ঢাকা, মঙ্গলবার 19 June 2018, ৫ আষাঢ় ১৪২৫, ৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

ঈদ উল ফিতরের ছুটিতে রূপসা সেতুতে খুলনাবাসীর ঢল

খুলনা অফিস : রূপসা সেতুতে খুলনাবাসীর ঢল নামে। ভ্যাপসা গরমের ভেতরেও ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড় দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। ঘামে ভিজে একাকার শিরোমণি থেকে আসা কামরুজ্জামান বলেন, মহানগরে নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিবেচনা করলে খানজাহান আলী (রূপসা) সেতুর মতো এতটা সুন্দর জায়গা দ্বিতীয়টি আর নেই।
ঈদের দ্বিতীয় দিন রোববার ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে এসেছেন আরও অসংখ্য মানুষ। দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিম পাল পাড়ার অধিবাসী হাফিজুর রহমান, খালিশপুরের নাসিম উদ্দিন, নুর উদ্দিন, রফিকুল, ইজিবাইক চালক আজিবর, চটপটি ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে কথা হলে সবাই প্রায় একই ধরনের কথা বলেন।
নিরাপত্তার প্রশংসা করে তারা বলেন, এখানে রাত দশটা পর্যন্ত বসে থাকা যায়। কেউ ঝামেলা করে না। চোর-বাটপার নেই বললেই চলে। প্রায় প্রতি ঈদে রূপসা সেতুতে আসেন কথা সাহিত্যিক মোহাম্মদ অয়েজুল হক। এটা পার্ক নয়, এখানে কেন আসেন- এমন প্রশ্নের জবাবে নিচে প্রবাহিত নদীর পানি দেখান। বলেন, নদী ভালোবাসি, নদীর সঙ্গে সখ্যতা। তাই ছুটে আসি। নদী আমাকে ডাকে।  ছোট ছোট ঢেউ। নির্মল বাতাস। খুলনা শিপইয়ার্ডের ছোট বড় জাহাজ, চলমান ছোট নৌকা, ট্রলার। দূরে আকাশ আর নদীর মিতালি। সেতুকে ঘিরে রেখেছে যেন গোটা শহর।
রূপসা সেতু পরিচালনাকারী ও টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ইউডিসি-জিআইইটিসি-জেভি-এর নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার তৌফিক আহমেদ রনি বলেন, ভ্রমণপিপাসুরা কোনো উৎসব হলেই সবচেয়ে বেশি ভিড় করেন রূপসা সেতু এলাকায়। যার ব্যতিক্রম ঘটেনি এবাবের ঈদেও। রনি বলেন, সেতু ও তার দু’পাশ মিলে সর্বমোট ১৩শ’৬০ মিটার দৈর্ঘ্য। খুলনা শহরের রূপসা থেকে সেতুর দূরত্ব ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। এই সেতুকে খুলনা শহরের প্রবেশদ্বার বলা হয়। কেননা এই সেতু খুলনার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর বিশেষত মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এই সেতুর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, দুই প্রান্তে দু’টি করে মোট চারটি সিঁড়ি রয়েছে। যার সাহায্যে মূল সেতুতে ওঠা যায়।
‘প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থী বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেতুটি পরিদর্শন করতে আসেন। গভীর রাত পর্যন্ত অনেক দর্শনার্থী সেতুর দুই পাড়ে আড্ডা জমান। পুলিশের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী থাকায় দর্শনার্থীদের কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না।’
অপরদিকে মহানগরী খুলনার প্রাণকেন্দ্র জোড়াগেট থেকে বাম দিকের সরু রাস্তা ধরে সোজা পশ্চিমে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই চোখে পড়বে বড় প্রাচীরঘেরা প্রেম কানন। সরু রাস্তাটার নাম প্রেম কানন রোড। রাস্তার নামকরণে সেই প্রেম কানন আজ জনহীন। ঈদের ৩য় দিন সোমবারও লোকজনের দেখা মিলছে না এক সময়ের জমজমাট সেই প্রেম কাননে।  ৫ বিঘা জমির উপর ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রেম কানন। সেবাইত এস্টেট অব শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ মন্দির খুলনার পরিচালনায় ও নির্দেশে ১৩ বছর ধরে মালি হিসেবে প্রেম কাননের দেখভাল করছেন শিবু প্রসাদ রায়।
সুদর্শন ফুলের বাগান, সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো বড় চত্বর। এঁকেবেঁকে চলা ঢালাই রাস্তা, স্বচ্ছ পানির পুকুর, পুকুরের সঙ্গে মেলানো মন্দির। সব মিলিয়ে যে কারও মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই জায়গা প্রেম কানন। সবকিছুর পরও সারা প্রেম কাননে প্রেমের কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেল না! বছর ১৫ আগে এ প্রেম কানন ছিল মানুষের ভিড়ে মুখরিত প্রাণচঞ্চল এক তীর্থস্থান, কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। ঈদ, পূজা কিংবা সরকারি ছুটির দিনে বিনোদনপ্রেমীরা এখানে ভিড় জমাতো। ছুটির দিনে আড্ডা চলতো সকাল থেকে রাত অবধি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ আর তেমনটি নেই।
দর্শনার্থীশূন্য প্রেম কানন প্রধান ফটকের বড় গেটে বেশ সুন্দর করে বাংলা ও হিন্দিতে লেখা রয়েছে প্রেম কানন। দেখলে মনে হবে কলকাতার কোনো দর্শনীয় স্থান। আগে মানুষ ভিড় করতো সকাল-সন্ধ্যা। কিন্তু এখন এই ঈদের ছুটিতেও তেমন কেউ আসে না এখানে।
মালি ও প্রেম কাননের দেখভাল করা শিবু প্রসাদ রায়ের স্ত্রী বলেন, প্রেম কাননে এখন আর আগের মতো কেউ আড্ডা দিতে বা ঘুরতে আসে না। আগে ঈদ, পূজা বা সরকারি ছুটির দিনে অনেক লোক ঘুরতে আসতো, কিন্তু এখন আর তেমন আসে না।
১৭ বছর ধরে প্রেম কাননের সামনেই দোকান পরিচালনা করছেন বকুল। তিনি জানান, ২০০৪-৫ সাল পর্যন্ত বাইরের মানুষ আসতো, জমজমাট ছিল। এখন কেউ আসে না। আকাশে কালো মেঘ জমা হয়েছে দেখে বকুল একটু মজার সুরেই বলেন, এখন আর বৃষ্টিভেজা মানুষের ছোটাছুটি নেই। প্রেম কাননে প্রেমের অভাব স্যার।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খুলনার ছোট গল্পকার নাছির আহমেদ বলেন, প্রেম কানন এক সময় ছিল প্রেমিক-প্রেমিকাদের জমজমাট আড্ডার স্থান।  ফাল্গুন মাসের দোলযাত্রার দিন প্রেম কানন সাজানো হতো পরিপাটি করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরও প্রায় আশির দশক পর্যন্ত দর্শনার্থীরা আসতো। এখন কিছু নেই। পাতাকুড়ানী আর গোসল করতে আসা লোকজনদের দেখা মেলে। এখানে কেবলই হাহাকার।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, প্রেমিক-প্রেমিকারা এখানে আসলে তাদের লাঞ্ছিত করে মোবাইল, টাকা ছিনতেই করে নেয় একটি চক্র। যে কারণে ভয়ে আর এখানে কেউ আসতে চায় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ