ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজপথের রাজনৈতিক আন্দোলনই হতে পারে জবাব

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
কর্মসূচি পালন করতে না পারায় ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ডেকেছে বিএনপি। কিন্তু ঢাকার প্রায় ১০০টি ওয়ার্ড রয়েছে। তারা যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে দাঁড়াত তাহলেও তো কর্মসূচি সফল হতো। ফুটপাথে দাঁড়াতে পারমিশন লাগে না। সেখানে দাঁড়িয়ে মৌন প্রতিবাদ করতে পারত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৫ বছর আগে যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে বৃহৎ দুটি দলের একটি অংশ নিতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশে এখন পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নেই। এখানে বড় একটি ঘাটতি রয়েছে। সেখানে বিএনপি কতটুকু এগোতে পেরেছে বা সরকার তাদের কতটুকু স্পেস দিয়েছে, দুটোই সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তোলে। তবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা বিএনপির ভুল ছিল। হোঁচট খেলেও সরকার ৫ বছরে দ্রুততার সঙ্গে উন্নয়নের চেষ্টা করছে। কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা নেই। বিএনপির প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি আরও ইতিবাচক হওয়া উচিত। নইলে স্বাধীনতার যে মূল ভিত্তি গণতন্ত্র, তা হবে না।
বিএনপি যদি ওই নির্বাচনে অংশ নিত, আজকের চেঁচিয়ে ভালো অবস্থানে থাকত। সরকারেরও উচিত বিএনপিকে কীভাবে নির্বাচনে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে ভাবা। বিএনপিকে নির্বাচনের পথে থাকতে হবে। অতীতের ভুলগুলো শুধরে বিএনপির শিক্ষা নেওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিজেদের মধ্যে একটা ভাইব্রেশন সৃষ্টি করতে হবে। এটা এখন অনুপস্থিত। কোনো ডেসট্রাকটিভ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ঠিক হবে না।
৫ বছরে ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার নিজের শক্তি ও ক্ষমতা জনগণের ওপর ব্যবহার করতে পেরেছে। কিন্তু জনগণের যে অধিকার, বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা বা সভা-সমাবেশের অধিকার, উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অধিকার, এগুলো দারুণভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। সরকারের গণবিরোধী কাজে যে ধরনের প্রতিবাদ করা উচিত ছিল, সংগঠিতভাবে কিংবা নিয়মতান্ত্রিকভাবে, সেটি করতে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। জনসম্পৃক্ত যে বিষয়গুলো রয়েছে, যেমন আইসিটি অ্যাক্ট, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও শিক্ষকদের ওপর দমন-পীড়ন-এসবের বিরুদ্ধে বিএনপি শুধু বিবৃতি দিয়েছে। তারা রাজপথে নামতে পারেনি। সরকার কোনো কার্যক্রমে বিএনপিকে রাজপথে নামতে দেয়নি। অবশ্য সরকার যদি বিরোধী দলকে কোনো স্পেসই না দেয় তাহলে তারা কী করবে? আজ শুধু বিএনপি নয়, সব বিরোধী মতের সঙ্গে সরকার একই আচরণ করছে। ফলে এখানে প্রতিবাদ করা বা জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির সুযোগ কতটুকু, সেটাই জরুরি প্রশ্ন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের যারা রয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ বিরোধী আন্দোলন কিংবা সাংগঠনিক কর্মকা-- সবকিছুতেই অনুপস্থিতি থাকছেন।  সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিটের বেশির ভাগেরই চালচিত্র প্রায় একই রকম। কোনো কোনো জেলার শীর্ষ নেতারা এলাকায় থাকলেও বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে নিজেদের আড়াল করে রাখেন তারা। এসব নেতার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও কম। সব ধরনের ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের। গ্রেফতারের হুলিয়া ও মামলা-হামলায় জর্জরিত এসব কর্মী-সমর্থকদের পাশেও দাঁড়াননি জেলার সুবিধাভোগী নেতারা। মাঠের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, বিগত আন্দোলনে কিছু জেলায় কিংবা মহানগর পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত মিছিল-সমাবেশ হলেও তা ছিল অনেকটাই লোকদেখানো। গণমাধ্যমে ছবি কিংবা প্রতিবেদন আসার পরপরই ওইসব জেলা নেতাদের আর এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর ফলে পুলিশি শাস্তির খড়গ নেমে আসে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ওপর। বিএনপিতে ২০ হাজারের অধিক মামলায় ৫ লাখ আসামির অধিকাংশই তৃণমূলের নেতা-কর্মী। কেন্দ্র থেকেও তারা পাচ্ছে না পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা। এরই মধ্যে অনেকে গ্রেফতার, গুম, খুনের শিকার হওয়ায় তাদের পরিবার-সংসারও ভেঙে গেছে।  একটি জেলার অবস্থা পর্যালোচনা করলে অনুভব করা সম্ভব বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা কত কষ্টে আছেন। মামলার জালে আটকা পড়েছেন চট্টগ্রাম বিএনপির ২৭৪  নেতাকর্মী। গত কয়েকমাস মাস ধরে মামলা কাঁধে নিয়ে চট্টগ্রাম আদালত থেকে ঢাকা হাইকোর্ট পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ চলছে তাদের। হাইকোর্ট থেকে একমাস কিংবা দুই মাসের অন্তর্র্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে আসলেও চট্টগ্রাম আদালত থেকে শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হচ্ছে কারাগারে।
৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলার রায়কে কেন্দ্র করে নগরীর কোতোয়ালি, খুলশী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, ইপিজেড, বন্দর ও পতেঙ্গা থানায় ৮টি পৃথক মামলায় বিএনপির ২৪০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এছাড়া ১৪ মার্চ ডবলমুরিং থানায় বিএনপির ৩৪ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিম্ন আদালত বিএনপি নেতাকর্মীদের জামিন বাতিল করছে। কিন্তু এরপরও গত চার বছর ধরে মামলার পর মামলা, হামলা ও নির্যাতন সত্ত্বেও বিএনপির কোনো নেতাকর্মী বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি।
ডা. শাহাদাত বলেন, কারাগারে গিয়ে নেতাকর্মীদের মনোবল আরো শক্ত হচ্ছে। নেতাকর্মীরা এখন হাসিমুখে কারাবরণ করছেন। মামলা-কারাগারকে তোয়াক্কা না করে নেত্রীর জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি আমিও রাস্তায় নেমেছিলাম। আমার সঙ্গে মহিলা দলের অনেক নেতাকর্মীও সেদিন জেলে গিয়েছিলেন। আমি দেখেছি, কারাগারে এসব মহিলা নেতাকর্মীরাও ভেঙে পড়েননি। তিনি আরো বলেন, আদালতে আত্মসমর্পণ করা নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ নেই। আদালত থেকে জামিন নামঞ্জুরের আদেশ শুনেও নেতাকর্মীদের ভেঙে পড়তে দেখা যায় না। বরং স্লোগান ধরে মিছিল করতে থাকেন তারা।
 নগর বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার বলেছেন, উচ্চ আদালতের অন্তর্র্বর্তীকালীন জামিন বহাল রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে না। এটা সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। (সূত্র : দৈনিক মানজমিন ১৩ এপ্রিল ২০১৮)
আন্দোলন ও নির্বাচন সামনে রেখে নেতা-কর্মীদের চাঙা করতে বিএনপির নেওয়া উদ্যোগ ‘ভন্ডুল’ হয়েছে ২ বছর আগেই। নির্ধারিত সময়ে অর্ধেক জেলায়ও কর্মিসভা করতে পারেনি দলটি। তা ছাড়া দলে ঐক্য গড়ার এই কর্মসূচিতে জেলার বিবদমান পক্ষগুলোর কোন্দল আরও স্পষ্ট হয়েছে। পক্ষগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়েছে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে ৭৭টি সাংগঠনিক জেলায় কর্মিসভা করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে ৫১টি দল গঠন করেছিল বিএনপি। ১৮ এপ্রিল দলনেতাদের এ-সংক্রান্ত যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাতে ‘দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা, দলের অবস্থান ও দলের ঐক্য’ নিয়ে বক্তব্য দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২৫ এপ্রিল এই কমিটিগুলো গঠনের ঘোষণা দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আন্দোলন, নির্বাচন সব বিষয়ে আলোচনা হবে এবং আমরা আশা করছি, এই সফরের ফলে আমাদের দলের ঐক্য আরও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের নেতা-কর্মীরা আরও উজ্জীবিত হবেন।’
কিন্তু মাঠে নেমে বাস্তবতা টের পেয়েছে বিএনপি। দীর্ঘদিন পরে এত বড় একটি সাংগঠনিক কর্মসূচি ঘোষণা করেও ‘ব্যর্থ’ হতে হয়েছে দলটিকে। বিশ্লেষকরা তখন বলেছিলেন, ঘোড়া বা ইঞ্জিন ছাড়া শুধু গাড়ি ছেড়ে দিলে তা চলবে না। বিএনপির ঘোড়া বা ইঞ্জিন হলেন দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁকে বের হতে হবে, দু-চারটা জায়গায় যেতে হবে। তাহলে দলীয় কোন্দল, সংঘর্ষ এসব কমে যাবে।’
তখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, বড় দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে কিছু সমস্যা থাকে। সংঘর্ষের বিষয়টি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন বা চিন্তিত নন। সংগঠন ‘ভাইব্র্যান্ট’ আছে বলে এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটছে। এ কারণে কর্মসূচি হোঁচট খেয়েছে বা বিএনপির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, তা নয়। অবশ্য তিনি এও বলেন, নেতৃত্বে ‘সেশনজট’ হওয়ায় কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগেও এটি আছে। এ কারণে কিছু সমস্যা থাকতে পারে। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৭ মে ২০১৭)
মুখে না বললেও আন্দোলন বা নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলের নেতাদের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার বিষয়টি বিএনপিকে চিন্তায় ফেলেছে। মূল-দলের পর অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটি দেওয়ায় আরও কয়েকটি জেলায় এ ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে। সামনে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নেতাদের মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যাতে জেলায় যাওয়ার আগে প্রয়োজনে ঢাকায় জেলার বিবদমান পক্ষগুলোকে ডেকে একসঙ্গে বসেন। সবার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করে তারপর কর্মিসভায় যান।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দাবি, দমনপীড়ন ও ত্যাগ-তিতিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই জেলা ও কেন্দ্র নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে নীতিনির্ধারকদের। ইতিপূর্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের বাদ দিতে হবে। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ