ঢাকা, সোমবার 25 June 2018, ১১ আষাঢ় ১৪২৫, ১০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাংক খাতের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গ

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দ উচ্চ সুদের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। বস্তুত ব্যাংক ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশের মতো উচ্চ মাত্রায় সুদ আদায়ের নজির বিশ্বের আর কোন দেশে নেই। প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর সুদের হার ৬ শতাংশ ও সার্ভিস চার্জ নমনীয় পর্যায়ে রাখা হলেও আমাদের দেশে ঠিক এর বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। দেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার দাবি জানালেও বিদ্যমান সুদের হার ১৬ থেকে ২১ শতাংশের মধ্যে উঠানামা করছে যা কোন মতেই কাম্য নয়। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের কারণে একদিকে যেমন দেশে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না, অন্যদিকে চলমান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্প্রসারিত করা যাচ্ছে না। ফলে সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের পথ। এছাড়া ঋণের উচ্চ সুদের কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এতে আমদানি করা পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়েছে, যা মেনে নেয়া যায় না। ব্যাংক ঋণ শিল্পবান্ধব না হওয়ায় ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যাংক, সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়লেও এ ব্যাপারে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দিব্যি থাকেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরাও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান। এ কারণেই তাদের উপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব শিথিল কিনা- এ প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।
এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দ মনে করেন, মুষ্টিমেয় দলবাজ স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিশৃঙ্খলা চলে আসছে যা অর্থনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা লুটপাটকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন তারা। দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় রাখার জন্য তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দাবির বাস্তবায়ন করা অতি জরুরি। উল্লেখ করা যায় যে, গত মার্চ মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত ‘আর্টিকেল ফোর মিশন’ সম্পন্ন করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ মিশনের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে চলতি মাসের ৮ তারিখে সংস্থাটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলোÑ শক্তিশালী প্রবিধান, কঠোর নজরদারি ও সুশাসন নিশ্চিত করা। বিরাজমান শৃঙ্খলা ও সুশাসনের ঘাটতি কাটিয়ে উঠে ব্যাংকিং খাতকে অবশ্যই গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর তা না হলে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের কাজ বাধাগ্রস্তই থেকে যাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। এ জন্য যাবতীয় অনিয়, অব্যবস্থাপনা, দলবাজি, জালিয়াতি, কমিশনবাজি, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী সরকারের বিগত সাড়ে ৯ বছর ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন সংকট চলছে, সম্প্রতি যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ খাতে জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ধারাবাহিকতায় বেসিক ব্যাংক থেকে অন্তত সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেংকারী এখনো আলোচিত-সমালোচিত। এর সাথে যোগ হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি। এগুলোর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ব্যাংক নতুন নতুন অনিয়ম অব্যবস্থা, জালিয়াতি, ল্টুপাট ও দুর্নীতির জন্ম দিচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। এ প্রেক্ষাপটে এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দের দাবি মোতাবেক প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পাশাপাশি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংক লুটেরাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা বড় প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ