ঢাকা, মঙ্গলবার 19 June 2018, ৫ আষাঢ় ১৪২৫, ৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

আমাদের পরিবহন সঙ্কট

আমাদের পরিবহন সমস্যা যে কত বড় তা প্রকট হয়ে দেখা দেয় ঈদের সময়। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের সময় যাত্রি পরিবহন নিয়ে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছিল। এই সঙ্কটেরই একটা চিত্র দেখা গেছে সড়ক, রেল ও নৌ পথের যাত্রি-পরিবহন দৃশ্যে। কয়েকদিনের দৃশ্যে মনে হয়েছে লঞ্চ এবং রেলের ভিতরের চেয়ে ছাদে যাত্রী অনেক বেশি। বাসের ছাদেও যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। এরপরও বহু মানুষ ঈদ করতে দেশে যেতে পারেনি সে রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের এই দুর্ভোগের কারণ যাত্রীর তুলনায় বাস, ট্রেন এবং নৌ যানের উৎকট অভাব। রেল ও নৌ যানের তুলনায় সড়ক পরিবহন মাধ্যম সংখ্যায় বেশি ও বিস্তৃত ছিল, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। কিন্তু সড়ক পরিবহনে মানুষ যেটুকু সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল সড়কের ভাঙ্গাচুড়া দশা এবং খানা খন্দকের কারণে মানুষ সে সুবিধা পায়নি। যোগাযোগ মন্ত্রী সম্ভবত দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সড়ক থেকে সড়কে অনেক ছুটাছুটি করেছেন, তার চিত্র আমরা পত্রিকায় দেখেছি। কিন্তু সবই গুড়েবালি। বলা যায়, অবস্থা আগের চেয়ে আরো খারাপ হয়েছে।
এই পরিবহন সঙ্কট এবং তজ্জনিত দুর্ভোগকে মানব-সৃষ্ট বললে অত্যুক্তি হবে না। সড়ক নির্মাণ ও সংরক্ষণে সব দেশের চেয়ে আমরা বেশি হারে খরচ করলেও সড়কের বেহাল দশা আমাদের বেড়েই চলেছে। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পাপ করেছি আমরা রেলওয়েকে নিয়ে। আজকের সুপার্সনিক পরিবহনের যুগেও গোটা দুনিয়ায় রেলওয়ে সবচেয়ে নিরাপদ নির্ঝঞ্ঝাট ও সহজগম্য পরিবহন মাধ্যম। অনেক উন্নত দেশে রেলওয়ে এতই জনপ্রিয় যে মানুষ প্লেনের চেয়ে রেলওয়েকে অগ্রাধিকার দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্লেনের চেয়ে রেলের ভাড়া বেশি। এরপরও মানুষ রেল ভ্রমণকে বেশি পছন্দ করে। এইভাবে রেলওয়ে যখন সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম এবং ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করছে, তখন আমরা রেলওয়েকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। সড়ক পরিবহনের সাথে বর্তমান রেলপথের তুলনা করলে রেলওয়ের প্রতি আমাদের নির্লজ্জ আচরণের কিঞ্চিৎ প্রমাণ পাওয়া যাবে। ১৯৮১ সালে সব ধরন মিলে সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ৬৩৪১ কিঃ মিঃ, ২০১৫ সালে এই দৈর্ঘ্য এসে পৌঁছেছে ২১৩০২ কিলোমিটারে। অন্যদিকে ১৯৮১ সালে সব গেজ মিলে রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৮৮৪ কিঃমিঃ, ২০১৫ সালে সাত কিঃমিঃ কমে ২৮৭৭ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮১ সালে রেলওয়ে  ইঞ্জিনের সংখ্যা ছিল ৪১৭, ২০১৫ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ২৮২তে। আগের তুলনায় আয় কিঞ্জিৎ বেড়েছে। ২০০৬ সালে রেলের রাজস্ব আয় ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে এসে সে আয় বেড়ে হয়েছে ৯৪০ কোটি টাকা। কিন্তু এই ৯৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করার জন্য রাজস্ব ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ১৯০০ কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয় এক সময় রেলওয়ের জন্য ছিল স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়। এখন একটি মন্ত্রণায়ের একটি ডিভিশন তা দেখাশুনা করে। রেলওয়ের প্রতি এ লজ্জাজনক আচরণ কেন তা আমরা জানি না। কিন্তু মানুষকে এর কুফল সাংঘাতিকভাবে ভোগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নৌপথ আজ মারাত্মকভাবে সংকুচিত। দক্ষিণ বঙ্গের কিছু অঞ্চল ছাড়া গোটা দেশের নদীগুলোর নাব্যতা আজ শূন্যের কোটায়। হাজার হাজার নদী, খাল আজ মরে গেছে, যেগুলো গণপরিবহনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হত। অবলুপ্ত নৌপথ উদ্ধার, বিভিন্ন নৌপথের নব্যতা সংরক্ষণ, নিরাপদ নৌযান চলাচল নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি প্রকল্পের নামে যা বলা হয় তা খাতাকলমেই আছে, বাস্তবে তার কার্যকারিতা নেই। মরা নদীগুলোতে স্রোত ফিরিয়ে না আনা গেলে নাব্যতাও ফিরবে না নৌপথও উদ্ধার হবে না। ড্রেজিংয়ের নামে যা হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রে টাকার অপচয়।
পরিবহন খাতের উন্নয়ন একটি অর্থনৈতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য রাজনীতিমুক্ত স্বচ্ছ আন্তরিকতা প্রয়োজন। সম্ভবত স্বার্থবিমুক্ত এই আন্তরিকতার অভাবের কারণেই রেলওয়ের আজ ভগ্নদশা। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীগুলো বাংলাদেশের রক্ত পরিবাহী ধমনীর মতো। নদীগুলো উদ্ধার না হলে শুধু পরিবহন নয় বহু ধরনের সংকটেই পড়তে হবে আমাদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ