ঢাকা, মঙ্গলবার 19 June 2018, ৫ আষাঢ় ১৪২৫, ৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

বেগম জিয়ার জামিন ও চিকিৎসা নিয়ে কিছু কথা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন মামলার রায়ের দিন জেলে যাবার সকল প্রস্তুতি নিয়ে আদালতে হাজিরা দিলেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন যে, তিনি দু’তিন দিন পরেই জামিনে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু দেখা গেলো নানা অজুহাতে তার জামিন বিলম্বিত হচ্ছে। তখন কেউ ভাবলো হয়তো এক মাসের ভেতরেই আসবেন। দেখা গেল তিনি এক মামলায় জামিন পেলে আরেক মামলায় Shown arrest হচ্ছেন। আবার নিম্ন আদালত তার জামিন না মঞ্জুর করছেন। বিএনপি উচ্চ আদালতে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন করা হচ্ছে। উচ্চ আদালত আবার অভূতপূর্ব ও অভাবিতভাবে নিম্ন আদালত থেকে মামলার মূল নথি তলব করছেন। দেরীতে হলেও নথি যখন আসলো উচ্চ আদালত নথি পর্যালোচনা করে কোন একশান না নিয়ে দু’মাস পরে মামলার তারিখ দিলো। এতে বেগম জিয়ার জামিন শুধু পিছালো না বরং সারা জাতিও হতাশ হলো। জামিনের নিরুদ্ধে সরকারের আপিল তো আছেই।
এখন আবার তাকে নিয়ে নতুন একটা খেলা শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে নির্জন অবস্থায় অন্তরীণ বেগম খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি বহু বছর ধরে হাঁটু ও পা ব্যথার রোগী। জেলে তার কোমর ব্যথা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। জেলখানার পুরাতন ভবনের স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া ও নির্জনতা তার অবস্থার আরো অবনতি ঘটিয়েছে। কয়েক দিন আগে তার একটি Mild Stroke হয়েছে বলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তিনি অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন। দেশের তিন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ কারাগারে অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা যা-তা ব্যাপার অবশ্যই নয়। এখানে রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রশ্নটি বিরাট হয়ে দেখা দেয়। কোনও ব্যক্তি জেলখানায় গেলে তার সমস্ত দায়-দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তায়। তার জীবনের নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হয়। বেগম জিয়া কোটি কোটি মানুষের নেতা, তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সরকার নিশ্চয়ই অবহিত আছেন। এই অবস্থায় সরকারি অবহেলায় যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে সরকার তার দায় এড়াবেন কিভাবে? এগুলো সব ঈদের আগের ঘটনা। তাকে তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে তিনি ও তার দল ইউনাইটেড হাসপাতালকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু সরকার চাচ্ছেন তাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করতে। এতে বিএনপি’র অনীহা রয়েছে। বিএনপি বলছে দেশের এই শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটিতে যারা চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগ দলীয় এবং তাদের অধীনে বেগম জিয়ার অপচিকিৎসা হবে। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহংসার শিকার হয়ে তার জীবন বিপন্নও হতে পারে। কথাটি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো দেয়া হয়েছে এবং যে মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে এগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উপাদান ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না বলে দেশী-বিদেশী আইন বিশেষজ্ঞরা মতামত প্রকাশ করেছেন। সেনা সমর্থিত সাবেক কেয়ারটেকার সরকারের আমলে বেগম জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়ের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা ছিল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১১টি এবং বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে ৫টি। শেখ হাসিনার মামলাগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাসহ তার দলের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে রুজু করা ১০ সহ¯্রাধিক মামলা ও আদালত প্রদত্ত শাস্তি মওকুফ করে নিলেন। কিন্তু বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর মামলা রেখে দিলেন। শুধু তাই নয়। বেগম জিয়া, বিএনপি’র অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং জামায়াতের আমীর, সেক্রেটারি জেনারেলসহ অপরাপর নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে নতুনভাবে হত্যা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও রাহাজানির অসংখ্য মামলা রুজু করে তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুললেন। এর প্রত্যেকটিই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জ্বলন্ত প্রমাণ। এই অবস্থায় বেগম জিয়ার চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান সঠিক বলে মনে হয়। আরো একটি প্রচ্ছন্ন কারণ আছে। বেগম জিয়াসহ বিএনপি ও বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সময়ে সময়ে প্রদত্ত হুমকি। বাংলাদেশে এখন প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে, এই রাজনীতি ক্ষমতায় টিকে থাকা ও তা দীর্ঘায়িত করা এবং বিরোধীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার রাজনীতি। জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি প্রদান ও তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ প্রভৃতি এরই অংশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের স্কাইপি কেলেংকারী ও দায় স্বীকার করে পদত্যাগ প্রভৃতি এর অন্যতম প্রমাণ।
আমি বেগম জিয়ার চিকিৎসার কথা বলছিলাম। ঈদ গেছে, ছুটি শেষে অফিস খুলেছে কিন্তু তাকে আজ সোমবার পর্যন্তও হাসপাতালে স্থানান্তর করার কোনও খবর পাওয়া যায়নি। এটা অমানবিক। ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয় না। ক্ষমতার দম্ভে মানুষের উপর অত্যাচার এবং কারুর মৌলিক অধিকার হরণের পরিণাম শুভ হয় না।
যে মমলায় বেগম জিয়াকে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে সেই মামলাটি একটি অদ্ভুত মামলা। প্রধানমন্ত্রী দেশে-বিদেশে সর্বত্রই বলছেন যে খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। কিন্তু তিনি কত টাকা খেয়েছেন আদালতের রায়ে কি তা বলা হয়েছে? ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ সুদে আসলে তিনগুণ বেড়ে ব্যাংকেই থাকলো, একটি পয়সাও উঠানো হলো নাÑ তা হলে উনি খেলেন কিভাবে? আসলে আইনজ্ঞদের দৃষ্টিতে যে মামলাটিতে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে সেই মামলায় তাকে আসামীই করা যায় না। কিন্তু তবুও তিনি শাস্তি পেয়েছেন। এটা কপালের ফের! আবার জামিনের বিষয়টিও একই রকম।
সরকার বারবার বলছেন, বেগম জিয়াকে কোর্ট শাস্তি দিয়েছে আমরা কিছু করি নাই। আসলে কি তাই? তার মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কথা তো আগেই বলেছি। আদালতের শাস্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে তিনি যখন শাস্তি মওকুফ চেয়ে আপীল করলেন তখন তার এই শাস্তি বৃদ্ধির জন্য সরকারও কি আপীল করেনি? আবার তাকে যখন উচ্চতম আদালত জামিন দিলো তখন কি সরকার তার বিরুদ্ধে আপীল করেনি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আদালতের কি স্বাধীনতা আছে। আদালত সরকারের কথা মতো চলার অথবা চুপ থাকার রেওয়াজ বাংলাদেশে আছে। কেয়ারটেকার আমালে ১১টা মামলার আসামী হিসাবে একজন নেত্রী যখন জেলে ছিলেন তখন চিকিৎসার নামে প্রশাসনিক আদেশে তাকে আদালতের অনুমতি ছাড়াই বিদেশ পাঠানোর নজির আছে। তিনি দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নয় বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সফর করেছেন। তখন যদি এটা সম্ভব হয়ে থাকে এখন বেগম জিয়াকে প্রকৃত চিকিৎসার জন্য জামিনে সরকার আপত্তি করছেন কেন। আগেই বলেছি সব কিছুই সরকারি নির্দেশে চলছে। আদালতের স্বাধীনতা এখানে গৌণ। আদালত স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে বলে দেশবাসী মনে করে না। আর মানুষ কি এটা ভুলে গেছে যে, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ কথা বলায় ও রায় দেয়ায় সরকার কিভাবে বন্দুকের নলের মুখে একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছেন? আন্দোলন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের খুবই বড়াই, তারাই শুধু জানেন আন্দোলন কি এবং কত প্রকার, অন্য কেউ জানেন না। অন্যদের তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। দলটির একজন শীর্ষ নেতা বলেছেন বিএনপি’র আন্দোলন আষাঢ়ের তর্জন-গর্জন সার। আরেকজন বলেছেন, বিএনপি’র রাজনীতি বেগম জিয়ার হাঁটু এবং কোমর ব্যথার মধ্যে আটকে গেছে। হর-হামেশা এ ধরনের কথা-বার্তাই তারা বলে আসছেন। বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে  কোনও প্রোগ্রাম করতে তারা দিচ্ছেন না। ব্যাপকহারে গ্রেফতার করছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহার করে তাদেরকে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন। এটা দেশের জন্য মঙ্গলজক নয়।
ঈদের দিন দেখলাম বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে তার এলাকায় জনসংযোগ করতে দেয়া হচ্ছে না, পুলিশ বাধা দিচ্ছে। সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি জনাব ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশেই নাকি পুলিশ তাকে বাধা দিচ্ছে। এটা অন্যায়। বিএনপি জনসংযোগ করতে পারবে না, জামায়াত জনসংযোগ করতে পারবে না, তারা প্রকাশ্যে অথবা ঘরোয়াভাবে কোনও আলোচনা সভায় মিলিত হলে নাশকতার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হবে এই কোন দেশে আমরা আছি? দেশ সকলের, শুধু আওয়ামী লীগের নয়। সবাই খাজনা দেন। দেশের মানুষ অশান্তি চায় না, শান্তি চায়, কাজেই মানুষ, মানুষের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের দলের প্রতি অশোভনীয় আচরণ থেকে বিরত থাকাই কল্যাণকর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ