ঢাকা, রোববার 24 June 2018, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুষ্টিয়ায় বাঁশ ও বেত শিল্প বিলুপ্তির পথে ॥ কর্মীদের পেশা পরিবর্তন

বাঁশের তৈরি মাছ ধরার ফাঁদ (চাঁই) বিক্রির ছবিটি কুমারখালী রেল বাজার থেকে তোলা হয়েছে

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) : সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যের বাঁশ ও বেত শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ শিল্পের সঙ্গে যেসব শ্রমিক জড়িত তারা আজ পেশা পাল্টাতে শুরু করেছেন। এ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকরা বর্তমান বাজারের প্লাাস্টিক ও অন্য সব দ্রব্য সামগ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে নির্বিকার হয়ে পড়েছেন। ফলে এ শিল্পের ঐতিহ্য হারানোর পাশাপাশি জেলার বাঁশ বেত শিল্পীদের ভাগ্যে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন।
 জেলার খোকসা উপজেলার শমোসপুর গ্রামের সন্ধ্যা দাস জানান, প্রয়োজনীয় বাঁশ বেতের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমাদের বংশাণুক্রমে পাওয়া বেঁচে থাকার একমাত্র কর্ম। এক বেলা খেতে পেলে অন্যবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। তবুও ১ ছেলে ও ৩ মেয়ে নিয়ে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছি। মেয়ে রানী দাস (১০) জানান, সংসারের অভাবের জন্য স্কুলে যেতে পারি না। সবাই যখন স্কুলে যায় তখন আমার খুব খারাপ লাগে। আমারও স্কুলে যেতে ইচ্ছে হয়।
এক সময় এ জেলার প্রতি ঘরে ঘরে বাঁশ বেতের তৈরি সামগপ্রীর খুব কদর ছিল। কিন্তু এখন সেসব পণ্য আর চোখে পড়ে না বললেই চলে। ব্যবহারকারীর অভাব ও বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাঁশ বেত শিল্পের নারীরা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। হাতেগোনা কয়েকজন নারী অনেকটা নিরূপায় হয়ে এ পেশায় টিকে থাকার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়ার কুলা, খাঁচা, চালনি, চাটাই, ডোল, খাদি, ঝুড়ি, পলো, দিয়ার, হাতপাখা, ঝাঁটা, টোপা, ডালা, মোড়া, প্রভৃতি বাঁশজাত পণ্যের দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক চাহিদা ছিল।
এদিকে প্রতিবছর কোনো নিয়ম না মেনেই হাজারো বাঁশ কাটা হচ্ছে। অথচ সে অনুপাতে বাঁশের জন্ম হচ্ছে না। কয়েক বছর আগে মাঝারি ধরনের যে বাঁশ ১৭০-২০০ টাকায় পাওয়া যেত বর্তমানে সেই বাঁশের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০-৩০০ টাকায়। কিন্তু বাঁশজাত দ্রব্যের মূল্য সে অনুপাতে বাড়েনি। গ্রামাঞ্চলে ২০ বছর আগেও বিশাল বড় বড় বাঁশঝাড় দেখা যেত। কিন্তু এখন তা আর চোখে পড়ে না। কারণ বাঁশঝাড় উজাড় করে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বসবাসের জন্য বাড়ি-ঘর। অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ন হওয়ার ফলে নগরে গড়ে উঠছে বড় বড় দালান। সেই দালান যদিও ইট, বালি, পাথর, রড, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হচ্ছে তবুও নির্মাণ কাজে বাঁশ ব্যবহারের বিকল্প না থাকায়, ব্যাপকহারে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে নির্মাণ কাজে।
বর্তমানে বাঁশের গুঁড়ি শিকড়সহ উঠিয়ে কুষ্টিয়ার অনেক ইটের ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে বাঁশের মুড়া ও শিকড় খুবই কার্যকর। ফলে এর গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ইটের ভাটাগুলোয়। বৃক্ষ নিধনের ওপর আরোপিত বিধি-নিষেধের পাশাপাশি ইটভাটায় বাঁশ ব্যবহারে বিধি নিষেধ আরোপিত হলেও তা না মানায় মূল্যবান সম্পদ বাঁশ ধীওে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এর খেসারত চরমভাবে দিচ্ছেন বাঁশ বেত শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীরা। ফলে তারা হতাশ হয়ে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাঁশ বেতের কাজ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও বিসিক কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো ভূমিকাই নিচ্ছেন না। সব মিলে জেলার সবখান থেকে হারিয়ে চলেছে বাঁশ ও বেত শিল্প।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ