ঢাকা, শনিবার 23 June 2018, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অর্থকড়ির ময়দান থেকে ‘মাল আউট’ জরুরি

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : একখান খাসা মাল বটে। মানে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি এবার সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের সমান হয়ে গেলেন। তিনি ১০ বার জাতীয় বাজেট পেশ করেছিলেন। মাল সাহেবও ১০ বারে পৌঁছুলেন। মরহুম সাইফুর রহমানকে স্পর্শ করলেন। অবশ্য দু’জনই একই জেলার। একই নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য। তাই মিলটাও চমৎকার। তবে সবই যে মিল আছে তা নয়। দু’জনের মধ্যে ফারাকও যথেষ্ট। একজন জাতীয়তাবাদী চেতনার। অন্যজন আওয়ামী ঘরানার। এবার সংসদে ২০১৮-২০১৯ এর জাতীয় বাজেট পেশের প্রাক্কালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘গত দশ বছরে দেশে কোনও কিছুর দাম বাড়েনি।’ এনিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। মিডিয়া পাড়ার লোকেরা মুখ টিপে হাসছেন। অর্থনীতিবিদরা সভা-সেমিনারে বক্তৃতা কপচাচ্ছেন। কিন্তু মন্ত্রীসাহেব নির্বিকার। যেইসেই। কানে যেন তালা মেরেছেন। অবশ্য মালসাহেবের যে বয়স, কানে এমনিতেই তালা লেগে যাবার কথা। দশ বছর আগে মানে ২০১৮ বিয়োগ ১০ = ২০০৮ সাল। দশ বছর আগের এ দেশের সব নাগরিক নিশ্চয়ই মারা যায়নি। বর্তমান সরকারের আমলে হাজার হাজার নাগরিক গুম-খুনের শিকার হলেও সবাইকে খতম করে দিতে পারেনি। যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের অনেকেই নিজহাতে বাজারহাট করেন। তারা জানেন বাজারের কী অবস্থা। মালসাহেবকে মন্ত্রী থাকা অবস্থায় বাজারে যেতে হয় না। মন্ত্রীর আরদালি, পিয়ন, দারোয়ান, ড্রাইভার গেলেও দেখামাত্র সবকিছু বাজারের সুড়সুড় করে ব্যাগে ঢোকে। অনেকে আগেই বাসায় পাঠান মালপত্র। অর্ডারও প্রয়োজন হয় না। তাই তিনি বাজারমূল্য বুঝবেন কেমনে? বাজেট বিষয়ে প্রশ্ন করলে মালমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রতি ভীষণ ক্ষেপে যান। ধমক দিয়ে কথা বলেন। অবশ্য কথায় কথায় রাবিশ, বোগাস বলবার একটা পুরনো অভ্যাস মালমন্ত্রীর আছে। এটা প্রায় সবারই জানা। তবে ওমন ভাষা এবার প্রয়োগ করেননি। শুধু ক্ষেপেছেন। পরে ক্ষুব্ধ হবার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আসলে মন্ত্রীসাহেবের টেকোমাথা কখন গরম হয় তা কেউ জানেন না। তিনি হয়তো নিজেও তা মনে রাখতে পারেন না। তাই যখনতখন যা-তা বলে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় মালমন্ত্রীকে। দশ বছর আগের চাইতে বর্তমানে মালপত্রের দাম শুধু বাড়েইনি, অনেক বেড়েছে। মালভেদে কয়েক গুণও বেড়ে গেছে। ‘দশ বছরে কোনওকিছুর দাম বাড়েনি’ জনাব মালমন্ত্রীর এমন বোগাস বক্তব্যের পর মিডিয়াগুলো দশ বছরে কোনও মালের কতটা দাম বেড়েছে তার হিসেব ছেপেছে। এতে দেখা যায় প্রায় সব মালের মূল্য বেড়েছে। বাড়েনি কেবল মালমন্ত্রীর হিসেবে। দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। তাঁদের সুযোগসুবিধেও বেড়েছে ঢের। তবে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা কয়েক লাখ মাত্র। যারা বেসরকারি চাকুরে কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত তাদের সবার বেতনভাতা বাড়েনি। অনেকের কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই যারা বেসরকারি কর্মচারী কিংবা যাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে কিংবা যাদের বেতনভাতা কমেছে তাদের অনেকরই দুর্বহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। তারা বাসাভাড়া দিতে পারছেননা। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আয়ও তেমন বাড়েনি। চাকরি থেকে বিদায় নেবার সময় যারা সামান্য অর্থ পাচ্ছেন তা ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। ব্যাংকে টাকা জমা রেখে লাভ হয় না বললেই চলে। এর ওপর নানা করের বোঝা রয়েছে। এরপর নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিন হুহু করে বাড়ছেই। তাই সাধারণ মানুষ চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। অথচ মালমন্ত্রী মহানন্দে বলে দিলেন ১০ বছরে কোনওকিছুর দাম বাড়েনি। এর চাইতে জনগণের সঙ্গে মশকরা আর কী হতে পারে। আমার মনে হয়, মালমন্ত্রীর এমন কথা এ সময়ের শ্রেষ্ঠ রসিকতা বটে। মন্ত্রী বলেছেন, ১০ বছর মানে তাঁদের শাসনকালে জনগণ দারুণ সুখে আছেন। জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। অর্থাৎ ব্যয় বাড়েনি। অথচ মন্ত্রী, এমপি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। ১০ বছর আগে আমাদের প্রধানখাদ্যপণ্য চালের কেজি ছিল ২৫/৩০ টাকা। সেটা এখন ৬০/৭০ এ উঠেছে। আটা ছিল ২০/২২ টাকা। এখন ৪০/৪২। গরুর গোশত ১৮০/২০০ টাকা। এখন ৫০০/৫৫০। খাসি ছিল ৪৫০/৫০০। এখন ৭০০/৮০০। সয়াবিন ছিল ৪০/৫০। এখন ১০০/১২০। লবণ ছিল ২০/২২। এখন ৪০/৪২। চিনি ছিল ৩০/৩৫। এখন ৫৫/৬০। মাছের দাম বেড়েছে দুইতিন গুণ। ওষুধের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। ডাক্তারের ভিজিট ছিল ২০০ টাকা। তা এখন বেড়ে হয়েছে কমপক্ষে ৫০০/৬০০ টাকা। বাসাভাড়া হয়েছে ডবল। যানবাহনের খরচ বেড়ে হয়েছে তিনচার গুণ। বাকি অন্যসব পণ্য এবং সেবার মূল্য বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু মালমন্ত্রী বাজেট ঘোষণার দুয়েকদিন আগে বললেন এসবের একদমই উল্টো। পেশকৃত বাজেট নিয়ে কথা উঠেছে এন্তার। বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদসহ অভিজ্ঞরা এ বাজেট গরিব মারবার বাজেট। এতে দরিদ্র আরও দরিদ্র হবে। ধনী হবে আরও ধনাঢ্য। বিপাকে পড়বেন মধ্যবিত্তরা। তাদের করের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে কমানো হয়েছে ধনীদের কর। এতে করে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। কেউ ফুলেফেপে বড়লোক হবে। নিঃস্ব হবে আরও নিঃস্ব। মালমন্ত্রীর উপস্থাপিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ত্রুটিপূর্ণ। ভুলেভরা। ফলে জনগণের মধ্যে বাজেট নিয়ে বিভ্রান্তি ও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় মালমন্ত্রী সর্বনি¤œ ভ্যাটের হার ২ এবং সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ উল্লেখ করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, ভ্যাটের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশ রেখেই ৬টি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হারেই ভ্যাট সংগ্রহ করবে এনবিআর। তাই মালমন্ত্রী ও এনবিআরের দু’রকম তথ্যে যেমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনই এতে হয়রানি বাড়বে বলে ব্যবসায়ীমহলের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। ভোটারবিহীন নির্বাচিত সরকারের বাজেট ‘গণবিরোধী ও প্রতারণার প্রামাণ্য দলিল’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি’র সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি আরও বলেন, এ বাজেট দুর্নীতির সহায়ক, নির্বাচনমুখী ও ঋণনির্ভর। এ বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোনও পদক্ষেপ নেই। কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ব্যাংক মালিকদের খুশি করা হয়েছে। ভ্যাট ও শুল্ক বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের শোষণের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ বাজেটে লুটেরা ও ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে মাত্র। তাই এ বাজেট জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশে বোরোর আবাদ ভালো হওয়ায় চাল উৎপাদন বেড়েছে। এজন্য চাল আমদানিতে ২৮% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে ইতোমধ্যে চালের দাম বেড়ে গেছে। অন্য জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে যা ঘটে এবারও তাই ঘটছে। অথচ মালমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেটে জিনিসপাতির দাম বাড়বার কারণ নেই। তিনিতো এমন বলবেনই। তাঁকেতো বাজার করতে হয় না। বিনা অর্ডারে সব চলে আসে বাসায়। সাধারণ মানুষের বাজার করতে গিয়ে ভিরমি খাবার জোগাড়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গতকাল যেটার দাম ছিল ৪০ টাকা। সেটা আজ ৫০ টাকায়ও কেনা যাচ্ছে না। শাক, সবজি, চাল, ডাল, লবণ, তেল, মরিচ, মশলা, মাছ, গোশত, রসুন, পেঁয়াজ, দুধ, চিনি সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। মালমন্ত্রীর টাকমাথা যেমন গরম, তেমন বাজারও গরম। স্বস্তি নেই জনগণের। তিনিতো বাজেট ঘোষণা এবং তা পাস করেই খালাস। এর অশুভ প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। ভোগান্তি বাড়ে জনগণের। বিশেষত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের। প্রত্যেক বাজেটেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। এবারও বাড়া শুরু করেছে বাজেট বাস্তবায়নের আগেই। বাস্তবায়নের পর আরেক দফা বেড়ে যাবে। এর কোনও ব্যত্যয় নেই। ব্যতিক্রম নেই। ‘১০ বছরে কোনওকিছুর দাম বাড়েনি’ মালমন্ত্রীর এমন বালসুলভ বচন নিয়ে একজন ছড়াকার ফেসবুকে চমৎকার একটা ছড়া পোস্ট করেছেন। ছড়ার শিরোনাম ‘দাম বাড়েনি’। লিখেছেন আবদুস সামাদ। ‘দশ বছরে দাম বাড়েনি চালের কিবা ডালের, শায়েস্তা খাঁর আমল নয় তো এখন আবুল মালের! দাম বাড়েনি তোমার আমার দাম বাড়েনি পিতার, দাম বাড়েনি এতিম শিশুর পরিচয়টা কি তার! দাম বাড়েনি ফুলের কিংবা দাম বাড়েনি ফলের, দাম বাড়েনি নলের কিংবা মানুষ মারা কলের! দাম বাড়েনি দাড়ি-টুপির দাম বাড়েনি বাড়ির, কোলের শিশু গুম হয়ে যায় দাম বাড়েনি নাড়ির! দাম বাড়েনি কথা-কাজের দাম বাড়েনি নীতির, চোরের মায়ের বড় গলা তেলেজলে প্রীতির! দাম বাড়েনি লাল সবুজের দাম বাড়েনি ভাষার, দাম বাড়েনি রোদে পোড়া সোনা ফলা চাষার! সবকিছুতো সস্তা এখন সস্তা তেলের বাজার, দাম বাড়েনি গণতন্ত্রের নানান রকম সাজার।’ সময়োপযোগী ছড়া উপহার দেবার জন্য ছড়াকারকে ধন্যবাদ। আরও ধন্যবাদ আমাদের মাননীয় মালমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও তাঁর দশম জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন এবং বিনা বাধায় তা পাস করিয়ে নেবার জন্য। একজন ফেসবুকে স্ট্যাটাস পোস্ট করেছেন, মাল সাহেব ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতেন। খেলতে খেলতে তিনি আউট হলে সবাই চিৎকার করে বলতেন ‘মাল আউট’। তিনি নিজেও নাকি অন্যদের সুরে সুর মেলাতেন। এখন মনে হয়, দেশের অর্থকড়ির ময়দান থেকে মাল সাহেব বিদায় নিলেও জনগণ আবার ‘মাল আউট’ বলে খুশিতে চিৎকার দেবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ