ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিদেশে গৃহপরিচারিকা সরবরাহ বন্ধ করুন

বিদেশ বিশেষ করে সৈাদি আরব প্রত্যাগত শত শত নারী কর্মী পরিবার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মানবেতর জীবন যাপন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজন তাদের গ্রহণ করছে না। তাদের অনেককেই তাদের স্বামী তালাক দিয়েছেন অথবা পরিত্যাগ করেছেন বলে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে না। ফলে অনেকে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত ছয় মাসে কর্ম ক্ষেত্রে বিরূপ পরিবেশ বিশষ করে যৌন ও শারীরিক নির্যাতন এবং মজুরী প্রদানে অস্বীকৃতি ও হয়রানি প্রভৃতি কারণে সহ¯্রাধিক নারী কর্মী বাংলাদেশে ফেরৎ এসেছে। এদের মধ্যে শুধু মে মাসেই ফেরৎ এসেছে ১২১ জন। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী কয়েক মাস আগে শান্তা রাণী নামে একজন বিধবাও পরিবারের আর্থিক সংকট লাঘবের জন্য বিদেশ গিয়েছিলেন। কিন্তু গৃহকর্তার যৌন হয়রানির কারণে তিনি সেখানে টিকে থাকতে পারেননি, কপর্দকহীন অবস্থায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। দেশে ফিরে আসার পর তার ছেলেরা তাকে অসত্বী হবার অজুহাতে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। শান্তা বলেছেন যে তার ছেলেরা এখন তাকে চরিত্রবতি মহিলা হিসাবে গণ্য করে না এবং বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তার বাড়ি রাজশাহী। সে এখন রাজধানী ঢাকার রিক্সাওয়ালাদের ভাত রান্না করে বহু কষ্টে মেয়েকে নিয়ে একটি বস্তিতে থাকে। সখিনা নামক সৈাদি প্রত্যাগতা আরেক নারী কর্মীও ইতোমধ্যে স্বামী কর্তৃক পরিত্যাক্তা হয়েছে। সৌদি আরবে থাকা কালে গৃহ কর্তার সাথে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে তার স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে। সখিনার ভাষ্য অনুযায়ী বহু অনুনয় বিনয় করে সে তার স্বামীকে এ কথা বুঝাতে পারেনি যে ইচ্ছাকৃত ভাবে সে কোনও অনৈতিক কাজ করেনি। সে জানিয়েছে যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বাররাও তার কথা শুনেনি এবং তালাকের পক্ষে তার স্বামীকে পরামর্শ দিয়েছে। সে এখন তার দুই সন্তান নিয়ে বিধবা মায়ের সাথে বাপের বাড়িতেই থাকছে। সাবিনা নামে আরেকজন সৌদি প্রত্যাগত গৃহকর্মী স্মামী শ্বশুর-শাশুড়ী কর্তৃক প্রত্যাখাত হয়ে এখন ১৫ দিন ধরে বোনের বাড়িতে থাকছে। তার পঙ্গু স্বামী কোনও কাজ কর্ম করতে পারে না। সংসারের আয় বৃদ্ধির জন্য সাবিনা সৌদি আরব গিয়েছিল। সে জানিয়েছে যে সেখানে সে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, সে কাজ করেছে কিন্তু মজুরী পায়নি। মজুরী দাবি করায় গৃহকর্তা সপরিবারে তার উপর হামলা করেছে।
ব্র্যাক এর মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম ভুক্তভোগী মহিলাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে তাদের বেশির ভাগকেই পরিবার প্রত্যাখ্যান করছে। দৃষ্টান্ত হিসাবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে একজন মহিলা বিমানে সৌদি থেকে ফিরে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার স্বামীর জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেছে কিন্তু তাকে নেয়ার জন্য স্বামী সেখানে আসেনি। বিষয়টি জানার পর ব্র্যাক কর্মকর্তারা তার পিতা এবং ভাইকে তাকে নিয়ে যাবার জন্য এয়ারপোর্টে আসতে টেলিফোনে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারাও তাকে নিতে অস্বীকার করেন। এই মহিলা বাধ্য হয়ে বিমানবন্দরে রাত্রি যাপন করেন। পরে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে তাকে একটি আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এই হচ্ছে অবস্থা। যে সংসার গড়ার জন্য, দু’পয়সা রোজগার করে সুখে শান্তিতে থাকার জন্য তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন আজ বিদেশ থেকে ফিরে এসে তারা সেই সংসারেই ঠাই পাচ্ছেন না। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা প্রবাসে গৃহ কর্তা, গৃহ কর্ত্রী এমন কি তার ছেলেমেয়েদের দ্বারাও নিগৃহীত হয়েছেন। এখন দেশে ফিরে এসে স্বামী সন্তান, বাপ ভাই কারুর কাছেই আশ্রয় পাচ্ছেন না। সামাজিক কলঙ্ক চার দিক থেকেই তাদের ঘিরে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশসমূহে নারী গৃহ কর্মীদের উপর যৌন নির্যাতন আজকের নতুন কোনও ঘটনা নয়। এই নারীরা অসহায়, তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাদের ভোগের বস্তুতে পরিণত করতে চায়। আর যেহেতু এই নারী কর্মীরা মাসিক মজুরীর বিনিময়ে বাসা বাড়িতে চাকুরি করে সেহেতু অনেক গৃহকর্তা গৃহকর্ত্রী ও তাদের পরিবার সদস্যরা তাদের সাথে ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করে। পরিবারের পুরুষ সদস্যেরা অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে যৌনদাসী বানিয়ে নেয়। তাদের কথা মত না চললে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। কঠোর পরিশ্রম করে তাদের ঘর সংসারের কাজও করতে হয়। আবার নুন থেকে চুন খসলে গৃহ কর্ত্রীদের পিটুনিও খেতে হয়। এই অসহায় মেয়েদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনা। প্রত্যেক দেশেই বাংলাদেশের একটি দূতাবাস আছে এবং এই দূতাবাসে প্রবাসী শ্রমিকদের সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য একজন লেবার এটাচি থাকেন। দুর্ভাগ্য বশত: এই কর্মকর্তারা নারী শ্রমিকদের দুর্দশায় কখনো এগিয়ে আসছেন বলে শোনা যায়নি। যৌন হয়রানির অভিযোগে ফিলিপাইনে, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কিছু দেশ যখন মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী কর্মী সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তখন বাংলাদশে সরকারে কিছু কর্মকর্তা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য এবং কোন কোন ক্ষেত্রে টু পাইস কামানোর লক্ষ্যে নারী কর্মী রফতানীর ব্যবসায়টি হাতে নিয়ে নেয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এক্ষেত্রে নিজেই উদ্যোগ নেন এবং লক্ষ্য মাত্রা ঠিক করে স্বল্প খরচে মধ্য প্রাচ্যে নারী শ্রমিক প্রেরণ করেন। তখন এসব দেশে যৌন নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছিল যে সেখানে ফিলিপাইন এবং শ্রীলঙ্কার ন্যায় অমুসলিম দেশ তাদের মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষার স্বার্থে মধ্য প্রাচ্যে নারী শ্রমিক প্রেরণ ‘বন্ধ’ করে দিয়েছে সেখানে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে উঠা নিরীহ গ্রামীণ মেয়েদের সেখানে পাঠানো কত টুকু যুক্তি যুক্ত হবে। সরকার বিষয়টির প্রতি কর্ণপাত করেননি। মহরম পুরুষ ছাড়া সেখানে মুসলমান মেয়েরা বাইরে যাবার রেওয়াজ নেই সেখানে রোজগারের জন্য একা তাদের বিদেশ প্রেরণের বিরুদ্ধে একটা জনমতও গড়ে উঠেছিল। সরকারের তরফ থেকে এ ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী দু’জনকেই এক সাথে বিদেশ প্রেরণের টোপ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। নারী শ্রমিক সরবরাহের পর থেকেই তাদের যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। তারা দেশে ফিরে নির্যাতনের করুন চিত্র ও তুলে ধরেছেন। সরকার বিনা তদন্তে বলে বেড়াচ্ছেন যে অভিযোগগুলো সব মিথ্যা। যদিও ‘মিথ্যা’ বলার ভিত্তিও তারা তৈরি করতে পারেননি। সরকারের উচিত ছিল অভিযোগ পাবার পরপরই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করে এর প্রতিকার করা, কিন্তু দৃর্ভাগ্যবশত: তারা তা করেননি। আমার মনে আছে ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে ফিলিপাইনের এক নারী গৃহকর্মীর উপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। ফিলিপাইন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সৌদি সরকারের নজরে এনে তার প্রতীকার কামনা করেন। ফিলিফাইন সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে সৌদি সরকার অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের সরকার তা করেননি বা করছেন না। এটা হচ্ছে যে সব নারী কর্মী ফেরা এসেছে তাদের কাহিনী কিন্তু তারা ফেরৎ আসতে পারেনি তাদের অবস্থা কি? তাদের কি যৌন দাসী হয়ে থাকতে হচ্ছে না আমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে? প্রবাসী পুরুষ কর্মীদের অনেকেই তাদের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় তথ্য সরবরাহ করছেন। এটা ভয়াবহ।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার গৃহকর্মী কাজ করছেন। এদের মধ্যে অবিবাহিত, বিবাহিত, বিধবা এবং স্বামী পরিত্যক্ত অনেক মহিলা রয়েছেন। অবিলম্বে এদের খোঁজ-খবর নেয়া দরকার। আমাদের মেয়েদের মান-সম্মানের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য পয়সার জন্য তারা তাদের সম্ভ্রম হারাবেন এবং নির্যাতনের শিকার হবেন তা হতে পারে না। তাদের নিরাপত্তা প্রদান এবং বৈরি পরিবেশ থেকে অবিলম্বে মহিলা গৃহকর্মীদের দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সাথে সাথে এখন থেকে বিদেশে নারী কর্মী প্রেরণ বন্ধ করারও দাবি জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ