ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 June 2018, ৭ আষাঢ় ১৪২৫, ৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

ব্যভিচারের ভয়ঙ্কর ঘৃণ্য রূপ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোন অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গী, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোন উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যার কোন শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই; যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, সাময়িকী, ভাস্কর্য, কল্পমূর্তি, মূর্তি, কার্টুন বা লিফলেট এবং উল্লেখিত বিষয়াদির নেগেটিভ ও সফট ভার্সন পর্ণোগ্রাফি হিসেবে গণ্য হবে।
পর্ণোগ্রাফি একটি সর্বজন স্বীকৃত অশ্লীলতা। মানব সমাজকে পুত:পবিত্র এবং বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে ইসলামে সকল প্রকার অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আপনি বলুন, আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন- যা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায়-অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা যা তোমরা জানো না। আল্লাহ সকল ধরনের অশ্লীলতা পরিহারের নির্দেশ প্রদান করে বলেন, “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচারণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন-যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।” পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী জাতিসমূহ অশ্লীল কাজ সম্পাদন করে তা আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে চালিয়ে দিত। তাই আল্লাহ বলেন, “আর যদি আহলে-কিতাবরা বিশ্বাস স্থাপন করতো এবং খোদাভীতি অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের মন্দ বিষয়সমূহ ক্ষমা করে দিতাম এবং তাদেরকে নেয়ামতের উদ্যানসমূহে প্রবেশ করাতাম।”
“তারা যখন কোন মন্দ কাজ করে তখন বলে, আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এ নির্দেশই দিয়েছেন।”  আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। তোমরা এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না। আল্লাহ মুসলিম জাতিকে মন্দ কাজ থেকে কেবল দূরে থাকতে আদেশই প্রদান করেননি; বরং এসব অশ্লীল কাজ থেকে জাতিকে দূরে রাখতে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নিদের্শও প্রদান করেন। আল্লাহ বলেন, “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, নির্দেশ করবে সৎ কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হল সফলকাম। অন্যত্র এ কাজকে মুমিনদের পারস্পরিক দায়িত্ব আখ্যা দিয়ে বলেন, “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভাল কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে”। এদেরই উপর আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর এ ভিন্ন বা উল্টো চরিত্রকে মুনাফিকদের কর্ম হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এ সম্পর্কে বলেন, “মুনাফেক নর-নারী একে অপরের অনুরূপ; তারা পরস্পরকে অসৎকর্মের আদেশ দেয় এবং সৎকর্মে নিষেধ করে।
আল্লাহ ‘আমর বিল মরূফ’ এবং ‘নাহি আনিল-মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) কে মু’মিন ও মুনাফিকদের সাথে পার্থক্যকারী নিদর্শন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। ফলে কোন মুসলিম অশ্লীল কোন কাজে জড়িত হওয়া তো দূরের কথা, বরং অশ্লীল কাজে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো তার দায়িত্ব। রসূলুল্লাহ সা: বলেন, “তোমাদের কেউ অন্যায়-অশ্লীল কর্ম দেখলে তা শক্তি দ্বারা প্রতিহত করবে। যদি সমর্থ না হয় তাহলে কথার দ্বারা প্রতিবাদ করবে। এতেও সমর্থ না হলে বিবেক দ্বারা প্রতিহত করবে। আর এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। ফলে ইসলাম প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বপ্রকার অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন, “লজ্জাকর কার্যে জড়িত হয়োনা, সে প্রকাশ্যেই বা গোপনে। ফলে অশ্লীল কর্ম সমাজে ছড়িয়ে দেয়াও মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ বলেন, “যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার লাভ করুক তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানে, তোমরা জান না। কোন নারীকে কটু কথা বলা, খারাপ ইশারা-ইঙ্গিত করা, হয়রানি করা, গালি দেয়া, ঢিল মারা, পথরুদ্ধ করা যেমন অশ্লীল কাজ তেমনি কোন নারী-পুরুষের বিকৃত স্থির চিত্র বা নগ্ন ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেয়া কিংবা প্রত্যক্ষ করা অশ্লীল কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা:) সবধরনের অশ্লীল কাজকে নিষেধ করে বলেন, “অশ্লীলতা এবং অশ্লীলতার প্রসার কোনটির স্থান ইসলামে নেই। নিশ্চয় ইসলামে সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে যার স্বভাব-চরিত্র সবার চাইতে সুন্দর। ইসলাম এ অপরাধকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি এ অপরাধ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অযাচিত ও রুচিহীন কয়েকটি কর্মকেও নিষিদ্ধ করেছে।
ইসলামে বিবাহবন্ধনকে সুস্থ জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের স্বচ্ছল করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ যৌনতার একমাত্র বৈধ পন্থা হিসেবে বিবাহ বন্ধনের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন, যার মধ্যে নারী-পুরুষের জন্য পারস্পরিক স্বচ্ছন্দ এবং প্রশান্তি রয়েছে। দাম্পত্য জীবনকে ইসলাম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান মনে করে এবং তা সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বিবাহকেই একমাত্র যৌনতা নিয়ন্ত্রণের সঠিক পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, “হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ আছে সে যেন বিয়ে করে, কারণ তা দৃষ্টি নিম্নগামী করে এবং যৌনঅঙ্গকে পবিত্র রাখে। পরস্পরের আচরণ সৌহার্দপূর্ণ রাখতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, এ ক্ষেত্রে কখনোও কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তার সমাধান হবে কীভাবে তিনি তার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। রসূলুল্লাহ সা: বলেন, “কোন মুমিন পুরুষ কোন মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না। যদি তার একটি অভ্যাস অপছন্দনীয় হয় তবে আরেকটি অভ্যাস তো পছন্দনীয় হবে।
ইসলামে পরিবারই যেহেতু যৌন চাহিদা পূরণের একমাত্র ক্ষেত্র তাই স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের যৌন চাহিদার প্রতি দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে। আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, “যখন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন সে যেন পরিপূর্ণভাবে (সহবাস) করে। আর তার যখন চাহিদা পূরণ হয়ে যায় এবং স্ত্রীর চাহিদা অপূর্ণ থাকে, তখন সে যেন তাড়াহুড়া না করে। এভাবে ইসলামে স্ত্রীর যৌন অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে স্বামীকে সতর্ক করা হয়েছে। এমনকি স্বামীর বিরুদ্ধে শাসকের কাছে অভিযোগ করার অনুমতিও দেয়া হয়েছে। আবূ মূসা আল-আশয়ারী রা. থেকে বর্ণিত, ওসমান ইবনে মাযউন রা.-এর স্ত্রী মলিন বদন এবং পুরাতন কাপড়ে রসূলুল্লাহ সা: এর স্ত্রীদের কাছে এলেন। তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, এতে আমার কী হবে? কেননা আমার স্বামীর রাত নামাযে কাটে ও দিন রোযায় কাটে। তারপর রসূলুল্লাহ সা: প্রবেশ করলেন। তখন রসূলুল্লাহ সা: এর স্ত্রীগণ বিষয়টি তাঁকে অবহিত করলেন। উসমান ইবনে মাযউন রা. এর সাথে সাক্ষাত হলে তিনি তাকে বললেন, “আমার মধ্যে কি তোমার জন্য কোন আদর্শ নেই? “উসমান রা. বললেন কী বলেন হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। তখন তিনি বললেন, “তবে কি তোমার রাত নামাযে আর দিন রোযায় কাটে না? অথচ তোমার উপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, তোমার উপর তোমার শরীরেরও হক রয়েছে। তুমি নামাযও পড়বে আবার ঘুমাবে, রোযাও রাখবে আবার ভাঙ্গবেও। তিনি বললেন, তারপর আরেকদিন তার স্ত্রী পরিচ্ছন্ন ও সুগন্ধি মাখা অবস্থায় এলেন যেন নববধূ।
আবু জুহাইফা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা: সালমান এবং আবু দারদা রা. এর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। সালমান রা. আবু দারদা রা. এর সাক্ষাতে গেলেন। তিনি উম্মে দরদা রা. কে ময়লা কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেলেন এবং তাকে তার ঐ অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, ‘আপনার ভাই আবু দারদার আবু দরদার দুনিয়ার চাহিদা নেই।’ এর মধ্যে আবু দারদা এলেন এবং তার (সালমানের) জন্য খাবার তৈরী করলেন এবং বললেন, খাবার গ্রহণ কর, কারণ আমি রোযা আছি। সালমান রা. বললেন, ‘তুমি না খেলে আমি খাচ্ছি না।’ কাজেই আবু দারদা রা. খেলেন। যখন রাত হল, আবু দারদা রা. উঠে পড়লেন। সালমান রা. বললেন, ‘ঘুমাও’। রাতের শেষ দিকে সালমান রা. তাকে বললেন, ‘এখন ওঠো’। কাজেই তারা উভয়ে নামায পড়লেন এবং সালমান রা. আবু দারদা রা. কে বললেন, ‘তোমার রবের অধিকার রয়েছে; তোমার উপর তোমার আত্মার অধিকার রয়েছে, তোমার উপর তোমার পরিবারের অধিকার রয়েছে; কাজেই প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা উচিত।’ পরে আবু দরদা রা. রসূলুল্লাহ সা: এর সাথে সাক্ষাত করলেন এবং একথা তাঁর কাছে উল্লেখ করলেন। রসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘সালমান যথার্থই বলেছে। বাস্তবেই ইসলাম নারী ও পুরুষের যৌন জীবনকে পারিবারিক বন্ধনের সীমারেখায় সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ করতে নির্দেশনা প্রদান করে। রসূলুল্লাহ সা, বলেছেন, “আমি কি তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে তোমাদের বলব? তারা হচ্ছে স্নেহপরায়ণ, অধিক সন্তান প্রসবকারিনী এবং স্বামীদের প্রতি বিন¤্র সংবেদনশীল, যারা যখন কষ্ট পায় বা কষ্ট দেয়, স্বামীর নিকট এসে হাত ধরে এবং বলে, আল্লাহর শপথ! তোমার প্রফুল্লচিত্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি কোন কিছুর স্বাদ নেব না।”
ইসলাম অশ্লীল কাজ হিসেবে ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “ব্যভিচারিণী নারী এবং ব্যাভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর। আল্লাহ লজ্জাস্থান হিফাজতকারীকে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজাতকারী নারী; আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও যিকিরকারী নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। তাই আল্লাহ ব্যভিচারকে শুধু নিষিদ্ধই করেননি; বরং ব্যভিচারের নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।
রসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘সাত প্রকার লোককে আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দান করবেন। সেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (সেই সাত শ্রেণীর একজন হল) যে ব্যক্তিকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী রমণী ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানায় আর ঐ ব্যক্তি শুধু আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে। “সুতরাং যৌনসঙ্গমরত কোন স্থিরচিত্র ও ভিডিও দেখাও ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার গুণাহের মতো। পর্ণোগ্রাফি ছবি বা অশ্লীল সিনেমা দেখাও ব্যভিচারের সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় নিষিদ্ধ। কেননা রসূলুল্লাহ সা: বলেন, চোখের যিনা দৃষ্টি দেখা, কানের যিনা শ্রবণ করা, মুখের যিনা কথা বলা, হাতের যিনা স্পর্শ করা, পায়ের যিনা পথ চলা। চোখের মাধ্যমে ব্যক্তি নারীর সৌন্দর্য ও রূপ উপভোগ করে। পরবর্তীতে এরূপ কাজের প্রতি অন্তরে ভাবের সৃষ্টি হয়। আর এ পথ ধরেই শুরু হয় অশ্লীলতা। ড. মুজাম্মিল সিদ্দিকী বলেন, “পর্ণোগ্রাফিক সিনেমা দেখা, এরূপ গান শুনা কিংবা গাওয়া, কারও হাত-পা এরূপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এসব কাজই এমন অপরাধ বা ব্যভিচার-সংশ্লিষ্ট এবং ব্যভিচারের চূড়ান্ত কাজটি এসবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।  সুতরাং পর্ণোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করাও নিষিদ্ধ। কেননা মুসলিমদের সর্বসময় দৃষ্টি অবনত করার আদেশ করা হয়েছে যেন সে অন্য কারো গোপন অঙ্গ দেখা থেকে বিরত থাকে।’
ব্যভিচারের আরেকটি বিকৃত রূপ হচ্ছে সমকামিতা। মানব সভ্যতার উন্নয়নে সমকামিতা এক বড় অন্তরায়। কুরআন এবং হাদীসের নানা স্থানে সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআনের সাত জায়গায় লূত আ. এর জাতির কথা বলা হয়েছে, যাদেরকে সমকামিতার অপরাধের জন্য আল্লাহ ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ বলেন, “আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে তার জাতিকে বলল, ‘তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি। তোমরা তো তৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন কর, তোমরা তো সীমালঙ্ঘন করছ। “তোমরা নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের সাথে যৌন কামনা পূর্ণ করছ? তোমরা তো মূর্খ সম্প্রদায়। পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, “নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না। প্রকাশ্যে হোক কিংবা অপ্রকাশ্যে। ‘সমকামিতা’ যে মারাত্মক ধরনের সীমালঙ্ঘন এবং অশ্লীল কাজ তা পবিত্র কুরআনের (৭:৮০,৮১) এবং ২৬:১৬৬) নং আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে। সে সাথে এই ধরনের কুকর্মের সাথে জড়িতদের (২৯:৩০)নং আয়াতে ফাসাদ সৃষ্টিকারী অর্থাৎ দুষ্কৃতিকারী এবং (২৯:৩১) নং আয়াতে জালিম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই ‘সমকামিতাকে’ ব্যভিচারের সাথে সম্পৃক্ত না করে সন্ত্রাস বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কারণগুলোর সাথে বিবেচনা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
ইসলামী চিন্তাবিদগণ রসূলুল্লাহ সা: এর হাদীস ও সীরাত থেকে সমকামিতার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান দিয়েছেন। রসূলুল্লাহ সা: কয়েকটি হাদীসে সমকামিতাকে অভিশাপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দু’জনের জন্য মৃত্যুদন্ডের শাস্তি ঘোষণা দিয়েছেন। রসূলুল্লাহ সা: বলেন, “কোথাও তুমি মানুষদেরকে লূতের জাতির মত পাপ করতে দেখলে তাকে হত্যা করবে। যে এটা করে এবং যে এটাকে সাহায্য করে দুই জনকেই হত্যা করো। ইমামগণ সমকামিতার শাস্তি বর্ণনায় বিভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ মুসলিম দেশে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় এবং শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। সৌদি আরব, ইরান, মৌরিতানিয়া, উত্তর নাইরেজিয়া, সুদান, ইয়েমেনে সমকামিতার শাস্তি হিসেবে মৃতুদন্ড দেয়া হয়। আফগানিস্তানে সমকামিতার শাস্তি জেল ও অর্থদন্ডে নামিয়ে আনা হয়েছে। ইউনাইটেড আরব আমিরাত ও বাংলাদেশে সমকামিতার বিরুদ্ধে আইন স্পষ্ট নয়। অনেক মুসলিম দেশ যেমন বাহরাইন, কাতার, আলজেরিয়া, উজবেকিস্তান ও মালদ্বীপে সমকামিতার শাস্তি হিসেবে জেল, অর্থদন্ড ও শারীরিক শাস্তি দেয়া হয়। মিশরে সমকামিতার বিরুদ্ধে কোন আইন নেই। কিন্তু সমকামিতা সেখানে বৈধ নয়। এর জন্য শাস্তি হিসেবে জেল জরিমানা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ পর্ণোগ্রাফি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও প্রদর্শনীতে কখনোই অনুমোদন করেনি। এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনাদর্শ ইসলাম পর্ণোগ্রাফিসহ সব ধরনের অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে এ অঞ্চলের মুসলিমরা ছিল যাবতীয় অশ্লীলতামুক্ত ও রুচিহীন ক্রিয়াকর্মের বিপরীতে উন্নত জীবন যাপনের প্রতি প্রত্যয়শীল। তাদের শিল্প, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা সহ সর্বপ্রকার সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এ উন্নত তাহযীব-তামাদ্দুনের পক্ষেই স্বাক্ষর বহন করে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় স্যাটেলাইট, মোবাইল প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে ইত্যাদি উদ্ভাবনের পর নৈতিকতা বিরোধী যে অশ্লীল ভিডিও ও স্থিরচিত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করে। প্রস্তাবিত আইনে পর্ণোগ্রাফি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের আবশ্যকতা সম্পর্কে প্রদত্ত বিবৃতি ও মূল আইনের শিরোনাম পরবর্তী উল্লেখিত আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় আইনটির যে প্রাসঙ্গিকতা ফুটে উঠেছে তা পক্ষান্তরে অশ্লীলতা নিয়ন্ত্রণে ইসলামী নৈতিকতায় ঐতিহাসিক ও উন্নত পদক্ষেপসমূহের তাৎপর্যই বহন করছে। ইসলাম মানব জীবন পরিচালনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক চরিত্রে বিকশিত শাশ্বত আদর্শ। পর্ণোগ্রাফির মতো একটি অনৈতিক কর্ম ইসলামী মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ জাতির ভেতর কখনই সৃষ্টি হতে পারে না। বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও জীবন-নির্ধারণের সঠিক ও পূর্ণ অনুসরণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ