ঢাকা, সোমবার 25 June 2018, ১১ আষাঢ় ১৪২৫, ১০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

একদলীয় সংসদের পথেই যাত্রা

আশিকুল হামিদ : নিয়ম এবং সংবিধানের নির্দেশনা মেনে চলার নামে ক্ষমতাসীনরা আবারও একটি একদলীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথেই যাত্রা শুরু করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক অঙ্গনের ধারণা ও আশংকাকে সত্যায়িত করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দিন কয়েক আগে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে কিছু পরিবর্তন ঘটবে। হুবহু বর্তমান সরকার থাকবে না। নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে আগামী অক্টোবর মাসে। তফসিল ঘোষিত হওয়ার পরপর গঠন করা হবে নতুন এক সরকার। সে সরকারের নাম হবে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। পরিকল্পিত এই সরকার সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ওই সরকারে মন্ত্রী অনেক কম থাকবেন। অর্থাৎ ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ আকারে ছোট হবে। অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়ে দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদেও শেখ হাসিনাই বহাল থাকবেন এবং ওই সরকারের সবকিছুই থাকবে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে।
নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, কোনো বিশেষ দল অংশগ্রহণ করলো কি করলো না তা নিয়ে তারা চিন্তিত নন। কারণ, আগামী নির্বাচনে অনেক বেশি দল অংশ নেবে এবং সকল অর্থেই সে নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রসঙ্গক্রমে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে নির্দলীয়, তত্ত্বাবধায়ক বা অস্থায়ী ধরনের কোনো সরকার গঠনের বিধান বা ব্যবস্থার সুযোগ সংবিধানে নেই। সুতরাং নির্বাচন হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ছোট আকারের নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে। সব দলের জন্যই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। কোনো বিশেষ দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসার জন্য সংবিধানের বাইরে গিয়ে বা সংবিধান লংঘন করে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না।
ওবায়দুল কাদেরের পরপর, গত ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই ধরনের কথা ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানিয়েছেন। ফলে আবারও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বলা বাহুল্য, এই আলোচনার পেছনে রয়েছে বর্তমান ‘নির্বাচিত’ জাতীয় সংসদ। প্রসঙ্গক্রমে ইতিহাস স্মরণ করতেই হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে ‘ঝেঁটিয়ে’ বিদায় করেছিল- যে ব্যবস্থাটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের ‘ফসল’ ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের উদ্যোগে সংসদে গৃহীত ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের মার্চে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল।
১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় গেলেও আওয়ামী লীগ কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সে সময় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভবত ভাবতেই পারেননি যে, পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে তার দলের ভরাডুবি ঘটবে। ভাবতে না পারার কারণ, নির্বাচনের আগে তার সরকার এমনভাবেই প্রশাসনকে সাজিয়ে গিয়েছিল, যাতে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসতে পারে। অন্যদিকে সেবার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই শেখ হাসিনার সরকার জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। একই কারণে ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ঘটেছিল লজ্জাকর পরাজয়। ওই নির্বাচনের পর বেগম খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী মন্ত্রিত্ব নিয়েছিল। দলটির আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং মহাসচিব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হয়েছিলেন।
শোচনীয় সে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ক্ষোভ সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওদিকে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাও জনগণের স্বার্থে এমন কোনো ভূমিকা পালন করেননি, যার কারণে জনগণ আবারও তাকে ক্ষমতায় আনার কথা চিন্তা করবে। ২০০৬ সালের নির্ধারিত নির্বাচন এগিয়ে আসার পরিপ্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি প্রতিটি জরিপেই বরং আওয়ামী লীগের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হচ্ছিল। তখনই শুরু হয়েছিল ষড়যন্ত্র। সে ষড়যন্ত্রের ফলেই ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার ভয়াবহ হত্যা-সন্ত্রাস থেকে নির্বাচন বাতিল করাসহ তথাকথিত ওয়ান-ইলেভেন ঘটেছিল। সবই সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে ঘটানো হয়েছিল। জেনারেল মইন উ আহমেদ ও ড. ফখরুদ্দিন আহমদকে সামনে রেখে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্রকেই শুধু বিদায় করা হয়নি, সবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যে নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছিল তার মাধ্যমেও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলা যায়, মূলত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার এবং বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী দলগুলোকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ওই নির্বাচন ছিল বড় ধরনের একটি ভয়ংকর পদক্ষেপ।  
বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে কতটা ন্যক্কারজনকভাবে হারিয়ে দেয়া হয়েছিল সে কথা স্মরণ করলে যে কেউ এখনো, এতদিন পরও বিস্মিত ও স্তম্ভিত না হয়ে পারেন না। তা সত্ত্বেও মূলত বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য থেকে বিএনপি ও  জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে বিরোধী দলের নেত্রীর আসনও গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে প্রকৃত ফলাফল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল বলেই আওয়ামী লীগ সরকার এগিয়েছিল বাঁকা পথে- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর ভর করেছিলেন। ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট হাই কোর্টের তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়ার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হয়েছিল। সে আপিলের রায়ের মূলকথা নিয়ে এখনো বিতর্কের অবসান হয়নি। কারণ, সে রায়টি একদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, অন্যদিকে বিতর্কিত হয়েছে স্ববিরোধিতাপূর্ণ হিসেবে। কেন না, রায়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়নি, একথাও বলা হয়েছিল যে, ‘দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে’ পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাছাড়া এটা ছিল একটি বিভক্ত রায়। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সাত সদস্যের মধ্যে কতজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন এবং তারা ঠিক কি অভিমত দিয়েছিলেন সেকথাও এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে। বড় কথা, রায়ের নামে যা ঘোষণা করা হয়েছিল তা আসলে ছিল একটি ‘সংক্ষিপ্ত আদেশ’, পূর্ণাঙ্গ রায় নয়। পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো সাংবিধানিক বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু সরকার সে পদক্ষেপই নিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় বলেছিলেন, সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার নাকি ‘আর কোনো সুযোগ নেই’! বলা দরকার, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে জুড়ে দেয়া অভিমতটুকুর উল্লেখই করেননি- যেখানে বলা হয়েছিল, ‘দেশের শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে’ পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
অমন একটি সংকীর্ণ এবং নিজেদের স্বার্থ পূরণকারী চিন্তার ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান যুক্ত করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করিয়েছিল। রাজনৈতিক সংকটের শুরুও হয়েছিল সেখান থেকেই। বিএনপির নেতৃত্বে জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো প্রথম থেকেই ওই সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে। উল্লেখ্য, ততদিনে ১৮ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। কিছুদিন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানালেও বেগম খালেদা জিয়া এক পর্যায়ে ছাড় দিয়ে বলেছিলেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং শেখ হাসিনা ওই সরকারের প্রধান হতে পারবেন না।
২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর ১৮ দলীয় জোটের নেতারা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটকে মধ্যস্থতা করার এবং একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা থেকে সরকারকে নিবৃত্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। জবাবে রাষ্ট্রপতি তার ‘সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার’ কথা শুনিয়ে বলেছিলেন, ১৮ দলীয় জোটের দাবি ও বক্তব্য তিনি সরকারের কাছে পৌঁছে দেবেন! এর পরপর প্রধানমন্ত্রী একদিকে হঠাৎ করে সংসদের চলমান অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটিয়ে সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন বিধান যুক্ত করার পথ বন্ধ করেছিলেন, অন্যদিকে সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির কথিত অনুমতি পাওয়ার খবর জানিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিলেন। আরো কিছু পন্থায়ও রাষ্ট্রপতিকে বিতর্কিত করেছিলেন তারা।
স্মরণ করা দরকার, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের নেতারা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটকে রাষ্ট্রের প্রধান ‘অভিভাবক’ এবং ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করে সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। লিখিত বক্তব্যে তারা বলেছিলেন, রাাষ্ট্রপতি যাতে অবিলম্বে সংঘাত, হানাহানি ও হিংস্রতার পথ পরিহার করে সংলাপের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সরকারকে তাগিদ দেন। সরকার যাতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে এবং সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয় তার জন্য উদ্যোগ নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সংসদ তখনও বহাল থাকায় রাষ্ট্রপতি যে কোনো সময় অধিবেশনও আহ্বান করতে পারতেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তেমন কোনো উদ্যোগ নেননি। আর সে সুযোগ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন। এর পরই আয়োজিত হয়েছিল এমন এক নির্বাচন, যে নির্বাচনে ১৫৫ জনই বিনা ভোটে ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন!
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতির ‘সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা’ সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গভবনে যাওয়ার এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটের কাছে দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া শুধু সদিচ্ছারই প্রমাণ দেননি, দেশপ্রেমিক প্রধান জাতীয় নেত্রীর ভূমিকাও পালন করেছিলেন। কারণ, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার হুবহু পুনর্বহালের দাবি পরিত্যাগ করার পাশাপাশি অনেক আগেই তিনি অন্য এমন সব বিষয়ে ছাড় দিয়েছিলেনÑ যেগুলোকে অজুহাত বানিয়ে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক সংকটের সমাধানকে অসম্ভব করতে এবং বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাতে পারতেন। খালেদা জিয়া শুধু একটি বিষয়ে অনড় থেকেছেন। সেটা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার সম্পর্কিত। এ সরকারের রূপরেখায় তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধানের পদে শেখ হাসিনাকে রাখা চলবে না। বিষয়টি নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে যে কোনোস্থানে সংলাপে বসার ব্যাপারেও সম্মতি জানিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়েছিলেন তার একতরফা নির্বাচনের নীলনকশা অনুযায়ী। বিদেশীদের পরামর্শ ও আহ্বানের জবাবেও প্রধানমন্ত্রী অনড় অবস্থানেই থেকেছেন। মুখে সংলাপ ও সমঝোতার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী সে সময় ‘সর্বদলীয়’ সরকারের নামে নিজের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মহাজোট সরকারের সম্প্রসারণ করেছিলেন। রাশেদ খান মেনন প্রমুখ মন্ত্রী রাতারাতি আওয়ামী মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং আবারও মন্ত্রিত্ব গ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যেন সত্যিই কোনো ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী! এই চেষ্টা অবশ্য সফল হয়নি। কারণ, কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দিলেও ক্ষমতাসীনরা দেখাতে পারেননি, প্রধানমন্ত্রীর ওই ‘সর্বদলীয়’ সরকারের বিধান সংবিধানের ঠিক কোন অনুচ্ছেদ বা উপ-অনুচ্ছেদে রয়েছে। অর্থাৎ ‘সর্বদলীয়’ সরকারের ব্যাপারে তারা আসলে সংবিধান লংঘন করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যও গোপন থাকেনি। সে উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংবিধানবহির্ভূত এমন একটি ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠন করা, যার মাধ্যমে লোক দেখানো নির্বাচন করে আবারও ক্ষমতায় আসা যাবে। বাস্তবেও সেভাবেই ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা।
বর্তমান পর্যায়েও একই লক্ষ্যাভিসারী তৎপরতা শুরু হয়েছে- যে বিষয়ে পরিষ্কার করেছেন মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ, জনাব ওবায়দুল কাদের তার বক্তব্যে প্রশ্ন, সংশয় বা ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ রাখেননি। সবই তিনি খোলাসা করে দিয়েছেন। ফলে ধরে নেয়া যায়, তাদের পরিকল্পিত নির্বাচনকালীন সরকারের নেতৃত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই থাকবেন। হতে পারে, লোক দেখানোর এবং বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে কৌশল হিসেবে তারা মন্ত্রীদের সংখ্যা কমিয়ে দেবেন। একই কৌশলের ভিত্তিতে সরকারে এমনকি অন্য কয়েকটি দল থেকেও মন্ত্রী নেয়া হতে পারে।
তাই বলে তেমন সরকার কিন্তু সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে কোনো অবদানই রাখতে পারবে না। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনসহ সকল সংকটের পেছনেই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ঘনীভূত হয়ে উঠতে থাকা সংকটের দিনগুলোতে বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অন্য সব দাবির ব্যাপারে নমনীয়তা দেখালেও একটি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তত্ত্ববধায়ক বা নির্বাচনকালীন ধরনের যে নামেই গঠন করা হোক না কেন, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না। যুক্তি দেখাতে গিয়ে এবং কারণ ব্যাখ্যাকালে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার পদে বহাল রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার এই দাবি ও বক্তব্য সে সময় সকল মহলেই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সমর্থিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। প্রমাণিতও হয়েছে যে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকলে তার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা তাদের আগের অবস্থান থেকে এক চুল পরিমাণও নড়েননি। ফলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় জোট তো বটেই, এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং ইনু-মেননদের অতি ক্ষুদ্র দু’-চারটি নামসর্বস্ব দল ছাড়া উল্লেখযোগ্য ও জনসমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দলই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে তিনশ’ জনের মধ্যে ১৫৫ জনই ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি আসনগুলোতেও পাঁচ-সাত শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি।
এদিকে বিএনপির মতো ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দলগুলোকে নির্বাচনে নিয়ে আসার ব্যাপারে এতদিন পরও ক্ষমতাসীনদের মনোভাবে যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি, সে কথাটাই মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মাধমে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, এভাবে দেশকে রাজনৈতিক সংকটের কবল থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। কথিত কোনো নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার চিন্তা ও পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে ক্ষমতাসীনদের উচিত, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা এবং তাদের দাবি মেনে নেয়া। নির্বাচন যাতে ‘নির্দলীয়’ একটি সরকারের অধীনে হতে পারে তার ব্যবস্থা করা। সেটা করার পরিবর্তে নিজেদেরই সংশোধিত সংবিধানের দোহাই দিয়ে আরো একটি ৫ জানুয়ারির আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি শুভ হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ