ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের চোখ ধাঁধানো রূপের ফোয়ারা ছড়ানো ঐতিহ্যবাহী কার্জন হল

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : কার্জন হল! আর কোনো বিশেষণ নয়। একটি নাম। একটি ইতিহাস। ইউরোপীয়, মুঘল ও মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের চোখ ধাঁধাঁনো রুপের ফোয়ারা ছড়ানো ঐতিহ্যবাহী এ হলটিই বাংলাদেশের অপরূপ সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। কার্জন হলের অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে শুধু এ দেশের মানুষকে নয় বিদেশী পর্যটকদের কাছেও এক রূপময় বাংলাদেশ। পর্যটন প্রেমীদের চোখ কার্জন হলের সম্মুখে এসে আটকে যায়। অপলোক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে তার রুপের চাহনি। যেন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এসে আটকে আছে দুই বাংলার দৃশ্যমান উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষায় নির্মিত কার্জন হলের প্রধান ফটকে। বঙ্গভঙ্গের আগে ১৯০৪ সালে স্থাপিত ভিত্তিপ্রস্তর আজকের কার্জন হল একটি দন্ডায়মান ইতিহাস।
বর্তমানে কার্জন হল ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে ব্যবহৃত হলেও এটি ছাত্র-ছাত্রীসহ দেশী-বিদেশী পর্যটকদেরও অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রও বটে। প্রতিদিন বিকালে এখানে জমে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ও দেশ-বিদেশের বিনোদনপ্রিয় হাজারো মানুষের আড্ডা।
১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯০৪ সাল। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন রমনা এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এক সুদৃশ্য ভবনের। যার নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯০৮ সালে। লর্ড কার্জনের নামানুসারে এই ভবন পরিচিতি পায় কার্জন হল নামে। আজো ঢাকার বুক চিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার অন্যতম সেরা এই স্থাপনা। কার্জনের লাল রঙের পেছনেও রয়েছে আরেক ইতিহাস। এই স্থাপনায় ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যরীতির সম্মীলন ঘটেছে। মুঘল সম্রাট আকবরের ফতেহপুর সিক্রির দিওয়ান-ই-খাসের অনুকরণে লাল বেলেপাথরের পরিবর্তে তৈরি এ স্থাপনার মাধ্যমে ব্রিটিশরা প্রমাণ করতে চেয়েছে উপমহাদেশে তাদের অবস্থান আকবরের মত। কেননা একমাত্র আকবরকেই তারা শ্রেষ্ঠ পরিশীলিত  মুঘল শাসক হিসেবে স্বীকার করত।
একটু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রবক্তা। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবের পেছনে সরকারি ব্যাখ্যা যথেষ্ট যৌক্তিকভাবে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে বাংলা হচ্ছে একটি বিশাল প্রদেশ। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা ছাড়াও বিহার এবং উড়িষ্যা ছিল বাংলার অন্তর্গত। তাই কলকাতা কেন্দ্রে বসে গভর্নর জেনারেলের পক্ষে পুরো বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল কষ্টকর। এই কারণেই পূর্ব বাংলা ও আসাম অবহেলিত থেকে গিয়েছিল। কার্জন ভেবেছিলেন বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাংলা প্রদেশকে দুটো অংশে ভাগ করে শাসন করতে হবে। নতুন একটি প্রদেশ করা হবে। যার নাম হবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ। এই প্রদেশের রাজধানী হবে ঢাকা। প্রদেশটির শাসনভার দেওয়া হবে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে। এই ঘোষণায় পূর্ববঙ্গের মানুষ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। মুসলমান অধ্যুষিত এই দেশের মুসলমান নেতারা এ কারণে ইংরেজ শাসকদের সবরকম সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন। মুসলমানদের নেতৃত্বে তখন ছিলেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
পুরো ঢাকায় কার্জন হলের সমকক্ষ ঐতিহাসিক কোন স্থাপনা হিসাবে কার্জন হলই একমাত্র স্থাপনা যা তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখনো তার রূপরস যৌবন ধরে রেখেছে। পাশ্চাত্য ও ইসলামিক স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে গঠিত এ ভবনের উত্তরদিকের সামনের অংশের অশ্বখুরাকৃতি এবং খাঁজকাটা খিলানের অংশ প্রত্যক্ষ করলে বুঝা যায় এখানে কিভাবে ইউরোপ ও মুঘল স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। অত্যন্ত যত্নসহকারে গড়ে তোলা প্রশস্ত বাগানে নির্মিত ইটের এ দ্বিতল ভবনে রয়েছে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় হল। সে সাথে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পার্শ্বে রয়েছে সংযোজিত কাঠামো যা অসংখ্য কক্ষ সমৃদ্ধ এবং চারপাশ দিয়ে বারান্দা ঘেরা। কার্জন হলের ভেতরে রয়েছে বিশাল হলরুম যা বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটির সামনে রয়েছে একটি প্রশস্ত বাগান, সেখানে সবুজের বুক চিরে পশ্চিম থেকে পূর্বে চলে গেছে একটি রাস্তা। সারাক্ষণ প্রাণচঞ্চল থাকা এ  ভবনের পাশেই রয়েছে ফজলুল হক মুসলিম হল ও শহীদুল্লাহ হল; মাঝে এক মনোরম পুকুর স্থাপত্যটিকে দিয়েছে একটি আলাদা আবেদন।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার মতে, কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল মূলত একটি টাউন হল হিসেবে। উনিশ শতকের শেষদিক হতে শুরু হওয়া ঢাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির জন্য এই টাউন হলটি নির্মিত হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, ১৯০৫ সালে দুই বাংলা ভাগ হয়। আর ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেলে এই ভবন ঢাকা কলেজের একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। এরপর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শ্রেণীকক্ষ ও পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতে শুরু হয় যা এখনো এভাবেই চলছে।
ইতিহাসবিদরা এটি সমর্থন করলেও আরেক দলের মতে কার্জন হল নির্মাণ করা হয়েছিল ঢাকা কলেজের সম্প্রসারিত ভবন হিসেবে এবং এর জন্য অনুদান প্রদান করেন ভাওয়ালের রাজকুমার। বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য রমনা এলাকার যেসব ইমারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তার মধ্যে অন্যতম। এটি নির্মিত হয় ঢাকা কলেজের পাঠাগার হিসেবে। তাদের যুক্তি- ১৯০৪ সালের ঢাকা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে দেখা যায় যেখানে বলা হয়েছে- ‘ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল রায় মহাশয় যতœবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমনে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে কার্জন হল নামের একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন’
ভাষা আন্দোলনের জ্বলজ্বলে স্মৃতি নিয়ে কার্জন হল সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাসে কার্জন হল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান। পাকিন্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকা এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি স্বদম্ভে ঘোষণা দিলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সমবেত শিক্ষার্থীরা না-না বলে তখন ঘোর প্রতিবাদ জানালেন। ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের সাথেও জড়িয়ে রয়েছে কার্জন হল। কার্জন হলের পাশেই ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবর অবস্থিত।
রাজধানী ঢাকার লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপত্য যে কারও নজর কাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত এই ভবন কার্জন হল নামেই পরিচিত। ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতি, মোগল স্থাপত্যশৈলী ও বাংলার স্বতন্ত্র সংবেদনশীল বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভবনটি তৈরি। কার্জন হল বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ভবন যা পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃত। ঢাকায় এলে একটু সময় করে দেখে নিতে পারেন। ভাল লাগা ছুয়ে যাবে ইতিহাসের ছোয়ায়।
কিভাবে যাবেন : আপনি অন্য জেলায় বসবাস করলে প্রথমে ঢাকা শহরে আসতে হবে। তারপর ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে নিজস্ব পরিবহন অথবা যেকোনো লোকাল পরিবহনে করে হাইকোর্ট এলাকা, গুলিস্তান, শাহাবাগ এলাকা অথবা পুরান ঢাকা এলাকায় এসে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কথা বললে যে কেউ আপনাকে দেখিয়ে দেবে। এসব এলাকা হতে রিকশাযোগে খুব সহজেই যাওয়া যাবে কার্জন হলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ