ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সফলতার মূল শক্তি জামায়াতি জিন্দেগী

-ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ

সব কিছুতে দলবদ্ধতা : আকাশের দিকে তাকালে কি দেখা যায়? দেখা যায় খন্ড খন্ড মেঘমালার মিছিল তাদের লক্ষ্য পানে দ্রুত ছুটে চলছে। তার নিচে দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির দল। চিল, কাক, শুকুন, বক, গাংচিল, চড়–ই, বাবুইসহ অগণিত পাখি। কিন্তু সেখানে বকের সাথে বক, কাকের সাথে কাক, চিলের সাথে চিল দলবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী একেকটি দল সাহসের সাথে শূণ্যাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছুটে চলছে নির্দিষ্ট নেতার অধীনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পানে। আমরা যে ফল মূল ভোগ করি তাহলো আম, জাম, কাঠাল, নারিকেল, কলা, আপেল এবং আরো অনেক। উহারাও এক জাতে মিলেই অবস্থান করে। আম বাগান আর কাঠাল বাগান সব সময়ই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তাদের অস্তিত্বের লড়াই করতে থাকে। বনের মাঝে বাঘ, ভাল্লুক, শিয়াল যাই দেখি সবাই আত্মরক্ষার জন্য নিজেরা দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে। ক্ষুদ্রতর প্রাণী পিঁপড়াসহ অসংখ্যা ক্ষুদ্রতর কীট পতঙ্গের দল আমাদের সামনে দিয়ে অস্তিত্বের লড়াই করে চলেছে অনবরত। এভাবেই আকাশে বাতাসে জমিনে, সাগরের তলদেশে হাজারো প্রাণী দলবদ্ধ হয়েই জীবন সংগ্রাম করে থাকে। আমরা যে লোকালয়ে বাস করি সেখানে কি দেখি? আমরা দেখি মাত্র কয়েকটি কুকুর নিজ পাড়ায় দলবদ্ধ হয়ে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে সতর্কভাবে ঘুরতে থাকে। যেই মাত্র অন্য মহল্লার দুই চারটি কুকুর তাদের সীমানায় আসলো তখন আর রক্ষা নেই। সর্ব শক্তি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ওদের উপর লাফিয়ে পড়ে। জামায়াতবদ্ধ এই কুকুরেরও নেতা আছে। নেতা কুকুরটির একটি মাত্র আওয়াজে অন্যরা জীবন বাজী রেখে শত্রু তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দুই দল কুকুরের এই যুদ্ধ আমাদের সামনে রাত, দিন, সকাল, সন্ধ্যায় অনবরত দেখে চলেছি। এসব দেখে আমরা সৃষ্টির সেরা জীব এই মানুষেরা কি বুঝতে পারি? একা একা বা বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে কি আমরা দুনিয়া বা আখেরাতের কাজে সফলতার মুখ দেখতে পারব? বিশ্বব্যাপী পূঁজীবাদ, সমাজবাদ, কমিউনিজম, জাতিয়তাবাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সহ হাজার মতবাদ নিয়ে দলবদ্ধভাবে লড়াইয়ে লিপ্ত সবাই। এসব মতবাদের নেতা কর্মীরা জীবন বাজী রেখে অস্তিত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত। যে দল যত মজবুত, বড় ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে পারে সেদলই বিজয়ী অবস্থায় বিরাজ করে। এসব বাতিল মতবাদের নেতা কর্মীরাও মজবুত জামায়াতী জীন্দেগীর গুরুত্ব ভাল করে বুঝতে পারে।
ইসলামে ধর্মীয় জীবন আর রাজনৈতিক জীবন সবই এবাদত : মসজিদ হল মুসলমানের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন পাঁচবার এখান থেকে আযান দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে ইমামের পিছনে দাড়িয়ে মুসলমানদেরকে ফরজ সালাত আদায় করতে হয়। নামাযের জামায়াতে কি সুন্দর ভাবে এক ইমামের পিছনে সুশৃংখল কাতারে হাজার হাজার নামাজী দাড়িয়ে যায়। ইমামের অনুসরন করে এক সাথে কিয়াম, রুকু, সিজদা, বৈঠক, সালাম ফিরানো সবই সর্বোত্তম কায়দায় সমাপ্ত করা হয়। ইন্নাদ্বিনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম, ইসলামই কেবল মাত্র পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এ লক্ষ্যে আল্লাহ বলেন- আমি মানুষ ও জীন জাতিকে পয়দা করেছি কেবলমাত্র এবাদত করার জন্য। তাই এবাদত মানে শুধু নামাজ, রোজা, হজু, যাকাতই নয়। ইবাদত হলো জীবনের সব ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর গোলামি করা। ইমামের অনুসরণ যে করে না তার সালাত কবুল হয় না। দিনে পাঁচবার নামাযে একসাথে রমজানের রোজায় ও হজ্জের মহা সম্মেলনে জামায়াতী জিন্দেগির যে মজবুত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, বাস্তব জীবনে উহার প্রতিফলন ঘটিয়ে সফলতা আনাই বুদ্ধিমত্তার কাজ। সূরা আল ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহর ঘোষণা হল- তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানব কল্যাণের জন্য। তোমরা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে। আমরা সেই মুসলমান জাতি। মুসলমানই সেরা জাতি। মুসলমান শাসকের জাতি। বিশ্বমানবতার অগ্রদুত বিশ্ব নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক ছিলেন। আল্লাহ্র হুকুম ও মুসলমানের অস্তিত্বের লড়াইয়ে তিনি যতগুলি যুদ্ধ করেছেন সব গুলিতেই তাকে দলবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট নেতার অধীনে নেতৃত্ব ও আনুগত্যের মাধ্যমে প্রানান্তকর সংগ্রাম সাধনা করতে হয়েছে। বিশ্ব নবীর পূর্বে সমস্ত নবী রাসূল যেমন মুসা (আ.), নূহ (আ.), ঈসা (আ.), ইব্রাহিম (আ.), ইসমাঈল (আ.), ইউসুফ (আ.), ইসহাক (আ.), সোলায়মান (আ.), দাউদ (আ.) এবং অন্যান্য মহা মানবগণ কি তাদের সমাজে একা একা ছিলেন? তারা কি জাতির নের্তৃত্ব কর্তৃত্বে সক্রিয় ছিলেন না? আমাদের মহানবী (সা.) এর সোনালী জীবনী থেকে আমরা পাই যে তিনি ছিলেন সেরা শাসক, সেরা বিচারক। ১০ বছরের মদিনার সেরা শাসক থেকেও তিনি ২৭টি যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন। পরোক্ষে পরিচালনা করেন ৮৫টি যুদ্ধ। মহানবী (সা.) এর অন্যতম সাহাবী আবুবক্কর (রা.), ওমর (রা.), ওসমান (রা.), আলী (রা.) সহ অন্যান্য সাহাবী, তাবেইন তাবে তাবেইন এবং পূর্বপুরুষেরা ছিলেন শাসক, সৈনিক, আমীর, মামুর, শহীদ, গাজী, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সমস্যার সমাধানকারী। সদা সর্বদা দুনিয়ার মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর গোলামীতে আবদ্ধ রাখতেই এসব তাদের করতে হয়েছে। এসবই ছিল এবাদত। সব নবীদের প্রতিই আল্লাহর পক্ষ থেকে একই হুকুম ছিল। তারা বলতেন- হে জনগণ, তোমরা শুধু এক আল্লাহর এবাদত (গোলামী) কর আর কারো এবাদত করোনা। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক তাঁর কিতাবে যথাযথ ও শক্ত হুকুম দিয়ে বার বার বান্দাহদেরকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। রাসুল পাক (সা.) এর মুখ নি:সৃত কঠিন বানী রয়েছে। রাসূলের বাস্তব জীবনে তার অসংখ্য নজির রয়েছে। জামায়াতী জিন্দেগী, বায়াত, আনুগত্য, জিহাদ ইত্যাদি বিষয়ে রাজনীতির অতি মূল্যবান অগণিত হাদিস মালা আজও দলিল হিসেবে মজবুত রয়েছে। কিন্তু দুঃখ আসে তাদের প্রতি যারা বলে জামায়াতবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা বায়াতী জিন্দেগীর বিরোধীতা করে, আবার ইসলাম বিরোধী শাসকের আনুগত্য করে। ইসলামী আন্দোলন বা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ এর ব্যাপারে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। তাই কুরআন ও সহীহ হাদিসের উপস্থাপন করে তাদের জবাব দেয়া ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার সহায়ক শক্তি হিসেবে পেশ করা হচ্ছে।
আমাদের মহানবী (সা.) সাইয়্যেদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) পরিপূর্ণ ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা সর্বদা জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করেছেন। তার জীবনের মিশনই ছিল- দাওয়াত প্রদান ও আহবান, সংগঠন ও প্রশিক্ষণ, সমাজ সেবা, সংশোধন ও সংস্কার এবং সরকারের সংশোধনের কাজ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। র্শিকমুক্ত নির্ভেজাল তৌহিদের প্রতিষ্ঠাতেই মানবতার মুক্তির পথ দেখানো।
শুধু আল্লাহ্ই এক ও একক : কুরআন পাকের সূরা এখলাছে আল্লাহ পাক বলেন, “হে রাসুল। তুমি বল, তিনিই আল্লাহ যিনি একক ও অদ্বিতীয়, আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”
মহান আল্লাহ তাঁর একক সত্তা দ্বারা বিশ্ব জাহানের সবকিছুর উপর কর্তৃত্ব করছেন। তিনিই কেবল একক সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। বিশ্ব জাহানের সবাই মুখাপেক্ষী। তাই মানুষ বা অন্য সব প্রাণী কেউই একক নয়। কেউই একা চলার উপযোগী নয়। সবাই একে অপরের সহায়ক। স্বাভাবিকভাবেই সব প্রাণী দলবদ্ধ। আল্লাহ তাই তাঁর প্রতিনিধি পাঠালেন। কুরআন পাকের সূরা বাকারার ৩০ আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, “স্মরণ করো, তোমার প্রতিপালক যখন ফিরিস্তাগণকে বললেন, আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করবো।” দুনিয়া জাহানে শুধু আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ্ পাক তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল পাঠালেন। আমরা সেই আদম সন্তান যারা সব দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু এক আল্লাহ্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় খালেছ ভাবে আল্লাহর এবাদত (গোলামী) করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ। নবী আগমণের উদ্দেশ্য হল আল্লাহ্র বিধানের প্রতিষ্ঠা। সূরা তাওবাহ- ৩৩ আয়াত, সূরা ফাতাহ- ২৮ আয়াত ও  সূরা সাফ এর ৯ আয়াতে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, “তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূল (সা.) কে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন যেন ইহাকে অন্যসব মতবাদের উপর বিজয়ী করা হয়। ” আল্লাহ প্রদত্ত এই ইসলামী জীবন বিধানের (দ্বীন) বিজয় এনে নির্ভেজাল তৌহিদের তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই যুগে যুগে নবী রাসুলদের আগমন হয়েছে।
মুসলমান কেন সেরা জাতি?
আল কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেন, “তোমরাই (হে মুসলমান) সর্বোত্তম জাতি। মানব জাতির সর্বাত্মক কল্যাণের জন্যে তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দাও আর অসৎ কাজের নিষেধ করো, আর মহান আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান পোষণ করো।” শুধু এক আল্লাহ্র এবাদত করে মানব কল্যাণ সাধন করতেই মুসলমানের আগমন। তারা যাবতীয় ন্যায় ও সৎ কাজের প্রতিষ্ঠা আর অসৎ কাজের বিলোপ সাধন করবে। মানব কল্যাণ এভাবেই হবে। এভাবেই একমাত্র আল্লাহ পাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
দলবদ্ধ হতেই হবে : কুরআন পাকের সূরা আল ইমরানের ১০৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মহান আল্লাহর রজ্জুকে সমবেতভাবে সুদৃঢ়রূপে ধারণ করো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর দ্বীনের  রশিকে ধারণ করে শক্তভাবে অবস্থান গ্রহণ করতে এখানে হুকুম দেয়া হল। কোন রকম বিচ্ছিন্নতার অনুমতি এখানে দেয়া হয়নি।
সূরা বাকারার ১০৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন- “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকতেই হবে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে।
কাফেরের মোকাবেলায় জয় লাভের দোয়া : মহান আল্লাহ্ পাক রাহমানুর রাহীম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন তাগুতি শক্তির মোকাবেলায় বিজয়ী হতে কীভাবে দোয়া করতে হবে। শত্রুপক্ষ কাফিরদের মোকাবেলায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে আল্লাহ্ পাক সূরা বাকারার ২৮৬ আয়াতের শেষ বাক্যে উপযুক্ত দোয়াও শিখিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলেন- “হে আমাদের মালিক যে বোঝা বইবার সামর্থ আমাদের নেই তা তুমি আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়োনা, তুমি আমাদের উপর মেহেরবানী কর। তুমি আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের উপর তুমি দয়া কর। তুমিই আমাদের একমাত্র আশ্রয়দাতা বন্ধু। অতএব কাফেরদের মোকাবেলায় তুমি আমাদের সাহায্য কর।”
জামায়াতবদ্ধ জীবন ওয়াজিব : রাসূলে পাক (সা.) বলেন, “আল্লাহ্ আমাকে যে পাঁচটি বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন আমিও তোমাদেরকে তারই হুকুম দিচ্ছি। তাহলো- জামায়াত গঠন, নেতৃ আদেশ শ্রবণ, আনুগত্য, হিজরত, আল্লাহর পথে জিহাদ। যে ব্যক্তি ইসলামী জামায়াত ত্যাগ করে এক বিঘত পরিমানও দূরে সরে গিয়েছে, সে যেন নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে দিয়েছে। অবশ্য যদি সে জামায়াতের দিকে পুনঃ প্রত্যাবর্তন করে, তার কথা সতন্ত্র । আর যে ব্যক্তি জাহিলিয়াতের দিকে (অর্থাৎ অনৈক্য ও বিশৃংখলার দিকে) আহবান জানায়, সে হবে জাহান্নামী। (এতদ শ্রবণে) সাহাবাগন জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসুল, নামায রোযা আদায় করা সত্ত্বেও কি সে জাহান্নামী হবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হ্যাঁ, যদিও সে নামায পড়ে, রোযা পালন করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করে তাহলেও সে জাহান্নামী হবে।” (আহমাদ ও হাকেম)
একাকী জীবন হলো শয়তানী জীবন : রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি জান্নাতের মাঝখানে নিজের ঘর বানাতে চায় সে যেন জামায়াতের সঙ্গে লেগে থাকে। কেন না শয়তান বিছিন্ন এক ব্যক্তির সঙ্গে থাকে। সঙ্গবদ্ধ দু’ব্যক্তি থেকে সে বহু দূরে অবস্থান করে (মিশকাত)। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ (সা.) বলেছেন- “নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের জন্য নেকড়ে স্বরূপ। নেকড়ে বকরীর দল হতে বিচ্ছিন্ন ও একা চলাচলকারী বকরীকে শিকার করে নেয়। (মানুষ যদি দলবদ্ধভাবে নেতার হুকুম অনুযায়ী বসবাস না করে একা একা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করে তাহলে শয়তান অতি সহজে তাকে হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলতে পারে। সুতরাং হে লোক সকল তোমরা দুর্গম ঝুঁকিপূর্ণ পথ পরিহার করে চলবে এবং সর্বসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াত বদ্ধভাবে বসবাস করবে। (মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত)
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (রা.) বলেছেন- “তিন ব্যক্তি যদি কোন জঙ্গলেও বসবাস করে তবুও তাদের মধ্যে একজনকে নেতা নির্বাচন না করে বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থান করা জায়েয নয়। (মুনতাকা)
নেতৃত্বের আনুগত্য ওয়াজিব : হযরত আবু হোরায়রা (রা.) এর বর্ণনা। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “প্রত্যেক আমীরের নেতৃত্বে তোমাদের উপর জিহাদ করা ওয়াজিব, সে সৎ কিংবা অসৎ যাই হোক না কেন। এমন কি সে কবীরা গুনাহ করলেও। প্রত্যেক মুসলমানের পিছনে নামায পড়া তোমাদের জন্য ওয়াজিব, চাই সে সৎই হোক কিংবা অসৎই হোক। এমন কি সে কবিরা গুনাহকারী হলেও। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জানাযা পড়া ওয়াজিব সে সৎ বা অসৎ যাই হোক না কেন। এমন কি সে কবীরা গোনাহ করে থাকলেও।” (আবু দাউদ)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)  এর বর্ণনা- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুসলমানের উপর তার পছন্দ অপছন্দ সর্ব বিষয়ে (আমীরের) আনুগত্য করা ওয়াজিব। যতক্ষন না সে গোনাহর আদেশ দেয়। কিন্তু সে যদি কোন নাফরমানী ও গোনাহ সম্পর্কীয় কাজের আদেশ করে তাহলে তার আনুগত্য করা ওয়াজিব নয়।” (বুখারী, মুসলিম)
জাহেলিয়াতের মৃত্যু যাদের : ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “যদি কেউ তার আমীরের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কেননা যে ব্যক্তি ইসলামী জামায়াত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেল এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হল, সে জাহেলী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল।” (ছহীহ বুখারী, মুসলিম)
যাদের এবাদত কবুল হয় না : আবু মালিক আশআরী হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “আল্লাহ আমাকে হুকুম করেছেন তোমাদেরকে পাঁচটি কথার নির্দেশ দিতে। তোমাদের আবশ্যক জিহাদ করা, নেতার কথা শুনা, আনুগত্য করা এবং হিজরত করা। যে ব্যক্তি জামায়াত থেকে এক বিঘত পরিমাণ বিচ্ছিন্ন থাকবে তার সালাত ও সিয়াম কবুল হবে না। ” (তাবারানী কাবীর)
মুসলমান বায়াতবদ্ধদল : মুসলমান মানেই হল অনুগত বান্দাহ। আল্লাহর আনুগত্য করে তাদের জান মাল আল্লাহর হুকুম মত দান করে তবেই বেহেস্তবাসী হবে। সূরা তাওবাহ ১১১ আয়াতে আল্লাহ পাকের ঘোষণা হল, “জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জান মাল অবশ্যই খরিদ করে নিয়েছেন”। মুমিন মুসলমানের জান মাল আল্লাহ কিনে নিয়েছেন বিনিময়ে জান্নাত দিবার শর্তে। এখানে জান মালের বিক্রি মানে জামায়াতের কাছে বায়াতের মাধ্যমে জান মালের বিক্রি চুক্তি করা হয়। আল্লাহ তার বান্দার জান মাল কিনে নিয়ে উহা তারই কাছে আমানত রেখেছেন যাতে আমীরের থেকে দেয়া শর্ত মোতাবেক উহার ব্যয় করতে থাকে। আমীর যখন যে হুকুম দিবেন উহার আনুগত্য করাই আল্লাহর কাছে জান মাল বিক্রি চুক্তি হবে। আল্লাহ পাকের দেয়া কুরআন হাদীসের বিরাট বহর পুরাপুরি জেনে পুরাপুরি আমল করে জান্নাতী হওয়া বড়ই কঠিন। তাই বান্দাহ আল্লাহ্ প্রদত্ত ও রাসূল (সা:) প্রদর্শিত বিধান মানতে আমীরের আনুগত্য করে সদা সর্বদা চলতে পারলেই বায়াতের (বিক্রি চুক্তি) হক আদায় হয়ে যায়। তখনই বান্দাহর পক্ষে জান্নাতী হওয়া সহজ হয়।
বায়াতের জীবনে রাসূল (সা.) : হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- একবার একদল সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বললেন, তোমরা এ বিষয়ে আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত হও যে, তোমরা কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। কারো প্রতি মন গড়া মিথ্যা অপবাদ দিবে না এবং সৎ কাজের অবাধ্য হবে না। (তারপর জেনে রাখো) যে কেউ এ ওয়াদা পালন করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর উপর ন্যস্ত। যে ব্যক্তি এ গুলোর কোন একটি করে এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি পায়, তার জন্য তা কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এ গুলোর কোন একটি অপরাধ করে এবং তা আল্লাহ্ তায়ালা প্রকাশ না করে গোপন রাখেন, তাহলে সে ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। হযরত উবাদা (রা.) বলেন, তখন আমরা ঐ শর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে বাইয়াত হলাম। (বুখারী ও মুসলিম)
ইসলামী আন্দোলন ফরজ : আল্লাহপাক তখনই খুশী যখন বান্দাহ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কাজ করে। কুরআন পাকের সূরা সাফ ৪ আয়াতে আল্লাহ পাকের ঘোষণা- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সর্বাধিক ভাল বাসেন যারা সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত দেওয়াল  রচনা করে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।”
সূরা সফের ১০-১১ আয়াতে আল্লাহ পাকের ঘোষণা হল, “হে ঈমানদারগণ। আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাময় শাস্তি থেকে রক্ষা করবে? তাহলো- তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমাদের ধন সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। ইহাই উত্তম যদি তোমরা বুঝতে সক্ষম হও।”
কালামে পাকের সূরা বাকারার ১৯৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তোমরা তাদের সাথে লড়াই করতে থাকো, যতক্ষন না (যমীনে) ফেতনা অবশিষ্ট থাকে এবং (আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা পূর্নাংগ ভাবে আল্লাহ্র জন্যে নির্দিষ্ট হয়ে যায়)”। সূরা নিসার ৭৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন- “কি কারন থাকতে পারে যে, তোমরা কেন যুদ্ধ করছো না সেই সব পুরুষ, স্ত্রীলোক ও শিশুদের খাতিরে যারা দুর্বল হওয়ার কারনে নিপীড়িত, নির্যাতিত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে, হে আল্লাহ আমাদের এ জনপদ হতে বের করে নাও, যার অধিবাসীগণ অত্যাচারী এবং তোমার থেকে আমাদের জন্য কোন বন্ধু, দরদী, সাহায্যকারী বানিয়ে দাও, যারা আমাদের উদ্ধার করবে।”
বিক্রি চুক্তি বা বায়াত : কালামে পাকের সূরা তাওবাহ ১১১ আয়াতে আল্লাহ বলেন, জান্নাতের বিনিময় আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জান মাল অবশ্যই খরিদ করে নিয়েছেন।
আল্লাহ জান্নাত দিবেন তাদেরকে যারা আল্লাহর সাথে তাদের জীবন ও মাল সম্পদ বিক্রি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। আল্লাহ্ মুমিনদের জান ও মালের বিনিময়ে জান্নাত দিবেন। আল্লাহর সাথে মুমিন বান্দাদের এই বিক্রি চুক্তির ব্যাখ্যা বুঝা দরকার। মোমিনদের জান-মাল আল্লাহ খরিদ করে তার মালিকানা আল্লাহ নিয়ে নিয়েছেন। ঐ জান মালই আল্লাহ আবার মুমিনদের কাছে আমানত দিয়েছেন। আর নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন তার বিক্রি চুক্তি ঠিক রেখেই তাকে তার জান-মালের দায়িত্ব তার ইখতিয়ারে দিয়েছেন। শর্ত হলো আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠাকামী জামায়াতের আমীরের আনুগত্য তাকে করতে হবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন- “তোমরা অনুগত্য কর আল্লাহর, রাসুলের এবং তোমাদের নেতার। “জামায়াতবদ্ধ জিন্দেগী হয় আমীর আর মামুর দ্বারা। আমীর হল, যার আনুগত্য করা হয়। মামুর হল, যে আনুগত্য করে। আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বা ইসলামী আন্দোলন উহার আমীরের কথামত মামুর তার জান-মাল ব্যয় করবে। আমীর যদি বলে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য তোমার সব মাল বা তার অর্ধেক বা সিকি বা ৫% দিয়ে দাও। মুমিনের জানমালের বিনিময়ে জান্নাত লাভের কথা তার মনে আছে। সে তাই অকাতরে তা বিলিয়ে দেয়। আমীর যখন তাকে দ্বীন কায়েমের জিহাদে শরীক হতে ডাক দেয়, সেখানে শহীদ হবার সম্ভাবনা আছে, তখনও ঐ মুমিন অকাতরে আমীরের কথামত শহিদ অথবা গাজী হবার তামান্নায় জিহাদে ঝাপিয়ে পড়ে। জামায়াতের আমীরের আনুগত্যের খেলাপী করে না।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমীরের নিকট থেকে আনুগত্যের হাত ছিনিয়ে নিল, সে কিয়ামতের দিনে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তার জন্য কোন দলিল থাকবে না। যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমন অবস্থায় যে তার গর্দানে (আমীরের) বায়াত নেই, সে জাহোলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল।” (সহীহ মুসলিম, মিশকাত)
ইসলামী আন্দোলনের আমীরের কাছে এ শর্তে যারা বায়াত হয় তারাই নির্ভর যোগ্য বুদ্ধিমান মুমিন। যে বায়াতের আওতায় আবদ্ধ হয়নি সে নিজ দায়িত্বে কুরআন হাদীসের সমস্ত হুকুম আহকাম জেনে ও পালন করে জান্নাতে যেতে চায়। এটা বড়ই কঠিন কাজ। আর যে বায়াতের আওতায় এসেছে সে সম্ভাব্য পরিমাণে কুরআন হাদীস জেনে সে অনুযায়ী আমল করছে আর বাকীটা আমীরের আনুগত্য। এই বুদ্ধিমান মুমিন তার প্রাপ্য জান্নাতে যাওয়া সহজ করে নিয়েছে। বাকীরা কঠিন মছিবতের অপেক্ষায়। তাই দুনিয়া ও আখেরাতের সফলকাম হবার মূল শক্তি হল জামায়াতী জিন্দেগী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ