ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা এম. আফলাতুন কায়সার

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন : এম. আফলাতুন কায়সার। জন্ম  ১৯৩০ ঈসায়ী ওফাত : ৭ জুন ২০১৭ ঈসায়ী, ১১ রমজান ১৪৩৮ হিজরী, বুধবার  সকাল ১১.৩০ টায়/ ঘটিকায়। পিতা- মুন্সী মতিউর রহমান, মাতা- জোবাইদা খাতুন, পিতামহ- মনসুর আলী প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। মাওলানা এম. আফলাতুন কায়সার চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার মুসাপুর নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম ও প্রসিদ্ধ কায়সার বংশে এ মহান আধ্যাত্মিক বুযুর্গ ও সর্বজন স্বীকৃত, অনুকরণীয়, অনুস্বরণীয় এবং বরণীয় আলিম জন্ম গ্রহণ করেন। (পৈতৃকবাড়ি বর্তমানে সাগর গর্ভে বিলীন) ১৯৮৩ সাল থেকে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত বাড়ি # ৫, লেন # ১২, ব্লক # আই, পোস্টঃ হাউজিং এস্টেট, থানাঃ  হালিশহর, জেলা: চট্টগ্রাম-৪২১৬ এই ঠিকানায় বসবাস করতেন। তিনি একাধারে সাধক, গবেষক, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ভাষাবিদ, প-িত, দক্ষ সংগঠক, ইসলামী চিন্তাবিদ, জ্ঞানতাপস, ধৈর্যশীল খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ও আলিম সমাজের উজ্জ¦ল নক্ষত্র ছিলেন। তিনি ইসলামী সাহিত্য ও জ্ঞান-গবেষণা আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক পুরোধা হিসাবেই অধিক খ্যাত। এই আলিম ও ইসলামী চিন্তাবিদ এবং সাধক পুরুষ শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে অনেক সুখ্যাতি অর্জন এবং প্রভূত অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সংক্ষিপ্তাকারে তাঁর অবদান এবং পরিচিতির সার সংক্ষেপ তুলে ধরাহল।
এম. আফলাতুন কায়সার শৈশবেই শিক্ষার সূচনা হয় গৃহশিক্ষক মৌলবী বজলুর রহমানের নিকট আরবী অক্ষর জ্ঞান লাভ করেন একই সাথে তিনি স্থানীয় গুরুদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে উক্ত ওস্তাদের অনুপ্রেরণায় তিনি গ্রামের জিয়াউল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে ১৯৪৮ সালে সুয়াম জামায়াত শেষ করে তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস কোর্স সুসম্পন্ন করেন। দেওবন্দের পড়াশুনা শেষে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালে তিনি লাহোর চলে যান সেখানে শাহ আলম মার্কেটস্থ তাজবীদুল কুরআন মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ক্বারী ফজলুল করিমের নিকট ইলমে তাজবীদের শিক্ষা গ্রহণ করেন। অত:পর তিনি পানজাব ইউনিভার্সিটির অধীনে ওরিয়েন্টাল কলেজ থেকে প্রাইভেটে মৌলবী ফাজেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন। এভাবে দেওবন্দে ৫ বছর এবং লাহোরে ৪ বছর প্রবাস জীবনের অধ্যয়ন শেয়ে ১৯৫৬ সালে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আর শিক্ষা জীবনের পাশপাশি তিনি (দেওবন্দ) সাংগঠনিক কার্যক্রমেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় জমিয়ত তালাবার বাংলা শাখার পরিচালক হিসেবে জনাব কায়সার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। দারুল উলুমে পড়াশুনার শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব অধিষ্ঠিত ছিলেন।
দেওবন্দের পাঠ শেষে লাহোরে পৌঁছেই শাহ আলম মার্কেটস্থ তাজবীদুল কুরআন মাদরাসায় কিতাব বিভাগের সিনিয়র ওস্তাদ পদে নিয়োগ লাভ করেন। একই সময়ে তিনি লাহোরে রেলওয়ে হেডকোয়ার্টার জামে মসজিদের খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন। অত:পর শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে দেশে ফিরে প্রথমেই তিনি সন্দ্বীপ কাজীরখিল মাদ্রাসায় হেড মাওলানা পদে যোগদান করেন। দুই মাস পর নোয়াখালীস্থ বশিকপুর সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট পদে নিয়োগ পেয়ে সন্দ্বীপ ত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি লক্ষ্মীপুরস্থ রায়পুর আলীয়া (কামিল) মাদরাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগ দেন। নিরবচ্ছিন্ন ৩৬ বছর উক্ত মাদরাসায় হাদীসের খেদমত শেষে ১৯৯৪ সালে উপাধ্যক্ষ হিসেবে তিনি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, সুদীর্ঘ কর্মজীবনে জনপ্রিয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলোচক হিসেবে তিনি দেশজুড়ে নন্দিত হন।
দেওবন্দের পড়াশোনা শেষে তিনি মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীর (র:)-এর নিকট তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ লাভ করেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত বিনয়ী, নম্র-ভদ্র, সদালাপী, মিষ্টভাষী, নিরহংকারী, ও স্বল্পভাষী। তিনি যাবতীয় বিদা’আত ও কুসংস্কারের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইরাক সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে জনাব কায়সার পবিত্র হজ্ব পালন এবং ইরাক সফরের সুযোগ পান। পুনরায় ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ হজ্ব মিশনের সদস্য হিসেবে তিনি দ্বিতীয়বার পবিত্র হজ্ব পালনের সৌভাগ্য লাভ করেন।
তিনি সুলেখক ও গবেষক এবং অসংখ্য বইয়ের রচয়িতা তাঁর লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী হচ্ছে:
মাওলানা মওদূদী (র:) রচিত হুকুকুয্ যাওযাইন শীর্ষক ঊর্দু কিতাবের প্রথম বঙ্গানুবাদ স্বামী-স্ত্রীর অধিকার নামে ১৯৮০ সালে ইসলামিক পাবলিকেশন্স ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।
আধুনিক প্রকাশনী ঢাকা কর্তৃক ৬ খন্ডে প্রকাশিত সহীহ আল বুখারী শরীফের বঙ্গানুবদে তৃতীয় ও ষষ্ঠে খন্ডে তিনি কাজ করেন।
৩. বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার  ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত সহীহ মুসলিম শরীফের পূর্ণ বঙ্গানুবাদ (মুকাদ্দামায়ে মুসলিমসহ) তিনি সুসম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার প্রকাশিত তিরমিজি শরীফ ও আবু দাউদ শরীফের বঙ্গানুবাদের বিভিন্ন খন্ডে তিনি কাজ করেন।
জন্ম নিন্ত্রয়ণ ও ইসলাম শীর্ষক গ্রন্থ রচনা, প্রকাশক এমদাদিয়া কুতুবখানা ঢাকা।                                                            
মিশকাত শরীফ (৭ম থেকে ১১শ খন্ড) প্রকাশক- এমদাদিয়া লাইব্রেরী ঢাকা।
আসমাউল রিজাল, প্রকাশক  এমদাদিয়া লাইব্রেরী- ঢাকা।
৮. বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষবোর্ড কর্তৃক দাখিল, আলিম ও ফাজিল ক্লাসের মিশকাত শরীফের নির্ধারিত সিলেবাসের অনুবাদ, প্রকাশক আশরাফিয়া লাইব্রেরী, চৌমুহনী, নোয়াখালী।
মীযানুল আখবার এর বঙ্গানুবাদ, প্রকাশক- আশরাফিয়া লাইব্রেরী, চৌমুহনী, নোয়াখালী।
১০. খুৎবাতুল আহকামের বঙ্গনুবাদ ও খুৎবায়ে ইবনু নুবাতা (বার চাঁদের খুৎবা) এর বঙ্গানুবাদ, প্রকাশক  আশরাফিয়া লাইব্রেরী, চৌমুহনী, নোয়াখালী।
১১. কা’বা থেকে কারবালা শীর্ষক গ্রন্থ রচনা (একটি ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও পবিত্র হজ্বের লেখচিত্র) প্রকাশক- জেনুইন পাবলিশার্স, চট্টগ্রাম। এছ্াডাও মাওলানা আফলাতুন কায়সার ঢাকার দৈনিক আজাদ ও মাসিক পৃথিবী ঢাকায় নিয়মিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক কর্ণফুলীতে প্রতি শুক্রবার জুমাবার শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয় কলাম লেখেন যা বিপুলভাবে পাঠক নন্দিত হয়। ১৯৯৬ সালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি অব্যাহতভাবে লেখালেখি করেন। এরপর অসুস্থতা জনিত কারণে আর কোন সৃজনশীল কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। জনাব কায়সারের দীর্ঘ লেখক জীবনে নিম্নোল্লিখিত গ্রন্থাবলি প্রকাশিত হয়।
১৯৫৬ সালে সন্দ্বীপের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদের প্রথমা কন্যা বেগম নুরজাহান এর সাথে তিনি শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ হন। জনাব কায়সার ৪ কন্যা ও ৪ পুত্র সন্তানের জনক। ২য় পুত্র ঃ মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ, অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। ও ৩য় পুত্রঃ হাফেজ মোহাম্মদ মাহবুব কায়সার, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  সন্তান সন্ততিদের মধ্যে বাকী সবাই উর্চ্চ শিক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেন।
লেখক : পি.এইচ.ডি. গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ