ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মা দিবস

খন্দকার হামিদা খাতুন : বর্তমানে পাশ্চাত্য দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় অপসংস্কৃতির দ্বার পথও আজ উন্মুক্ত। যার ফলে পরিচ্ছন্ন পরিশুদ্ধ ইসলামী সংস্কৃতি আজ অপসংস্কৃতির দ্বারা আক্রান্ত। অপ্রিয় হলেও একথা সত্য যে মুসলিম সমাজ খুব সহজে অমুসলমানদের রীতিনীতির প্রতি প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ‘আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।’ এখানে সংযোগ বা বিয়োগের কোন সুযোগ নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম অধিকার আদায়ের ধর্ম, এখানে অন্যায়, অবিচার, জুলুমের কোন স্থান নেই। নিজেদের ধর্ম প্রচারে আছে প্রাপ্তি তবু কেন মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলতে এতো লজ্জাবোধ করে? পশ্চিমা রীতির আছর মুসলমানদেরকে এতোটাই কাবু করেছে যে, নিজেদের আপন ধর্ম ইসলাম যা মেনে চললে ইহজগত পরজগতের শান্তি সুনিশ্চিত। যে ধর্মের কথা গর্বের সাথে প্রচার করা যায়। তা থেকে আজ মুসলমানরা এমনভাবে গুটিয়ে রেখেছে যেন ‘কোন লজ্জাবতি গাছ’। কেউ ছুয়ে জুরে দিয়েছে আর সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আলো বাতাস থাকা সত্ত্বেও যেন গাছটি একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে। এহেন অবস্থার শিকার আজ মুসলমান জাতি। ছুয়ে দেওয়ার লজ্জায় আজ ইসলামী রীতিনীতি এবং অনৈসলামী রীতিনীতির সংমিশ্রণ ঘটেছ। আর এরই ফলশ্রুতি স্বরূপ মুসলমানরা আজ বিভিন্ন দিবস পালনে অভ্যস্থ। যা মুসলমানদের জন্য বছরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস রয়েছে। যা যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে রয়েছে সারা বছরের সুখ সমৃদ্ধি। এই দুইটি দিবস ১. ঈদুল ফিতর, একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে এ দিবস। ২. ঈদুল আযহা, এ ঈদে মুসলমানদের উপর পশু কুরবানী করা ওয়াজিব।
এ দুইটি দিবস মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একে অন্যের প্রতি দায়িত্বের অনুভূতি জাগ্রত করিয়ে দেয়। আর পাশ্চাত্য দেশগুলো যে সব দিবস উদযাপন করে আসছে তা মূলত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়াই প্রমাণ করে। বিশ্বে যে সকল দিবস পালিত হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম একটি দিবস ‘মা’ দিবস। এ দিবস আমাদের দেশের মুসলমানগণও যথারীতি পালন করে থাকেন। ব্যস্ত জীবনে সারা বছর মায়ের সাথে যোগাযোগ খোঁজ-খবর নেয়ার সুযোগ না মিললেও হয়তো এদিনে মায়ের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য একটা ফোন করেন অথবা কোন উপহার বা পছন্দের কোন খাবার নিয়ে নিজেই মায়ের নিকট গিয়ে হাজির হন, আর মনে করেন মায়ের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করেছি।
সন্তানের অসহায় দিনগুলোতে মায়েরা কখনো দিবসের চিন্তা করেননি। সময়ের চিন্তাও করেননি। বরং চব্বিশ ঘন্টা নিজেদের আরামকে হারাম করে মায়া-মমতা ভালোবাসা দিয়ে সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই মায়ের জন্য বছরে একটি দিন যথেষ্ট নয়। বরং বছরের ৩৬৫ দিনই হোক মায়ের জন্য। ইসলাম মায়ের প্রতি যে সম্মান প্রদান করেছে তা পৃথিবীর সকল সম্মানের ঊর্ধ্বে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে (১৭.২২.২৯) আয়াত পর্যন্ত আদর্শ সমাজ গড়ার যে ধারা সমূহ: নাযিল করেছেন তার প্রথমেই শিরকের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা। ‘তোমার রব’ ফায়সারা করে দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না।’ দ্বিতীয়: পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব: পিতা-মাতার সাথে সদাচার ও সদ্ব্যবহারকে আল্লাহর একত্বের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহর নিকট এই সদ্ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। ‘পিতা-মাতার সহিত ভালো ব্যবহার করো এবং তাদের একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তাহলে তাদের সামনে ‘উহ্্’ শব্দটিও বলো না।’
বার্ধক্যে উপনীত হয়ে পিতা-মাতা সন্তানের সেবা যতেœর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন সন্তানের দয়া ও করুণার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন যদি সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ পায়, তবে তাদের তা ক্ষত হয়ে দেখা দেয়। বার্ধক্যের কারণে মানুষের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে হয়ে যায়। আবার বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে বুদ্ধি-বিবেকও অকেজো হয়ে পড়ে, তখন পিতামাতার চাহিদা এবং দাবি দাওয়াও এমন ধরনের হয়ে যায় যা পূরণ করা সন্তানের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়ে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ অবস্থায় পিতামাতার মনোতুষ্টি ও সুখ-শান্তি বিধানের আদেশ দেয়ার সাথে সাথে সন্তানকে তার শৈশবকাল স্মরণ করিয়ে দেন যে, আজ পিতামাতা তোমার যতটুকু মুখাপেক্ষী, এক সময় তুমিও তদাপেক্ষা বেশি তাদের মুখাপেক্ষী ছিলে। তখন তারা যেমন নিজেদের আরাম আয়েশ ও কামনা-বাসনা তোমার জন্য কুরবান করেছিলেন এবং তোমার অবুঝ আবদার কথাবার্তাকে ¯েœহ মায়া মমতা সহকারে মেনে নিয়েছিলেন, তেমনি মুখাপেক্ষীতার এই দুঃসময়ে বিবেক ও সৌজন্যবোধের তাকিদ এই যে তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশের ছোট শব্দ ‘উহ’ এতটুকু বলা যাবে না, পিতামাতার সামান্য কষ্ট হয় তাও নিষিদ্ধ। এরপর বলা হয়েছে, যে পিতামাতার সাথে এই সদ্ব্যবহার যেন নিছক লোক দেখানো না হয় বরং আন্তরিক মমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে হওয়া কর্তব্য এবং বলা হয়েছে, তাদের জন্য এরূপ দোয়া কর: ‘হে আমাদের প্রতিপালক তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন পালন করেছেন।’
পিতামাতার প্রতি অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে কি তারা ব্যয় করবে? বলে দিন যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতামাতার জন্য, আত্মীয় আপনজনদের জন্য, এতিম, অনাথদের জন্য অসহায়দের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য’। আল কুরআন (২.২১৫) আয়াত। লোকেরা কোথায় ব্যয় করবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় তোমার যা-ই ব্যয় করো তার হকদার হচ্ছে তোমার পিতামাতা, নিকট আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরগণ। এ আয়াতে সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পিতামাতার কথা বলা হয়েছে।
পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার সম্পর্কে কতিপয় হাদিস: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, পিতা-মাতার সদ্ব্যবহারকারী সন্তান যখন মুহাব্বতের দৃষ্টিতে পিতামাতার দিকে তাকায়, তখন আল্লাহ তার প্রতি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজ্বের সওয়াব লিখে দেন। সাহাবাগণ আরজ করলেন, সে যদি দিনে একশতবার এভাবে দৃষ্টিপাত করে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, একশতবার দৃষ্টিপাত করলেও প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে এই সওয়াব পেতে থাকবে। (সুবহানআল্লাহ)। হযরত আবু উসামা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন: সন্তানের উপর পিতামাতার হক্ব কি? তিনি বললেন, তারা উভয়ে তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের আনুগত্য ও সেবাযত্ন জন্মাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে বেয়াদবী ও তাদের অসন্তুষ্টি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে পিতামাতার আনুগত্য করে, তার জন্য জান্নাতে দুটি দরজা খোলা থাকবে, যদি পিতামাতার মধ্য থেকে একজনই ছিল, তবে জান্নাত অথবা জাহান্নামের একটি দরজা খোলা থাকবে। একথা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, জাহান্নামের এই শাস্তির বাণী কি তখনও প্রযোজ্য যখন পিতা-মাতা এই ব্যক্তির উপর জুলুম করে? তিনি তিনবার বললেন, ‘হ্যাঁ’ পিতামাতা যদি সন্তানের উপর জুলুমও করে তবু পিতামাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে। কারণ পিতামাতার উপর প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সন্তানের নেই। তারা জুলুম করলেও সন্তান সেবা-যতœ ও আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিতে পারে না।
পিতামাতার অবাধ্য হওয়া সম্পর্কে কতিপয় হাদিস: মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) পুনঃ পুনঃ বলতে লাগলেন লাঞ্ছিত ও অপমানিত হোক অপদস্থ হোক। লোকগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) কার উপর এমন বদ দোয়া করছেন? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি পিতামাতা উভয়কে বা উভয়ের যে কোন একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পাওয়া সত্ত্বেও তাদের খেদমতের দ্বারা নিজেদের বেহেশতে গমন সুনিশ্চিত করে নিতে পারলাম।
রাসূল (সা.) সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: কবিরা গুনাহের মধ্যে অধিক বড় গুনাহ কোনটি তাহা কি আমি তোমাগিদকে বলিব? সাহাবীগণ বলিলেন, হ্যাঁ অবশ্যই আমাদিগকে বলুন, অতপর তিনি বলিলেন, তাহা হইলো আল্লাহর সহিত শিরক করা এবং পিতামাতার সহিত সম্পর্কচ্ছেদ অধিকার অনাদায় ও দুব্যর্ববহার করা। হযরত আবু বকর (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা চাইলে যত গুনাহ এবং যেকোন গুনাহ্্ই ক্ষমা করে দিবেন, তবে পিতামাতার সহিত সম্পর্কচ্ছেদ নাফরমানী করলে তা তিনি কখনও ক্ষমা করবেন না, কেননা এর শাস্তি মৃত্যুর পূর্বেই এ দুনিয়াই শিগগিরই করে দেয়ার জন্য আল্লাহ তার আয়ু কমিয়ে দেন। আর যখন কোন বান্দা তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণ করে তখন আল্লাহ তার আয়ু বাড়িয়ে দেন যাতে সে আরো সৎকাজ করে বেশি বেশি নেকী অর্জন করতে পারে। (প্রিয় পাঠকগণ) ইসলামে কোথাও একতরফা হক্ব ধার্য করা হয়নি বরং সেই সঙ্গে অন্যদের প্রতি কর্তব্যের কথাও বলা হয়েছে।
সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করাকে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্তানের জন্মের পর থেকে পূর্ণ বয়স্ক হয়ে যাওয়ার পরও তাদের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা এ সকল দায়িত্ব পিতা মাতাই পালন করে থাকেন। পিতামাতার এ জন্য বিশেষ কোন যুক্তি বা দলির তালাশ করেন না। পিতামাতা নিজেদের মনের স্বাভাবিক নির্দেশেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
রাসূল (সা.) মায়ের হক্বের ব্যাপারে বলেছেন, তোমাদের পিতার তুলনায় মাতার হক্ব তিন গুণ। এই হাদিস অনুযায়ী মা’ই সর্বাধিক হকদার। এর কারণ, মা’ই সন্তান গর্ভধারণ করেন, প্রসব, লালন পালন, ¯েœহ-মমতা ও আদর-যতœ ইত্যাদির ব্যাপারে সর্বাধিক কষ্ট করে থাকেন। মা সন্তানকে যতটা ¯েœহ-যতœ ও মায়া-মমতা এবং যতবেশি খেদমত করে এর সহিত অন্য কোনও অবদানের কোন তুলনা হতে পারে না। তাই আসুন, আমরা আমাদের গুনাহ মাফের কারণ স্বরূপ বছরে একদিন নয়, বরং আজীবনের জন্য পিতামাতার সন্তুষ্টি অর্জনের আশা পোষণ করি।
একথা সত্য যে, আজ আমরা আমাদের পিতামাতার সহিত যে আচরণ করব, কাল আমরা আমাদের সন্তানদের থেকে তাই পাবো। অথবা আজ আমরা আদব রক্ষা করতে না পারলে কাল আমাদের সন্তানদের বেয়াদবীতে আমরা আমাদের সন্তানদের উপর খুশি থাকতে পারবো তো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ