ঢাকা, বুধবার 20 June 2018, ৬ আষাঢ় ১৪২৫, ৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

ভিক্ষুকের সাতকথা

-আখতার হামিদ খান
ঢাকা শহরের ভিক্ষুকদের চিত্র নিউ মার্কেট
নিউ মার্কেটের ওভার ব্রিজের নিচে প্রবেশ পথে সুস্থ-সবল এক লোক দাঁড়িয়ে। সামনের রাস্তার ওপর চাটাইয়ে শোয়া ৩/৪ বছরের এক শিশু। শরীরের তুলনায় মাথাটি চেপ্টা সাইজের। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখা গেল অনেকেই শিশুটিকে ভিক্ষা দিচ্ছে। শিশুটির নাম কি? এমন প্রশ্ন করতেই ভয় পেয়ে গেলেন পাশের লোকটি।  অনেকটা ভয়ে ভয়ে বললেন কুলসুম। ভিক্ষুক এবং আমার কথার মাঝে কাছে এগিয়ে এলেন আরও কয়েকজন কৌতূহলী ভিক্ষুক। তারা জানালেন লোকটির নাম গফুর। এটি তার মেয়ে নয়। এই মেয়ের বাবার নাম আমদার বাঘা। বাড়ি বরিশাল মুলাদীর বাইল্যাতলী গ্রামে। আমদার বাঘার তিন কন্যা। তিনজনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিন শিশুকেই দৈনিক হিসেবে নির্দিষ্ট টাকায় ভাড়া দেয়া হয়। একদিনে কয় টাকা ভাড়া? এই প্রশ্নের উত্তরে গফুর জানালেন, এমনিতে একশ’ দেড়শ’ টাকা। কিন্তু রমজান মাসে, শবেবরাতে, শবে কদরের দিন এবং প্রতি শুক্রবার এ পরিমাণ বেড়ে যায়। কুলসুমের বাবা পরিচয়দানকারী গফুরের ভিক্ষা আর্তি ‘মেয়ের টাইফয়েড জ্বরে এই অবস্থা চিকিৎসার জন্য আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য করুন।’ এ শিশুকে প্রদর্শন করে এভাবে উঠছে লাখ লাখ টাকা। কিন্তু অভাগী কুলসুমের চিকিৎসা আর হয় না। হয়তো তার জন্ম প্রদর্শনের জন্যেই। জানা যায়, কুলসুমের বাবা আগে কাঠমিস্ত্রির জোগালির কাজ করত। বর্তমানে তা ছেড়ে দিয়েছেন। তিন প্রতিবন্ধী কন্যাই তার উপার্জনের উৎস।
আজিমপুর কবরস্থান
আজিমপুর কবরস্থানের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ফাঁকা জায়গাতে ২৬ বছর ধরে আসন গেড়ে আছে ভিক্ষুক নুরু। দু’টি শীর্ণ হাত, দুটি সরু পা নিয়ে চাটাইয়ে ওপর বসে দু’যুগেরও বেশি সময় ধরে এ স্পটে চলছে ভিক্ষুক নুরুর ভিক্ষাবৃত্তি। জানা যায়, ভিক্ষুক নুরুই নাকি এখানকার অলিখিত সরদার। নাম কি? এ কথা জিজ্ঞেস করতেই এক পলকে আপাদমস্তক মেপে নিল নুরু। তারপর তার পাল্টা প্রশ্ন ‘আপনি কি সাংবাদিক? না এনজিও কর্মী’- এ উত্তর দিতেই নুরুর চেহারায় রাজ্যের বিরক্তি- ‘না, এত মাইনচের সঙ্গে কথা কওনের আমার সময় নাই। ’ অন্য ভিক্ষুকরা জানালেন, নুরুর বাড়ি ভোলা। বর্তমানে জায়গা কিনে বাড়ি করেছেন কেরানীগঞ্জের খোলাগুড়ায়। কবরস্থানের মূল গেটে ভিক্ষার জন্য জায়গা পেতে হলে তাকে দৈনিক দিতে হবেস ২০-৩০ টাকা। নইলে রহস্যজনকভাবেই কবরস্থানের লোক এসেই ওই ভিক্ষুককে তুলে দেবে। এ কথা বলছিলেন নুরুর দু’তিন গজ দূরে বসা বৃদ্ধ ভিক্ষুক জয়নাল। বাড়ি শরীয়তপুর নড়িয়া থানার শেখসা বাজার। নুরুকে নিয়ে এই বৃদ্ধার সাথে কথা হচ্ছে দেখে নুরু এবার রীতিমতো রেগে গেল। নুুরু বলল- ‘যা কথা আমার সঙ্গে কন, ওই বুড়ারে ডিসটার্ব কইরেন না।’ এ কথা শুনে নুরুর কাছে আসতেই নুরু রীতিমতো বোবা বনে গেল।
যশোর মাগুরার মোহাম্মদপুর থানার মোহনপুর গ্রামের বাড়ি পঙ্গু ভিক্ষুক সিরাজের। ট্রাক এক্সিডেন্টে হাত দুটি ও ডান পা হারানোর পর ১৯৯৩ সাল থেকে সিরাজ ঠাঁই নিয়েছে আজিমপুর কবরস্থানে। জানালেন আজিমপুরে আয় ভাল। বৃহস্পতি ও শুক্রবার সবচেয়ে বেশি। ওই দু’দিন ৪/৫ শ’ টাকা করে পাওয়া যায়। এমনিতে গড়ে দেড়শ’ টাকা আয় হয়। থাকেন কামরাঙ্গীর চর বাসা ভাড়া নিয়ে। ঘরে তার রয়েছে দুই দুইটি বউ। দু’ বউ পালাক্রমে তাকে আনা নেয়ায় সাহায্য করে।
হাইকোর্ট মাজার
হাইকোর্ট মাজারে প্রবেশ পথেই দাঁড়িয়ে আউলা মাথার বাউলা কেশ জাতীয় কিছু লোক। তাদের আকুতি, ‘দে বাবা, দুটো ডাইল ভাত খামু’। এই মাজারে ৩০/৩২ বছর ধরে ডাইল-ভাত খাবার আবদারে ভিক্ষা করছে নিজামউদ্দিন। মুখভর্তি সাদা ধবধবে দাড়ি, পরনে দামি লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি আর নাদুস-নুদুস স্বাস্থ্য তার সচ্ছলতার সাক্ষ্য বহন করছে। নিজামউদ্দীন জানালেন, তার সম্বল বলতে বড় ছেলে খোকনকে দুবাই পাঠানো। বিদেশ গিয়ে একমাত্র সম্বল ছেলেটাও এখন ‘বউয়ের আঁচলে’ ঢুকে গেছে। এ মাজারে ১৯৮০ সাল থেকে পান বিক্রি করছেন মোহম্মদ আলী শেখ। তিনি জানালেন, নিজামউদ্দিন কোর্ট এলাকার ‘ডাইল-ভাত’ ফকির নামে পরিচিত। নিজের ব্যবসার জন্য হাজারে মাসিক ১০ টাকা সুদে তিনি ক’দিন আগেও ডাইল-ভাত ফকির থেকে ৪ হাজার টাক ঋণ নিয়েছেন। জানা যায়, রাজধানীর শনির আখড়ায় ডাইল-ভাত ফকিরের নিজের জায়গা এবং দুটি মুদি দোকান রয়েছে। ছোট মেয়ের জামাই মুদি দোকান দেখাশোনা করে।
হাইকোর্টের মাজারেই এখনও মাথায় পাগড়ি দিয়ে পুরোদস্তুর মৌলানা সেজে ভিক্ষা করে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা নুরু। গতবার নিজের টাকায় হজ করে এসেছেন। হজ করে এসেই আবার নেমে পড়েছেন নিজের পুরনো পেশায়। তবে হাইকোর্টের অন্য ভিক্ষুকরা জানালেন, বৃহস্পতি, শুক্র এই দু’দিন নুরু গেটে বসে। বাকি ৫ দিন সে বাসাতেই থাকে। হাইকোর্টের মাজারে ভিক্ষুকদের মধ্যে সিদ্দিক পাগলা প্রকাশ উয়ালশাহও ধনী ভিক্ষুক হিসেবে ভিক্ষুকমহলে বেশি পরিচিত।
দিন যায় বাড়ি আর ফেরা হয় না কোহিনূরের সন্ধ্যা আধো অন্ধকার চারদিকে। পল্টন মোড় পার হয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যেতেই ডাক ‘স্যার বাড়ি রংপুর, যাইতে পারছি না ভাড়ার অভাবে। দুটো ট্যাহা দিবেন স্যার।’ বোরকা পরা এক মহিলার আকুতির সঙ্গে থাকা ছোট দু’শিশুর ফ্যালফ্যাল চাহনি। দেখলেই ভেতরটা একটু নাড়িয়ে দেয়। অনেকেই এ আকুতিতে সাড়া দিচ্ছেন। সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলল এ সাহায্যের পথনাটক। মহিলা দু’শিশুসহ রিকশায় চাপল। অন্য রিকশাও পিছু পিছু চলছে তার অনুসরণে। দীর্ঘ পথ পার হয়ে রিকশা এসে থামল ডেমরা ধলপুর সিটি কর্পোরেশন বস্তিতে। জানা গেছে, এই মহিলার নাম কোহিনূর। তার চার মেয়ে-সুলতানা, রাজিয়া, হাসনা ও নূরী। স্বামী রিকশা চালায়। ছোট দু’মেয়ে হাসনা ও নূরীকে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় চলে তার রংপুর যাওয়ার ভিক্ষাবাণিজ্য। বুদ্ধিমতি কোহিনূর এখন শুধু প্রেসক্লাবের মোড়েই থাকে না মানুষ তাকে চিনে ফেলবে বলে এখন বেছে নিয়েছেন মোহাম্মদপুরের আসাদ গেটকে। পূর্বের মতো চলে এখানেও পথনাটক। পরে আর কোহিনূরের রংপুর যাওয়া হয় না। দু’কেজি চাল নয়তো কেজি দুই ডাল নিয়ে যেতে হয় ধলপুর। যেখানে জীবন-জীবিকার নিত্য টানাটানি।
সাহসি ভিক্ষুক
কারওয়ানবাজার। সিএনজি ট্যাক্সি করে আসছিলেন মোহম্মদপুর টাউন হলের খোরশিদ আলম। গাড়ি একটু জ্যামে পড়তেই হঠাৎ হাতে ‘ঘু’ নিয়ে আভির্ভুত হলেন এক উলঙ্গ ভিক্ষুক। ময়লা এক্ষুণি নিক্ষেপ করবে এই ভঙ্গিতে ডান হাতটা দোলাতে দোলাতে বলল ‘দে, ট্যাকা দে’। পকেট থেকে ১০ টাকা বের করতেই তার হুঁশিয়ারি ১শ’ টাকা দে। অগত্যা ১শ’ টাকা দিয়ে রক্ষা। শুধু একজন নয়, অসংখ্য ভুক্তভোগীর মুখে এ ধরনের ঘটনা শোনা যায়। কারওয়ানবাজার, পুরানা পল্টন, কাকরাইল, জজকোর্ট, চকবাজার এলাকায় এ ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। এ ভিক্ষুকরা নেশাসক্ত।
চাঁন মিয়ার ঘরে তিন চাঁদ
মোটাসোটা শরীর। পাখির পায়ের মতো দুটি রাজধানীতে ভিক্ষা করছে আবদুল গফুর চাঁন। এক সময় কোমরের দু’পাশে টায়ার বেঁধে গড়িয়ে গড়িয়ে ভিক্ষা করত। ভিক্ষাও মিলত বেশ। তেমন কষ্টের দিন ার নেই। মিরপুর গোলচক্কর থেকে মিরপুর পল্লবী পর্যন্ত চাঁন মিয়ার জীবন ঘুরে এখন হুইল চেয়ারে। ঘরে তার তিন তিনটি বউ। এর মধ্যে প্রথম বউ আছিয়া বেগম দুটি ছেলে নিয়ে থাকে পল্লবী বালু মাঠ বস্তিতে। দ্বিতীয় বউ নাজমা আক্তার রূপনগর শিয়ালবাড়ি বস্তিতে থাকে। তৃতীয় বউ মেরুন্নেছা অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। তাই চান আদর করে ডাকেন মেরু বলে। এই সুন্দরী মেরুকে নিয়ে চাঁন থাকেন মিরপুর ৫ নং ওয়ার্ডের বাউনিয়া বটতলা বেড়িবাঁধ বস্তিতে। পর্যায়ক্রমে তিন দিন তিন বউ গাড়ি ঠেলে। চাঁনের ভাষা অনুযায়ী তার প্রতিদিন গড়ে আয় ৩/৪ শ’ টাকা। শুক্রবার এর দ্বিগুণ। তার প্রথম স্ত্রী জানান, মিরপুর ১১ নং সুইপ প্লটে চাঁনের জায়গা আছে। রিকশা আছে ৩০/৩২ টি। ৪৮ বছর বয়সী চাঁনের বক্তব্য ‘খাওন পরনের আল্লাহর রহমতে অভাব নেই। নিজ বাড়ি বরিশাল গৌরনদীতে সামান্য জায়গা কিনেছে বলে জানান চাঁন।
ভিক্ষুক তবে ভদ্র
কোন সাল তা মনে নেই। শুধু মনে আছে এরশাদের আমল। এ সময় থেকে আমড়ার বিচি কুড়িয়ে রাজধানীর গুলিস্তান হলে বিক্রি করত ভোলা মুলাকান্দির কিশোর আকতার হোসেন। বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় ৫ টাকায় ১শ’ আমড়া বিচি বিক্রি করে চলত মাকে নিয়ে আকতারের সংসার। একদিন বিচির বস্তা মাথায় নিয়ে ট্রেনে উঠতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে ডান পা কেটে যায় আকতারের। এরপর? রোগেশোকে মরে যায় মা’টা। পঙ্গু আকতার বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেয় মিরপুর মাজারে। ময়মনসিংহ ধরা ভবঘুরে স্কুল থেকে মেট্রিক পাসস করা আকতার এখনও বসে থাকে এ মাজার গেটে। তবে কারও কাছে ভিক্ষা চাইতে লজ্জা লাগে। কেউ কিছু হাইদ্যা দিলে খাই-মাথা নিচু করে জানাল আকতার।
ভিক্ষুক না রঙের মানুষ
নিজের হাতে ধারাল ব্লেট দিয়ে কেটে ‘দে’ বলে আবার হাতে পোচ দিতে উদ্যত হয় এক ভিক্ষুক। পুরনো ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় এসব ভিক্ষুকের আনাগোনা বেশি। ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্মে আসা। কোরআন কেনার টাকা, নিকটত্মীয় মারা গেছে এসব দোহাই দিয়ে অনেকে ভিক্ষার হাত মেলে।
শেষ কথা
ভিক্ষুকরা চুরি-ছিনতাইসহ ট্রাফিক সমস্যা সৃষ্টি করে। এই ভিক্ষুকরা ভবঘুরে কেন্দ্রে যেতে চায় না। কারণ ভবঘুরে কেন্দ্রে দু’বেলা ভাতের ব্যবস্থা ও সকালে নাস্তার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ভিক্ষুকরা ভবঘুরে কেন্দ্রে যেতে চায় না। বিদেশি দেখলেই ভিক্ষুকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। অনেকে বলে থাকেন, এরা নামে ভিক্ষুক হলেও অনেকে লাখপতি। এরা ভিক্ষুক নয়, যেন একেকটা ডাকাত। নগরীর ভিক্ষাবৃত্তি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূলত দারিদ্র্য বাড়ার কারণে ভিক্ষুক বাড়ছে। লেখাপড়া, চাকরি পাওয়া এসব সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় তারা এসব বিকল্প পেশাকে বেছে নিচ্ছে।
ভিক্ষাবৃত্তি একটি সহজ পেশা এবং পৃথিবীর আদিতম পেশা। এতে কোনও পুঁজি লাগে না। যতই অসম বণ্টন বাড়বে ততই এ ধরনের পেশা বাড়বে। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভেতরে এর সমাধানের পথ বের করতে হবে।
ভিক্ষাবৃত্তি সমস্যা নিরসনে ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় ভবঘুরে আইন প্রণীত হয়। তবে এ আইনে ভিক্ষাবৃত্তি রোধ না হওয়ায় ১৯৫৩ সালে তা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনে ভিক্ষাবৃত্তিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এর ৮১ ধারায় বলা আছে, কেউ ভিক্ষার জন্য দৈহিকব্যাধি বা বিকলাঙ্গ প্রতিবন্ধী অঙ্গ প্রদর্শন করলে এক মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। রাস্তায়, পথেঘাটে জনস্থানে ভিক্ষা করা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এসব আইনি বাক্য প্রয়োগের একটিও নজির নেই। মানে ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ