ঢাকা, শনিবার 23 June 2018, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পলাশীর ট্রাজেডি ও ২৩ জুনের প্রেক্ষাপট

আজ ২৩ জুন পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সাথে ১ ঘন্টার প্রহসন যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ্দৌলা পরাজিত হন। বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। সিরাজ উদ্দৌলার বীরত্ব ও মহত্বকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ইতিহাসে বিকৃত করা হয়েছে। সিরাজ উদ্দৌলা ছিলেন মহান দেশ প্রেমিক, অসম সাহসী যোদ্ধা, বিজ্ঞ রাজনীতিক এবং একজন আদর্শবান ও বলিষ্ঠ নবাব। জাতির অস্তিত্বে জাতির চেতনায় পলাশী ট্রাজেডী যে করুণ গাথাঁ রচিত হয়ে আছে ইতিহাসে তা’ জাতিকে বার বার বেদনা হত করে তোলে। বাংলার প্রথম নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। পরে ১৭২৭ সালে তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন বাংলা বিহারের নবাব হন। ১৭৩৯ সালে তাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁ সিংহাসনে বসেন। পরবর্তীতে আলীর্বদী খাঁ সরফরাজ খাঁ কে পরাজিত করে নিজে বঙ্গ’ বিহার , উড়িষ্যার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। আলীর্বদী খানের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তার প্রিয় নাতী সিরাজ  উদ্দৌলাকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করে যান। সিরাজের পিতার নাম জয়নুদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন বিহারের গর্ভণর। সিরাজের মায়ের নাম আমিনা বেগম। সিরাজউদ্দৌলার রাজত্বকাল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আধুনিক ইতিহাসের মিথ্যা র্দূনামের আসরে তাঁর ভূমিকা ছিল অতীব বেদনাদায়ক।
সিরাজউদ্দৌলা যখন প্রথম সিংহাসন আরোহন করেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। তাঁর রাজত্ব কাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ৯ এপ্রিল ১৭৫৬ সাল থেকে ২৩ জুন ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে তাঁকে প্রথমেই জ্ঞ্যাতিশক্রু খালা ঘষেটি’বেগম ও জ্ঞ্যাতি ভ্রাতা শওকত জং এর ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায় এই ষড়যন্ত্রেও মীর জাফর আলী খান শরিক ছিলেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের ষড়যন্ত্র দানা বাঁধে তৎকালীন বাংলার ক্ষমতাধর রাজন্য ও অমাত্য বর্গের কুট চক্রান্তে। এদেঁর মধ্যে প্রধান ছিলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রাজা রাজবল্লভ, জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদ প্রমূখ। ষড়যন্ত্রের এই পর্যায়ে খুঁটি হিসেবে একদিকে এই চক্রান্তকারীরা ইংরেজদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেন অন্যদিকে মীরজাফর আলী খানকে তাদের পছন্দের মানুষ হিসাবে কাছে টেনে নেন। সিদ্ধান্ত হয় সিরাজ-উদ-দ্দৌলাকে পদচ্যুত করে মীরজাফর আলী খানকে মসনদে বসানো হবে। ষড়যন্ত্র পাকা করে ২২ জুন রর্বাট ক্লাইভ ৩,০০০ সেন্যের এক বাহিনী নিয়ে মুশির্দাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ইংরেজ পক্ষের ৩,০০০ সৈন্যের মধ্যে ৯০০ ছিল ইউরোপীয় এবং বাকী ২১০০ সৈন্য ছিল এদেশীয় বাঙ্গালী।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদ থেকে ২৩ মাইল দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশী নামক স্থানে সৈন্য সমাবেশ করেন। ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরেই উভয় পক্ষে যুদ্ধ হয়। সিরাজ উদ্দৌলার সৈন্য ছিল ৫০,০০০। ৩৫,০০০ পদাতিক এবং ১৫,০০০অশ্বারোহী। কামান ছিল ৫৩ টি। ইংরেজদের কামান ছিল ৮টি। যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুলর্ভ তাদের বিশাল বাহিনী নিয়ে নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু মাত্র মীর মদন, মোহন লাল এবং ফরাসী সেনাপতি সিনফ্রের নেতৃত্বে স্বল্প সংখ্যক, সৈন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করতে লাগলো। দুপুর ১১টার সময় ক্লাইভ বসলেন পরামর্শে। পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হলো রাতে তারা আক্রমন করবে নবাবকে। রাত্রি ১১টার পর হঠাৎ নামালো বৃষ্টি মুষলধারে। আধঘন্টা পরে বৃষ্টি যখন থামলো, তখন দেখা গেলো মীর মদনের অনেক খানি গোলার বারুদ ভিজে গেছে, ঠিক মতো আচ্ছাদন বা যতেœর অভাবে। ইংরেজরা কামান দাগতে লাগলো আড়াল থেকে আর ঠিক সে সময়ই একটা গোলা এসে লাগলো মীর মর্দানের উরুতে। এতে কয়েক জন যোদ্ধাসহ মীর মর্দান নিহত হলেন। ঐতিহাসিক মৃনাল চক্রবর্তী লিখেছেন-বেলা দু’টো পর্যন্ত সমান ভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড গোলাগুলি বর্ষণ চলতে থাকে। মীর মর্দানের মৃত্যুর পরই নবাবের সৈন্য বাহিনীর মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মীর মর্দানের মৃত্যুর ফলে নবাবের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং তিনি মীর জাফরকে ডেকে পাঠান এবং তার পায়ের উপর মাথার উষ্ণীষ নিক্ষেপ করেন ও মুখ মন্ডলের ভাব অত্যান্ত বিষন্ন করে দৃঢ়তার সঙ্গে রাজমুকুটের সম্মান রক্ষার জন্য তাকে অনুরোধ জানান। তারপরও ক্ষমতা লোভী মীরজাফরের হৃদয় বিগলিত হলো না। তিনি মোহন লালের প্রচেষ্টায় যুদ্ধের গতি নবাবের অনুকুলে দেখে সিরাজকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। মোহন লালের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সিরাজ মীর জাফরের উপরই বিশ্বাস স্থাপন করে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিলেন। নবাবের সৈন্যরা যখন অস্ত্র পরিত্যাগ করছে তখনই বিশ্বাস ঘাতক মীর জাফরের নিদের্শ ইংরেজ বাহিনী অন্য দিক থেকে রাতের আঁধারে আক্রমণ করে নবাব বাহিনীকে পযুর্দস্ত করে ফেলে। যুদ্ধে ইংরেজরা জয়ী হয়। নবাব সিরাজ উদ্দৌলা কোনো রকমে প্রাণ রক্ষা করে মুশির্দাবাদে ফিরে আসেন। নিরুপায় সিরাজ স্বীয় পত্নী ও কন্যা সহ মুশির্দাবাদ থেকে পলায়ন করেন। পথি মধ্যে রাত কাটাতে গিয়ে মীর জাফরের জামাতা মীর কাশিমের হাতে ভগবান গোলায় ধৃত হন। ৩রা জুলাই সাধারণ বন্দীর মতো শৃঙ্খলিত অবস্থায় তাকে মুর্শিদাবাদে হাজির করা হয় এবং মোহাম্মদী বেগের ছুরিকা ঘাতে তাকে নিমর্ম ভাবে হত্যা করা হয়। নবাব কে হত্যা করার পর তাঁর লাশ ক্ষত বিক্ষত করে হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদ শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় পলাশী যুদ্ধের মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন জগৎ শেঠ। প্রভূত অর্থের বলেই বশ করে তিনিই মীর জাফর, ইয়ার লতীফ, রাজা রাজ বল্লভ সকলকে প্ররোচিত করেন এবং পলাশী যুদ্ধের ষড়যন্ত্রের চুড়ান্ত পরিকল্পনা তার প্রাসাদেই গ্রহণ করা হয়।  অর্থনৈতিক সংস্কারের জাতীয় অর্নথের মূল নায়ক জগৎশেঠ ছিলেন এক নম্বর বিশ্বাস ঘাতক, দালাল, ষড়যন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার। ষড়যন্ত্র কারীদের মনে যদি সেদিন বিন্দু পরিমাণ দেশপ্রেম ও জাতীয়তা বোধ উপস্থিত থাকতো তাহলে সেদিন ২৩ জুন নবাব সিরাজের পরাজয়ের পর দেশীয় সৈন্যরা বিদেশী প্রভুদের একঘন্টায় পরাভূত করে দেশের স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারতো। পলাশীর প্রান্তরে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া প্রেক্ষাপট আজ আমাদের গভীর ভাবে নতুন করে উপলদ্ধি করতে হবে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়, বিশ্বাস ঘাতকতার অধ্যায়। দেশী ও বিদেশী বিশ্বাস ঘাতকদের চক্রান্তের ফলে সিরাজ উজ-উদ্দৌলার পতন ঘটে এবং এই উপমহাদেশ ইংজে রাজত্বের সূত্রপাত ঘটে।
* জোবায়ের আলী জুয়েল, কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, jewelwriter53@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ