ঢাকা, শনিবার 23 June 2018, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজপথের রাজনৈতিক আন্দোলনই হতে পারে জবাব

জিবলু রহমান : [চার]

১৯ জুন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সময় তার ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আপনি ও আপনার সঙ্গে যারা ছিলেন, সেই মাইনাস টু তত্ত্বের প্রচারকরা; আপনারা কি এখনো মাইনাস টুতে আছেন? নাকি মাইনাস ওয়ান-এ আছেন? এটা একটু খোলাশা করে জনগণকে জানাবেন কি? ১৮ জুন ২০১৮ সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়কালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে দলের নেতারা রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চাইছে বলে দাবি করেছেন । তিনি বলেন, ‘আমার তো মনে হয়, তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নয়, রাজনীতি করার ইস্যু খুঁজছেন। তাদের কাছে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নয়, ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের পরে বিএনপি আন্দোলনের অজুহাত হিসেবে এটিকে কাজে লাগাতে চায়।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপি নেতারা কি প্রতিদিন জেলখানায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন? তার আত্মীয়রা জেলখানায় দেখা করতে যাবেন। তারা গেছেন এবং ঠিকই দেখা করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে এটা জেলখানা, কারও বাসাবাড়ি না। জেলখানায় প্রতিদিন নেতারা দেখা করতে যাবেন এ সুযোগ জেল কোডে নাই। ওবায়দুল কাদের বলেন, জেলখানায় আত্মীয়-স্বজনরাই মূল। আমি যখন জেলে ছিলাম, আমারও আত্মীয়-স্বজনরা দেখা করতে এসেছেন। জেলখানায় দলীয়দের দেখা করার সুযোগ নেই। তারপরও তিনি একটি দলের প্রধান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সেই জন্য তাকে দলের লোকজন এবং আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে হয়। সেখানে কোনো প্রকার বাধা ছিল না। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সেবা নিয়ে কাদের বলেন, সিএমএইচ হলো সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল। কেন যে তিনি সেখানে চিকিৎসা নিতে চান না তা আমাদের জানা নেই। আমার এখন সন্দেহ হয় বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে চিন্তিত কিনা। ‘খালেদা জিয়া কেন ইউনাইটেডে চিকিৎসা নিতে পারবেন না’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তখন আমাদের নেত্রীকে সিএমএইচে চিকিৎসা করানোর সুযোগ পেলে স্কয়ারে নিয়ে যেতাম না। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ১৯ জুন ২০১৮) অন্যদিকে সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে দ্বিতীয় দিনের মতো খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও ইউনাইটেড হাসপাতাল নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। সরকার তাকে (খালেদা জিয়া) হাসপাতালে নিতে চাইলে তিনি যখন যান না, তখন অনেকে মনে করেন তিনি অসুস্থ নন। কোনো অসুস্থ লোক হাসপাতাল পছন্দ নিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে পারেন না। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ১৯ জুন ২০১৮) এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ডাক্তার ফায়েজুল হাকিম রেডিও তেহরানকে বলেছেন, সরকার যাই বলুক, জনগণ মনে করেন, বেগম জিয়াকে রাজনৈতিক কারণে জেলে নেয়া হয়েছে। তার চিকিৎসা নিয়ে সরকার টালবাহানা করছে। সরকার যদি মনে করে বিএনপি কারাবন্দি বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু খুঁজছে তাহলে সরকারের উচিত বিএনপিকে সে সুযোগ না দিয়ে তাঁর আস্থা রয়েছে এমন চিকিৎসকদের দিয়ে তার উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়া। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ১৯ জুন ২০১৮) মিজানুর রহমান খান লিখেছেন, ‘...অসুস্থতার কারণে জামিন ও সুচিকিৎসা বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালতের গাইডলাইন কিছুটা আছে। কিন্তু তা খুব স্পষ্ট বলে প্রতীয়মান হয় না। এক-এগারোতে আমরা স্বাস্থ্যগত কারণে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করতে শুনেছি। দুদক তখন দ-িত ব্যক্তির পক্ষে তৎকালী পিজির (বর্তমানের বিএসএমএমইউ) মেডিকেল বোর্ডের অনুকূল প্রতিবেদন নাকচ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যগত কারণকে মানবিক জায়গা থেকে দেখতে পারেনি। যেমন ইকবাল মাহমুদের (টুকু) মামলায় তখন দুদক বলেছিল, আপিল বিচারাধীন থাকতে জামিন চলবে না, কারণ তিনি ইমার্জেন্সি আইনে দ-িত হয়েছেন। একই আইনজীবী এখন জামিনের বিরোধিতা করতে ইমার্জেন্সি আইন না থাকায় ভিন্ন যুক্তিকে বড় করে দেখাতে চাইছেন। ৬০ ডিএলআরে আপিল বিভাগের একটি রায় ছাপা আছে। তাতে বলা আছে, যখন দ- তিন বছর থাকবে এবং অসুস্থতার কারণে জামিনের দরখাস্ত করার আগামী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার (আপিলকারীর কোনো দায় থাকবে না) সম্ভব হবে না কিংবা যথাযথভাবে গঠিত মেডিকেল বোর্ড জীবনের প্রতি গুরুতর হুমকি বিবেচনায় সনদ দিলে জামিন মঞ্জুর হতে পারে। আপিল বিভাগ এর আগে বেগম জিয়াকে জামিন দিয়ে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের বিচার সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। রাষ্ট্র বলেছে, এই সময়সীমা মানা সম্ভব। তাহলে প্রশ্নটা থাকছে, ‘‘যথাযথভাবে গঠিত মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার জীবনের প্রতি গুরুতর হুমকি বিবেচনায় কোনো সনদ দিলে তার ভিত্তিতে জামিন মঞ্জুর হওয়ার’’ শর্তের ওপর। কীভাবে যথাযথভাবে বোর্ড গঠিত হবে, তা আইনে নির্দিষ্টভাবে বলা নেই। ২০০৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর টুকুর মামলায় তৎকালীন পিজির ছয় অধ্যাপকের দ্বারা গঠিত বোর্ডের সুপারিশ মেনেছিলেন হাইকোর্ট। বলেছিলেন, এটি যথাযথভাবে গঠিত। এখন কীভাবে হতে পারে, তা আদালত নির্দিষ্ট করতে পারেন...।’ (সূত্র : বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ‘পলিটিক্স’!, দৈনিক প্রথম আলো ১৯ জুন ২০১৮) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ৫ বছরে কোনো কিছুতেই নেই বিএনপি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দলটি আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। বিগত ৫ বছরে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিয়েও নানা প্রতিবন্ধকতায় ভালো ফল পায়নি দলটি। সরকার জোর করে তাদের প্রার্থীদের ফলাফল ছিনিয়ে নিয়েছে। আগামীতে কয়েকটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে কী করবে তা বলা মুশকিল। মামলা-হামলায় কাবু দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগেও যোগ দিচ্ছে। তাদের ধরে রাখার কোনো পদক্ষেপই দল থেকে নেওয়া হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার পর সরকারের এজেন্টরা কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ের নেতাদের নানা সুবিধা দিয়ে বিএনপির ঘর ছোট করতে চাচ্ছে। গত ২ বছরে বিএনপির রাজপথে কোনো কর্মসূচি ছিল না। কাউন্সিল করলেও গুছিয়ে তুলতে পারেনি দলকে। অবশ্য রাজপথে কয়েক দফা মিছিল-সমাবেশের ডাক দিলেও ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের বাধায় তা করা যায়নি। ২০১৪-২০১৭ এই তিন বছরই তুলনামূলকভাবে সরকার ছিল গরম আর বিএনপি ছিল নরম। (সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৩ জানুয়ারি ২০১৭) বিশ্লেষকরা বলেছেন, ‘বিএনপির মতো দলে বিশাল জনগোষ্ঠী আছে। কিন্তু তারা তা কাজে লাগাতে পারেনি। বিগত ৫ বছরে বিএনপি তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সৃজনশীল কিছু করতে পারেনি। জনপ্রিয় দল হিসেবে বিএনপির কাছেও জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। যদিও হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত নেতা-কর্মীদের সামনে নানামুখী প্রতিবন্ধকতাও ছিল। সরকারের বাধায় মিছিল-সমাবেশও করতে পারেনি দলটি। এর পরও দলটির কৌশলী হয়ে আরও কিছু করার ছিল।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারের ‘অনিয়ম বা দুঃশাসনের’ বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদই করতে পারেনি বিএনপি। জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোও হাতছাড়া করেছে বিএনপি। এত বড় একটি জনপ্রিয় দল নিজেদের প্রজ্ঞা দিনিয়ে কৌশলী ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সংগঠন, রাজনীতি ও আন্দোলন-কোনোটাই উল্লেখ করার মতো ছিল না দলটির। দাবি আদায়ে আন্দোলন করার মতো কোনো শক্তি হাতে ছিল না তাদের। জেলা পর্যায়ের পুনর্গঠনের কাজ চলছে ঢিমেতালে। মোট কথা-৫ বছর বিএনপি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। দলের ভিতর গণতন্ত্র চর্চা করতে পারেনি বিএনপি। দেশেও গণতন্ত্র ফেরাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি দলটি। মানসিক অবসাদ তাদের পাশাপাশি জাতির জন্যও ক্ষতিকর। দলটির বিপুল জনশক্তি রয়েছে, কিন্তু কাজে লাগাতে পারছে না। রাজনীতি করতে হলে পথে নামতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে। কিন্তু একটি বক্তৃতা বা বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ