ঢাকা, বুধবার 20 June 2018, ৬ আষাঢ় ১৪২৫, ৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

রামপাল : হারিয়ে যাওয়া রাজধানী

হামিদ খান : ঢাকা মহানগরী যখন জঙ্গলাকীর্ণ, সেই হাজার বছর আগে বিক্রমপুরের রামপালে তখন নগর সভ্যতা জেগে উঠেছে। যুদ্ধবিগ্রহ, বন্যা, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে অনেক নিদর্শন বিলুপ্ত এবং কিছু মাটি চাপা পড়ে আছে। খননের ফলে কিছু উদ্ধার করা গেছে। সেই উদ্ধার কর্ম নিয়ে আবার বেশ কিছু মজার মজার ঘটনাও ঘটেছে।
বিক্রমপুরে নান্না ও সুয়াপুর নামে দু’টি গ্রাম আছে। এই দু’টি গ্রামের সন্ধিস্থলে একটি বড় রকমের বিহার ছিল। ঐ ঢিবিগুলো ‘বাজাসনের ভিটা’ নামে পরিচিত। এখান থেকে পুরাকৃতি উদ্ধার নিয়ে বেশ মজার ঘটনা ঘটেছিল। ১৯২০ সালে নিবারণ চন্দ্র দাস সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে এই এলাকা জরিপ করান। তিনি বাজাসন বিহারের বড় ঢিবি খানিকটা খনন করেছিলেন। নান্নারবাসী প্রাচীন জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্র রায় বিশিষ্ট ঐতিহাসিক শ্রী যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তকে বলেন, অনেক দিন আাগে একজন সন্ন্যাসী ঐ বাজাসনেই থাকতেন। তার তিন চার বছর পর আবার এক কাপালিক সন্ন্যাসী এসে উপস্থিত হন। তিনি কিছুই খেতেন না, কাপড়ও পরতেন না। জোর করে খাওয়ালে খেতেন ও কাপড় পরতেন। তিনি রাতে বাজাসনে ধ্যান করতেন। বয়সের কথা জিজ্ঞেস করলে বলতেন ৩৫০ বছর। সকলে তাকে পাগল বিবেচনা করত। একদিন রঘুনাথপুরে প্রসিদ্ধ প-িত সার্বভৌম মহাশয় এসে তার সাথে কথা বললে এই সন্ন্যাসী সংস্কৃতিতে অনর্গলভাবে ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে বলেন। এতে সবাই চমৎকৃত হয়ে যান। তিনি বলতেন, ‘তোমরা এই ভিটা খনন কর, এখানে পঞ্চমু- শিব আছে, আরও অনেক কিছু আছে।’ অনেক বছর পর সরকারি পক্ষ থেকে এই ঢিবি খনন করা হয়, তখন এখান থেকে নানা ধরনের মূর্তি ও পাথর পাওয়া যা। রঘুনাথপুর রামপালের অন্তর্গত একটি প্রাচীন স্থান। রঘুনাথপুরের একটি পুরাতন পুকুর খনন করে কতগুলো দেব-দেবীর মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। এই পুকুরটি পঞ্চসারগ্রাম নিবাসী শ্রী পরেশনাথ মহলানবীশ এর গণনা অনুযায়ী খনন করা হয়। এই জ্যোতিষী ঐতিহাসিক যোগেন্দ্র নাথ গুপ্তকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে বলেন, তিনি গননা করে জানতে পেরেছেন প্রাচীন রাজধানী রামপাল অঞ্চলের রঘুনাথপুর গ্রামে একটি পুরনো বুজে যাওয়া দীঘির বহু নিচে পাকা বাঁধানো স্থান আছে। সেখানে অনেক ধাতব পদার্থ রয়েছে যেমন সোনা, রুপা, তামা, পিতল, কাঁসা, রাং, সীসা, টিন ইত্যাদি সাধারণ পাথরকেও বুঝিয়েছেন। তিনি চিঠিতে বলতেন যে, তিনি ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটকে তার গণনার কথা জানান এবং সরকারি খরচে এই খনন কাজ পরিচালনা করার অনুরোধ করেন। ম্যাজিস্ট্রেট তার কথায় আস্থা রাখতে পারেননি। অবশেষে তিনি ঢাকার কমিশনারকে তার অব্যর্থ গণনা পরীক্ষা করার অনুরোধ জানান। এই খননের ব্যয় তিনিই বহন করবেন এই অঙ্গীকারের প্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেট এলাকা পরিদর্শন করেন। ম্যাজিস্ট্রেট জ্যোতিষীর ব্যয়ে খনন করে গণনা ফলাফল পরীক্ষার অনুমতি দেন। এই অনুমতির বলে তিনি ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ১৯১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বহুলোক লাগিয়ে খনন কাজ চালান হয়। খননের ৪ মাস পর্যন্ত পুলিশ পাহারা ছিল। ১৪/১৫ হাত মাটির নিচে থেকে পাকা বাঁধানো স্থান দেখা গেল। সেখান থেকে ধাতুর তৈরি বহু দেবমূর্তি, ত্রিশূল, খড়ম, থালা, সড়া, ঘট, শংখ ইত্যাদি বিভিন্ন পূজা উপকরণ উদ্ধার করা গেল। সরকার ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে এই পুরাকীর্তিগুলো সযতেœ রক্ষা করেন। বিভিন্ন সময় মূল্যবান বহু পুরাকীর্তি হারিয়ে গেছে। ভাঙা পড়েছে ইটের বহু প্রাচীন কাঠামো। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে খনন কাজ পরিচালনা করলে বের হয়ে পড়বে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন রাজধানীর অজানা ইতিহাস। গড়ে উঠবে ঢাকার অদূরে একটি পর্যটন কেন্দ্র।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ