ঢাকা, শুক্রবার 22 June 2018, ৮ আষাঢ় ১৪২৫, ৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ নির্বাচনকালীন সরকার

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পরবর্তী তথা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে সে সরকার হবে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ার পরপরই এই সরকার গঠন করা হবে আগামী অক্টোবর মাসে। পরিকল্পিত নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ওই সরকার আকারে ছোট হবে অর্থাৎ কমসংখ্যক মন্ত্রী থাকবেন। আর সম্পূর্ণ বিষয়টিই থাকবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারে। 

নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, কোনো বিশেষ দল অংশগ্রহণ করলো কি করলো না তা নিয়ে তারা চিন্তিত নন। কারণ, আগামী নির্বাচনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চাইতে অনেক বেশি দল অংশ নেবে এবং সকল অর্থেই সে নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রসঙ্গক্রমে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে নির্দলীয়, তত্ত্বাবধায়ক বা অস্থায়ী ধরনের কোনো সরকার গঠনের প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, সংবিধানে তেমন কোনো ব্যবস্থার সুযোগ নেই। সুতরাং নির্বাচন হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ছোট আকারের নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে। সব দলের জন্যই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। কোনো দল যদি অংশ না নেয় তবে সেটা হবে সংশ্লিষ্ট দলটির সিদ্ধান্তের ব্যাপার। কিন্তু কোনো বিশেষ দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসার জন্য সংবিধানের বাইরে গিয়ে বা সংবিধান লংঘন করে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ, তিনি শুধু একজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর মন্ত্রী নন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। সে কারণে তার বক্তব্যকেই সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবে সেভাবে গ্রহণ করা হয়েছেও। লক্ষ্যণীয় যে, জনাব ওবায়দুল কাদের তার বক্তব্যে প্রশ্ন, সংশয় বা ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ রাখেননি। সবই তিনি খোলাসা করে দিয়েছেন। ফলে ধরে নেয়া যায়, তাদের পরিকল্পিত নির্বাচনকালীন সরকারের নেতৃত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই থাকবেন। হতে পারে, লোক দেখানোর এবং বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে কৌশল হিসেবে তারা মন্ত্রীদের সংখ্যা কমিয়ে দেবেন। একই কৌশলের ভিত্তিতে সরকারে এমনকি অন্য কয়েকটি দল থেকেও মন্ত্রী নেয়া হতে পারে।

তাই বলে তেমন কোনো সরকার কিন্তু সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে কোনো অবদানই রাখতে পারবে না। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনসহ সকল সংকটের পেছনেই প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ঘনীভূত হয়ে উঠতে থাকা সংকটের দিনগুলোতে বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অন্য সব দাবির ব্যাপারে নমনীয়তা দেখালেও একটি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন ধরনের যে নামেই গঠন করা হোক না কেন, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না। যুক্তি দেখাতে গিয়ে এবং কারণ ব্যাখ্যাকালে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার পদে বহাল রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার এই দাবি ও বক্তব্য সে সময় সকল মহলেই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সমর্থিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। কারণ, ক্ষমতাসীনরা কথায় কথায় যে সংবিধানের দোহাই দিয়েছিলেন, সংশোধিত সে সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এত বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যে, অন্য ১০ জন মন্ত্রীর সিদ্ধান্তকেও তিনি নাকচ করে দিতে পারেন। ফলে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকলে তার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন বলা হয়েছিল, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় জোট যথার্থই বলেছে। দাবিও তারা সঠিকভাবেই তুলে ধরেছিল। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা তাদের আগের অবস্থান থেকে এক চুল পরিমাণও নড়েননি। ফলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় জোট তো বটেই, এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং ইনু-মেননদের অতি ক্ষুদ্র দু’-চারটি নামসর্বস্ব দল ছাড়া উল্লেখযোগ্য ও জনসমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দলই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘সেঞ্চুরি’ হাঁকানোর ধুম পড়ে গিয়েছিল। তিনশ’ জনের মধ্যে ১৫৪ জনই ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি আসনগুলোতেও পাঁচ-সাত শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। 

বিএনপির মতো ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দলগুলোকে নির্বাচনে নিয়ে আসার ব্যাপারে এতদিন পরও ক্ষমতাসীনদের মনোভাবে যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি, সে কথাটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আমরা মনে করি, এভাবে দেশকে রাজনৈতিক সংকটের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কথিত কোনো নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কল্পনাবিলাস পরিত্যাগ করে সময় একেবারে পেরিয়ে যাওয়ার আগেই ক্ষমতাসীনদের উচিত, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা এবং তাদের দাবি মেনে নেয়া। নির্বাচন যাতে নির্দলীয় একটি সরকারের অধীনে হতে পারে তার ব্যবস্থা করা। উল্লেখ্য, মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ব্যাপারে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে রেখেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে ‘নির্দলীয়’ হতে হবে। 

আমরা আশা করতে চাই, বেগম খালেদা জিয়ার তথা বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা অনিবার্য সংকটের কবল থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করবেন। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা একই সঙ্গে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করারও সুযোগ পাবেন। সেটা করার পরিবর্তে নিজেদেরই সংশোধিত সংবিধানের দোহাই দিয়ে আরো একটি ৫ জানুয়ারির আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি সবার জন্য অশুভ হয়ে উঠতে পারে বলে আমরা আশংকা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ