ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদকবিরোধী অভিযান

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে দেশের মাদক সা¤্রাজ্যের ঠিক কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ অবৈধ মাদকের প্রকৃত মাফিয়া ডন, গডফাদাররা এখনও অধরা। সেই সাথে সারাদেশে খুচরা মাদক ব্যবসায়ীরাও পুলিশের সহায়তায় ইতিমধ্যে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হয়েছে বলে বিভিন্ন দৈনিকের প্রকাশিত খবরে জানা যায়। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর বস্তিগুলো ও তৎসংলগ্ন বস্তিসাদৃশ্য আবাসিক এলাকাগুলোর প্রায় সব পাড়া-মহল্লার অলি-গলিতে সন্ত্রাসী, মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ও অভ্যন্তরীণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত। রাজধানীর কয়েকটি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনীর সাফল্যের হার খুবই কম। সম্ভবত আগেই অভিযানের তথ্য জানিয়ে দিলে অভিযানের আগে মাদক ব্যবসায়ীরা অন্যত্র গা-ঢাকা দিতে সুযোগ পেতে পারে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে পুলিশের সহায়তা নিয়ে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা অভিযানের আওতার বাইরে থাকতে পারছে। পুলিশের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্য নিজেরাই সরাসরি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং আরেক শ্রেণীর পুলিশ সদস্য ও সোর্স নামধারী সন্ত্রাসীরা মাসোহারা ও গোপন বোঝাপড়ার বিনিময়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। অভিযানে মাদকের সামান্য কিছু অংশ আটক হলেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
ইয়াবা ও মাদক ব্যবসার সাথে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহর, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনেকেই জড়িত থাকার অভিযোগ পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকলেও এসব অভিযুক্তদের কেন ধরা হচ্ছে না? তবে মাদক অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত নাগরিক হত্যাকা- সংবিধান মোতাবেক সমর্থনযোগ্য নয়। আবার ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নিরপরাধ ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত নন এমন লোককেও সাজানো বন্দুক যুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে হত্যা করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক খবরে কক্সবাজারে মাদক অভিযানে নিহত ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হকের ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ নেতা একরামের মৃত্যুতে মাদক অভিযান নিয়ে খোদ সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠল। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা ও ভয়ে সন্ত্রস্ত করে রাখতে চাচ্ছে বলে ইতিপূর্বে বিএনপি’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাসাবাড়ি থেকে ডেকে নেয়ার পর বন্দুকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার তথ্য দেশবাসীর মনে প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। চিহ্নিত গডফাদার মাদক ব্যবসায়ীরা কথিত বন্দুক যুদ্ধে মারা গেলে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকলেও আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসাই মানবাধিকারের দাবি। সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সত্য-মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচারের শিকার হওয়া সন্দেহভাজনদের কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যার বর্বর ঘটনাগুলো দেশে ন্যায়বিচারহীনতার আওয়ামী স্বৈরাচারী সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অনেক দেশেই মাদকের গডফাদাররা নিজস্ব মাদক সাম্রাজ্যে ও অবৈধ অস্ত্রের সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে বলে জানা যায়। অবৈধ মাদকের মাফিয়া ডন, গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পাল্টা আক্রমণ ও শক্ত প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে যে মানুষগুলো কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই হয় মাদকের খুচরা ব্যবসায়ী ও বাহক, না হয় সাধারণ মানুষ। নেত্রকোনার ছাত্রদল নেতা আমজাদ হোসেন, যশোরের ইউনুস আলী বা কক্সবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হকের সামাজিক-পারিবারিক জীবনের চিত্র এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যাকা-ের হিসাব কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না। এদেরকে ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তির ব্যবস্থা করা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কোন কঠিন কাজ ছিল না। মূলত এটাই তাদের দায়িত্ব। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের, গডফাদাররা নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া এবং সন্দেহভাজনদের আটক ও বন্দুকযুদ্ধের নামে সংবিধান পরিপন্থী বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের যেসব অভিযোগ দেশে-বিদেশে তীব্র হয়ে উঠেছে তা এই অভিযানের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর ফলে সরকারের এই গোটা অভিযানই কলঙ্কজনক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ