ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নাইজেরিয়াকে হারিয়েই আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় রাউন্ডে তুলতে চান মেসি

আর্জেন্টিনার নাইজেরিয়া

স্পোর্টস রিপোর্টার : রাশিয়া বিশ্বকাপে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি গত আসরের রানার্স আপ আর্জেন্টিনা। মেসির দলটি এখনো নিশ্চিত নয় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারবে কিনা। অবশ্য এবারে বিশ্বকাপে ফেভারিটদের শুরুটাই ভালো হয়নি। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, রানার্স আপ আর্জেন্টিনা আর ফেভারিট ব্রাজিলের। দুই ম্যাচ খেলে এখনো নিশ্চিত হয়নি এই তিন দলের দ্বিতীয় রাউন্ড। তবে ব্রাজিল আর জার্মানি কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও আর্জেন্টিনার সামনে পথটা বেশ কঠিন। আর সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে আজ বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মাঠে নামছে মেসির আর্জেন্টিনা। দলটির প্রতিপক্ষ শক্তিশালী নাইজেরিয়া। এই ম্যাচে হারলেই রাশিয়া বিশ্বকাপ ছেড়ে দেশের পথে ছুটতে হবে রানার্স আপ আর্জেন্টিনার। আর দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে হলে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথমে জিততেই হবে। আর আজ আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই তার দলকে ফাইনালে তুলতে চান মেসি। শুধু এই ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে জিতলেই হবেনা। ক্রোয়েশিয়া-আইসল্যান্ডের ম্যাচের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে মেসিদের। ‘ডি’ গ্রুপের এই ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত বারটায়। অবশ্য একই সময়ে একই গ্রুপের আরো একটি ম্যাচ আছে। এই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হবে আইসল্যান্ড। ইতোমধ্যে ক্রোয়েশিয়া পরপর দুই ম্যাচ জিতে আগেই দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে। তবে এই ম্যাচে আইসল্যান্ড জয় পেলে কপাল পুড়বে আর্জেন্টিনার। তাই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে আজ প্রথম টার্গেট জয়ের বিকল্প দেখছেনা মেসির দল। অবশ্য পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছে আর্জেন্টিনাই। কারণ দুই দলের এ পর্যন্ত খেলা আটটি ম্যাচেই চারটি হয়েছে বিশ্বকাপে যার মধ্যে সবকটিতেই জয়ী হয়েছে শক্তিশালী আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালের পরে প্রথমবারের মত পরপর দুটি বিশ্বকাপের ম্যাচে জয়ের অপেক্ষায় রয়েছে নাইজেরিয়া। এই ম্যাচে টুর্নামেন্টের হট ফেবারিট আর্জেন্টিনা যেখানে বাঁচা মরার লড়াইয়ের মুখোমুখি সেখানে প্রতিপক্ষ নাইজেরিয়ান পরের রাউন্ডে যেতে হলে ড্র করলেই চলবে। তবে সেক্ষেত্রে আইসল্যান্ড যদি ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দেয় তবে সমীকরণ সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। তবে সবকিছুর পরেও নাইজেরিয়াও ভালভাবেই জানে মেসি জ্বলে উঠলে সেটা তাদের জন্য সমস্যাই বয়ে আনবে। যদিও দলের প্রস্তুতিতে মেসিকে আটকানোর সব ধরনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের ডিফেন্ডার উইলিয়াম ট্রুস্ট-একং। তিনি বলেন, এই প্রথমবার আমরা এমন একটি দলের বিপক্ষে খেলছি না যাদের সব খেলোয়াড়ই ভাল। আমরা আমাদের সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে ম্যাচে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করবো। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে আহমেদ মুসার করা দুই গোলে নাইজেরিয়ার জয় নিশ্চিত হয়েছিল। আর তারপর থেকেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগে মেসির পাশাপাশি মুসার নামও সকলের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে। আর পুরো বিষয়টি বেশ উপভোগ করছেন মুসা। বিশ্বকাপে টিকে থাকার  শেষ সুযোগের এই ম্যাচে পুরো বিশ্বের সাথে জাতীয় দলের সতীর্থরাও মেসির জ¦লে ওঠার অপেক্ষায় থাকবে। অবশ্য রাশিয়া বিশ্বকাপে শুরুটাই ভালো হয়নি মেসিদের। প্রথম ম্যাচে নবাগত আইসল্যান্ডের সাথে ১-১  গোলে ড্র ও তারকা সমৃদ্ধ ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্থ হয়ে আর্জেন্টিনার সামনে এখন পরাজয়ের শঙ্কা। টুর্নামেন্টের আগেই মেসিকে নিয়ে একটি আলোচনায় সরব ছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ কি মেসির জন্য সৌভাগ্যের বার্তা বয়ে আনবে কিনা। ফুটবলীয় ক্যারিয়ারে তার চির প্রতিদ্বন্ধী ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো পর্তুগালের জন্য ২০১৬ ইউরো শিরোপা উপহার দিয়েছেন। কিন্তু মেসি আধুনিক যুগের অন্যত সেরা খেলোয়াড় হওয়া সত্তেও জাতীয় দলের হয়ে বড় কোন সাফল্য এখনো হাতে পাননি। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের বিকল্প নেই। একইসাথে ইতোমধ্যেই নক আউট পর্ব নিশ্চিত করা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আইসল্যান্ড যেন কোন সাফল্য না পায় সেদিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বিধ্বস্ত হবার ম্যাচটি যেন কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ও কিংবদন্তী তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনা দলের প্রধান কোচ জর্জ সাম্পাওলি ও তার মেথড নিয়ে প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। এমনকি সারা বিশ্ব জুড়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এমন গুঞ্জনও   শোনা গেছে কোচের বিপক্ষে খোদ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রাই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। যদিও আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লডিও টাপিয়া পুরো বিষয়টিকে ভ্রান্ত ধারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আর্জেন্টাইন ফুটবল প্রধান বলেন, সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকরা অনেক শক্তিশালী। এটা ভুললে চলবে না যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তারা কাজ করে থাকে। তাদের হাতে সেই ধরনের ক্ষমতা আছে। তবে পুরো বিষয়টি একেবারেই মিডিয়ার তৈরি। তারা কোচিং স্টাফদের সরাসরি অনুশীলনে দেখতে পায়। পুরো দলের অনুশীলন তারা প্রত্যক্ষ করে। সেখানে তাদের চোখে অনেক কিছুই ধরা পড়তে পারে। কিন্তু আমি একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারি এ ধরনের কিছুই জাতীয় দলের মধ্যে ঘটেনি। এদিকে মেসি জানিয়ে দিয়েছেন,ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিতে চান আর্জেন্টিনা তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এখনও শেষ ষোলো নিশ্চিত হয়নি আর্জেন্টিনার। শেষ ষোলোতে যাওয়ার দোলাচলে দুলছে মেসির দল। এমন অবস্থায় বিশ্বকাপ জিতেই অবসর নেয়ার অঙ্গীকার করলেন মেসি। তিনি বলেছেন, ‘আমি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব কিছুই জিতেছি। কিন্তু শেষটাতে এসে আমি উচ্চাভিলাষী। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ না জিতে আমি ফুটবল থেকে অবসর নেব না।’ ২০১৪ বিশ্বকাপে একাই দলকে ফাইনালে তুলেন মেসি। কিন্তু ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ঐ বিশ্বকাপের ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপ জয়ের শেষ প্রান্তে এসে হতাশার চাদরে মুষড়ে পড়তে হয় মেসিকে। ২০১৪ আসরের ব্যর্থতার পর কোপা আমেরিকার শতকম টুর্নামেন্টের ফাইনালে চিলির কাছে ট্রাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বারের মত রানার্স-আপ হতে হয় আর্জেন্টিনাকে। ২০১৫ সালেও এই চিলির কাছে টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে  হেরেছিলো মেসির দল। এই ক্ষোভে ২০১৬ জাতীয় দল অবসরের ঘোষণা  দেন  মেসি। তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের অনুরোধে অবসর ভেঙ্গে আবারো আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরে আসেন মেসি। ফিরে এসে ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে বাঁধা খুড়িয়ে খুড়িয়ে পেরোতে হয় দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচে মেসির হ্যাট্টিকে ইকুয়েডরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট কাটে আর্জেন্টিনা। তারপরও বিশ্বকাপে ভালো করার ব্যাপারে আশাবাদি ছিলেন মেসি। কিন্তু নবাগত আইসল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে ড্র্র’ দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। অবশ্য ঐ ম্যাচে মেসি  পেনাল্টি মিস না করলে খেলার ফল অন্যরকম হতে পারতো। আইসল্যান্ডের সাথে ড্র’র পর ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে লজ্জার হার বরণ করে অর্জেন্টিনা। ঐ হারে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে যাবার পথ কঠিন হয়ে পড়ে মেসির দলের। তবে শেষ ষোলোতে যাবার পথ এখনো খোলা আছে তাদের। আজ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারাতেই হবে আর্জেন্টিনার। পাশাপাশি ‘ডি’ গ্রুপের অন্য ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে আইসল্যান্ডের হারতে হবে অথবা ড্র করতে হবে। তাই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী মেসি। আর্জেন্টিনাকে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ দেয়ার ইঙ্গিত দিলেন মেসি, ‘বিশ্বকাপ জয় আমার কাছে অনেক বড় কিছু। কারণ, আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ জয় বিশেষ একটা ব্যাপার। আসলে আমার কাছে এটা বিশেষ কিছু।’ আর্জেন্টিনার হয়ে একবার বিশ্বকাপ উঁিচয়ে ধরতে মরিয়া হয়ে আছেন মেসি। জন্মদিনের দিন তার বক্তব্য ওমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ‘বিশ্বকাপের ট্রফি উপরে তুলে ধরার স্বপ্ন আমি সব সময়ই দেখে আসছি। বিশ্বকাপ জেতার পর যে আনন্দের অনুভূতি হয়, সেটা অন্যদের মধ্যে দেখেছি। ঐ মূর্হুতটি নিয়ে ভাবলে আমার মাথার চুল দাঁড়িয়ে যায়। আমি বিশ্বের লাখ-লাখ আর্জেন্টাইনকে বিশ্বকাপের আনন্দ দিতে চাই। আমি সকলের এই স্বপ্নটা বিসর্জন দিতে পারি না।’ এদিকে নাইজেরিয়া কোচ গার্নট রোরও আশাবাদী শেষ ম্যাচে চাপে থাকা আজেন্টিনাকে হারিয়ে জয়ের। তাই আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই পরের পর্ব নিশ্চিত করবে তার দল। প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-০ গোলে হারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ঠিক একই ব্যবধানে আইসল্যান্ডকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সুপার ঈগলরা। তাই এখন আর্জেন্টিনাকেও হারানোর স্বপ্নে বিভোর গোটা নাইজেরিয়ান শিবির। সংবাদ মাধ্যমে কথা বলার সময় রোর বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে হারানোর জন্য আমাদের সামনে অনেকগুলো সুযোগ রয়েছে। আমরা জানি আমরা এটা করতে পারবো। এটা সত্যিই দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ একটা ম্যাচ হতে চলেছে কেননা যারা হারবে তারাই এই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে চলেছে।’ শেষ দেখায় আর্জেন্টিনাকে হারানোর সুখসৃতিও আছে নাইজেরিয়ার। সেই উদাহরণ টেনে রোর আর বলেন, ‘ইতোমধ্যেই আমরা তাদের সাথে দু’গোলের ব্যবধানে জিতেছিলাম আর সে ম্যাচে আমরা যথেষ্ট ভালও খেলেছিলাম। তবে হ্যাঁ এটা সত্যি যে মেসি ওই ম্যাচে মাঠে ছিল না। তবে এই ম্যাচে আমি আমার দলের কাছ থেকে নম্রতা, সংহতি ও হার না মানার লড়াই দেখতে চাই। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ