ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমরা সমুদ্র তলদেশ থেকে মহাকাশে চলে গেছি -শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার ঢাকায় গণভবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় বক্তৃতা করেন -পিআইডি

# মানুষের চোখ খুলে গেছে সময় খুব বেশি নেই
# ভোট চুরির বদনাম নিতে চাই না
# বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের উন্নয়নের কথা জনগণের মধ্যে তুলে ধরতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামীলীগ সভাপতি ও  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, গত ৯ বছরে আমরা সমুদ্র তলদেশ থেকে মহাকাশে চলে গেছি। বাংলাদেশ এখন স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য। এটা আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। এসবই জনগণকে জানাতে হবে।
আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ খুবই হিসাবি। কেউ দুর্নীতি করলে তারা তা ভুলে যায় না। মানুষের চোখ খুলে গেছে। সময় খুব বেশি নেই।
গতকাল শনিবার দুপুরে গণভবনে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বেলা ১১টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এ সভা শুরু হয়। সভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম, কার্যনির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও দফতর সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, এতো উন্নয়নের পরও যদি জনগণ ভোট না দেয় তাহলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দায়ী থাকবেন। কারণ তখন বুঝতে পারবো ক্ষমতায় থাকতে আপনি জনগণের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। টাকার বিনিময়ে কাজ করেছেন। এ কারণে জনগণ আপনাদেরকে ভোট দেয়নি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি করে কেউ ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়, কেউ যেন নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে না পারেন। আমরা ভোটচুরির বদনাম নিতে চাই না। জনগণের মন জয় করে তাদের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে।
 শেখ হাসিনা বলেন, যারা অন্যদলের লোকজনকে দলে ভেড়াচ্ছেন তারা মনে রাখবেন, যাদের দলে ভেড়াচ্ছেন তারা আপনার আপন লোক নয়। এরা মামলা থেকে বাঁচতে অথবা মধু খাওয়ার জন্য দলে ভিড়ছে। এরাই কিন্তু দলের বদনাম করবে। সুতারাং ওদের সম্পর্কে সচেতন থাকুন। ওরা কোনোদিনই আপনাদের আপন হবে না। দলের যে লোকজনকে আপনারা অবহেলা করছেন তারাই আপনার আপন লোক।
 শেখ হাসিনা বলেন, যাকে প্রার্থী করা হবে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। প্রার্থী পছন্দ হোক আর না হোক নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে। নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলা না হয়।
তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করেছেন। তার পরে তাকে হত্যা করা হলো। পরিবার হারিয়ে আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে আমার পরিবার। এখানে আমি বাবা-মায়ের আদর ও ভাইবোনের ভালবাসা পেয়েছি।
তিনি বলেন, একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা ভাবনা থাকবে কীভাবে আমরা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারি। নিজের ভাগ্য নয়, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনেই আমাদের কাজ করতে হবে।
প্রার্থী হতে গিয়ে কেউ আওয়ামী লীগের বদনাম করলে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি বিষয় লক্ষ করছি, কেউ কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রার্থী হয়ে গেছেন। প্রার্থী হয়ে তারা বিএনপির লুটপাট-সন্ত্রাসের কথা বলে না, তাদের বক্তব্যে এসে যায় আমার আওয়ামী লীগের এমপির বিরুদ্ধে, সংগঠনের বিরুদ্ধে।’
তিনি বলেন, প্রার্থী হওয়ার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু প্রার্থী হতে গিয়ে আমার দলকে বদনামে ফেলবে, এটা কোনও মতেই মেনে নেবো না। এটা সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। আমার সরকার উন্নয়নের কাজগুলোর কথা না বলে কোথায় কার বিরুদ্ধে কী দোষ আছে, সেটা খুঁজে জনগণকে যারা বলবেন, তারা কখনও আওয়ামী লীগের নমিনেশন পাবেন না। এটা পরিষ্কার কথা। আমি এগুলো কিন্তু রেকর্ড করছি। যারা দলের বিরুদ্ধে বদনাম করবে সে কী বোঝে না যে এতে তার ভোটও নষ্ট হবে। ১০ বছর সরকারে থাকার পর যদি কেউ দলের বিরুদ্ধে বদনাম করে তাহলে জনগণ তো তাকেও ভোট দেবে না। এটা হলো বাস্তবতা।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডের কথা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। বলতে হবে আমরা এই কাজ করছি, এই কাজ করবো। ভোটের রাজনীতি করতে গেলে নিজ এলাকায় আমাদের উদ্যোগের মানুষকে বলতে হবে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসা মানেই যে জনগণের দুর্ভোগ তা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।’
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সামনে নির্বাচন, নির্বাচন মানেই তা চ্যালেঞ্জিং হবে। এটা কিন্তু আমাদের জন্য একটানা তৃতীয়বার। এই তৃতীয়বারের নির্বাচনে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে, দেশের জনগণ কিন্তু খুবই হিসাবী। কেউ দুর্নীতি করলে তারা তা ভুলে যায় না। কাজ করতে গিয়ে টাকা দেবে আর ভোট চাইতে গেলে বলবে টাকা দিয়ে কাজ নিছি ভোট দেবো কেন? জনগণের চোখ কিন্তু খুলে গেছে। সময় খুব বেশি নেই। পুরনো কেউ নমিনেশন পাবেন কিনা তা নির্ভর করবে আপনার এলাকায় কতটুকু জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারলেন আর কতটুকু তৃণমূলকে মূল্যায়ন করলেন, তার ওপর।
 শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে, সেই চিন্তা নিয়ে কাজ করতে হবে। কে কী পেলাম না পেলাম সেই হিসাব না করে, দেশের জন্য কী করতে পারলাম, আগামীকে কী করবো সেটা মাথায় রেখে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জোট করেছি, মহাজোট করেছি। দলের স্বার্থে এটা করতে হয়েছে। আগামীতেও আমরা এটা করবো। আমরা বন্ধু হারাবো না। সবাইকে নিয়েই থাকতে চাই। এজন্য যতটুকু আত্মত্যাগ করতে হবে তা করবো। বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বটা এক্ষেত্রে বেশি।’
বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘যারা নাকি জুয়া খেলে অর্থ উপার্জন করে, সেই জুয়াড়ু, মাদকসেবী, এতিমের অর্থ আত্মসাৎকারী, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তারা কেন ভোট পাবে? সেই দল কেন ভোট পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর তো আমি পাই না। যদি বিএনপি-জামায়াত, যুদ্ধাপরাধী ক্ষমতায় আসে তাহলে এই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে উন্নয়ন আমরা করেছি তা থেকে পিছিয়ে লুটপাট করে খাবে।’
পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে টেনে সরকারপ্রধান বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। দোষারোপ করেছিল। একজন সুদখোরের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে মার্কিন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে এই পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করে দিলো। তারা আমাদের দুর্নীতির বিষয়ে দোষারোপ করতে চেয়েছিল। আমি চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, বলেছিলাম, আমরা দুর্নীতি করে নিজের ভাগ্য গড়তে ক্ষমতায় আসিনি। জনগণের ভাগ্য করতে এসেছি। বললাম কী দুর্নীতি তার প্রমাণ দিন। ওই দুর্নীতির প্রমাণ দিতে গিয়ে বেরুলো বিএনপির মন্ত্রীর দুর্নীতির তথ্য। অবশেষে কানাডার কোর্ট রায় দিতে বাধ্য হয়েছে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সব অভিযোগ ভুয়া ও মিথ্যা। তারা কোনও দুর্নীতির প্রমাণ দিতে পারিনি।’
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ঘোষণা দিলাম নিজেরাই পদ্মা সেতু করবো। বিশ্বব্যাংকের থেকে টাকা নেবো না। অনেক বাধা এলো। কিন্তু আমি সাহস পাই বাংলার জনগণের ওপর। ভরসা করি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ওপর। অনেকেই বলেছেন, এটা সম্ভব নয়। বললো, বিশ্বব্যাংক ছাড়া এটা হবেই না।’ ভালোভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে তিনি এ সময় সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
 শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি গঠনতান্ত্রিকভাবে দুর্নীতিকে দলের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেেেছ। দুর্নীতিকেই তারা তাদের গঠনতন্ত্রে নিয়ে এসেছে। তাদের নীতিটাই হচ্ছে- এটা (দুর্নীতিকে) আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা।
এসময় তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বিএনপির গঠনতন্ত্রে ছিলো- কেউ যদি দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে চেয়ারপারসন হতে পারবে না। তারা এই গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে দুর্নীতিবাজকে রাখতে সেই ব্যবস্থা করছে। এর মাধ্যমে নিজেরাই স্বীকার করেছে- তাদের দলটি দুর্নীতির দল। এই ধরনের দুর্নীতির দল ক্ষমতায় থেকে দেশের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধভাবে ক্ষমতায় গিয়ে গঠিত দল জনগণকে কিছু দিতে পারে না। তারা চুরি করতে পারে। এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে আজ তাদের নেত্রী জেলে। আবার জেলে যাওয়ায় তার অবর্তমানে এমন একজনকে চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগ করলো, যে দুই-দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ