ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে দ্রুত সুবিধায় চলাচলের বাহন মোটরসাইকেল

* দেশে ৩০ দশমিক ০৮ লাখ  মোটর যান রয়েছে
* প্রতিদিন সারা দেশে নতুন মোটরসাইকেল নামছে ১ হাজার ৫৫টি ও ঢাকার রাস্তায় ২৭১টি
মুহাম্মদ নূরে আলম : রাজধানীতে দ্রুত চলাচলের সুবিধাজনক বাহন মোটরসাইকেল। যানজটের মধ্যেও  গতি এনেদিয়েছে মোটরসাইকেল। দেশে ৩০ দশমিক ০৮ লাখ মোটর যান রয়েছে। প্রতিদিন সারা দেশে নতুন মোটরসাইকেল নামছে ১ হাজার ৫৫টি ও ঢাকার রাস্তায় ২৭১টি । রাজধানী ঢাকার রাস্তায় চলতে গিয়ে ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে গেলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়া বাহনটির নাম মোটরসাইকেল। আবার বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই বাহনের আধিক্য চোখে পড়ে। সব ধরনের ক্রেতার চাহিদার কারণে দেশে দ্রুত বাড়ছে মোটরসাইকেলের ব্যবহার। দেশে বাজাজ, টিভিএস, হিরো, হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, মাহিন্দ্রা ও কিছু চীনা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল আমদানি করে আমদানিকারকেরা। অন্যদিকে রানার, যমুনা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল দেশে তৈরি হয়। সব মিলিয়ে ১৫টি প্রতিষ্ঠিত মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড দেশের বাজারে আছে। মোট বাজারের ৮৬ শতাংশ আমদানিকারকদের দখলে, বাকিটা দেশীয় উৎপাদকদের দখলে। আমদানি করা মোটরসাইকেলের বেশির ভাগ আসে ভারত ও চীন থেকে। দেশীয় উৎপাদকেরা ইঞ্জিন বাইরে থেকে আমদানি করে বাকি সব উপকরণ দেশে তৈরি করে।
একই সঙ্গে পণ্যটির বাজারও দিন দিন বড় হচ্ছে। জাতীয় সংসদে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও পুলিশ ট্রাফিক বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, দেশে ৩০.০৮ লাখ মোটর যান রয়েছে। এরমধ্যে, ৩৯,৯৪৫ টি বাস, ২৭,১১৮টি মিনিবাস, ১,১৯,৮০৪টি ট্রাক, ৪,৬৬৪টি লরী ও ৩,১০,৮২১টি ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। মোটর সাইকেল সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪-১৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস নামে। তবে সেই অবস্থা কাটিয়ে গত দুই বছরে আবার চাঙা হয়ে উঠেছে এ খাত। ২০১৭ সালে দেশে আড়াই লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। অর্থাৎ গত বছর গড়ে মোটরসাইকেলের বিক্রিতে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজের মোটরসাইকেল। ডিসকভার, পালসারের মতো পুরোনো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সঙ্গে বাজাজ সম্প্রতি বাজারে এনেছে অ্যাভেঞ্জার ও ভি নামের দুটি নতুন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বাজাজের নতুন দুটি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কিনতে অগ্রিম ক্রয়াদেশ দিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে বাজাজ মোটরসাইকেলের একমাত্র পরিবেশক দেশীয় প্রতিষ্ঠান উত্তরা মোটরস। প্রতিষ্ঠানটির অফিস সূত্রে জানাযায়, ‘মানের কারণে ক্রেতার এক নম্বর পছন্দ বাজাজের মোটরসাইকেল। দেশের আনাচেকানাচে সব জায়গায় বাজাজের বিক্রেতা, পরিবেশক ও সেবাকেন্দ্র আছে। আমাদের যন্ত্রাংশও বাজারে খুব সহজলভ্য। এসব কারণেই বাজাজ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছে।’
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে শুধু রাজধানীতেই ৩২ হাজার ৫৬২টি নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংখ্যাটির গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন ২৭১টি নতুন মোটরসাইকেল নামছে ঢাকার রাস্তায়। রাস্তাজুড়ে বাস, রিকশা, কার, হিউম্যান হলারসহ নানা বাহন। ধারঘেঁষে হাত দেড়েক ফাঁকা জায়গা। ড্রেনের কারণে কোথাও কোথাও আরো সংকুচিত। এটুকুর মধ্যেই চলছে মোটরসাইকেল। ‘ওস্তাদ, বায়ে মোটরসাইকেল’ সহকারীর (হেলপার) এ সতর্কবাণী বাসচালকের কানে না পৌঁছাতেই ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক মোটরসাইকেল। রাজপথ থেকে অলি-গলি, ঢাকার সব সড়কেই একই চিত্র।
রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়ত মানুষের সঙ্গে পাল্লাদিয়ে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। সেই যানবাহনের বড় একটি অংশ এখন যোগ হয়েছে মোটরসাইকেল। কারণ রাজধানীতে পাবলিক পরিবহনের সংকট এবং যানজটের কারণে প্রায় সবাই এখন মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছে। আর সময় বাচাঁতে পরিবারের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে একই মোটরসাইকেলে চলতে দেখাগেছে।
মহানগর পুলিশ প্রশাসন ও বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর সড়কগুলোতে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করার ব্যবস্থা রয়েছে এর ১০ গুণ বেশি যানবাহন চলে। যার অধিকাংশ এখন মোটরসাইকেল দখল করে নিয়েছে। বিআরটিএর মোটরযান নিবন্ধন তথ্যভা-ারের হিসাব বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ঢাকায় নিবন্ধিত হয়েছে ৩২ হাজার ৫৬২টি মোটরসাইকেল। অর্থাৎ প্রতি মাসে ৮ হাজার ১৪০ আর প্রতিদিন ২৭১টি করে নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন নিয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে নিবন্ধন পেয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৪টি মোটরসাইকেল। সে হিসাবে দেশে প্রতিদিন ১ হাজার ৫৫টি নতুন মোটরসাইকেল রাস্তায় নেমেছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ঢাকা মহানগরে বিভিন্ন ধরনের মোট ৫৬ হাজার ২৫১টি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে রাজধানীর সড়কপথে দৈনিক ৪৬৮টি নতুন যানবাহন যোগ হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে নিবন্ধন হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৩৪টি যানবাহন। নিবন্ধন পাওয়া যানবাহনের সিংহভাগই মোটরসাইকেল।
মার্কেট রিসার্চ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন মোটরসাইকেলের বাজারের আকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১১০ সিসি (ঘন সেন্টিমিটার) ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল। এই ক্ষমতার মোটরসাইকেলের বাজার অংশীদারত্ব মূল্যের দিক দিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ। দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এবং কম তেলে বেশি পথ চলার সুবিধার কারণে এই শ্রেণির মোটরসাইকেল ক্রেতাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। এ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ১৫০ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল। এটির বাজার অংশীদারত্ব প্রায় ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে ১২৫ থেকে ১৩৫ সিসি ক্ষমতার মোটরসাইকেলের বাজার অংশীদারত্ব প্রায় ১৭ শতাংশ।
গণপরিবহনের স্বল্পতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, যানজটের ভোগান্তি এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা থাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মোটরসাইকেল। সারা দেশের সড়কগুলোয় প্রতিদিনই বাড়ছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে শুধু রাজধানীতেই ৩২ হাজার ৫৬২টি নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংখ্যাটির গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন ২৭১টি নতুন মোটরসাইকেল নামছে ঢাকার রাস্তায়। বিশ্ব বিখ্যাত অ্যাপভিত্তিক পাবলিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান উবার ও পাঠাও রাইড সেবায় যুক্ত হয়ে দুই চাকার বাহনটির চাহিদা-জনপ্রিয়তা ও সংখ্যা আরো বাড়ছে। তবে ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির এ প্রবণতাকে রাজধানীর পাবলিক যানবাহনের সংকট ও যানজটের বিকল্প বলছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীতে ‘পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলার জন্য প্রায়ই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়।
 মোটরসাইকেল চালকদের কে কিছুটা ছাড় দিয়েদেন ট্রাফিক সার্জেন্টরা। রাজধানীর পল্টনমোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের এ বলেন, রাস্তায় সবচেয়ে বেশি আইন ভাঙেন মিনিবাস চালকরা। সিগনাল দিয়ে যান চলাচল আটকে রাখলেও তারা ফাঁক গলে বেরিয়ে যান। দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।। যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) একজন কর্মকর্তা বলেন, আইন না মানার কারণে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মিনিবাস চালকের বিরুদ্ধে মামলা দিই। এসব যানবাহন যেন রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আমরা নিরলস কাজ করছি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি হাঁটার গতির চেয়েও কম। অপ্রতুল সড়কে যানবাহনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় মোটরসাইকেলকে সহজলভ্য করতে সরকারকে নতুন করে ভাবার পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের জানায়, সড়কে বিশৃঙ্খলার কথা বলি বা নিরাপত্তার কথা সবকিছুর জন্য গাড়ীর বেপরোয়া গতি হুমকিস্বরূপ। এটা আমাদের গণপরিবহন খাতের জন্য অনেক ক্ষতির কারণ। কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশ মোটরসাইকেলের কারণে সমস্যায় ভুগছে। আমরাও সে পথেই হাঁটছি। বিশেষজ্ঞরা একতলা ছোট মিনিবাস কে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে শুধু রাজস্ব আয়ই দেখছেন।
রাজধানীর ফার্মগেট থেকে পান্থপথ, গুলিস্তান, পল্টন, মালিবাগ, মগবাজার ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, রামপুরা, মৌচাক, বাড্ডা, কুড়িল, গাবতলী, শ্যামলী থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত এলাকায় এই প্রতিবেদক গত তিনদিন সরেজমিনে গিয়ে মিনিবাস বেপরোয়া চালানোর চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখা গেছে, পুলিশের সামনেই দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছেন মিনিবাস চালকরা। রাজধানীতে যানজট থাকার কারণে তীব্র হর্ন দিয়ে দুরন্ত গতিতে ফুটপাতের ওপর দিয়েই চলাচল করে অনেক সময় মোটরসাইকেল। কোন কোন তরুণ চালক আঁকাবাঁকা করে দ্রুত গতিতে বাইক চালাচ্ছে। আবার চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে দ্রুত ঝুঁকি নিয়ে চলে যাচ্ছেন। এভাবে চলাচলের কারণে অন্যান্য যানবাহনের পাশাপাশি প্রতিদিনই ঘটছে বাস ও মোটর বাইকের দুর্ঘটনা।
 মজার ব্যাপার হলো, কয়েকটি পুলিশের বাইকে নেই কোন নম্বর। শুধু পুলিশ লেখা আছে। এসব বাইকে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অনেক। নাম্বার ছাড়া বাইক চালানো কয়েক জন চালক বলেন, দেখেন, পুলিশের বাইকে কোন নাম্বার নেই। যারা নিয়ম-কানুন বাস্তবায়ন করবে তাদের বাইকে নেই, তাহলে সাধারণ মানুষের বাইকে থাকবে কিভাবে। ভিআইপি সিগন্যালও মানছিল না এক বাইক চালক। দুই দফা পুলিশের বাধায় তাকে আটকানো হয়। সুযোগ পেলেই ফাঁক-ফোকড় দিয়ে দ্রুত টান দিয়ে চলে যান বাইক চালকরা।
সময় বাঁচাতে নিয়মের বাইরে চলাচল করছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। সিগন্যালে দীর্ঘ সময়েও যখন ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা মেলে না, তখন তারা একটু এদিক সেদিক দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সুযোগমতো বাইক উঠিয়ে দেন ফুটপাতে। পথচারীরা বলছেন, যে কোনো সভ্য দেশেই ফুটপাত পথচারীদের হাঁটার জন্য। এছাড়া নগরীর অনেক ফুটপাত আবার ভাঙ্গা, চলাচলের অনুপযোগী। তাই পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়েই চলাচল করছেন। বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) সূত্রে জানাযায়, চলতি বছরের মধ্যে বাজাজ ছাড়াও টিভিএস, হোন্ডা ও হিরো দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে। দেশে উৎপাদিত হলে মোটরসাইকেলের দাম আরও কমানো সম্ভব হবে। তবে এ জন্য সরকারকে কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ও কর কমিয়ে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। তাদের সব মিলিয়ে ৩৮ শতাংশ কর দিতে হয়। দেশীয় ব্র্যান্ড রানার এই হারে তাদের কাঁচামাল আমদানি করে। যারা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনসহ সব যন্ত্রাংশ আলাদা এনে দেশে সংযোজন করে, তাদের ৮৯ শতাংশ কর দিতে হয়। বাজাজ, টিভিএস, হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল সাধারণত এ পদ্ধতিতে দেশে আমদানি করে বিক্রি করা হয়। আর যারা সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানি করে, তাদের সব মিলিয়ে ১৫১ শতাংশ কর দিতে হয়। জাপানি ব্র্যান্ড ইয়ামাহা, সুজুকির মোটরসাইকেল এ পদ্ধতিতে দেশে আমদানি করা হয়। এ জন্য এসব ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের দাম বাজারে সবচেয়ে বেশি। মোটরযান অধ্যাদেশ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, রাস্তায় বা জনগণের চলার জায়গায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। যদি কেউ জনগণের স্বাভাবিক চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাকে জেল, আর্থিক জরিমানা অথবা জেল ও জরিমানা উভয়ই করতে পারবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
মিরপুরের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা তাহমিনা বলেন, সকালে বাসা থেকে বের হলেই দেখা মেলে অসহনীয় যানজটের। কর্মস্থলে যেতে বাসে ওঠা নিয়ে করতে হয় রীতিমতো যুদ্ধ। বাসে উঠতে না পারলে অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এরপর অতিষ্ট হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটা। যানজটের কারণে অনেকে মাঝপথে বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেন। হঠাৎ তার মনে এলো পাঠাও মোটরবাইককের কথা, কল করা মাত্র পাঠাও বাইক এসে হাজির। যানজটময় ঢাকায় অনেক সহজ করে দিয়েছে মোটরবাইক। রাজধানীর কাওরান বাজারের হোটেল সোনারগাঁও সিগন্যালে কথা হয় বাইকচালক মনিরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তায় পুলিশের ব্যবহার দেখে মনে হয়, এই শহরে মোটরসাইকেল চালকেরা সবাই তো আর বেপরোয়া চালায় না ?। তাদের হয়রানি করা হয় সব সময়। অথচ রাস্তায় সবচেয়ে বেশি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বাস, লেগুনা, সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহন। এসব যানবাহন রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করাচ্ছে। এটা দেখার কেউ নেই। রমনা এলাকায় দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অনেকেই ফুটপাত দিয়ে অবাধে মোটরসাইকেল চালায় পুলিশও। তবে যারা এ কাজ করেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও আছে। ধরা পড়লে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলাও করা হয়। এ বিষয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’য়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণকে সবার আগে সচেতন হতে হবে। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এদিকে রাজধানীতে কত মোটরসাইকেল আছে তার সঠিক হিসাব না থাকলেও ডিএমপি বলছে, ঢাকায় নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের চেয়ে দ্বিগুণ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৫১১টি। এর মধ্যে ২০১০ সাল পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ২১ হাজার ৮১টি। ২০১১ সালে ৩৪ হাজার ৭০৮টি। ২০১২ সালে ৩২ হাজার ৮১০টি। ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ৩৩১টি। ২০১৪ সালে ৩২ হাজার ৮৯৪টি। ২০১৫ সালে ৪৬ হাজার ৭৬৪টি এবং ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৯২৩টির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। মোটরসাইকেলের বিক্রি এত বৃদ্ধির পরও বাংলাদেশে বাহনটির ব্যবহার ভারত, পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক কম। জাপানের বহুজাতিক ব্র্যান্ড ইয়ামাহার গবেষণা অনুযায়ী, এ দেশে প্রতি ১৬১ জনে একজন মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। ভারতে প্রতি ২০ জনে একজন, আর পাকিস্তানে প্রতি ১৭ জনে একজনের মোটরসাইকেল রয়েছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মোটরসাইকেলের ব্যবহার আরও বেশি। এ তিন দেশে প্রতি চার থেকে পাঁচজনে একজনের মোটরসাইকেল রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ৩ লাখ ৩২ হাজার মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিআরটিএর হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ নিবন্ধিত মোটরযান আছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৮ লাখের বেশি। ২০০৬ সাল থেকে নিজস্ব কারখানায় মোটরসাইকেল তৈরি করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস। ৫০ থেকে ১৫০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সবচেয়ে বেশি চলে রানারের ৮০ থেকে ১০০ সিসির মোটরসাইকেলগুলো। দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নেপালের বাজারে মোটরসাইকেল রপ্তানি শুরু করেছে রানার অটোমোবাইলস। রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারে ২০১৭ সালে বেশ ভালো ব্যবসা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ