ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুরে আজ ভোট

গাজীপুর থেকে মোঃ রেজাউল বারী বাবুলঃ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের পাশাপাশি সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যে আজ দ্বিতীয় বারের মতো শুরু হচ্ছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। দেশবাসীর দৃষ্টি এখন আজকের গাজীপুর সিটি নির্বাচনের দিকে। লাখ লাখ ভোটারের মন জয় করে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রথম মেয়র মনোনীত হয়েছিলেন বিএনপি জোট প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান। বর্তমানে তিনি অসুস্থ থাকায় এবার ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে মানোনয়ন দেয়া হয়েছে প্রবীণ রাজনীতিবিদ সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকারকে। আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তরুণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ৪২৫টি কেন্দ্রে ১১ লক্ষাধিক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। দ্বিতীয় দফায় নির্ধারিত হবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদ। নির্বাচন কমিশন এবং পর্যবেক্ষকরা ৩৩৭টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে ২০ দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষ থেকে। ২০ দলের প্রার্থী হাসান উদ্দিন করকার বলেন, খুলনার স্টাইলে গাজীপুরেও নির্বাচন করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। তারপরও সকল বাধা ও ঝর বৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্বিঘেœ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ২০ দলীয় জোট মেয়রপ্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসন উদ্দি সরকার। গাজীপুর সিটিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন জাহাঙ্গীর আলম। প্রার্থী, সমর্থক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেদিক থেকেই অনিয়ম হোক না কেন, কঠোরভাবে তা দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডল।
 নির্বাচন উপলক্ষে গাজীপুরে একদিকে যেমন উৎসব আমেজের পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে ২০দলীয় জোট নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকদের মাঝে। অপরদিকে রোববার রাত ১২টার পর থেকে সব ধরনের প্রচার প্রচারণা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করেছে সর্বত্র। ২৩ জুন রাত থেকে মহানগরীতে অবস্থানরত সকল বহিরাগতদের এলাকা ত্যাগ করার জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন ম-ল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “যদি কেউ নির্বাচনে অন্যায়-অনিয়ম করে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কড়া হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে, নির্বাচনের কাজে যদি বিঘœ সৃষ্টি করে, সে প্রার্থী বা সমর্থক হউক বা কোনো অফিসিয়াল হতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কড়া আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
 সোমবার নগরীর বঙ্গতাজ অডিটোরিয়াম থেকে ভোটের সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়। এরপর প্রিজাইডিং অফিসার ও ভোটিং কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় সেগুলো নিয়ে যান কেন্দ্রে কেন্দ্রে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন অডিটোরিয়ামের দোতলায় নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, অত্যন্ত ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান করব আমরা । আমরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহায়তা পাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন থেকেও জানানো হয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হবে। সাড়ে ১১ লাখ ভোটার যাতে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারে, আমরা সেটার ব্যবস্থা করেছি।”
নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য স্ট্রাইকিং ফোর্সের পাশাপাশি বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় ১৩ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা।
পুলিশ বিএনপি কর্মীদের ‘নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে’ এবং নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে যে অভিযোগ দলটির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার করে আসছেন- সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জবাবে তিনি বলেন, “তারা অভিযোগ করলে আমরা সাথে সাথে আমলে নিচ্ছি। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে এবং মৌখিকভাবে অবহিত করছি। তদুপরি কমিশনে আমরা চিঠি দিচ্ছি। কমিশন থেকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন,“ পুলিশ সুপারকে লেখা একটি চিঠি আমরা পেয়েছি, যাতে বলা আছে, ফেরারি ছাড়া কাউকে বিনা কারণে হয়রানি করা যাবে না এবং নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। সে বিষয়টি আমরা প্রার্থী হাসান সরকারকেও জানিয়েছি, অন্য প্রার্থীদেরও জানিয়েছি। পুলিশ সুপারকেও জানিয়েছি, যাতে সবাই সচেতন থাকে।”
সব মিলিয়ে গাজীপুরবাসীকে একটি ‘সুন্দর নির্বাচন’ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
 সোমবার সকাল থেকে ভোটের সরঞ্জাম বিতরণের সময় শহরের বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে ছিল ভিড় ও ব্যস্ততা। নির্বাচন কমিশন থেকে ব্যালট বক্স, ব্যালট পেপার, সিল, অমোচনীয় কালিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হচ্ছিল কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে।
৪২৫টি ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নিজ নিজ কেন্দ্রের মালামাল বুঝে নিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর কড়া প্রহরায় ভোট কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান করবেন। তিনি গাজীপুর সিটিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হবে বলে আশা করেন। গাজীপুরের জনগণ উন্নয়নের জন্য নৌকায় ভোট দেবে এটাই তার প্রত্যাশা। জাহাঙ্গীর আলম মহানগরের ৩০ নং ওয়ার্ড নিজ বাড়ির কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিবেন।
তবে বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে বিএনপির এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে পুলিশ হানা দিচ্ছে। যাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ তাদের অনেকের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক নেতাকর্মীকে গাজীপুরের বাইরের থানার পুলিশ এসে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। নেতাকর্মীরা রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারছে না। দলীয় কর্মী ও আইনশৃংখলা বাহিনী দিয়ে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি জানান,খুলনার স্টাইলে গাজীপুরেও নির্বাচন করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সকল বাধা ও ঝরবৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ২০ দলীয় জোট মেয়রপ্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসন উদ্দি সরকার। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, এটি আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। আগামীতে আর হয়তো কোন মুক্তিযোদ্ধাকে আপনারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে পাবেন না। আমি বিগত দিনে সততার সাথে রাজনীতি করে গাজীপুরবাসীর ইজ্জত রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। এই বিশেষ বয়সে আপনারাও আমার ইজ্জত রক্ষা করবেন বলে বিশ্বাস করি। তিনি ২০ দলীয় জোটের সকল নেতাকর্মীর উদ্দেশে বলেন, ন্যূনতম সুষ্ঠু ভোট হলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। তাই ভোট কেন্দ্র দখল ও কারচুপি প্রতিরোধে কেন্দ্রের আশপাশে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও আাইনশৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
হাসান উদ্দিন সরকার সোমবার দিনব্যাপী নিজ বাসভবনে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সর্বশেষ প্রস্তুতি পর্যালোচনা বৈঠক করেন। তিনি প্রতিটি ওয়ার্ডের সার্বিক পরিস্থিতি ও গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। সোমবার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মিডিয়ায় তিনি সাক্ষাকোরে বলেন, গত ২০ জুন প্রার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভায় নির্বাচন কমিশন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচনী মাঠে তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বরং ওই মতবিনিময় সভার দিন থেকেই ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধড়পাকড় শুরু করে আইনশৃংখলা বাহিনী। যা এখনো অব্যাহত আছে। রোববার রাতেও ১৮ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। এখনো তাদের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট ২০ দলীয় জোটের ৯৩ জন নেতাকর্মীকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। হাসান সরকার বলেন, আওয়ামী লীগ কারচুপি বা ভোট ডাকাতি করলে অনন্তকাল তারা এই কলঙ্ক বহন করবে। ইতিহাস তাদেরকে ক্ষমা করবে না।
হাসান উদ্দিন সরকার মহানগরের ৫৪ নং ওয়ার্ডে বশির উদ্দিন উদয়ন একাডেমি কেন্দ্রে ভোট দিবেন।
নির্বাচন কমিশনে ২টি অভিযোগ বিএনপির
নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতিকের প্রধান এজেন্ট ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোঃ সোহরাব উদ্দিন সোমবার দুপুরে নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কাছে এ সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
তিনি জানান, পুলিশের অভিযানের মুখে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রোববার রাতে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনার সাথে জড়িত ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। গ্রেফতারকৃতদের কারোর বিরুদ্ধেই কোন মামলা নেই।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. মাজহারুল আলম জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সকল অঞ্চলে ২০ দলীয় জোটের সকল নেতাকর্মী ও সমর্থকের বাসা-বাড়িতে পুলিশ প্রতিদিনই হানা দিচ্ছে। বিশেষ করে ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী-সমর্থকদের তালিকা ধরে টার্গেট গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। এতে নেতাকর্মীরা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। লাগাতার পুলিশী হামলা ও হয়রানিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিএনপি তথা ২০দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের অসহায় পরিবার।
গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের উদ্ধৃতি দিয়ে ধানের শীষের মিডিয়া সেল জানায়, পুলিশ নেতাকর্মীদের বাড়ির গেট ও দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে গ্রেফতার করছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে কোন গ্রেফতারি পরোয়ানা নাই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক মিথ্যা মামলার আসামী হলেও বর্তমানে জামিনে আছেন। পুলিশের গ্রেফতার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, যাদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কোন মামলা ছিল না তাদেরকে ধরে ভিন্ন জেলা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। দুই/তিন দিন পর কাউকে টাঙ্গাইল, কাউকে নারায়ণগঞ্জ ও কাউকে ঢাকার জেলখানায় পাওয়া যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেককে অন্য জেলার একাধিক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে দেওয়া হচ্ছে। ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের এই গ্রেফতার অভিযানে গাজীপুর ডিবি পুলিশের সাথে জেলার সকল থানা ও পাশর্^বর্তী জেলাসমূহের পুলিশ নামোনো হয়েছে। ২৪-০৬-১৮ রাতে ডিবি পুলিশ ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২০ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের কারোর অবস্থান এখনো জানানো হচ্ছে না।
ধানের শীষের মিডিয়া সেল কর্তৃক দেয়া তথ্য মতে গ্রেফতারকৃতরা হলো, কোনাবাড়ি ১১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সবুজ, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আহ্বŸায়ক বিডি আর অব. মজিবুর রহমান, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য ও নির্বাচনী এজেন্ট এডভোকেট আনোয়ার হোসেন, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য এডভোকেট ইউসুফ, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য কবির হোসেন, আব্দুল মান্নান, কাউলতিয়া ২৪ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য  জৈনুদ্দিন মোড়ল, পূর্ব ধীরাশ্রম ২৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কর্মী হেলেন বাদশা, পশ্চিম ধীরাশ্রম বিএনপিকর্মী আলমগীর, ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি আহ্বায়ক মোশারফ হেসেন বাদশা, ২৯ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মজিবর রহমান, টঙ্গীর মু;দাফা ৫২ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য মো. ইউনুস মিয়া, গাছা কলমেশ^র আদর্শ বিদ্যালয় কেন্দ্র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য লিটন মোল্লা গিয়াস, কাউলতিয়া পোড়াবাড়ির ২৩ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হারিস, কাশিমপুর এলাকার সাইফুল, বাউরাইদের সাবেক কাউলতিয়া ইউপি ছাত্রদল সভাপতি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য বাকির হোসেন, কানাইয়া গ্রামের ৩০ ওয়ার্র্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যর শোভা ও আব্দুর রহমান। সোমবার দুপুরে৩৩নং ওয়ার্ডে বোর্ডবাজারের খাইলকুর বটতলা থেকে এক জামায়াত কর্মী বাকি বিল্লাকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। সোমবার নগরের দেশীপাড়া এলাকায় কেন্দ্রপরিচালনা কমিটরি সভাপতি আবুল হোসেনের বাড়িতে ডিবি পুলিশ হানা দিয়ে ঘড়ের আসবাব পত্র তছনছ করে ও হুমকি দেয়।
এছাড়া পুলিশ রোববার দিবাগত রাতে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বাঙ্গালগাছ এলাকায় বিএনপির নির্বাচনী অফিসের কেয়ারটেকার শামীমকে বেধড়ক পিটিয়েছে, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রদল নেতা ইমতিয়াজ আলম খান তুষারকে বাসায় না পেয়ে তার বৃদ্ধ পিতা আলম খানকে মারধর করেছে। এছাড়া বাসন ইউনিটের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব, বিএনপির সদর থানা সাংগঠনিক সম্পাদক বশির আহমেদ বাচ্চু, কাউলতিয়া নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন চেয়ারম্যান, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের সালনায় বিএনপি নেতা হারুন, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের নান্দুয়াইলে শরিফ, খলিল মেম্বার, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক রয়েল হায়দার, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল নেতা জুয়েল মন্ডল, পূবাইল অঞ্চল নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও পূবাইল যুবদলের সভাপতি মজিবুর রহমান, পূবাইল ছাত্রদল সভাপতি নজরুল ইসলাম, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে গাছা যুবদলের সহসভাপতি মোশারফ মন্ডল, ১০ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্র কমিটির সদস্য সচিব মিলনসহ অসংখ্য নেতাকর্মীর বাড়িতে রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে ভাংচুর করে পুলিশ। এসময় তাদেরকে বাসায় না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এর আগে শনিবার রাতে পুলিশ চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বাসন অঞ্চল ধানের শীষের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা সাবেক বাসন ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন চৌধুরীর বাড়ির গেটের তালা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে। এসময় তাকে না পেয়ে দারোয়ান ও পরিবারের সদস্যদের কাছে পুলিশ এই বলে হুমকি দিয়ে যায় যে, ‘ আগামীকাল জাহাঙ্গীরের সাথে তাকে (আলাউদ্দিনকে) দেখা করতে বলবি, দেখা না করলে তার পরিণতি খারাব হবে। আর যদি দেখা না করে তাহলে ঘর থেকে যেন বের না হয়’। টঙ্গী থানা স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডার ও মহানগর ছাত্রদল নেতা সিরাজুল ইসলাম সাথীর বাসায় ২৩ জুন রাতে হানা দেয় ডিবি ও থানা পুলিশ। পুলিশ নেতাকর্মীদের বাসায় না পেয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়ে যায়, নির্বাচনের আগে যেন এলাকায় না আসে। পুলিশের এই অভিযানে যুক্ত হয়েছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনী। সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে পাশের এলাকা সমূহের যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সমন্বয়ে গঠিত করা হয়েছে অভিযান পরিচালনা কমিটি। তারা পুলিশের সাথে মুখোশ পড়ে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বাসা বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এছাড়া আওয়ামীলীগ ক্যাডাররা ধানের শীষের সব পোস্টার ছিরে ফেলছে। রোববার রাতে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড এরশাদ নগর এলাকায় ও গাছা অঞ্চলে ধানের শীষ প্রতীকের অধিকাংশ পোস্টার ছিড়ে ফেলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গত ২০ জুন প্রার্থীদের ডেকে মতবিনিময় সভায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার কোন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, নির্বাচন অবাধ না হলে বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিনষ্ট হলে যারা দায়ী থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু ২০ দলীয় জোট মেয়রপ্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে বার বার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গাজীপুরে পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেফতার না করতে নির্দেশ
বিএনপির উল্লেখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার না করার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে। এ অবস্থায় নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনো বাসিন্দা বা কোনো ভোটারকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার না করার জন্য নিদের্শ প্রদান করেছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার রকিব উদ্দিন মন্ডল।
নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র জানায়, নির্বাচনে ২৯ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, এবিবিএন, আনসারসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রায় ১১ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে।
নগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে ৫৭টি স্ট্রাইকিং ফোর্স, সংরক্ষিত আসনে ২০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। ৫৭টি ওয়ার্ডে ৫৭টি এবং অতিরিক্ত একটিসহ মোট ৫৮টি টিম মোতায়েন থাকবে।
প্রতি দুইটি ওয়ার্ডে এক প্লাটুন করে মোট ২৯ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। এদের মধ্যে ৭ প্লাটুন কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর এলাকায়, ১০ প্লাটুন টঙ্গী এলাকায় এবং ১২ প্লাটুন জয়দেবপুর, বাসন চান্দনা চৌরাস্তা ও কাউলতিয়া এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন।
ছাড়া পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ান আনসার সমন্বয়ে ৫৭টি ওয়ার্ডে ৫৮টি মোবাইল ফোর্স, ২০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োজিত থাকবে।
নির্বাচনের আগে ও পরে চার দিন ৫৭টি ওয়ার্ডে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। আরো ১০ জন অতিরিক্ত হিসেবে সর্বমোট ৬৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন থাকবেন। সিটি কর্পোরেশনের প্রতি তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে মোট ১৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। তারা ২৪ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত নগরীতে দায়িত্ব পালন করবেন।
ছয় কেন্দ্রে ইভিএম
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ছয়টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রগুলো হলো চাপুলিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ভোটার ২৪৮০), চাপুলিয়া মফিজউদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয় (ভোটার ২৫৫২), পশ্চিম জয়দেবপুরের মারিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (ভোটার ২৫৬২), মারিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (ভোটার ২৮২৭), রাণী বিলাসমনি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (ভোটার-১৯২৭) এবং রাণী বিলাসমনি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (ভোটার-২০৭৭)। এছাড়া তিনটি কেন্দ্রে বসানো সিসি ক্যামেরা থেকে সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নজর রাখতে পারবে নির্বাচন কমিশন।
 সিটি কর্পোরেশনের ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ, আনসার ভিডিপিসহ ২৪ (১২ জন অস্ত্রধারী) জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। আর সাধারণ কেন্দ্রগুলোতে ২২ (১০ জন অস্ত্রধারীসহ) জন সদস্য মোতায়েন থাকবে।
নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামান জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে ৬জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মো. জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা), বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার (ধানের শীষ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মো. রুহুল আমীন (কাস্তে), ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা ফজলুর রহমান (মিনার), ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন (মোমবাতি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নাসির উদ্দিন (হাত পাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ আহমেদ (টেবিল ঘড়ি)সহ ৭ জন মেয়র প্রার্থী ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন এবং ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪জন প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে একজন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গ কিলোমিটার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ