকি কারখানার বেতনও পরিশোধ করা সম্ভব হবে। 

এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে আয়েশা নামের এক পোশাক শ্রমিক বলেন, আমরা শুনেছিলাম ১০ জুনের মধ্যে আমাদের বেতন দেয়া হবে। এখনও পরিবারের কারোর জন্যই কোনো কেনাকাটা করা হয়নি। ভেবেছিলাম বেতন পেলে কেনাকাটা করবো। ১০ তারিখ তো দূরের কথা কবে বেতন পাবো তাই জানি না। মালিকেরা ঠিকই পরিবার পরিজনদের জন্য কেনাকাটা করেছেন। কিন্তু আমরা কি করবো। আমাদের তো আর ঈদ বলে কিছু নেই। এবার হয়তো বাড়ি যাওয়াও হবে না। আয়েশার মতো একই অভিযোগ অনেকেরই।   

আবার বেতন দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে প্রশিক্ষার প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা কর্মচারিরা। তারা জানান, দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন প্রশিকার কর্মীরা। এদের মধ্যে অনেকেই সর্বোচ্চ ৪৩ মাস থেকে সর্বনিম্ন ১৩ মাস বেতন পান না। কিন্তু জীবন তো আর চলে না। তাই বাধ্য হয়ে বেতনের দাবিতে নেমেছি অবস্থান কর্মসূচিতে। 

জানা যায়, বকেয়া বেতনের দাবিতে এভাবেই টানা ৬৪ দিন সিঁড়িতে বসে কাটিয়েছেন প্রশিকার প্রায় ৩০০ কর্মী। পল্লবী থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় ঈদের আগে কয়েক মাসের বেতন দেয়ার আশ্বাস দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গত রোববার পর্যন্ত সেই টাকা দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে কেউ সর্বশেষ তথ্যও জানায়নি। বাধ্য হয়েই সবাই বসে রয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অনিশ্চয়তায় জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। যাদের বেতন একটু কম, তাদের বেতন তবুও হয়েছে। কিন্তু যাদের বেশি, তাদের বেতন একেবারেই আটকে দিয়েছে। কয়েকজনের বেতন হয় না টানা ৪২ থেকে ৪৩ মাস। জীবন চলছে এখন আশায় আশায়। সঞ্চয় ভেঙে, জমি বিক্রি করেও জীবনযাত্রার ব্যয় যখন মেটানো যাচ্ছে না তখন ধার দেনা করা ছাড়া উপায় কি। কর্মকর্তারা জানান, গ্র্যাচুইটিসহ বিভিন্ন ফান্ড মিলিয়ে অবস্থানরত কর্মীরা গড়ে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা করে পাবেন। এছাড়া একেক জনের গড়ে ৭ থেকে ২২ লাখ টাকা করে বেতন আটকা রয়েছে। 

ঈদে বাড়িতে যাবেন কিনা জানতে চাইলে কর্মকর্তারা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, আপনারাই বলেন আমাদের বাড়ি যাওয়া উচিত কি-না। কোন আাশায় বাড়ি যাবো। আমরা নিজেরাই দুর্বিষহ জীবন যাপন করছি। এভাবে বেচে থাকা যায় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে এখন না খেয়ে মরার দশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ