ঢাকা, বুধবার 20 June 2018, ৬ আষাঢ় ১৪২৫, ৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

ঈদের ছুটিতে ট্রেন ভ্রমণ

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে বাড়ি ফেরার ব্যাপারে মানুষের প্রস্তুতি যেমন আগে থেকে ছিল তেমনি এবারও যথারীতি পিছু নিয়েছিল কষ্ট ও দুর্ভোগও। লঞ্চ, বাস ও ট্রেনের টিকেট যোগাড় করা এবং স্বজনদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য যা কিছু করার সবই সময় থাকতেই করেছিল মানুষ। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার এই একটি বিষয়ে বাংলাদেশের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্যেই মিল রয়েছে। বাড়ি গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা ও সময় কাটানোসহ পারিবারিক অন্য অনেক কাজও মানুষ ছুটির দিনগুলোর মধ্যে করে থাকে। সব মিলিয়ে ঈদের ছুটি তাই এক বিরাট সুযোগ হয়ে আসে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, কোনো ঈদের ছুটিই মানুষের পক্ষে নির্বিঘ্নে ও আনন্দের সঙ্গে কাটানো সম্ভব হয় না। ট্রেন ও বাসের টিকেট পাওয়ার জন্য রাত থেকে সারাদিন এমনকি ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টদায়ক ও বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা শুধু পুরুষদের নয়, বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বয়সের নারীদেরও হচ্ছে। তাই বলে লাইনে দাঁড়ালেই আবার টিকেট মেলে না, টাকা গুনতে হয় নির্ধারিত দামের চাইতে বেশি। কারণ, সেখানে চলছে কালোবাজারীদের দৌরাত্ম্য। গণমাধ্যমোর রিপোর্ট ও জনগণের প্রতিবাদের মুখে কখনো কখনো ধাওয়া দেয়ার ও গ্রেফতার করার লোক দেখানো নাটক করা হলেও কালোবাজারীদের তৎপরতা যেমন বন্ধ হয়নি, তেমনি এ সত্যও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে যে, রেলওয়ের কর্তাব্যক্তিরা তো বটেই, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেও কালোবাজারে টিকেট কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত। এটা আসলে তাদের বার্ষিক একটি আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
ঈদের এ সময়ে বাস এবং লঞ্চ ও স্টিমারের টিকেটও সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যায় না। এবারও পাওয়া যায়নি। ওদিকে মারাত্মক আশংকার সৃষ্টি হয়েছিল নিরাপদ যানবাহনের ব্যাপারে। কারণ, সড়ক-মহাসড়কের তো বটেই, প্রায় তিন কোটি মানুষ যে লঞ্চ ও স্টিমারে যাতায়াত করে সেগুলোর অবস্থাকেও শোচনীয় এবং বিপদজনক বলা যথেষ্ট নয়। এবারও বেশ কিছুদিন ধরেই ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা শত শত লঞ্চ ও স্টিমারকে লাল-নীল রং লাগিয়ে এবং বডিতে ঝালাই করে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে সচিত্র রিপোর্ট বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও দেখানো হয়েছে। কিন্তু বিআইডাব্লিওটিএ বা সরকারের কোনো সংস্থাকেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ফলে একদিকে ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা লঞ্চ ও স্টিমার পুরো নৌপথ দখল করে রেখেছে, অন্যদিকে সড়ক-মহাসড়কগুলো পরিণত হয়েছিল যানজট ও ভোগান্তির বিপদজনক বিষয়ে।  লঞ্চ ও স্টিমারগুলো তো সদরঘাট থেকেই ডুবি ডুবি অবস্থায় যাত্রা শুরু করেছে!
এমন নিশ্চিত সম্ভাবনার কারণেই এবারের ঈদে অনেক বেশি মানুষ ট্রেনের ওপর ভরসা করতে চেয়েছিল। রোজা রেখে ও রাত থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এবং বেশি টাকা দিয়েও বহু মানুষ ট্রেনের টিকেট যোগাড় করেছিল। কিন্তু যাকে বলে বাংলাদেশ রেলওয়ে! এজন্যই ঈদের প্রাক্কালে দিন দুই পর্যন্ত মোটামুটি শিডিউল অনুযায়ী ট্রেন ছেড়ে গেলেও শেষ তিনদিন যথারীতি বিপর্যয় ঘটেছিল শিডিউলের। দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নির্বিঘ্ন ও ঝামেলামুক্ত ট্রেনযাত্রার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিলেও অন্যান্য বছরের মতো এবছরও ঢাকার কমলাপুর এবং চট্টগ্রামসহ দেশের ছোট-বড় সকল স্টেশনেই শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ-সাত ঘণ্টা পরও ট্রেন ছেড়ে গেছে। আর কোনো একটি শিডিউলের বিপর্যয় মানেই যেহেতু অন্য প্রান্তেরও বিপর্যয় সেহেতু ঈদের সময় ট্রেনের যাত্রী মাত্রকেই মারাত্মক বিপর্যয়ের কবলে পড়তে হয়েছে।
শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি ছিল নির্ধারিত আসন না পাওয়ার যন্ত্রণা। দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণির টিকেট কাটা সত্ত্বেও অনেকেই ট্রেনে উঠে তাদের আসনে বসতে পারেননি। কারণ, রেলওয়ের লোকজনের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে রফা করে বিনাটিকেটের লোকজন গিয়ে আসনগুলো দখল করেছিল। প্রচন্ড প্রতিবাদ ও আপত্তির মুখে কিছু কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে স্টেশন ম্যানেজারসহ রেলওয়ের কর্তা ব্যক্তিরা অবশ্য তৎপর হয়েছেন। রেলওয়ের নিরাপত্তা রক্ষীদের দিয়ে তারা এমনকি বিনাটিকেটের লোকজনের ওপর লাঠিও চার্জ করিয়েছেন। কিন্তু আসন দখলের কর্মকান্ড একেবারে বন্ধ করতে পারেননি। এমন অবস্থা অব্যাহত থেকেছে ঈদের আগে শেষদিন পর্যন্তও। এরই পাশাপাশি ছাদের ওপরও হাজার হাজার মানুষ গিয়ে উঠে বসেছে। জিজ্ঞাসার জবাবে তাদের মুখে ছিল একটিই কথা- যেভাবেই হোক, বাড়ি যেতেই হবে। এজন্যই তারা ছাদের ওপর ‘ঝুইল্ল্যা মুইল্ল্যা’ হলেও উঠে যেমন বসেছে, তেমনি গন্তব্য পর্যন্ত না গিয়েও নামেনি ট্রেনের ছাদ থেকে। ভাগ্য অবশ্য ভালোই বলতে হবে। কারণ, ছাদ থেকে পড়ে বড় ধরনের কোনো মৃত্যুর ঘটনা এ বছর ঘটেনি।
কিন্তু তা সত্ত্বেও সব মিলিয়ে মানতেই হবে, এবারের ঈদের সময়ও রেলওয়ে যথারীতি চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে। আমরা আশা করতে চাই, দুর্ঘটনা ও মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে আনার ব্যাপারে আরো একটি ঈদের জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে রেলওয়ে বিভাগ অনতিবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই তেমন উদ্যোগ তথা ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এই ব্যবস্থা নিতে হবে সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে। শুধু ঈদের সময় নয়, সারা বছর ধরেই যাত্রী সাধারণকে নিশ্চিন্ত ও আরামদায়ক ভ্রমণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ট্রেন তো বটেই, বাস এবং লঞ্চ ও স্টিমারসহ সব ধরনের যানবাহনের ব্যাপারেও আমরা একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এই সত্য অনুধাবন করবে যে, জনগণ শুধু মিষ্টি কথা আর আশ্বাস শুনতে চায় না। তারা কাজ দেখতে চায়। বড় কথা, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় দুর্ভোগের কবলে পড়তে তো চায়-ই না, প্রতিবার অসংখ্য স্বজনের মৃত্যু ও লাশও দেখতে চায় না তারা। তারা চায়, ট্রেনসহ সকল যানবাহনই নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত হয়ে উঠুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ