ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এরদোগান নাকি অন্য কেউ?

এরদোগানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাররেম ইনজি

২৩ জুন, আইরিশ টাইমস : সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যদি কেউ ইস্তাম্বুলের হাইওয়েতে ড্রাইভিং করে থাকেন, তবে তিনি এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে আজ রোববারের তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী কেবল একজনই কেবল একজনই আর তিনি হচ্ছেন রজব তৈয়ব এরদোগান।

বহুতল ভবন থেকে শহরের অলি-গলিতে কেবল এরদোগানের বিশাল আকারে সব বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছে। এসব বিল বোর্ডের শিরোনামে লেখা রয়েছে, ‘তুরস্ক একজন বড়মাপের শক্তিশালী নেতা চায়।’

আনাতোলিয়ান জেলার মেট্রোপলিটান শহরের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা রাস্তায় ৪৫ মিনিটের ড্রাইভিংয়ে কেবল এরদোগানের বিলবোর্ডই চোখে পড়বে। টেলিভিশনের স্যুইচ অন করুন এবং সেখানেও ফের এরদোগান।

গত পাঁচ বছরে তুরস্কে ৫টি নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু রবিবারের পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন আগের সব নির্বাচন থেকে অনেকটাই ভিন্ন আর সেটা হচ্ছে তুরস্কের ভবিষ্যত এখন পরিষ্কারভাবে একজন ব্যক্তির হাতে চলে যাবে।

গত ১৫ বছরে এরদোগানের অধীনে একে পার্টি একটি সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সহ ইসলামিক স্টেট ও কুর্দি সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করেছে। লাখ লাখ জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য অগণিত শহর, উপশহর ও জেলা প্রতিষ্ঠা করেছে।

শহরের উন্নয়ন

ইস্তাম্বুলের ইউকুডারের আবাসিক জেলাটি অন্য শহরের তুলনায় সবেচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি আধুনিক শহরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। শহরের জরাজীর্ণ ও সংকীর্ণ রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যা সহ অসংখ্য সমস্যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।

অলিন অর্নিক নামে শহরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘১৯৯০ এর দশক থেকে ইউসকুডারের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা এখন রান্নার কাজে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার করে থাকি। ৯০এর দশকে এটি এখানে ছিল না।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন অবকাঠামোর নির্মাণ এবং পরিবহন সুবিধা এখানকার মানুষদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ এনে দিয়েছে।’

প্রায় ৮০ মিলিয়ন পাউন্ট ব্যয়ে তুরস্কের বৃহত্তম মসজিদ, অত্যাধুনিক চালকবিহীন মেট্রো লাইন এবং ৩৬৫ মিটার উঁচু টিভি টাওয়ারসহ অত্যাধুনিক সব রেস্টুরেন্ট নির্মাণ ইউসকুডারকে উন্নয়নের কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিনত করেছে।

কিন্তু রবিবার এরদোগান সম্ভবত প্রধান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রথমবারের মতো তুরস্কের বিরোধী দলগুলো একতাবদ্ধ হয়েছে। মুহাররেম ইনস এবং আইয়ি পার্টির নেতা মেরাল আকসেনার নতুন দুই মুখ প্রেসিডেন্ট এরদোগানের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বি।

বিভিন্ন দল ও অন্যান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত ‘জাতীয় জোট’ প্রত্যাশা করছে, এটি পার্লামেন্টে একে পার্টির সংখ্যাগুরিষ্ঠতা কেড়ে নিতে পারবে। একই সঙ্গে জোটটি পার্লামেন্টরি সিস্টেম পুনর্বহাল করারও স্বপ্ন দেখছে।

এরদোগানের বিজয় দেশটির মসনদে একজন নতুন নির্বাহী প্রেসিডেন্টের আগমন ঘটাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাকে বিলুপ্ত করবে।

নির্বাচনে এরদোগানের প্রধান হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক স্কুল শিক্ষক ইনস। বৃহস্পতিবার ইজমিরে হাজার হাজার সমর্থকদের একটি সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন। এই সমাবেশকে বলা হচ্ছে চলতি বছরে বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। তিনি টেলিভিশনের বিতর্কে বার বার এরদোগানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট তা সর্বদা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি

একে পার্টির অধীনে, বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি কয়েক বছরের মধ্যে ডবল পরিসংখ্যানে পৌঁছেছে। এটি তুরস্কের বিরোধীদের জন্য ভাল সুযোগ এনে দিয়েছে।

এছাড়াও, গত গ্রীষ্মে আঙ্কারা থেকে ইস্তাম্বুল পর্যন্ত ‘জাস্টিস মার্চ’ নামে বিরোধী সিএইচপি’র লংমার্চ দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। একই সঙ্গে এটি হাজার হাজার এরদোগান বিরোধীদেরও একত্রিত করেছে।

যদি বিরোধী দলীয় ‘ন্যাশনাল জোট’ এরদোগান ও তার জাতীয়তাবাদী সমর্থক এমএইচপি’র পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নিতে পারে এবং এরদোগান যদি দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে বাধ্য হন, তবে তার অপরাজেয়তার আভা অনেক দূরে সরে যেতে পারে।

এবং এটা সত্য যে, একে পার্টি অতীতে যখন কোনো সমস্যায় পতিত হয়েছে, তখন এটি আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে।

২০১৫ সালের নির্বাচনে দলটি যখন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হন, তখন এটি রক্ষণশীল ইসলামি দলের সমর্থন নিয়ে তার অবস্থানকে দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছিল। 

দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার জন্য নির্বাচন আহ্বান সত্ত্বেও আজ রোববারের ভোটে এরদোগান নিজেকে বরং একটি কঠিন অবস্থানে খুঁজে পেতে পারেন। সর্বশেষ জনমত জরিপে সেটাই পূর্বাভাস দিচ্ছে।

 ‘সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগরেস’ নামে একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের পরিচালিত জরিপে দেখানো হয়েছে, এরদোগানের একে পার্টি এবং জাতীয়তাবাদী এমএইচপি জোট সুস্পষ্টভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাচ্ছেন।

জরিপ অনুযায়ী, ৪২.৬ শতাংশ ভোটার এরদোগানের একে পার্টি কিংবা জাতীয়তাবাদী এমএইচপি’র পক্ষে তাদের ভোট প্রদানের পরিকল্পনা করছেন।

জরিপের এই ফলাফল এরদোগানের জন্য একটি বড় পরাজয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে এরদোগানের একে পার্টি এককভাবে ৪০.৮৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে, বর্তমানে তার জোটের অংশ এমএইচপি ১৬ শতাংশেরও কিছু বেশি ভোট পেয়েছিল।

এই নির্বাচনী ফলাফল তুর্কি প্রেসিডেন্টকে আরেকটি দলের সমর্থন খোঁজার এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য একটি বৃহত্তর জোট গঠন করতে বাধ্য করে।

চারটি প্রধান বিরোধী দল- সিএইচপি, আইয়ি, এসপি এবং ডিপি- একত্রে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা একত্রে এখনো পর্যন্ত ৩২.৮ শতাংশ ভোট পাচ্ছেন বলে জরিপে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে, কুর্দি সমর্থিত ও এরদোগান বিরোধী ‘এইচডিপি’ পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য বাধ্যতামূলক ১০ শতাংশ ভোট পেতে যাচ্ছেন বলে দেখানো হয়েছে।

২০০২ সাল থেকে তুরস্ককে শাসন করা এরদোগানের জন্য জরিপের এই ফলাফল একটি বড় ধরনের ধাক্কা।

এই নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট আরো বেশি কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

এই সাংবিধানিক পরিবর্তন অনুযায়ী, আইন প্রবর্তনের ক্ষমতা পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত থাকলেও প্রেসিডেন্ট কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই মন্ত্রিসভা নিয়োগ করতে সক্ষম হবেন। গত বছরের গণভোটে তুর্কি নাগরিকরা এই পরিবর্তনকে অনুমোদন করেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ