ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অতি বর্ষণে পানিবদ্ধতায় নাকাল রাজধানীবাসী

স্টাফ রিপোর্টার : সকালে দু-তিন দফায় কয়েক মিনিটের হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। দুপুর রাবোটার দিকে চারদিক অন্ধকার। ঝোড়ো বাতাস। এরপর মুষুলধারে বর্ষণ। বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক সড়কে পানিবদ্ধতা তৈরি করে। একই সাথে সৃষ্টি হয় যানজটের। এই বৃষ্টি, পানিবদ্ধতা আর যানজটে গতকাল সোমবার নাকাল হয়েছে রাজধানী ঢাকাবাসী। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অফিসফেরৎ ও খেটে খাওয়া মানুষ। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা দেয় পানিবদ্ধতা। কোথাও কোথাও জমে যায় হাঁটুপানি। এতে ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। বৃষ্টির পানির পানিবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসীর। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মৌচাক-মালিবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় একই চিত্র চোখে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের বৃষ্টিতেই রাজধানীর কোথাও কোথাও জমছে হাঁটু পানি, আর কোথাও বা কোমর পর্যন্ত। ফলে আকাশে মেঘ করে এলে পানি জমার আতংকও ভর করে রাজধানীবাসীর মনে। এই আতংক পানিবদ্ধতায় চলাফেরার। বর্ষাকাল শুরুর প্রথমেই এমন পানিজটের মুখোমুখি হওয়ায় ভারী বর্ষণের সময় দুর্ভোগের মাত্রা নিয়েও শঙ্কিত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর নবোদয় হাউজিং এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন খালের পানি রাস্তায় পৌঁছায় মাত্র আধ ঘন্টার বৃষ্টিতেই। মিরপুর এলাকায় বৃষ্টির পানিতে থৈথৈ অবস্থা অনেক পথচারী নৌকা দিয়ে রাস্তা পার হয়। গতকাল সোমবার দুপুরের ঘন্টাখানেকের বৃষ্টিতে এই এলাকার রাস্তায় জমেছে হাঁটু পানি। নালা-নর্দমার ময়লা পানির সঙ্গে বৃষ্টির পানি একাকার হওয়ায় লোকজনকে পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগে। আর পানিবদ্ধতার অজুহাতে বেড়েছে রিক্সা ভাড়া। সাধারণ যাত্রীদের গুণতে হচ্ছে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া। স্থানীয় বাসিন্দা হিমেল বিশ্বাস জানান, বৃষ্টি হলেই এটা এখানকার চিত্র। ১০ মিনিটি বৃষ্টি হলেই পানি জমেযায় রাস্তায়। সিটি কর্পোরেশন কি এর সুরাহা করবে না? এই এলাকায় পানিবদ্ধতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে খালের জমে থাকা ময়লা। এই কারণে ব্যাহত হচ্ছে পানির অবাধ প্রবাহ। তবে চলতি মাসের শুরুতেই খাল পরিষ্কার ও খননের কাজ শুরু করে তারা।
দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে শুরু হওয়া ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে বেইলি রোড, রাজারবাগ, নটরডেম কলেজ, মতিঝিল, মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের সামনে, আরামবাগ, শাজাহানপুর, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, মিরপুর রোড, গ্রিন রোড, তেজকুনিপাড়া এলাকায় পানিজট তৈরি হয়। এফডিসির সামনের রাস্তায় প্রায় দুই ফুট পানি জমে যায়। শান্তিনগর-মালিবাগ-মগবাজার এবং মিরপুর এলাকায় ভাঙা রাস্তা, কাদায় ভোগান্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। বিদ্যালয় পড়ুয়া দুই মেয়েকে আনতে পথে বেরিয়ে ছিলেন গৃহিণী নাসরিন সুলতানা। বিকেলের বৃষ্টিতে সিদ্ধেশ্বরীর স্কুলের সামনের রাস্তায়ও পানি জমে যায়। নাসরিন বলেন, ‘পুরোটাই ড্রেনের ময়লা পানি। এর মধ্য দিয়েই চলতে হচ্ছে। ১০ মিনিটের বৃষ্টিতেও এই এলাকায় পানি জমে যায়।’
রাজধানীর আরামবাগ, মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের সামনে ছিল কোমর পানি। এই এলাকার অফিসগামী মানুষের গতকাল সোমবার ছিল সীমাহীন ভোগান্তি।
এদিকে সামান্য বৃষ্টিতে পানি জমেছে লালমাটিয়া এলাকার সি ব্লকের অধিকাংশ রাস্তায়। এতে করে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। বৃষ্টি হলেই ব্লক সি হয়ে মিরপুর রোডে যাওয়ার রাস্তাগুলোর অবস্থা পানির দখলে থাকে। একই চিত্র ধানমন্ডি ও মিরপুরের। এই অভিজাত এলাকার ৮/এ এবং ১০/এ সড়কে জলাবদ্ধতার চিত্র চোখে পড়ার মতো। এখানে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের। মাস্টার মাইন্ড স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘ধানমন্ডির মতো একটি এলাকায় এ ধরনের জটিলতা মানা না। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল থেকে বের হয়ে হাঁটু পানি ভেঙে বাড়ি ফিরতে হয়। বৃষ্টির পরে দুই তিন ঘন্টা পানি জমে থাকে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বৃষ্টি হলেই রাজধানীর যে জায়গাগুলো প্লাবিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম ধানমন্ডি ২৭ নম্বর। গতকাল সোমবার দুপুরে দেখা গেছে, রাপা প্লাজার সামনে জমেছে হাঁটু পানি। যান চলাচলসহ ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চলাচল। পথচারী সোবাহান নামের এক জন জানান, ‘বিপদে পড়ে গেছি। এই রাস্তায় আসাই উচিত হয় নাই। রিক্সায় ছিলাম। এখন রিক্সাওয়ালাও পানি দিয়া যাবে না।’
রাজধানীর গোটা মিরপুর এলাকাজুড়েও একই সমস্যা। পশ্চিম শেওড়াপাড়া এলাকায় কালভার্ট সংলগ্ন বাসাগুলোতেও পানি ঢুকেছে ঘন্টা খানেকের বৃষ্টিতে। একই অবস্থা মিরপুরের সাংবাদিক কলোনী খাল সংলগ্ন এলাকা, কালশী, মিরপুর ১ নম্বর মাজার রোড ও লালকুটি এলাকায়। মিরপুর মাজার রোড এলাকার বাসিন্দা মো. সুজন দেওয়ান অভিযোগ বলেন, ‘রাস্তা সেই কবে খুঁইড়া রাখছে, এখনো কোনো সমাধান নাই। অবস্থা যা ছিল তাই আছে। বৃষ্টি হলেই বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। বৃষ্টিতে পানিবদ্ধতা হলেই অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছে রিক্সা চালকেরা। কোথাও কোথাও তারা ভাড়া দাবি করছেন স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি। ফলে পানি জমলেই বহুমুখি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে রাজধানীর উত্তরাংশের অধিকাংশ এলাকার বাসিন্দাদের। এই অবস্থায় পানিবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা প্রত্যাশা করছেন বাসিন্দারা।’ এদিকে দ্রুত এই সংকট নিরসনের আশ্বাস দিলেন ঢাকা উত্তরের প্যানেল মেয়র।
আগামী দুই দিনের এক পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দুপুর থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বর্ষণে আগারগাঁও এলাকা থেকে ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পরিমাপ করা হয়েছে। আর সারা দিনে ঢাকায় বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ ৩৭ মিলিমিটার। গত শনিবার ২৩ জুন সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়বে। তবে ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের কোনো আশঙ্কা নেই। এদিকে, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা নদীর পানির সমতলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বলেন, এই ঋতুর বৈশিষ্ট্য হলো, বিকেলের দিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে মেঘের সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো ভোরেও হতে পারে। এই মেঘের কারণে বজ্রপাত ও বৃষ্টি হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ