ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাসুলুল্লাহ (স.) এর আদর্শ

মনসুর আহমদ : পৃথিবীর সবদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের সমারোহ, রয়েছে নিয়ম শৃক্সলার অটুট বিধান । চন্দ্র্র সূর্য, গ্রহ নক্ষত্র, যার যার কক্ষ পথে নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের তরঙ্গে, বাতাসের প্রবাহে, জলপ্রপাত- ঝর্ণার মর্মর ধ্বনিতে, শূন্য গগনে মেঘমালার গর্জনে, পাখির কূজন কাকলিতে, গিরি কান্তার মরুপ্রান্তরে সর্বত্র বেজে চলছে একটি প্রেমময় সৃষ্টির সুর। এরা সবাই একটি বিধান মেনে চলছে বিধায় প্রকৃতি এত সুন্দর। প্রতিটি জড়কণার মাঝে প্রোটন বা নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট নিয়মের গোপন নৃত্য জড় জগতের সৃষ্টির কারণ। আমার নিকটতম সত্তা রক্ত কণিকায় রয়েছে যেমন বিভিন্ন গ্রুপ ও হরমোনের হারমোনিয়াস বৈচিত্র, তেমনি সুদূর গগনের ছায়াপথ ও ব্লাকহোলের মাঝেও চলছে নিয়মের খেলা। বিশ্ব চরাচরে চারিদিক নিয়মের খেলা ও আইনের নীরব চর্চা ও অনুসরণই জগতকে গড়ে তুলছে এত মায়াময়,  সুন্দর  ও সুশৃঙ্খল । তাইতো মানুষের দৃষ্টি বার বার ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে, খুঁজে পায় না কোথাও শৃঙ্খলায় ফাটল। “ফারজেয়েল বাছারা হাল  তারা মিন ফুতুর?”(১) এক মহা শক্তিমানের নিয়ম, যাকে আমরা প্রাকৃতিক বিধান বা Natur’s Law ইত্যাদি বলে থাকি তার অধীনে জগৎ চলছে বিধায় জগৎ এত সুন্দর।
মানুষ সামাজিক ও  বুদ্ধিমান জীব।  মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে চালু রয়েছে মানব চিন্তাপ্রসূত বিভিন্ন নিয়ম, ও বিধান। মানব সৃষ্ট আইনের অধীনে চলতে গিয়ে মানব সমাজকে  অশান্তি, যন্ত্রণা ও বিরহ বেদনার অনলে জ্বলতে হচ্ছে। নৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনে মানুষের রয়েছে স্বাধীনতা, আইন মানা না মানার স্বাধীনতা । ব্যক্তি - সমাজ- রাষ্ট্র তথা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কল্যাণ গ্রহণ বা বর্জনের এখতিয়ার রয়েছে মানুষের। “ইম্মা শাকেরাওঁ ওয়া ইম্মা কাফুরা”(২) মানব সমাজ যখন কল্যাণ  ও মঙ্গলময় আইনের অধীনে সমাজ ও ব্যক্তি জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করবে, তখনই সমাজে আসবে শান্তি। শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গলের অন্বেষায় মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ ব্যস্ত। মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি পেতে অনুসরণ করতে হবে গোটা বিশ্বজাহানের শান্তির দূত রহমাতুল্লিল আ’লামীন কে।
নিরপেক্ষ মন ও উদার দৃষ্টি নিয়ে তাকান যাক আলোকোজ্জ্বল নূরের আধার রহমাতুল্লিল আ’লামীনের  দিকে। দেখা যাক কী ভাবে তিনি দু’হাতে শান্তি বিলালেন লোকে লোকে। প্রাকৃতিক জগতের শান্তির মূল কারণ আল্লাহর আইনের কাছে আত্মসমর্পণ। মহাবিশ্বের সব কিছু জীব -জড়, গ্রহ নক্ষত্র থেকে শুরু করে অনু পরমাণু পর্যন্ত ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। যে কারণে মহাজগতের কোথাও বিশৃঙ্খলা পরিদৃশ্যমান হয় না। যা কিছু বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সবই মানব সমাজে। চিন্তার স্বাধীনতা, কর্ম নির্বাচন ও সম্পাদনে স্বাধীনতা প্রদান  করে মানব জাতিকে  সর্বাধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাই মানুষ যখন ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহর আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে তখন মানব জীবন সুশৃঙ্খল, সুন্দর ও সুখের হয়।  
মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞাত। তাই তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য যে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম নীতি প্রদান করেছেন তা অনুসরণ করলেই মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
রসুল (স.) আল্লাহর বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দৃষ্টান্ত প্রদান করেছেন কী ভাবে একাটি জাতি অশান্তি ও বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শত শত যুগ অতিবাহিত করার পর আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করে একটি উন্নত ও সুরক্ষিত জাতীয় জীবন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল । আজও মানব সমাজকে শান্তি প্রাপ্তির জন্য একমাত্র রসুল(সঃ)-এর দ্বারস্থ হতে হবে।  আজও এ অশান্ত সমাজে  শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে বুঝতে হবে মানব সৃষ্ট আইন ও আল্লাহর আইনের পার্থক্য। আল্লাহর আইনের সৌন্দর্য অনুধাবন ও তা প্রয়োগের প্রচেষ্টা মানব সমাজের সদস্য হিসেবে প্রতিটি মুমিনের মৌলিক ও প্রধান দায়িত্ব। 
প্রথমেই দেখা যাক আইন বলতে কী বুঝায়।
“পাশ্চাত্য আইন তত্ত্বে (Western Jurisprudance) যে সমস্ত আদেশ মানুষ পালন করিতে বাধ্য এবং যাহা না করিলে তাহাকে বিরূপ প্রক্রিয়ার শিকার হইতে হয় এবং যে গুলি আদালত কার্যকরী করেন, সেই সমস্ত আদেশকে আইন বলা হয়।” (৩)
আইনতত্ত্ববিদদের মতে, আইন তাকেই বলা হয় যা প্রচলন ও পালনে বাধ্য করেন সার্বভৌম রাষ্ট্র শক্তি অর্থাৎ তা-ই আইন যা সকলে পালন করতে বাধ্য এবং যা পালন না করলে শাস্তি পেতে হয়। (৪)
মানব সমাজে আইনের প্রচলন একটি ক্রমিক ধারার পরিণতি। রাষ্ট্র চিন্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,  মনুষ্য সৃষ্ট আইন যা বাস্তব আইন (Positive Law) সমাজ বিবর্তনের পরিণত ধারায়  সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেখতে পাই সপ্তদশ শতক পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় আইনের পেছনে এক মৌল বা স্বাভাবিক আইনের অস্তিত্বকে মনীষীরা স্বাভাবিক ভাবেই স্বীকার করে নিয়েছেন। জেসুইট রাষ্ট্র নৈতিক চিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ফ্রানসিসকো সুয়ারেজ (১৫৪৮- ১৬১৭)। তাঁর বিশ্বাস ‘সমস্ত প্রকৃতি জুড়ে এবং মানুষর স্বভাবে এমন কতগুলি নীতি বিদ্যমান যা কোন ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত আচরণের প্রেরণা, আবার কোন ক্ষেত্রে অন্যায় আচরণের প্রেরেণা। সুতরাং, ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ঈশ্বরের খেয়াল খুশীর ফলশ্রুতি বলে তিনি মনে করেন না।এ পার্থক্য যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।’
হুগো গ্রটিয়াসের (১৫৮৩-১৬৪৫) মতে ‘বিচ্যুতিহীন শাশ্বত সত্যই স্বাভাবিক আইন।’ স্বাভাবিক  আইনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “ স্বাভাবিক আইন হল নির্ভুল যুক্তির নির্দেশ, যা নির্দেশ করে কোন আচরণ যুক্তিসিদ্ধ স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ কি না। সুতরাং, নৈতিক ভিত্তি বা নৈতিক প্রয়োজনীয়তা এর অন্তর্নিহিত উৎকর্ষ, এর পরিণতি স্বরূপ এরূপ আচরণ প্রকৃতির স্রষ্টা ঈশ্বরের দ্বারা নিষিদ্ধ বা অনুমোদিত হয়। (৫)  
সুয়ারেজ যে স্বাভাবিক আইনকে ভগবৎ নির্দেশ বলে বর্ণনা করেন, গ্রটিয়াস তাকে যুক্তির নির্দেশ বলে অভিহিত করেন। গ্রটিয়াস দুই ধরনের আইনের কথা বলেছেন - স্বাভাবিক আইন ও স্বতঃস্ফুর্ত আইন  (Voluntary Law)। তিনি স্বতঃস্ফুর্ত আইনকে মানবিক নির্দেশ বা ভগবৎ নির্দেশ  হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন এবং রাষ্ট্রীয় আইন (civil Law) মানবিক আইনের অন্তর্ভুক্ত এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তিই তার স্রষ্টা।
স্কটল্যান্ডের বুদ্ধিজীবী জর্জ বুকানন (১৫০৬- ১৫৮২)-এর মতে আইন শৃঙ্খলাবিহীন পাশব জীবন থেকে মুক্তিলাভের প্রেরণাই সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা সৃষ্টির মূল কারণ। মানুষের শারীরিক অস্তিত্ব যেমন স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল, তেমনি সুবিচার (Justice)  অব্যাহত রাখার মধ্যেই সমাজের সার্থকতা। আইন-ই সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং, শাসক মূলতঃ অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হলেও জ্ঞানের ক্রমবিকাশের সঙ্গে তার এই ক্ষমতা আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ে। প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণই হল আইনের স্রষ্টা। 
আদিম যুগের মানুষ কি করে শৃঙ্খলাযুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘প্রকৃতির রাজ্য” এবং “সামাজিক চুক্তি” এই দু’টি বিশ্লেষণ মূলক কাঠামোর কথা এসেছে। হবসের প্রকৃতির রাজ্য (state of nature) সমাজ বা রাষ্ট্রের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। প্রকৃতির রাজ্য ছিল তার অনুমিত প্রকল্প (Hypothesis).
হবস স্বীকার করেন যে প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ শান্তি চাইলেও তা পায় না, কারণ অপরকে সে বিশ্বাস করে না।এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা  তার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র (Internal court)।  তিনি দেখেছেন যে, অধিকাংশ মানুষ নিজেদের সুবিধার জন্য সাধারণ আইন মেনে নেবে। যেহেতু সাধারণ আইন ভঙ্গ করাটাও কিছু সংখ্যক লোকের কাছে সুবিধা জনক, তাই মানুষের সুখ ও নিরাপত্তার জন্য বল প্রয়োগকারী সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেন। তিনি স্বাভাবিক আইনের সাহায্য বর্জন করে কৃত্রিম ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এই কৃত্রিম ব্যবস্থাই হল তার সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন  রাষ্ট্র।  তিনি মনে করেন, আইনের উৎস সার্বভৌম কর্র্তৃপক্ষ।
হবসের সমসাময়িক জন লক (১৬৩২-১৭০১) মনে করেন, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ পরিচালিত হত স্বাভাবিক আইনের দ্বারা। এই স্বাভাবিক আইন ছিল যুক্তির শাসন। লক মনে করেন, প্রকৃতির রাজ্য ছিল প্রাক্ সামাজিক অপেক্ষা অধিকতর প্রাক্ রাজনৈতিক । আর প্রাক্ রাষ্ট্রনৈতিক জীবনেও মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ মুক্ত ছিল না। প্রত্যেকেই যুক্তি ও অনুশাসন মেনে চলতো। এই যুক্তির অনুশাসনকে তিনি স্বাভাবিক আইন আখ্যা দিয়েছেন। 
প্রবৃত্তির তাড়নায় যুক্তি বিরোধী আচরণের দ্বারা মানুষ যখন স্বাভাবিক আইন ভঙ্গ করে তখন শুরু হয় সংগ্রামের রাজত্ব। লক বলেন, প্রকৃতির রাজ্যে স্বাধীনতা সুখ শান্তি এবং শৃঙ্খলা বিরাজ করলেও তিনটি কারণে তা আদর্শ অবস্থায় ছিল না। কারণ আদিম মানুষের স্বাভাবিক আইন সম্পর্কে ধারণা ছিল অস্পষ্ট। স্বাভাবিক আইন ব্যাখ্যা করা ও বলবৎ করার কোন সংস্থা ছিল না। লকের মতে স্বাভাবিক অধিকারকে সুরক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্র নৈতিক সমাজের সৃষ্টি হয়।  তাঁর মতে মানুষ যখন রাষ্ট্রনৈতিক সমাজ গঠনে প্রবৃত্ত হয় তখন তাদের প্রথম কাজ হল আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সৃষ্টি করা। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সমাজের দ্বারা সংসদের হাতে অর্পিত হয়েছে বলে এ ক্ষমতা অন্য কারও হাতে অর্পণ করার অধিকার সংসদের নেই।
সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ক্রমবিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আইনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসী দার্শনিক জাঁ বোদা(১৫৩০-১৫৯৬) । বোঁদা মনে করেন, মানুষের সম্পর্ক স্বাভাবিক আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁর মতে, ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য যার দ্বারা নির্ধারিত, তাই স্বাভাবিক আইন। তাঁর মতে যুক্তি (Reason) রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক । সম্ভবতঃ যাকে তিনি যুক্তি বলেছেন তা হল স্বাভাবিক আইন।  তিনি স্বাভাবিক আইন ও নৈতিক আইনকে অভিন্ন মনে করেন । তিনি যুক্তি ও নৈতিক আইনকে রাষ্ট্রের ভিত্তি মনে করেন। আইন প্রণয়নে তাঁর অভিমত, সার্বভৌমের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের আইন। আর সার্বভৌমিকতা হল তার মতে -‘নাগরিক এবং প্রজাদের উপরে রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা যা, আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়।’
বোঁদা সার্বভৌমিকতাকে স্বৈরচারিতা  থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। আর তাই তিনি সার্বভৌমিক ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক আইন ও স্বাভাবিক আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “যদি আমরা সার্বভৌমিকতা বলতে Legibus Omnibus Soluta বুঝি, তা হলে কোন শাসকই সার্বভৌম নয়, কারণ সকলেই ঐশ্বরিক আইন, স্বাভাবিক আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য।” সার্বভৌমিকতার এই ধারণা থেকে বোঁদা কখনও বিচ্যুত হননি। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতা ঐশ্বরিক আইন এবং স্বাভাবিক আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। যা স্বাভাবিক আইন  বা ঐশ্বরিক আইন  নয় এমন কতকগুলি চিরন্তন নিয়মাবলীর দ্বারা তিনি সার্বভৌম ক্ষমতা (Legibus Soluta) সীমাবদ্ধ করতে আগ্রহী হলেও কার্যত ব্যর্থ হন।(৬)
ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের  প্রয়োজনে  পশ্চিমা আইনের উৎস ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উপরোল্লিখিত আলোচনার পাশা পাশি ইসলামী আইনের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা প্রয়োজন।  তা হলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে কেন ইসলামী অইন মানবতার জন্য কল্যাণকর । 
ইসলামী আইনতত্ত্ববিদগণের মতে আল্লাহ ও মানুষের চুক্তি হচ্ছে আইনের উৎস। অর্থাৎ সৃষ্টির আদিকালে আল্লাহ তা’আলা মানুষের সাথে একটি প্রাথমিক চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তিতে মানবকুলের রূহ সমূহ আল্লাহর আনুগত্যের শপথ নিয়েছিল । আর আল্লাহ মানুষের “রব” হিসেবে তাদের প্রতিপালন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আল্লাহ তা’আলা চুক্তি অনুযায়ী এক সুসংবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেছিলেন। মানুষের আল্লাহকে রব মানা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চুক্তির মধ্যে হতেই উদ্ভুত হয়েছে আল্লাহর আইন। 
ইসলামী আইনের উৎস আল্লাহ ও মানুষের মাঝে চুক্তি, পশ্চিমা আইনের উৎস সার্বভৌম তথা রাষ্ট্রের সাথে প্রজার চুক্তি। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী হবস মনে করেন শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে সার্বভৌমের প্রতিষ্ঠা করে। যে চুক্তির দ্বারা রাষ্ট্রের সৃষ্টি, সেই চুক্তির দ্বারা সার্বভৌম সমাজস্থ সকল ব্যক্তিকে আদেশ দেবার অধিকার অর্জন করে। এই সার্বভৌমের আদেশই আইন যা মেনে চলতে প্রজারা বাধ্য। 
পশ্চিমা আইনবেত্তাদের মতে যুক্তি (Reason) ই হল রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য  আইনের নিকটতম উৎস। কিন্তু ইসলামী আইনের উৎস শুধু যুক্তি নয়, বরং মানুষের মানসিক  বৃত্তি সমূহ যখন যুক্তির আলোকে প্রদীপ্ত হয় তখন সে সুস্থ ভাবে বিশ্বের দিকে তাকালে এক মহাজ্ঞানী স্রষ্টা ও মালিকের সন্ধান খুঁজে পায়। এই আল্লাহ যে বিধান সমূহ ওহীর মাধ্যমে পেশ করেন, আর তা -ই ইসলামী আইনের উৎস। যেখানে পশ্চিমা আইনের উৎস যুক্তি, সেখানে ইসলামী আইনের উৎস যুক্তির ঊর্ধ্বে ঈমানের মধ্যে সূচিত হয়ে ওহীর মাধ্যমে নাজিলকৃত আইন ইসলামী আইন রূপে পরিগণিত হয়। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ