ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুর সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু করতে কমিশনকে সর্বশক্তি প্রয়োগের আহ্বান

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৮-২০১৯ : নাগরিক ভাবনা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সর্বশক্তি প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন। সংস্থাটির সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এই সিটি নির্বাচনগুলোই নির্ধারণ করবে জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সুজন সম্পাদক এসব কথা বলেন। প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৮-২০১৯: নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সংস্থাটি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রংপুর নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারলেও খুলনা সিটি নির্বাচনে মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে পারেনি। এটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্য ইতিবাচক নয়। আমি সকলের কাছে আশা করবো গাজীপুরে যেন খুলনার পুনরাবৃত্তি না হয়। আমরা আশা করি গাজীপুর সিটিতে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। একইসাথে সরকার ও প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।
সুজন সম্পাদক বলেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যদি না হয়, তাহলে তার মাশুল জাতিকে দিতে হবে। আশা করি সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনেই বুঝা যাবে জাতীয় নির্বাচনটা কেমন হবে। কেননা সকাল দেখলেই বুঝা যায়, দিনটা কেমন যাবে। তাদের উপর মানুষের আস্থা থাকবে কি না।
প্রস্তাবিত বাজেটের মূল্যায়ন : গোলটেবিল বৈঠকে বাজেট নিয়েও কথা বলেন আলোচকরা। তারা বলেন, বাজেট প্রতিটি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবাইকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালের প্রস্তাবিত বাজেট সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সহায়ক নয়।
প্রস্তাবিত বাজেটের সমলোচনা করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই বাজেট স্বার্থন্বেষী- সুযোগসন্ধানী মহলকে তুষ্ট করা জন্য দেয়া হয়েছে। বাজেটে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আকর্ষণী বা তুষ্ট করার মত কিছুই নেই। তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের কথা বলে থাকি। কিন্তু বৈষম্য দূরীকরণে বাজেটে তেমন কোনো আলামত নেই। বরং বাজেটে একদল স্বার্থান্বেষী মহলকে লুটেপুটে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটে করমুক্ত সীমা আড়াই লাখ টাকা রাখা হয়েছে। আড়াই লাখ টাকা কিন্তু বেশি না। ফলে নি¤œ-মধ্যবিত্ত মানুষ করের মধ্যে চলে আসছে। তাদের কাছ থেকে কর আদায় করা হচ্ছে, অথচ ব্যাংকিং খাতকে যারা ডোবাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তাদেরকে উল্টো সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কমানো হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে ট্যাক্স হার।
বদিউল আলম বলেন, ব্যাংকিং খাতে ট্যাক্স না কমিয়ে করপোরেট সেক্টরে যদি ট্যাক্স কমানো হত, সেক্ষেত্রে করপোরেট সেক্টরে সম্ভবনাময়ী সেক্টরে পরিণত হতো। তিনি বলেন, বিশ্বে যখন প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। সেখানে আমাদের বাজেটে প্রতিনিয়ত বরাদ্দে কমতেই আছে, এটা আমাদের জন্য অশানি সংকেত।
শিক্ষাখাতে বরাদ্দ প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিল ১৪.৩ শতাংশ আর ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১২.৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত অর্থ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১১.৪১ শতাংশ। প্রতিনিয়ত বরাদ্দ কমতেই আছে, এর দ্বারা কী বার্তা দিচ্ছে? আর তাছাড়া বরাদ্দের অধিকাংশ টাকা যাবে অবকাঠমো খাতে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা থাকলেও আমাদের দেশে বরাদ্দ হচ্ছে মাত্র ০.৯২ শতাংশ। এটা হতাশার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এবাজেট সাধারণ মানুষের জন্য হয়নি। অল্প কিছু শ্রেণিকে তুষ্ট করার জন্য এই বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেন সাধারণ মানুষ মনে করে এটা একটা বড়  বাজেট। তারাতো সবকিছু বোঝে না। একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ এ থেকে অনেক বেশি সুবিধা পাবে। তাছাড়া বাজে এনা লাইটিকেল কোনো বর্ণনা নেই। গত বছরের বাজেট কিন্তু রিভাইস ও সংশোধন করা হয়েছে। এডিপি সংশোধন করা হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে এতো বড় বাজেট এবারও যে বাস্তবায়িত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেহেতু এটা নির্বাচনের বছর তাই সাধারণ মানুষ বুঝবে না, কী রিভাইস ও ইমপ্লিমেন্ট হয়েছে। এতে মানুষকে খুশি করার জন্য কর তেমন বেশি আরোপ করা হয়নি। অতএব সরকারের একটা বিরাট ভাবমূর্তি দাঁড়ালো যে তারা বিরাট বাজেট দিয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অন্যান্য কর্মসংস্থানের জন্য বাজেটে বিশেষ বার্তা থাকবে বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বাজেটে কিছুই বলা নেই। এমনকি বিনিয়োগ বাড়ানোর ব্যাপারেও কিছু বলা নেই।
তিনি বলেন, শিক্ষাখাতে বাজেট সেই ১২ শতাংশই রয়ে গেছে। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। যেটা করা হয়েছে তাতে শিক্ষকের বেতন-ভাতাতেই সব চলে যাবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বিষয়টি আরও দুঃখজনক। মনে হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে সাধারণ মানুষের প্রচুর সুযোগ সুবিধা চলে এসেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু হয়তো আছে তাতে দরিদ্র মানুষরা উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু আজকাল দরিদ্র মানুষরা তো শুধুমাত্র ডায়রিয়া ও পেটের অসুখে ভোগেন না। তাদেরও ব্যয়বহুল রোগ হচ্ছে। হাসপাতাল ভবন হলেও স্বাস্থ্য উপকরণ, যন্ত্রপাতি, রোগীদের পথ্য  এগুলোতে বাজেটে আরো বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল। কেননা স্বাস্থ্যসেবা  প্রাইভেট সেক্টরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক এ গভর্ণর বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে তেমন নজর না দিয়ে মেগা প্রকল্পের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। মেগা প্রজেক্টগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। কিন্তু বর্তমান সমস্যা ভুল না করে মেগা প্রজেক্টে হাত দিলে তা কোনোভাবেই জনকল্যাণমুখী বাজেটের অন্তর্ভুক্ত বলা যায় না।
সালেহ উদ্দিন বলেন, বলা হচ্ছে এনবিআরকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছ শুধুমাত্র এনবিআরের লোকবল বাড়ানোর প্রতিক্রিয়া। তারাতো গতবারের টার্গেট পূরণ করতে পারেনি। তাহলে এবার কি অবস্থা হবে?
এছাড়া বেসরকারি অনেক বড় একটি আয়ের খাত হিসেবে ব্যাংকিং সেক্টর ও সঞ্চয়পত্রকে দেখানো হয়েছে। এমনিতেই ব্যাংকিং সেক্টর চাপের মুখে, তার উপর আবার এই চাপে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের উপর চাপ পড়বে। যার কারণে আমানত কমে যাচ্ছে ও সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোর প্রতি দৃষ্টি ও মনোযোগ এত বেশি যে এতে মাঝারি বা ছোট প্রকল্পের আওতায় থাকা লোকগুলো কিন্তু সাফার হচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে, কিন্তু এসব চিন্তা করলে জনকল্যাণমুখী বাজেট এটাকে বলা যাবে না
সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, গত ১১ মাসে ৬৩ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। আর এক মাসে বাকিটা বাস্তবায়ন করা কি সম্ভব ? অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার খুবই নিম্ন। যে কারণে আমরা তুলনামূলকভাবে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছি। কেননা ধনী ও গরিবের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে।
 গোলটেবিল আলোচনায় গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, উন্নয়ন কর্মকা-ের কোনো সমন্বয় নেই, তাও আমরা মেনে নিচ্ছি। আর সরকার এই সুযোগেই বলছে দেশ উন্নত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন,  আমরা আফিম খেয়েছি, তাই কোনো প্রতিবাদ হয় না। অথচ আমরা বাঙালি জাতি প্রতিবাদী জাতি ছিলাম। এখন কেন কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না? এত বড় বাজেট হয়ে গেল ঠিক না বেঠিক কেউ কিছুই বলে না।
সংসদে বাজেটের উপর সঠিক আলোচনা হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে কি আলোচনা হয়, আমরা সবাই জানি। সংসদ সদস্যরা বাজেট আলোচনায় উঠে দলের নেতাদের প্রশংসা শেষে বলেন, বাড়ির পাশে একটা ব্রিজ দরকার। এটা বলেই তাদের আলোচনা শেষ করে। এই বাজেট আলোচনা দিয়ে কিভাবে আমরা এগিয়ে যাব।
আলোচনা সভায় বক্তারা  বলেন, আমাদের বিরাট পরিমাণে সম্পদ পাচার হয়ে যাচ্ছে। বাজেটে সম্পদ পাচার বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেই। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। তিনি বলেন, গত বছরে ৯.১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৬, ৫৮৫ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। একইভাবে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৬১.৬৩ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
তারা বলেন, বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা, এই অবস্থা থাকলে এই অর্থ পাচারের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু এই পাচার রোধে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ