ঢাকা, মঙ্গলবার 19 June 2018, ৫ আষাঢ় ১৪২৫, ৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার স্বার্থে?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : নিবন্ধটি শুরু করছি মানবতাবাদী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে। বিচারের নামে যখন অবিচার চলছিল তখন তিনি লিখেছিলেন- বিচারক জানে আমি যা বলেছি,যা লিখছি তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়; ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়! কিন্তু তবু হয়ত সে আমাকে শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয় সে রাজার, সে ন্যায়ের নয়; সে আইনের; সে স্বাধীন নয়; সে রাজভৃত্য! পৃথিবীতে যত আইন প্রণয়ন করা হয় তা সবই মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু এই আইনের অপব্যবহার যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র চলে তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। আর তখনই মানুষের মনে দ্রোহের আগুন জাগ্রত হয়। বিশ্বব্যাপী আইনের সুশাসনের অবিচার চললেও কেউ প্রতিবাদ করার হিম্মত দেখায় না। নতুন যে কোনো আইন প্রণয়ন করার কথা উঠলেই মানুষের উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে আইনের ব্যতয় ঘটে না তা মোটা দাগে বলার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা কাক্সিক্ষতমানের আইনের সুশাসন এখনও উপভোগ করতে পারেনি। যারাই ক্ষমতার সিঁড়ি আরোহন করেছেন সবাই কম বেশি মানুষের অধিকার কিভাবে হরণ করা যায় সে রকম আইন নিজেদের সুবিধামতো প্রণয়ন করেছে। ক্ষমতার মগডালে থাকলে আইনের তোয়াক্কা করতে হয় না। কিন্তু ক্ষমতার বাহিরে যারা থাকেন তারা টের পান কত ধানে কত চাল। ক্ষমতাসীন শাসক যখনই কোনো আইন তৈরি করার খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন তখনই তার আইনি কাঠামোর নমুনা দেখে বলা যায় যে,এটা মানুষের কল্যাণের চেয়ে বিরোধী মতালম্বীদের দমনের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের মতামতকে উপেক্ষা করে আইসিটি ৫৭ ধারা নামে একটি কালো আইন পাস করেছিল। কিন্তু গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ও ৫৭ ধারার বিষয়বস্তুগুলো ঘুরেফিরে রেখে দিয়েছে। সরকার সমর্থকরা নতুন এই আইনের অপব্যবহার হবে না বলে দাবি করলেও সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক নেতারা আইনটির অপব্যবহারের আশংকা প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বোদ্ধা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এ আইন মানুষের বাকস্বাধীনতা শুধু হরণ করবে। ৫৭ ধারার যে অপপ্রয়োগ হচ্ছিল নতুন আইনে তা অন্যভাবে প্রকাশ পাবে।
গত ২৯ জানুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিষয়টি উদ্বেগের হলেও সরকারি দলের নেতানেত্রীসহ আইনমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, এই ৫৭ ধারা ভবিষ্যতে থাকবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার কৌশলে এ ধারার সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চারটি ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছে যা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ সরকার এক দিকে বলছে এই ৫৭ ধারা আর থাকছে না,অপর দিকে ঘুরেফিরে ৫৭ ধারার অনেক কিছুই রেখে দিয়েছে। নিকট অতীতে ৫৭ ধারা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও নাগরিক সমাজের তুমুল প্রতিবাদে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আদালত এই আইনকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মতামত দিয়েছিল। ৫৭ ধারার বাতিলের খবর শুনে অনেকে স্বস্তির নিংশ্বাস ফেলছিল। কিন্তু স্বস্তির সুবাতাস বইতে না বইতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদিত করায় আবারো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভুলন্ঠিত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে যে নতুন আইনের খসড়া অনুমোদিত করা হয়েছে তা মুলত ৫৭ ধারার চেয়েও বেশি ভয়ংকর। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বর্ণিত অপরাধ ও শাস্তির বিধান পুনর্বিন্যাস করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ তে যে সব ধারা সংযোজন করা হয়েছে তা মূলত নতুন বোতলে পুরনো বিষ। এ আইনের ৫৭ ধারায় গত কয়েক বছরে সাংবাদিক ও বিরোধী মতালম্বী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বহু মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আইসিটি আইনে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪১৭টি। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই হয়েছে ৫৭ ধারায়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় যে সব অপরাধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে তার সাথে ৫৭ ধারার তেমন কোন পার্থক্য নেই। এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দেশের মানুষ। শুধু সাংবাদিক নয়,অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষও এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খসড়া আইনে মোট ১৪টি ধারার অপরাধকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। যে কারণে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই অনেককে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হতে পারে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনটি প্রথম ২০০৬ সালে সন্নিবেশিত হয়। সংসদে পাস ও সন্নিবেশিত হওয়ার সময় আইনটি এমন বিতর্কিত বা বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেনি। আইনটি পাস হওয়ার পর প্রথম দফায় ২০০৯ সালে, দ্বিতীয় দফায় ২০১৩ সালে সংশোধন, সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর থেকে ১৪ বছর কারাদন্ড এবং ৫৭ ধারার অপরাধকে জামিন অযোগ্য করার মাধ্যমে একে একটি নিবর্তনমূলক আইনে পরিণত করা হয়। গত বছরের প্রথম ৬ মাসে আইসিটি আইনে ৩৯১টি মামলা হয়। তবে বেশীরভাগ মামলায় সবচেয়ে হয়রানিমূলক ও জামিন অযোগ্য ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। গত ২ আগস্টে দেশের একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিকে মুদ্রিত হয়েছে যে,গত ৬ মাসে আইসিটি আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই ৫৭ ধারার। গত বছরের জানুয়ারিতে আইসিটি মামলা হয়েছিল ৪২টি। জুনে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯টি। ছাগল মারার মামলাও হয়েছে ৫৭ ধারায়। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে ওই ধারাটিতে মানুষের কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি হয়েছে।
ক্ষমতাসীন সরকার ও তাঁর আজ্ঞাবহ সমর্থকরা নতুন এই আইনের অপব্যবহার হবে না বলে দাবি করলেও সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক নেতারা আইনটির অপব্যবহারের আশংকা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে আইনটির ৩২ ধারা নতুন বির্তকের জন্ম দিয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি, আধাসরকারি,বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কেউ কোনো কিছু রেকর্ড করলে তা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে। এ জন্য ১৪ বছরের কারাদন্ড এবং ২০ লাখ টাকার অর্থদন্ডের বিধান করা হয়েছে। এ ছাড়াও বেশকিছু ধারা যুক্ত হচ্ছে নতুন আইনটিতে। এ কারণে নতুন এই আইনটি ৫৭ ধারার চেয়েও কঠোরতর বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, নতুন এ আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাধীন চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা। ক্ষমতাসীনদের অপরাধের ঢাকনা বন্ধ করা। বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এমনিতেই নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে। নতুন এ আইন পাস হলে নাগরিকদের অধিকার সংকুচিত হবে। বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড.আসিফ নজরুলের ভাষ্যমতে নতুন যে আইনটি করা হয়েছে তা আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার চেয়েও খারাপ একটা আইন।  এ আইন করার মধ্য দিয়ে সরকারের পাওয়ারফুল সেকশন তাদের অন্যায় অবিচার,জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করতে চাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি বিরোধী রাজনৈতিক নয়, সমাজের যেকোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, বিশেষ করে দেশের নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক সমাজের অবশ্যই এ আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। আইনবিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ৩২ ধারার মাধ্যমে আমার আশংকা হচ্ছে, অনুসন্ধানী রিপোর্টটা বন্ধ হয়ে যাবে। অনুসন্ধানী রিপোর্টটা গণতন্ত্রের জন্য,সরকারের জবাবদিহিতার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন। এটা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে সংবাদমাধ্যম তার প্রধান কাজটা করা থেকে বিরত থাকবে এবং যাদের বা যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হচ্ছে, তারা জবাবদিহিতার উর্ধ্বে উঠে যাবে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সোয়া দুইশ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৯১ সালে বিধান করা হয়েছিল কংগ্রেস বা তাদের সংসদ বাকস্বাধীনতা খর্ব করে কোনো আইন পাস করতে পারবে না। যেকোনো কারণেই বাকস্বাধীনতা খর্ব করার অর্থ গণতন্ত্রকে খর্ব করা। নতুন আইনের ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ধারায় বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যের জন্য দীর্ঘ কারাদন্ডের যে ব্যবস্থা সেটা গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাকস্বাধীনতার ওপর এত বিধিনিষেধ থাকার অর্থই হলো আমরা গণতন্ত্র বিসর্জন দিতে চলেছি। দেশ, সমাজ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কোনোটার জন্যই এ ধরনের বিধান বাঞ্ছনীয় নয়। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)। এতে বলা হয়েছে ওই আইনটি স্বাধীন মত ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি। এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধান রয়েছে তা ওই আইন থেকে সরিয়ে ফেলতে আহ্বান জানানো হয়েছে। নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে আরএসএফ। এই আইন বাস্তবায়ন করা হলে অনুসন্ধানী রিপোর্ট মৃত্যুকুপে পরিণত হবে। আর অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত না হলে অনেক দুর্নীতি-দুষ্কৃতির তথ্য নাগরিকদের অজানা থেকে যাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে সকল দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে তা যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নথিতথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে হতো তাহলে হলমার্ক, ইউনিপেটু, ডেসটিনির লুটপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজারভ চুরি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্য, শেয়ারমার্কেট কেলেংকারিসহ বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থ কেলেংকারির কথা আমরা কখনো জানতে পারতাম না। সরকারি দলের নেতা-নেত্রী এমপির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক ব্যবসা, মানবপাচার, ইয়াবা ব্যবসার অপকর্মের কাহিনীগুলোও নাগরিকেরা জানতো  না। দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও হয়রানিমূলক কোনো আইনই একটি গণতান্ত্রিক দেশে কাম্য হতে পারে না। সরকার জনগণের ভাষা অনুধাবন করে এই আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ