ঢাকা, শনিবার 23 June 2018, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অবিস্মরণীয় নবাব সলিমুল্লাহ

সৈয়দ নাসরুল আহসান : ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব পর ঊনবিংশ শতকের শেষ দিনগুলো উপমহাদেশের বিশেষ করে বাংলার মুসলমানদের জন্য ছিল সবচেয়ে সঙ্কটময় কাল। আবার এই সময়ে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুইজন মুসলিম মনীষী নবাব আব্দুল লতিফ এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ ইন্তিকাল করেন। এদিকে মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত আমির আলিও চিরদিনের জন্য বিলেতে চলে যান। আর ঠিক এই সময় বিশেষভাবে বাংলার মুসলমানদের ত্রাণকর্তা হয়ে নবাব সলিমুল্লাহর আবির্ভাব ঘটে। নওয়াব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সলিমুল্লাহর জীবন ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী নেতার জীবন।
১৮৭১ সালে ঢাকার বিখ্যাত নওয়াব পরিবারের নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নয়াব আহসানউল্লাহ। তাঁদের পূর্ব পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল কাশ্মীর। তাঁর জনৈক পূর্বপুরুষ খাজা আবদুল ওহাব বাংলার শেষ স্বাধীন নওয়াব সিরাজউদ-দৌলার সময় সিলেট আগমন করেন এবং নীলের ব্যবসা করে প্রচুর ধন সম্পদ অর্জন করেন, ১৮শ’ শতকের শেষদিকে তিনি ঢাকার পুর্ব দরজা এলাকার (বর্তমান বেগমবাজার) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে খাজা আবদুল গণি, পিতা খাজা আলীমুল্লাহর জীবদ্দশায় স্বীয় সততা, মিতব্যয়িতা ও জনপ্রিয়তার জন্য বিশাল পৈতৃক জমিদারীর কর্তৃত্বভার লাভ করেন। তখন থেকেই পরিবারটি বিভিন্ন জনহিতৈষী কাজের মাধ্যমে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। ১৮৭৫ সালে বৃটিশ সরকার খাজা আবদুল গণিকে নওয়াব উপাধিতে ভূষিত করেন। পরে এটি বংশগত উপাধিতে পরিণত হয়। ১৮৯৫ সালে নওয়াব আবদুল গণির মৃত্যুর পর তার পুত্র খাজা আহসান উল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হন। সলিমুল্লাহ ছিলেন খাজা আহসান উল্লাহর দ্বিতীয় পুত্র।
লেখা পড়ার দিকে সলিমুল্লাহ ছেলেবেলা থেকে ঝোক ছিল। তিনি কুরআন, হাদীস থেকে শুরু করে ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি ও মহৎ ব্যক্তিবর্গের জীবনী খুব মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করতেন। তিনি উর্দু, আরবী ও ইংরেজি ভাষায়ও যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেন।
১৮৯৩ সালে মূলত জনসেবার উদ্দেশ্যেই সলিমুল্লাহ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে পিতা খাজা আহসানউল্লাহ মৃত্যুবরণ করলে মাত্র ৩০ বৎসর বয়সে পারিবারিক দায়িত্বভার তাঁর উপর পড়ে। তিনি সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেই সঙ্গ বংশানুক্রমিক ‘নওয়াব বাহাদুর’ উপাধিও লাভ করেন ১৯০২ সালে। ১৯০৩ সালে তাঁকে কে.সি.আই.ই উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সলিমুল্লাহ উদার পৃষ্ঠপোষকতার বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। ঢাকার আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়), মিটফোর্ড হাসপাতাল (সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ), সলিমুল্লাহ এতিমখানা, ঢাকা কলেজ হোস্টেল (সলিমুল্লাহ হল) প্রভৃতি তাঁর জনহিতকর কার্যের স্বাক্ষর বহন করছে।
রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবদান : বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করেই আজ সলিমুল্লাহ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনে — করেন।
১৯০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর বৃটিশ সরকার বাংলা বিভাগের প্রস্তাব করেছিলেন। সে সময় বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর, আসাম, পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশ নিয়েছিল বেঙ্গল প্রদেশ। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দরুন পূর্বাঞ্চল সরকারি সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।
প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্ব থেকেই বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ১৮৫৭ সালে স্যার চার্লস গ্রান্ড প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সী বিভক্তির সুপারিশ করেন।
বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম গ্রে মত প্রকাশ করেন যে, বাংলার সুশাসন একজন ছোট লাটের পক্ষে সাধ্যাতীত এবং সমগ্র প্রদেশের সকল অংশের প্রতি সুবিচার প্রায় অসম্ভব। উইলিয়াম গ্রের ইচ্ছা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ  প্রদশে হবে। তার নিজস্ব প্রশাসনিক ও ্ইন পরিষদ থাকবে।
বাংলার হিন্দু সম্প্রদায় এ পরিকল্পনার ঘোর বিরোধিতা শুরু করেন। ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামে তদানীন্তন সাপ্তাহিক পত্রিকা মারফত জানা যায়, প্রথম প্রতিবাদ সভাটি হয় বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ধানকোড়া জমিদার বাড়িতে। এতে সভাপতিত্ব করেন সেখানকার জমিদার হেমেন্দ্র রায় চৌধরী। আন্দোলন চালানোর জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। পরে এ কমিটির উদ্যোগে দেশের সর্বত্র জনসভার মাধ্যমে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের উদ্দেশে ঢাকায় একটি ‘গণপরিষদ’ গঠন করা হয়। এ পরিষদের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের নিকট বাংলা বিভাগ প্রস্তাব কার্যকর না করার আহ্বান জানিয়ে টেলিগ্রাম করা হয়।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। ঢাকায় রাজধানী স্থাপিত হয়। স্যার বাম্পতিত ফুলার ছোট লাটের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ নতুন প্রদেশকে সানন্দে গ্রহণ করে।
বঙ্গভঙ্গের সময় সলিমুল্লাহ পূর্ব বাংলার মুসলমানদের নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে আসেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের ব্যাপারে তিনি লর্ড কার্জনের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। নবগঠিত প্রদেশের উন্নতির জন্য সলিমুল্লাহ মুসলমানদের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। এই বিষয় পূর্ববঙ্গের অন্যান্য মুসলমান নেতাগণ তাঁকে সমর্থন করেন। রাজশাহীর মুহাম্মদ ইউসুফ, কুমিল্লার নওয়াব আলী চৌধুরী, সিলেটের মুহাম্মদ ইয়াহিয়া, ময়মনসিংহের আবদুল হাই আখতার, বগুড়ার খন্দকার হাফিজউদ্দিন, ধনবাড়ীর নওয়াব আলী চৌধুরী ও বরিশালের এ. কে. ফজলুল হক তার রাজনৈতিক জীবনের সহচর ছিলেন।
এই সময় ভারত সচিব লর্ড মর্লি পার্লামেন্টে আভাস দেন যে, বৃটিশ সরকার ভারতের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের বিষয় বিবেচনা করেছে। ইহার ফলে মুসলমান নেতাগণ সক্রিয় হয়ে উঠেন। নতুন শাসনতন্ত্র মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে তাহারা বড়লাট লর্ড মিন্টোর নিকট এক প্রতিনিধি দল প্রেরণের আয়োজন করেন। সেই প্রতিনিধি দল প্রথমে ১৯০৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর লক্ষেèৗতে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হন। স্যার আব্দুর রহিম এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এই বৈঠকে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া সম্বন্ধে স্মারকলিপির খসড়া প্রস্তুত করা হয়। চোখে অস্ত্রোপচার হওয়ার দরুণ নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর  বড় লর্ড মিন্টোর নিকট প্রেরিত প্রতিনিধি দলে অংশগ্রহণ কতে পারেন নাই। তাহার রাজনৈতিক সহচর নওয়াব আলী চৌধুরী ও এ. কে. ফজলুল হক প্রতিনিধ দলে যোগ দেন। এই প্রতিনিধি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ নওয়াব আলী চৌধুরীর সহিত তার প্রস্তাবিত মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনার খসড়া পাঠিয়েছিলেন। সিমলার এক ঘরোয়া বৈঠকে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তার নেতাদের বিষয় আলোচনা করেন এবং ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে এই বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর নভেম্বর মাসে নবাব সলিমুল্লাহ তার পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত পত্র মুসলমান নেতাদের নিকট প্রেরণ করেন।
পরিকল্পনা সম্বতি পত্র (Circular letter) : সলিমুল্লাহ লিখেন, ১। আজ আমাদের সদাশয় স¤্রাটের জন্মদিন। এই শুভ দিনে আমি আমার মুসলমান ভ্রাতাদের নিকট আমার পরিকল্পিত সর্ব ভারতীয় মুসলিম সংঘের (Mohammedan All India Confederacy) বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করিতেছি।
২। সিমলার মহামান্য বড়লাটের নিকট প্রেরিত সর্ব ভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধি দলে যোগ দিতে অসমর্থ হওয়ায় আমি আমার বন্ধু প্রতিনিধিদেরকে লিখিতভাবে আমার পরিকল্পনার ‘বিষয় জানাইতেছিলাম। আমি লিখিয়াছিলাম যে, সমগ্র ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের আশা-আকাক্সক্ষা রূপায়িত করিবার জন্য একটি কেন্দ্রীয় মুসলিম প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
৩। আমি জানিতে পারিয়াছি যে, আমার পরিকল্পনার বিষয় নিয়ো প্রতিনিধিগণ সিমলার ঘরোয়া বৈঠকে আলোচনা করিয়াছেন এবং এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করিয়া তাহারা প্রস্তাব করিয়াছেন যে, ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে।
৪। সিমলায় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার পরিকল্পনার পূর্ণ খসড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন সংস্থা, সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নিকট প্রেরণ করি এবং পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের যুক্তিযুক্ততা সম্বন্ধে সকলের ন্যায়সঙ্গত আলোচনা আহ্বান করি।
৫। আমি জানিতে পারিয়াছি যে, আমার পরিকল্পনা নিয়া সিমলায় যে আলোচনা হয় তাহাতে অধিকাংশ প্রতিনিধি মুসলমানদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুকূলে মত দিয়াছেন।
৬। কেহ কেহ মনে করেন যে, কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নাই, কারণ ইহাতে স্থানীয় সংস্থাগুলি দুর্বল হইয়া পড়িবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইলে আলীগড় শিক্ষা কেন্দ্রের উপকারিতাও কার্যকারিতা অনেক বাড়িয়া যাইবে এবং প্রতি প্রদেশে ইহার মত শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হইবে। রাজনীতি সম্পর্কে আমি বলিতে চাই যে, যদি আমরা জীবনের প্রতিযোগিতায় পিছনে পড়িয়া থাকিতে না চাই তাহা হইলে আমাদেরকে যুগের সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে হইবে।
৭। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা। ইহা অস্বীকার করা যায় না যে, মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়, তাহাদের নিজস্ব অতিরিক্ত স্বার্থ আছে। এই স্বার্থের সহিত অন্য সম্প্রদায়ের সম্পর্ক নাই এবং উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা না থাকায় এই ‘স্বার্থগুলি অবহেলিত হইয়া আসিয়াছে।’
কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান না থাকিলে আমাদের সম্প্রদায়ের এই বিশেষ স্বার্খগুলি রক্ষা করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকিলে এই বিষয়ে সরকারকে সাহায্য করা ও পরামর্শ নেয়ার সুবিধা হয়। উদ্দেশ্য হইবে সম্ভবত সরকারের বিধিব্যবস্থা সমর্থন করা এবং সারা দেশে আমাদের সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নতির কাজ করা।
৯। আমরা যে প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা ভাবিতেছি তাহা উপযুক্ত নামকরণ খুবই দরকার। অনেক বিবেচনার পর আমি মনে করিয়াছি যে, ইহার জন্য মুসলমানদের সর্ব ভারতীয় সংঘ (The Mohammedan All india Confederacy) নাম উপযোগী হইবে। ইহার উদ্দেশ্য : (ক) তথাকথিত জাতীয় কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান প্রস্তাব প্রতিহত করা।
(খ) আমাদের সম্প্রদায়ের যেসব যুবক আমাদের মধ্যে উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান না থাকায় কংগ্রেসে যোগ দেিয়ছে, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হইলে তাহারা রাজনীতি ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা ও সামর্থ্যরে পরিচয় দিতে সুযোগ পাইবে।
১০. সিমলায় যে আলোচনা হইয়াছিল তাহা হইতে বুঝা যায় যে, কেহ কেহ আমাদের উদ্দেশ্য এরূপ খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করার পক্ষপাতি নহেন; কারণ তাহারা মনে করেন যে, ইহাতে আমাদের হিন্দু ভ্রাতাগণ অসন্তুষ্ট হইত পারেন। কিন্তু আমাদের এখন সময় আসিয়াছে যে, এখন আমাদেরকে ভাবাবেগের উপর নির্ভর করিয়া থাকিলে চলিবে না, এই ভাবাবেগের দরুন এখন আমাদের মধ্যে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করিয়া ধ্বংস ও দুর্দশার সূত্রপাত হইয়াছে।
নবাব সলিমুল্লাহ সর্ব ভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক সংঘ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ভঙ্গভঙ্গের বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মুসলমানদের সমর্থন লাভ করা। এই সময় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও হিন্দুদের তীব্র আন্দোলন চলছিল এবং বঙ্গভঙ্গ বজায় রাখার জন্য পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের মুসলমান নেতাগণ ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক সহযোগিতা লাভের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। ঢাকায় ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ পরিকল্পনার উপর মুসলমান প্রতিনিধিদের আলোচনা হয় এবং ইহার সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহ ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা।
সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা : ১৯০৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকায় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের অধীবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টার সময় নবাব সলিমুল্লাহর শাহবাগ নামক সুরম্য বাগানে অধিবেশন শুরু হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হতে আগত প্রায় এক হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। নবাব সলিমুল্লাহ অভ্যর্থনা সংসদের সভাপতি ছিলেন। নবাব ওয়াকার-উল-মূলক, শরীফুদ্দিন (পাটলা), পরিষদের খলিফা মুহাম্মদ হোসেন, হাসান ইমাম, লখৌর রাজা সওগাত আলী খান, খান বাহাদুর সৈয়দ মুহাম্মদ হোসেন, নওয়াব আলী চৌধুরী, মুহাম্মদ আলী, ভুপালের সৌপদী নিজামুদ্দীন, নবাব মুহদিল-উল-মুলক, ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ, কুমিল্লার আলী নওয়াব চৌধুরী, চৌধুরী কেয়ামত উল্লাহ, মওলানা শওকত আল,ি মৌলবী আওলাদ হাসান, চৌধুরী কেরামত উল্লাহ, সৈয়দ হোসেন, অমৃতসরের রাজা মুহম্মদ ইউসুফ শাহ, খাজা মুহাম্মদ আফজাল, শাহজাদা আফতাব আহমদ খান প্রমুখ। বিশিষ্ট প্রতিনিধিগণ এই অধিবেশনে যোগদান করেন। এদের অনেকে সিঙ্গদার বড়লাটের নিকট প্রেরিত প্রতিনিধি হয়েছিলেন।
সরকারি, বেসরকারি কয়েকজন ইউরোপীয়গণও শিক্ষা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কলিকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শরীফুদ্দিন উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী পূর্ববঙ্গ ও আসামের শিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। মওলানা শিবলী নোমানী ও নবাব মুহদি-উল-হক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বঙ্গভঙ্গের উল্লেখ করে মহসিনুল-উল-মূলক বলেন সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মুসলমানদেরকে নিজেদের উন্নতির জন্য পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে উপদেশ দেন। প্রতিনিধিগণ সকলেই বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করেন।
রাজনৈতিক অধিবেশন : ৩০ ডিসেম্বর রোববার সকালে শাহবাগে শিক্ষা সম্মেলনের শেষ অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনে ঘোষণা করা হয় যে, মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্দেশ্যে উপস্থিত প্রতিনিধিগণ সেখানে এক বিশেষ সভায় মিলিত হবেন। তদানুযায়ী শাহবাগে প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাব ক্রমে নবাব ওয়কার-উল-মূলক এই ঐতিহাসিক অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। নবাব সলিমুল্লাহর সর্বভারতীয় মুসলিম সংঘ পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে আলোচনা হয়। সভাপতি উর্দু ভাষায় তার ভাষণ দেন। তিনি বলেন যে, মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য তাদের একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। তিনি কংগ্রেসের উত্তেজনামূলক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন এবং মুসলমানদেরকে তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের শালীনতা বজায় রাখতে পরামর্শ দেন। এরপর সভাপতি নবাব সলিমুল্লাহকে তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনার প্রস্তাব পেশ করতে আহ্বান করেন। নবা সলিমুল্লাহ তার বক্তৃতায় ভারতীয় মুসলমানদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে আলোচনা করেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক জাগরণের বিষয়ও উল্লেখ করেন। তিনি প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা শত অসুবিধা সত্ত্বেও দেশের দূরবর্তী স্থান হইতে এক মহৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হইয়া এখানে আসিয়া মিলিত হইয়াছেন। এই মুহূর্তে আমাদের মধ্যে যে অধিকতর রাজনৈতিক তৎপরতার বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সেই বিষয়ে আমার বিস্তারিত বর্ণনার আবশ্যক নাই। আমাদের দেশ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে নবজীবনের সম্পাদন দেখা গিয়াছে। ভারতের রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হইতেছে এবং যে মুসলমানদের জীবন স্পন্দন এতদিন রুদ্ধ ছিল তাহাদের মধ্যেও এখন জাগরনের সাড়া পড়িয়াছে।’
নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুদের আন্দোলনের বিষয় উল্লেখ করে বলেন যে, ‘বিলাতের দলীয় সরকার ভারতের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞাত নহে, এই কারণে কর্তৃপক্ষ যাহারা বেশি চিৎকার করিতে পারে তাহাদের কথাই শোনে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমানদের স্বার্থ উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছে। মুসলমানেরা শান্তশিষ্ট থাকিয়া কিছুই পায় নাই। তাহাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে।’
নবাব সলিমুল্লাহ বলেন যে, ‘প্রায় দশ বছর পূর্বে সৈয়দ আহমদ যে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভব করিয়াছিলেন পূর্ব বাংলার মুসলমানদের বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে সে রূপ প্রতিষ্ঠান গঠন আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহাদের সম্মুখে চারটি পথ খোলা আছে-
ক. রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করিয়া মুসলমানদের স্বার্থূরক্ষার কাজ সরকারের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া। খ. রাজনীতি ক্ষেত্রে নামিয়া হিন্দুদের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব গ্রহণ করা। গ. হিন্দুদের জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেওয়া এবং তাহাদের কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা। ঘ. মুসলমানদের নিজেদের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠন করা।
মুসলমানগণ তৃতীয় পথ অনুসরণ করিতে পারে না, কারণ ১৮৮৭ সাল হইতে তাহারা কংগ্রেস হইতে সরিয়া রহিয়াছে। তাহারা দ্বিতীয় পথও অনুসরণ করে নাই, মুসলমানদের পরম শত্রুও বলিতে পারিবেন না যে, তাহারা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। ১৮৮৭ সাল হইতে মুসলমানগণও প্রথম পথও অনুসরণ করিয়াছে, তাহারা রাজনীতিতে নিস্ক্রিয়তার নীতিতে বিশ্বাস করিয়াছে। কিন্তু রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় থাকায় তাহাদেরকে খুব অসুবিধা ভোগ করিতে হয়। এমন অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে। অতি সংকটজনক পরিস্থিতিতেও মুসলমানগণ রাজশক্তির প্রমাণ দিয়েছে।’
নবাব সলিমুল্লাহ মুসলমানদের শিক্ষার উন্নতির উপর জোর দেন। মুসলমানদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য শিক্ষার বিস্তার অত্যাবশ্যক। তিনি মনে করেন যে, নবাব মহসীন-উল-মূলক ও তার সহকর্মী এবং আলীগড় কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের প্রচেষ্টায় শিক্ষা বিস্তারের কাজ ভালোভাবে চলছিল। প্রস্তাবিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নবাব সলিমুল্লাহ বলেন যে, যুগের পরিবর্তন হয়েছে, এই যুগধর্মের প্রেরণায় মুসলমানরা এক রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ১৮৯৩ সাল অপেক্ষা বর্তমানে মুসলমানদের জন্য সক্রিয় প্রচারণা, তাদের দাবি-দাওয়া ও আশা-আকাক্সক্ষার অভিব্যক্তি এবং তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা বিস্তৃতি বেশি আবশ্যক হয়ে পড়েছে। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ এর উদ্দেশ্য হবে। এতে বৃটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের রাজভক্তি এবং প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের সদ্ভাব ব্যহত হবে না। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলমানগণ প্রয়োজন মতো তাদের দাবি-দাওয়া সম্বন্ধে সুচিন্তিত অভিমত সরকারের নিকট উত্থাপন করবে। মুসলমানদের বিশেষ স্বার্থরক্ষার জন্য তাদেরকে এককভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হইবে। অন্য সম্প্রদায়ের ন্যায্য স্বার্থের সহিত মুসলমানদের যাতে সংঘাত না হয় সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে। ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কোন স্বার্থের ব্যাপারে কোনরূপ সংঘাতের সম্ভাবনা নাই, কিন্তু তাদের মূখ্য স্বার্থের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দিতে পারে। মুসলমানদের পৃথক প্রতিষ্ঠান না থাকলে তাদের পক্ষে ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা সম্ভবপর হবে না। এরপর নবাব সলিমুল্লাহ তার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। হাকীম আজমল খান, জাফর আলী এবং আরও কয়েকজন প্রতিনিধি। প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। তারা সংস্থার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সামান্য রদবদল করে নিম্নলিখিত প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় এই সভায় সর্বভারতীয় মুসলিম সংস্থা (All India Muslim League) নামে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য প্রস্তাব করা যাচ্ছে।
নিম্নলিখিত উদ্দেশ্য সাধন করা এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হবে।
১. ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে বৃটিশ সরকারের প্রতি রাজভক্তি উদ্রেক করা এবং সরকারের কোন অবস্থা সম্বন্ধে তাহাদের মনে প্রাপ্ত ধারণা জন্মিলে তাহা অপমোদন করা।
২. মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, স্বার্থরক্ষা ও উন্নতির ব্যবস্থা করা।
৩. সংস্থার উপরোক্ত উদ্দেশ্যগুলো অব্যাহত রাখা এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি মুসলমানদের মধ্যে যাহাতে বিদ্বেষভাব সঞ্চার     না হয় তার ব্যবস্থা করা।
নবাব ওয়াকার-উল-মূলক ও নবাব মুহসিন-উল-মূলক সর্বভারতীয় মুসলিম সংস্থার (All Indian Muslim League) যুগ্ম-কর্মসচিব নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র রচনার জন্য ৬০ সদস্য নিয়ে একটি সাময়িক সংসদ (Prvoisional Commitee) গঠিত হয় : এই সংসদকে চার মাস সময় দেয়া হয়। মুসলিম লীগের পরবর্তী অধিবেশনে গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হবে বলে বলা হয়। ঢাকার এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের নিন্দা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর নবাব সলিমুল্লাহ ও অধিবেশনের সভাপতিকে ধন্যবাদ দিয়ে সবার কাজ সমাপ্ত হয়। মুসলিম লীগ গঠনের ও বঙ্গভঙ্গ বিষয়ক প্রস্তাবের নকল নবাব ওয়াকার-উল-মূলক বড় লাটকে প্রেরণ করেন।
নবাব সলিমুল্লাহর পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সলিমুল্লাহ তার প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছিরেন সর্বভারতীয় মুসলিম সংঘ (Confederacy), কোন কোন প্রতিনিধি ‘সংঘ’ শব্দটি পছন্দ করেন নাই। এই জন্য এর নাম রাখা হয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ।
হিন্দু সংবাদপত্রগুলি মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার তীব্র সমালোচনা করে। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী সম্পাদিত দি বেঙ্গলী পত্রিকায় একে সলিমুল্লাহ লীগ এবং সরকারের দাতাাগোষ্ঠী ও তাবেদারের সমিতি বলে বিরূপ কটাক্ষ করা হয়।
সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সদর দফতর লক্ষৌতে স্থাপিত হয়। ১৯০৭ সালের ২ শে ডিসেম্বর লীগের প্রথম বার্ষিক অধিবেশন করাচীতে অনুষ্ঠিত হয়। বোম্বাইর স্যার আদমজী পীর ভাই এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। লীগের গঠনতন্ত্র সম্বন্ধে আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। লীগের সভা সংখ্যা ৪০০ নির্দিষ্ট হয়। ৪০ সদস্য নিয়ে এর কেন্দ্রীয় কর্মসংসদ গঠনের ব্যবস্থা হয়। ১৯০৭ সালে নবাব মুহসীন-উল-মূলকের মৃত্যু হয় এবং নবাব ওয়াকার-উল-মূলক আলীগড় কলেজের কর্মসচিব নির্বাচিত হন। কলেজের দায়িত্ব গ্রহণ করায় ওয়াকার-উল-মূলক মুসলিম লীগের কর্মসচিবের দায়িত্ব বহন করতে অসমর্থ হন। ১৯০৮ সালের ১৮ই মার্চ আলীগড়ে লীগের এক বিশেষ সভা আহূত হয় এবং এই সভায় মাননীয় আগাখান লীগের স্থায়ী সভাপতি ও সৈয়দ হোসেন বিলগ্রামী এর কর্মসচিব নির্বাচিত হন। কয়েকটি প্রদেশে লীগের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। সৈয়দ আমীর আলীর উদ্যোগে ১৯০৮ সালের ৬ই মে লন্ডন মুসলিম লীগের শাখা স্থাপিত হয়। আমীর আলীর সভাপতিত্বে লন্ডন লীগ ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে ১৯০৬ সালে বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
মুসলিম লীগের পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশন ১৯১১ সালের ডিসেম্বরের দিল্লীতে হবার কথা ছিল। এই সময়ে স¤্রাটের দিল্লী দরবার অনুষ্ঠিত হওয়ায় লীগের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয় এবং ১৯১২ সালের মার্চ মাসে নবাব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে কলিকাতায় লীগের এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন : হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন এবং তারা এর বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলনের সৃষ্টি করেন। তারা একে জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি আঘাত বলে বর্ণনা করেন। তারা একে মুসলমানদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতিত্ব এবং মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন। তারা ১৯০৫ সালের ৭ই আগস্ট কলিকাতার টাউন হলে কাশিমবাজারের জমিদার মহারাজা মহেপ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন।
খ্যাতনামা নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী বঙ্গভঙ্গের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ বিভক্ত করে হিন্দুদেরকে অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে। কলিকাতার হিন্দুরা ১৬ই অক্টোবর জাতীয় শোক দিবস পালন করেন। সভায় নেতাগণ বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কংগ্রেস ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট স্বদেশী আন্দোলন আরম্ভ করে। বিলাতী দ্রব্য বয়কট করা হয়। বিলাতী দ্রব্যে প্রকাশ্যে আগুন লাগানো হয়। কংগ্রেসের মারাঠী নেতা বালগমাধর তিলক বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তা সুসংহত করার জন্য মারাঠাদের নায়ক শিবাজীকে ভারতের সকল হিন্দুদের জাতীয় বীরের আসনে প্রতিষ্ঠার আয়োজন করেন। দেশের সর্বত্র শিবাজীর জন্মবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিপালিত হয়। এতব্যতীত, এই সময় বাংলাদেশের হিন্দুদের মদ্যে সন্ত্রাসবাদী সংস্থা গড়িয়া উঠে। উচ্চ পদস্থ ইংরেজ কর্মচারীদেরকে হত্যা করে বঙ্গভঙ্গ রদ করা এর উদ্দেশ্য ছিল।
বঙ্গভঙ্গ রদ : ভারত সচিব লর্ড মর্সি  ও বড়লাট লর্ড মিন্টো মুসলমানদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, বঙ্গভঙ্গ একটি চূড়ান্ত বাস্তব। স্যার হেনরী বেনারম্যানের নতুন শ্রমিক সরকারও বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে অনুরূপ উক্তি করেন। কিন্তু বেনারম্যান আবার এরূপ মন্তব্যও করেন যে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ কারণ থাকলে বিষয়টির পূর্ণ বিবেচনা হতে পারে। এতে সরকারের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে পূর্ববাংলার মুসলমান নেতাদের মনে সন্দেহ জন্মে। তাঁরা স্মারকলিপির মাধ্যমে সরকারকে তাদের আশংকার কথা জানান। কিন্তু নতুন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য পরিকল্পনা রচনা করেন। বড় লাটের শাসন পরিষদের অন্যতম স্যার জন জেনকিলস নতুনভাবে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এবং কলিকাতা হতে দিল্লীতে ভারতের রাজধানী স্থানান্তরের প্রস্তাব করেন। ১৯১১ সালের নভেম্বর মাসে ভারত সচিব বঙ্গদেশ পুনর্গঠনের নতুন পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। ভারতের রাজধানী কলিকাতা হতে দিল্লীতে স্থানান্তরিত করা হয়। ১২ই ডিসেম্বর সম্রাট পঞ্চম জর্জ ঐতিহাসিক দিল্লী দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের পকিল্পনা ঘোষণা করেন। এর ফলে বাংলা ভাষাভাষী পাঁচটি বিভাগ লাইয়া বাংলাদেশ পুনর্গঠিত হয়, বিহার ও উড়িষ্যাকে বাংলাদেশ হতে পৃথক করা হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়া : বঙ্গভঙ্গ রদ করায় স্বভাবতঃই হিন্দুগণ সন্তুষ্ট হয়। কংগ্রেস সভাপতি অন্বিকাচরণ মজুমদার বৃটিশ শাসকদের রাজনীতি বত্তার প্রশংসা করেন। কংগ্রেসের ইতিহাস লেক পট্টভী সীতারাময় লিখেছেন যে, ১৯১১ সালে কংগ্রেসের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন জয়যুক্ত হয়, বঙ্গভঙ্গ রদ করে বৃটিশ সরকার ভারত শাসনে ন্যায়নীতির পরিচয় দেয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণার মুসলমানেরা মর্মাহত হয়। মওলানা মুহম্মদ আলী মুসলমানদের প্রতি বৃটিশ সরকারের বিশ্বাস ভঙ্গের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন যে, মুসলমানগণ তাদের রাজভক্তির প্রতিদানে তাদের অধিকার হতে বঞ্চিত হয়েছে। বঙ্গভঙ্গ রদ করায় মুসলমানগণ যে কি রূপ মর্মাহত হয়েছিল তা নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১২ সালের মার্চ মাসে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির অধিভাষণে ব্যক্ত করেন। দিল্লী দরবারে বৃটিশ সরকার তাকে কে.সি.আই.ই উপাধি দিয়ে সম্মানীত করেন। কিন্তু তিনি এই উপাধিকে ঘুষ ও তার গলায় অপমানের বন্ধন বলে গণ্য করেন।
পূর্ব বাংলার মুসলমানদেরকে শান্ত করার জন্য বড়লাট ১৯১২ সালের ৩ শে জানুয়ারী ঢাকায় আসেন এবং তাদেরকে আশ্বাস দেন যে, ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারত সরকার ২রা ফেব্রুয়ারী এক ইশতেহারে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব প্রকাশ করে। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের দরুণ এই প্রথম প্রকাশ্যে হিন্দু ও মুসলমানদের সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়।
সলিমুল্লাহর অভিভাষণ : বঙ্গভঙ্গ রদ জনিত নৈরাশ্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কলিকাতায় ১৯১২ সালের ৩রা মার্চ মুসলিম লীগের পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহ সভাপতির ভাষণের প্রারম্ভে পাঁচ বৎসরের মধ্যে মুসলিম লীগের যে উন্নতি হয়েছে তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর ভারত ভ্রমণ ও যুগান্তকারী দিল্লী দরবারের কথা উল্লেখ করেন এবং তাঁদের প্রতি মুসলমানদের শ্রদ্ধা ও রাজভক্তি জ্ঞাপন করেন। তিনি দিল্লীর দরবারে কয়েকটি ঘোষণার উল্লেখ করেন এবং মন্তব্য করেন যে, এদের একটি পূর্ববাংলার মুসলমানদের মনে আঘাত করেছে এবং তাদের ঘরে ঘরে বিষাদের সঞ্চার করেছে।
সরকার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে করায় নবাব সলিমুল্লাহ সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে হিন্দুদের বিরোধিতার নিন্দা করেন। ঢাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণায় কলিকাতায় হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের অনেকে একে ন্যাড়েদের মন্ডা বিশ্ববিদ্যালয় বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি মুসলমানদের শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ ও বিশেষ সুবিধার দাবি করেন। তিনি ব্যবস্থাপক সভা ও স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলনের উপর জোর দেন।
ভগ্ন স্বাস্থ্যের দরুন নওয়াব সলিমুল্লাহ প্রত্যক্ষ রাজনীতি হতে অবসর গ্রহণ করেন। তার অবসর গ্রহণের জন্য কারণও ছিল। বঙ্গভঙ্গ রদ করায় তিনি একবারেই নিরাশ হয়েছিলেন।
১৯১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারী নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ কোলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর। মৃত্যু সংবাদ ঢাকায় পৌঁছালে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। পরদিন এক বিশেষ লঞ্চে তাঁর মৃতদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। নওয়াব বংশের পারিবারিক গোরস্থান বেগম বাজারে তাঁকে দাফন করা হয়। ধর্মের প্রতি সলিমুল্লাহর খুব ভক্তি ছিল। ধর্মীয় বিধানগুলো তিনি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। তিনি মনে করতেন ইসলাম ধর্মের মাধ্যমেই মুসলমানগণ নিজেদের উন্নতি বিধান করতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, নওয়াব সলিমুল্লাহর জীবনের সকল কিছুই মানুষের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন। তাঁর দানের তুলনা হয় না। আজ থেকে প্রায় একশত বছর পূর্বে নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ যে স্বপ্ন নিয়ে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের সংগ্রাম চালিয়েছিলেন প্রায় সেই ভৌগোলিক ভূ-খ-কে নিয়েই বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক : রাজনীতিবিদ, কলাম লেখক ও সভাপতি
(নবাব সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল কমিটি)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ