ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 June 2018, ৭ আষাঢ় ১৪২৫, ৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতাকারীর শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করা হচ্ছে -সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার : মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতাকারী ও মাদকের গডফাদারদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ কম। এ জন্য সংশোধিত আইনে মাদকের গডফাদারসহ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হবে।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর পপ্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হওয়ার পর প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০ অনুযায়ী মাদক অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যক্তির দখলে/কর্তৃত্বে/অধিকারে মাদকদ্রব্য পাওয়া না গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ কম। এতে মাদক ব্যবসায় জড়িত মাস্টারমাইন্ডরা সহজেই পার পেয়ে যায়। মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতাকারী ও মাদকের গডফাদারসহ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ প্রণয়ন করা হচ্ছে। সংশোধিত আইনে মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক ও মাদকের গডফাদারসহ মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হবে। তা ছাড়া এই আইনে মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকেও আইনের আওতায় আনার জন্য মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য ও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকার সব সময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মাদকের আগ্রাসন প্রতিরোধে মাদক চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যানবাহন ও মাদক স্পটগুলোতে তল্লাশী অভিযান চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৮ মে থেকে এ পর্যন্ত চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং এগুলো পরিবহনের বাহন উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট ১৫ হাজার ৩৩৩টি মামলা করা হয়েছে। মোট ২০ হাজার ৭৬৭ জন আসামীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০-এর অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক আদালত গঠনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাদক অপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হচ্ছে। মাদক অপরাধ-সংক্রান্ত মামলার বিচার কার্যক্রম আলাদা কোনো আদালতের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখছে।
সরকারি দলের সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সে নীতি বাস্তবায়নে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাদক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সব সংস্থা ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ জন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩৬টি মামলা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদক সমস্যা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ে নিয়মিত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়াবা পাচার রোধে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি সভাতেই মিয়ানমারকে ইয়াবার উৎপাদন ও প্রবাহ বন্ধ করার জন্য এবং মিয়ানমার সীমান্তে ইয়াবা তৈরির কারখানা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ডিসি-ডিএম পর্যায়ে সভা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলায় ৯৪ জনবলের বিশেষ জোন স্থাপন ও বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের সহায়তায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প
চীন সরকারের সহায়তায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য সেলিনা বেগমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চীন সরকারের সহায়তায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বেসিনে বন্যা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমীক্ষা সম্পাদনের জন্য প্ল্যানিং ফর ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।
তিনি বলেন, বিগত ৯ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় হতে ভিপিএফ খাতে ২০ লাখ ২৩ হাজার ২৭৬ দশমিক ৭৩৪ মেট্রিক টন শস্য ও ৯ কোটি ৮৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫৭২ টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওর এলাকায় আগাম বন্যার কবল হতে ফসল রক্ষা তথা সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৪ শত ২৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘কালনী-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থাপনা’, ৫ শত ৮৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ ও ৯ শত ৯৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘হাওড় বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পসমূহের আওতায় বিদ্যমান ডুবন্ত বাঁধসমূহের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ হাওর এলাকার নদ-নদীসমূহের ড্রেজিং এবং অভ্যন্তরীণ খালসমূহ পুনঃখননের কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন।
শেখ হাসিনা বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের উপর দিয়ে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীসহ (৫৪টি ভারত হতে এবং ৩টি মিয়ানমার হতে) সর্বমোট ৪০৫টি নদী প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত বর্ষকালে সংঘটিত হয়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনের পানি প্রবাহের সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পলি নদ-নদী ও অন্যান্য জলাধারসমূহের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং ভরাট করে ফেলে। ফলে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা দেখা দেয়।
তিনি বলেন, বিগত ৯ বছরের বন্যা-দুযোর্গ মোকাবেলায় ৯০২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও ৮৯৬ কিলোমিটার নদ-নদী ড্রেজিং ও খনন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান নদী যমুনা, গঙ্গা/পদ্মা নদীর ভাঙন ও বন্যা রোধে সরকার ফ্লাড অ্যান্ড রিভারব্যাংক রিস্ক ম্যানেজম্যান্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের ৩টি পর্যায়ে মোট ৫৭ কিলোমিটার নদী তীর প্রতিরক্ষা কাজ, ৮৯ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ১৮ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজ, ২৩ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও ৭টি রেগুলেটর নির্মাণ/ মেরামত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা কবলিত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন জিআর চাল, ২২ লাখ জিআর ক্যাশ, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ১ হাজার বান্ডেল ঢেউটিন এবং গৃহ নির্মাণের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এ সব স্থানে বাঁধের উপর দিয়ে যাতে পানি প্রবাহিত না হয় সে লক্ষ্যে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাটি/বালির বস্তা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল’ থেকে কমিশনার, সিলেট বিভাগের কাছে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে ব্যবহারের জন্য আমি নির্দেশ দিয়েছি। প্রয়োজনে আরও অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ