ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে ২১টি অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাট ইজারার প্রস্তুতি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : কুরবানির পশুর হাট ইজারা নিয়ে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তোড়জোর শুরু হয়েছে। যথারীতি এবারও ২১ টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দু’এক দিনের মধ্যেই কুরবানির পশুর হাট ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে প্রকাশ।
রোজার ঈদের ২ মাস ১০ দিনের মাথায় কুরবানির ঈদ, এ হিসাব মাথায় রেখেই কুরবানির ঈদের প্রস্তুতি হিসেবে পশু বেচা কেনার ক্ষেত্রে যাতে পূর্ব প্রস্তুতিগুলো সঠিক সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা যায়, সে জন্যই দুই সিটি কর্পোরেশনে গত ক’দিন আগেই অস্থায়ী পশুর হাট ইজারার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য অস্থায়ী হাটগুলো ইজারা দেয়ার জন্য যাচাই বাচাই কার্যক্রম শেষ করেছে। দু’এক দিনের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে ঘুরে ফিরে একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা কুরবানির পশুর হাটের ইজারা পাচ্ছেন। এতে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিহ্নিত সিন্ডিকেট চক্রের আপস মীমাংসার মাধ্যমে কম মূল্যে দলীয় নেতা কর্মীদের মাঝে ভাগভাটোয়ারা করে ইজারা দেয়া নেয়া হয়ে আসছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাসহ বড় বড় কর্মকর্তারা ডেকে এনে সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের কুরবানির পশুর হাটগুলো নাম মাত্র মূল্যে ইজারা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। যাতে তারা সরকারের কাছে নিজেদেরকে আস্থাভাজন কর্তকর্তা বলে পরিচয় দিতে পারেন। যদিও এ বছর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্তকর্তা নতুন এসেছেন।
এছাড়া কুরবানির হাট ইজারা নেয়াকে কেন্দ্র করে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি’র সম্পত্তি বিভাগের সামনে এবং আঞ্চলিক অফিসে প্রতিদিন ‘মহড়া’ দেন ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীসহ তাদের ক্যাডার বাহিনী। এতে সকল ইজারা প্রার্থীর পক্ষে নির্বিঘেœ দরপত্র জমা দেয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে প্রতি বছরই সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে সিন্ডিকেটের বাইরে কারও পক্ষে সিডিউল সংগ্রহ ও জমা দেয়া সম্ভব হয় না। ডিএসসিসি’র ও ডিএনসিসি’র অস্থায়ী গরুর হাটগুলোর ইজারা ক্ষমতাসীনদের আয়ত্বে রাখতে সব সময়ই নেয়া হয় নানা কৌশল। এর মধ্যে একই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে-বেনামে নাম মাত্র মূল্য দিয়ে দরপত্র জমা দিয়ে থাকেন। যে কারণে নিজেদের কাঙ্খিত দামে ইজারা পেতে সহজ হয়ে যায়। এতে প্রতি বছর সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়।
অনুন্ধানে দেখা গেছে, গত বছর সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের কারণে রাজধানী ঢাকার অস্থায়ী ২৪টি কুরবানি পশুর হাট থেকে শত কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন। হাটগুলো থেকে কমপক্ষে ১৫০ কোটি টাকা হাসিল উত্তোলন করেছে ইজারাদাররা। অথচ হাটগুলোর ইজারা থেকে ডিসিসি পেয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। সিটি কর্পোরেশন চাইলে হাটগুলো থেকে আরো অন্তত ৬ থেকে ৭ গুণ রাজস্ব আয় করতে পারত।
গত বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৯টি হাটের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এছাড়া ৭টি হাট খাস আদায়ের জন্য দিলেও একটি হাট হাইকোটের স্থগিতাদেশের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে মোট ১৫টি হাট ইজারা দিয়েছিল ডিএসসিসি। আর উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে ৮টি হাটের ইজারা দেয়া হয়েছিল। এসব হাটের ইজারামূল্য ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকা। ইজারাদারদের তথ্যমতে, অস্থায়ী হাটে চার লাখ ৫০ হাজার গরু বিক্রি হয়। ৪৬ হাজার ছাগল বিক্রি হয়। এ সময় শতকরা ৫ টাকা হারে ১৩৮ কোটি টাকা হাসিল আদায় হয়েছে। গত বছরের বাজারদর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গরুর গড় দাম ছিল ৬০ হাজার টাকা এবং ছাগলের গড় দাম ছিল ১০ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটে এ তথ্য সরবরাহ করে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। একই চিত্র ছিল ২০১৬ সালের অস্থায়ী কুরবানি পশুর হাটগুলোরও। ওই বছর ঢাকা শহরের ২২টি পশুর হাটে দুই লাখ ৪৩ হাজার গরু বিক্রি হয়। আর ৩৫ হাজার ৪২০টি ছাগল বিক্রি হয়। এ হাটগুলোর মোট ইজারামূল্য ছিল ১৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অথচ এসব হাটে ৭৪ কোটি টাকা হাসিল আদায় হয়। ২০১৬ সালে ইজারামূল্যের চেয়ে ৫৬ কোটি টাকার বেশি হাসিল আদায় হয়। এসব তথ্য ইজারাদারদের দেয়া। তবে হাসিল আদায় আরও বেশি ছিল। কারণ ইজারাদাররা রাজস্ব আয় কম দেখানোর জন্য নিজেদের মতো করে তথ্য সরবরাহ করে। সেখানে সিটি কর্পোরেশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তথ্যানুসন্ধানে অস্থায়ী কুরবানি পশুর হাটের ইজারামূল্য ও হাসিল আদায়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। দরপত্র প্রতিযোগিতামূলক না হওয়ার পেছনে এটি অন্যতম কারণ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাব এবং টেন্ডার সমঝোতার কারণে আবেদন কম পড়ে। পাতানো দরপত্রের কারণে সংশ্লিষ্টদের নিয়ন্ত্রণে থাকে অস্থায়ী কুরবানি পশুর হাটগুলো।
কয়েকটি হাটের ইজারামূল্য ও
হাসিল আদায়ের চিত্র
২০১৬ সালে ঝিগাতলা হাজারীবাগ অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাটের ইজারামূল্য ছিল ৬৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ সে বছর ওই হাটে ১০ হাজার ৩২০টি গরু বিক্রি হয় এবং চার হাজার ১২০টি ছাগল বিক্রি হয়। শতকরা ৫ টাকা হাসিল হিসাবে ইজারাদার গরু বিক্রি থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ছাগল বিক্রি থেকে ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা হাসিল আদায় করেন। এসব জানার পরও গত বছর ঝিগাতলা হাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এবারও একই পথে চলছে হাট ইজারার প্রক্রিয়া।
রহমতগঞ্জ : ২০১৬ সালে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি হাটের ইজারামূল্য ছিল ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ওই বছর হাটে চার হাজার ৯৮০টি গরু বিক্রি হয়। গরুর গড় মূল্য অনুযায়ী ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাসিল পান ইজারাদার। ইজারামূল্যের চেয়ে গত বছর ওই পশুর হাট থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেশি হাসিল আদায় করেন ইজারাদার। ডিএসসিসি গত বছর এ হাটের ইজারামূল্য নির্ধারণ করে মাত্র ১০ লাখ ৩ হাজার টাকা। এবারও হাট ইজারার একই প্রক্রিয়া শুরু করেছে ডিএসসিসি।
ভাটারা : গত বছর ভাটারা সাঈদনগর হাটের ইজারামূল্য ছিল ১৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ হাটে গরু বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার এবং ছাগল ৩ হাজার। গড় মূল্য হিসাবে গরু বিক্রি করে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার হাসিল আদায় করা হয়। ছাগলের হাসিলসহ ইজারাদার এ হাট থেকে মোট হাসিল আদায় করে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ইজারামূল্যের চেয়ে ইজারাদার ১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাসিল বেশি আদায় করে। গত বছর হাটের সর্বনি¤œ দর ৬ শতাংশ বৃদ্ধি করে ডিএনসিসি।
দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কুরবানির পশুর হাট ইজারা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছি। যথাযথ নিয়মের মধ্যে থেকেই হাটগুলোর ইজারা কাজ সম্পন্ন করা হবে। তবে এসব হাট থেকে রাজস্ব বাড়ানোর কোনো প্রস্তুতি নেই।
উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ইজারা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এ সংক্রান্ত ফাইল মেয়রের দফতরে রয়েছে। ফাইল হাতে পেলে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান নীতিমালার কারণে সিটি কর্পোরেশন চাইলে কোনো হাটের ইজারামূল্য বাড়াতে পারে না। ডিএনসিসি এলাকার হাটে ইজারামূল্যের চেয়ে বেশি হাসিল আদায় হলেও তা সহনীয়।
এবার রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ২১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রস্তুতিও শেষ করেছে। ডিএসসিসি এলাকায় ১৩টি এবং ডিএনসিসি এলাকায় ৮টি বসবে। তবে এলাকাবাসীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে হাটের সংখ্যা বাড়তেও পারে। আর ন্যূনতম দর না উঠলে নির্ধারিত হাটের যে কোনোটি বাদও পড়তে পারে।
গত বছরে ডিএসসিসির ইজারা দেয়া হাটগুলো হলো- খিলগাঁও মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ, হাজারীবাগের ঝিগাতলা মাঠ, লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ, কামরাঙ্গীরচরের ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ সংলগ্ন জায়গা, ধূপখোলা ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠ, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, যাত্রাবাড়ীর দনিয়া মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, কদমতলীর শ্যামপুর বালুর মাঠসহ ৯টি হাট।
এছাড়া যে ৬টি হাট খাস আদায়ের জন্য দেয়া হয় সেগুলো হলো, গোপীবাগ-কমলাপুর বিশ্বরোড সংলগ্ন বালুর মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গা। লালবাগ, চকবাজার বেড়ীবাঁধ ও রাজনারায়ণ ধর রোড সংলগ্ন ডিএসসিসির খালি জায়গা। বেডীবাঁধ সংলগ্ন ঢাকা হাইড মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গা। সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা। কাউয়ারটেক মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গা ও গোলাপবাগ মাঠ সংলগ্ন সিটি কর্পোরেশনের স্কুলের মাঠ ও ডিএসসিসি’র খালি জায়গা। পোস্তগোলা শিল্প আঞ্চলের খালি জায়গা হাটটি খাস আদায়ের জন্য দেয়া হলেও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে বাতিল হয়ে যায়। এ বছর নতুন অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা।
ডিএনসিসির পশুর হাটগুলো হলো- উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের প্রথম গোলচত্বর সংলগ্ন খালি জায়গা, ভাটারা (সাঈদ নগর) পশুর হাট, বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের (আফতাব নগর) পূর্বাংশের খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী সড়ক সংলগ্ন (বছিলা) পুলিশ লাইনের জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা, মিরপুর ডিওএইচএস সংলগ্ন উত্তর পাশের সেতু প্রোপার্টি হাউজিংয়ের ফাঁকা জায়গা, আশিয়ান সিটির খালি জায়গা, খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ