ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 June 2018, ৭ আষাঢ় ১৪২৫, ৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজর
Online Edition

বিশ্বকাপ ফুটবল সবাইকে এক করেছে

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ফুটবল নিয়ে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা সারা পৃথিবী জুড়েই। যে দেশ বিশ্বকাপে খেলেনা তারাও মেতে থাকেন এই খেলাটি নিয়ে। সে কারণেই ফুটবলকে সার্বজনীন খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই যেমন বাংলাদেশের কথাই যদি ধরা হয় তাহলে বলতেই হবে বিশ্বকাপে খেলছে এই দেশটি। রাস্তায় বের হলে কিংবা বাড়ির ছাদে চোঁখ রাখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে ফুটবল উন্মাদনার বিষয়টি। সারা দুনিয়ার মানুষকে এক করেছে এই ফুটবল। রাশিয়া এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২১তম বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। সেখানে সারা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের চোখ আটকে আছে। প্রিয় দলকে সমর্থন দিতে আবার কেউ কেউ চলে গেছেন রাশিয়ায়। রাশিয়ার রাস্তায় তাই শোনা যায়, ‘অনেকে মনে করে, ফুটবলটা জীবন-মরণের ব্যাপার। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, এটি তার চেয়েও বেশি কিছু।’ কথাটি বলেছিলেন বিল শ্যাংকলি। লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের কোচ। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামের প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে যেন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত ওই কথাগুলো। জীবনের সব রূপ-রং-রস নিয়ে যে উদ্বোধন হয়ে গেল বিশ্বকাপ ফুটবলের! চার বছর পর আবার ফুটবল বসন্তে মেতে উঠেছে গোটা পৃথিবীর মানুষ। দর্শনের মধ্যেই সমর্পণ বলে একটা ব্যাপার রয়েছে। এই যেমন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর লুঝনিকি দর্শনে ফুটবলের প্রতি সেই সমর্পণটা বোঝা যায়। আর তা স্টেডিয়ামে ঢোকার অনেক আগে থেকেই। পুরো পৃথিবী থেকে লোক এসেছে রাশিয়া, পুরো রাশিয়া থেকে লোক এসেছে মস্কোতে আর পুরো মস্কো যেন ভেঙে পড়েছে লুঝনিকিতে। কারা নেই সেখানে! স্বাগতিক বলে রাশিয়ার বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকা স্বাভাবিক। তবে উৎসবে যেন তাদের পেছনে ফেলে দিয়েছে বাকিরা। সেটি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি থেকে শুরু করে পর্তুগাল-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স হয়ে পেরু-ইরান-অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকরা। বেশির ভাগই এসেছে নিজ নিজ দেশের জার্সি গায়ে। অনেকের গালে রঙে আঁকা পতাকা, মেক্সিকানদের মাথায় বাহারি হ্যাট, ফরাসিদের মাথায় তেরঙ্গার ছোপ। নাচল তারা, গাইছে তারা। কেউ চিৎকার করছে স্প্যানিশে, কোনো দল হয়তো পর্তুগিজে। ফ্রেঞ্চ-ইতালিয়ান-আরবি ভাষাও শোনা যাচ্ছে কান পাতলে। এক দল আরেক দলের ভাষা জানে না; এক গ্রুপের সুরের সঙ্গে অন্য গ্রুপের সুরের মিল নেই কোনো। কিন্তু উৎসবের মোহনায় সবার মিলে যাওয়া ঠেকছিল না তাতে। ফুটবলের সুরেই যে মেতে উঠেছে গোটা লুঝনিকি, পুরো মস্কো, সমগ্র রাশিয়া, আর সমস্ত বিশ্ব! মাঠের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের স্থায়িত্ব কম কিন্তু রং বেশি। সেখানে গাঢ় খয়েরি রঙের স্যুট পরা পপ আইকন রবি উইলিয়াম সবাইকে স্বাগত জানান ‘লেট মি এন্টারটেইন ইউ’ গানের সুরে। ছিলেন সাদা পরির পোশাকে রুশ অপেরা শিল্পী আইদা গারিফুলিনা। ফুটবলারদের প্রতিনিধি হয়ে রোনালদো। ব্রাজিলের হয়ে দুইবার বিশ্বকাপজয়ী সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড। এই বিশ্বকাপের মাসকট নেকড়ে ‘জাবিভাকা’কে বল পাস দিলেন তিনি। তাতেই তো টুর্নামেন্টের প্রতীকী কিক অফ হয়ে যায় যেন। বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে মাঠে ঢোকেন ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াস এবং রুশ সুপারমডেল নাতদালিয়া ভেদিয়ানোভা। অনুষ্ঠানে নিজেদের প্রথাগত কিছু ডিসপ্লে করে রাশিয়া। ৩২ জোড়া নাচিয়ে পারফর্ম করেন বিশ্বকাপের ৩২ দলের প্রতিনিধি হিসেবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মূলত আবর্তিত সংগীতকে ঘিরেই। আর গ্যালারি-মাঠের সব রং যেন গিয়ে মেশে ফুটবলের সাদা-কালোয়। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরও আগে ভøাদিমির পুতিনের স্বাগত ভাষণ। এই বিশ্বকাপ রাশিয়ার কাছে অন্য রকম চ্যালেঞ্জের। বাকি বিশ্বের কাছে নিজেদের সম্মান পুনরুদ্ধারের; বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের পথে আরেক ধাপ এগোনোর। ফুটবলের ছায়ায় রাজনীতিও যে সমান্তরালে বহমান, সেটি বোঝা গেছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও। পুতিনের সঙ্গে লুঝনিকিতে বিশ্বের যেসব দেশের নেতারা ছিলেন, সেই তালিকায় চোখ বোলালেই বোঝা যাবে, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, উত্তর কোরিয়া, কাজাকিস্তান, কিরগিজস্তান, লেবানন, মলদোভা, প্যারাগুয়ে, পানামা, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান। ফুটবল বসন্তের সৌরভ তাতে কমছে না এতটুকুন। সুন্দর ফুটবলের পিপাসাও তাতে কমছে না কারো। সেই যে কবে লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানি লিখেছিলেন, “জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর বুঝতে পেরেছি আমি আসলে কে, আমি সুন্দর ফুটবলের ভিখারি। আমি পুরো বিশ্বের স্টেডিয়াম থেকে স্টেডিয়াম ঘুরে দুই হাত ছড়িয়ে একটাই প্রার্থনা করি,‘ ঈশ্বরের দোহাই, একটা ভালো মুভ হোক।’ যখন তা হয়, আমি দৈবকে ধন্যবাদ দিই; কোন দল বা দেশ ওই সুন্দর ফুটবলটি খেলল, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা থাকে না।” হয়তো কিছু মাথাব্যথা থাকবে। ব্রাজিলের সমর্থকরা আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেবে কিভাবে? জার্মানরা কিভাবে সহ্য করবে ইংরেজদের? তবু আশ্চর্য এক সহাবস্থানে সামনের এক মাস থাকবে ঠিকই পুরো বিশ্ব। ফুটবলের মোহনায়। ফুটবলের বসন্তে। এই এক মাসের জন্য বিল শ্যাংকলির কথাটিকে মিথ্যা মনে হবে না কিছুতেই! এদিকে রাশিয়ায় আরো একদিক থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি কাজ করছে। বত্রিশ বছরের যুবক মোহাম্মদ আবদুল মতিন তাদেরই একজন। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া এসেছিলেন ডাক্তারি পড়তে। এরপর থেকে একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে গেছেন অনেকটা উঁচুতে। দেশকে তুলে ধরেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ফিফার সবচেয়ে ক্ষমতাধর যে কয়েকটা উইং আছে তার মধ্যে একটা হলো, অ্যান্টি ডোপিং ডিপার্টমেন্ট। এমনকি বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীনও তাদের যে কোনো স্থানে প্রবেশাধিকার আছে। কাউকে সন্দেহ হলে তার স্যাম্পল পাওয়া পর্যন্ত ওয়াশরুম পর্যন্ত যেতে হয় এ দলের সদস্যদের। মেসি, নেইমার, রোনালদো, সালাহদের মতো তারকারাও এই তালিকা থেকে বাদ যায় না। মোহাম্মদ আবদুল মতিন এই দলের সদস্য। সারা বিশ্ব থেকে এই টিমের সদস্য হতে আবেদন জমা পড়েছিল সাড়ে সাতাশ হাজার। এর মধ্য থেকে ১১ বার সাক্ষাৎকার নিয়ে মাত্র ৪৪ জন সেরা ডাক্তারকে বেছে নেয় ফিফা। এ যেন সিন্ধু সেঁচে মুক্তো পাওয়ার মতোই ব্যাপার! আবদুল মতিনের সঙ্গে দেখা হতেই জানালেন নানান তথ্য। কিভাবে অ্যান্টি ডোপিং টিম কাজ করে। একজন ফুটবলারকে সন্দেহ হলে কিভাবে তার নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। আরও অনেক কিছু। সেই সঙ্গে বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরব একদিন। সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই ছুটছি আমি।’ ফিফার মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি যে দেশকে কতটা মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন, তা বুঝা গেল সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে যেতেই। বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিক পরিচয় পেলেই পাওয়া যায় আলাদা খাতির। আইটি সাপোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে সাধারণ ভলান্টিয়ারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় বাংলাদেশের ডাক্তার আবদুল মতিন। তার দেশের সাংবাদিক শুনলেই ছুটে আসেন তারা। বাড়তি আদর আপ্যায়ন করেন। আবদুল মতিন এমবিবিএস শেষ করেছেন রাশিয়ার রুস্টভ অন ডন থেকে। এরপর সেন্ট পিটার্সবার্গেই কার্ডিওলজির উপর করছেন পিএইচডি। নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি কী ভাবেন? প্রশ্নটা করতেই লাজুক হেসে বললেন, শুরু থেকেই আমার একটা লক্ষ্য ছিল। আমি দেশকে এতটা উঁচুতে তুলে ধরতে পেরেই গর্ব বোধ করি। আবদুল মতিনকে নিয়ে গর্ব করবে পুরো বাংলাদেশই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ