ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 June 2018, ৭ আষাঢ় ১৪২৫, ৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার

শিল্প ও উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী আমদানির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে পণ্যের মূল্যও। একযোগে মার্কিন ডলারের দামও বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য-পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ৫৩৩ কোটি ডলারে পৌঁছে গেছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৭১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বিগ্ন অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা প্রচন্ড চাপে পড়েছে। এমন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুষ্ঠু ও সঠিক নীতি-কৌশলের ভিত্তিতে কঠোর ভ’মিকা পালন করতে না পারে তাহলে মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা আরো বাড়বে। সেই সাথে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দামও। বাস্তবে বহুদিন ধরে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েও চলেছে।
এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি এবং ডলার ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, আমদানির আড়াল নিয়ে অর্থপাচারই অন্তরালের প্রকৃত কারণ। সহজ কথায়, আমদানি পণ্যের দাম অনেক বেশি দেখিয়ে মার্কিন ডলারের মাধ্যমে বিশেষ কিছু গোষ্ঠী দেশ থেকে  বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে চলেছে। যেহেতু কাগজেপত্রে সবই করা হচ্ছে আইনসম্মতভাবে সেহেতু একদিকে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী আমদানিকারকদের ডলার সরবরাহ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে টান পড়ছে। কমে আসছে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ।
কথা শুধু এটুকুই নয়। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে ডলারের দামও বেড়ে চলেছে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মাত্র মাস কয়েক আগেও যে মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল ৮০ টাকার নিচে, সে একই ডলারের মূল্য সম্প্রতি ৮৬ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে। উল্লেখ্য, ব্যাংকগুলো কিন্তু ৮৩ টাকার সামান্য বেশি দর নির্ধারণ করে রেখেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলকেই প্রতি ডলারের জন্য অন্তত ৮৬ টাকা গুনতে হচ্ছে। এমন অবস্থা শুরু হয়েছে রমযানের কিছুদিন আগে থেকে- এপ্রিলের দিক থেকেই অনেকটা হঠাৎ করে বেড়েছে মার্কিন ডলারের দাম।
হঠাৎ কেন ডলারের বাড়তে শুরু করেছে তার উত্তর দিতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, অবৈধ পথে টাকার পাচারই এমন অবস্থার প্রধান কারণ। চলতি ২০১৮ সাল যেহেতু নির্বাচনের বছর সেহেতু স্বাভাবিক নিয়মেই বিদেশে টাকার পাচার অনেক বেড়ে গেছে। ক্ষমতার সম্ভাব্য রদবদল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রতিশোধসহ সহিংসতার আশংকায় বড় দলের নেতা, ঠিকাদার ও অসৎ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাসহ আরো অনেকেই দেশে টাকা রাখার চাইতে বিদেশে পাচার করে দেয়াকে নিরাপদ মনে করছেন। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকায় এ ধরনের ব্যক্তিরা হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থার আশ্রয় নিচ্ছেন। তাছাড়া টাকা যেহেতু পাচার করা যায় না এবং করা গেলেও সেটা যেহেতু লাভজনক ও নিরাপদ নয় সেহেতু সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো মার্কিন ডলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একই কারণে রাতারাতি ডলারের দামও বাড়তে শুরু করেছে। তথ্যাভিজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, পাচারের এই ধারা প্রতিহত না করা গেলে ডলারের দাম তো বাড়তে থাকবেই, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, একদিকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়া এবং অন্যদিকে মার্কিন ডলারের মূল্য ৮৬ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। অর্থনীতিবদসহ তথ্যাভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন এবং এমন অনুমান সত্যও যে, নির্বাচনের বছর বলে ডলারের মূল্য আরো বাড়তেই থাকবে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি ও রফতানিসহ পণ্যের মূল্যের ওপর। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে বলে পণ্যের মূল্যও বাড়তে থাকবে। অন্যদিকে রফতানি করতে গিয়ে একই ডলারের কারণে ক্ষতির শিকার হবেন ব্যবসায়ীরা।
নির্বাচনের বছর ধরনের যতোকিছুরই দোহাই দেয়া হোক না কেন,  আমরা কিন্তু বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না। কারণ, গত বছরই ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তার এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, টাকা পাচারের ক্ষেত্রে মাত্র এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৮তম অবস্থান থেকে ২৬তম অবস্থানে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে গড়ে ৪৪ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। জিএফআই-এর ওই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছিল, ‘নির্বাচনের বছর’ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
মার্কিন সংস্থার এই রিপোর্টের আলোকে তথ্যাভিজ্ঞরা সে সময় জানিয়েছিলেন, এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে দেশের ভেতরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সৃষ্টি হয়নি চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের কারণেই দেশি-বিদেশি কোনো শিল্প উদ্যোক্তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না। তথ্যাভিজ্ঞরা প্রসঙ্গক্রমে সরকারের প্রতিহিংসামূলক নীতি ও কর্মকান্ডকে পরিস্থিতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
২০১৮ সালের শেষ প্রান্তিকে এসেও পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই সচেতন সকল মহলে ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অবৈধ পথে লক্ষ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার ফলেও শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সংকট ক্রমাগত আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে। সে কারণে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, টাকার পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হলে সরকারের উচিত অবিলম্বে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ করে দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা দরকার, কাউকেই যাতে অবৈধ পথে টাকা পাচার করার কথা চিন্তা না করতে হয়। আমরা প্রসঙ্গক্রমে টাকা পাচারকারীদের চিহ্নিত করার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি জানাই। এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হলেই টাকার পাচার যেমন কমবে তেমনি কমে আসবে মার্কিন ডলারের মূল্যও। সে লক্ষ্যেই সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে অনতিবিলম্বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ