ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তুরস্কের প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হলেন রজব তৈয়ব এরদোগান

সংগ্রাম ডেস্ক : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে রজব তৈয়ব এরদোগানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যদিয়ে তুরস্কের ১৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন এরদোয়ান। সংশোধিত সংবিধানের অধীনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পাচ্ছেন নিরঙ্কুশ নির্বাহী ক্ষমতা। গত বছরের গণভোটে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রবর্তনের রায় আসার পর এরদোগান হচ্ছেন তুরস্কের ইতিহাসে প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট। নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই রবিবার (২৪ জুন) বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে এরদোয়ানের বিজয়ের খবর নিশ্চিত করা হয়। এরদোগান তুরস্কের সর্বোচ্চ নির্বাচনি কর্তৃপক্ষ (ওয়াইএসকে)-এর প্রধান সাদি গুভেন আঙ্কারায় সাংবাদিকদের জানান, গত রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ৯৭৭ শতাংশ ব্যালট গণনা শেষে এরদোগান ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে প্রার্থীকে অবশ্যই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেতে হয়। কোনও প্রার্থী যদি প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট না পান, তবে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন হয়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দি¦তা করেন দ্বিতীয় দফায়। প্রথম দফা নির্বাচনের পনের দিন পর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফা নির্বাচন। যদিও ইতোমধ্যেই পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে গেছেন এরদোগান। তাই দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনও প্রয়োজন হবে না। গত বছর অনুষ্ঠিত গণভোটে সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় আসার পর রোববার (২৪ জুন) প্রথমবারের মতো একযোগে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দেয় তুর্কি জনগণ। ওই গণভোটে দেশের সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাহী প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় পরিণত করার পক্ষে রায় এসেছিল। নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোগান উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা পাবেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করতে পারবেন তিনি। নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পার্লামেন্টের মনিটরিং করার ভূমিকাও বাতিল করার ক্ষমতা থাকবে এরদোগানের হাতে।
২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এরদোগান। ২০১৪ সালেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন। তার প্রধান সমর্থক হচ্ছেন রক্ষণশীল এবং ধার্মিক অপেক্ষাকৃত বয়স্ক তুর্কিরা। ২০১৬ সালের এক ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে এক গণভোটে সামান্য ব্যবধানে জয়লাভ করেন এরদোগান। এতে তিনি দেশটিকে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে জনরায় পান। এরদোগান এবারের নির্বাচনে জয়লাভ করায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সরকারি কর্মকর্তা, ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীদের নিয়োগ দেবেন এবং যেকোনো সময় সংসদ ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন।
রোববার অনানুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণার পর পরই সাংবাদিকদের এরদোগান বলেন, ‘শাসক নয়, বরং সবসময় জনগণের সেবক হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার জনগণ এ ব্যাপারে সজাগ। ভোটের মাধ্যমে তারা তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।’ তিনি বলেন, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমে তুরস্ক দুনিয়াকে গণতন্ত্রের শিক্ষা দিয়েছে। এ নির্বাচনে তুরস্কের জনগণ, এ অঞ্চল এবং দুনিয়ার সব নিপীড়িত মানুষের বিজয় অর্জিত হয়েছে।
এদিকে এরদোগানের বিজয়ের খবরে রাস্তায় নেমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তার সমর্থকরা। আঙ্কারায় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এরদোগান বলেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র জিতে গেছে, জনগণের ইচ্ছার জয় হয়েছে। তুরস্ক জিতে গেছে।’
বিশ্বনেতারাও এরদোগানকে একের পর এক অভিনন্দন বার্তা পাঠাচ্ছেন। এরমধ্যে রয়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, টার্কিশ রিপাবলিক অব নন্দার্ন সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা আকিঞ্চি, বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী বয়কো বরিসোভ প্রমুখ।
রোববার একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্লামেন্ট নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে এরদোগানের দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পিপলস এলায়েন্স। ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, ৫৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছে এরদোগানের জোট। সিএইচপি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল এলায়েন্স পেয়েছে ৩৪ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট।
৬০০ আসনের পার্লামেন্টে এরদোগানের দল একেপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ২৯৩ জন এমপি। জোট শরিক এমএইচপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ৫০ জন। কামাল আতাতুর্কের দল সিএইচপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ১৪৬ জন এমপি। তাদের জোট শরিক ইয়ি পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ৪৪ জন।
পার্লামেন্টেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পাশাপাশি তুরস্কের পার্লামেন্ট নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ক্ষমতাসীন রজব তৈয়ব এরদোানের নেতৃত্বাধীন জোট পিপল’স এলায়েন্স। রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জোটটি পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর প্রধান বিরোধী জোট ন্যাশনাল এলায়েন্স পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে এই ফল জানিয়েছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদলু এজেন্সি। এরদোগানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টির সঙ্গে জোটে রয়েছে ইউরোপবিরোধী জাতীয়তাবাদী বলে পরিচিত রাজনৈতিক দল এমএইচপি। ভোটের হিসাবে জোটগত ভাবে পিপল’স জোট পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৬২শতাংশ। এরমধ্যে একেপি পেয়েছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, এমএইচপি পেয়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
প্রধানবিরোধী জোট ন্যাশনাল এলায়েন্স পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। এই জোটের মুহাররেম ইনজের নেতৃত্বাধীন দল সিএইচ পেয়েছে ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ, ইয়ি পার্টি ১০ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং সাদাত পার্টি ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
এছাড়া কুর্দীপন্থী হালকারাম ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এইচডিপি) পেয়েছে ১১ দশমিক ০৫ শতাংশ। এই দলটি প্রধান দুই জোটের কোনোটির শরিক হয়নি।
তুরস্কের পার্লামেন্টের ৬০০ আসনের মধ্যে জোটগতভাবে পিপল’স এলায়েন্সের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ৩৪৩ জন। আর বিরোধী ন্যাশনাল এলায়েন্সের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ১৯০জন। দলগতভাবে একেপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ২৯৩ জন এমপি। একেপির জোট শরিক এমএইচপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ৫০ জন।
এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী জোট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ন্যাশন জোট। এই জোটভুক্ত আধুনিক তুরস্কের জনক হিসেবে পরিচিত কামাল আতাতুর্কের দল সিএইচপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ১৪৬ জন এমপি। তাদের জোট শরিক ইয়ি পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ৪৪ জন এমপি। সাদাত পার্টি ১৪ শতাংশ ভোট পেলেও কোনও নির্বাচিত এমপি পায়নি।
এছাড়া বাকি ৬৭ আসনে জয় পেয়েছে কুর্দীপন্থী হালকারাম ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এইচডিপি)।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যদিয়ে তুরস্কের ১৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন এরদোগান। সংশোধিত সংবিধানের অধীনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পাচ্ছেন নিরঙ্কুশ নির্বাহী ক্ষমতা। গত বছরের গণভোটে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রবর্তনের রায় আসার পর এরদোগান হচ্ছেন তুরস্কের ইতিহাসে প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট।
৯৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট গণনা শেষে এরদোগান পেয়েছেন ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রধান প্রতিদ্বন্দ¦ী মুহাররেম ইনজে পেয়েছেন ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া অন্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে সালেহাতিন দেমিরতাস ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, মেরাল আকসেনার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
তুরস্কের মোট ভোটার সংখ্যা ৫ কোটি ৬৩ লাখ ২২ হাজার ৬৩২। এবার ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫৪ হাজার ভোটার। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ