ঢাকা, মঙ্গলবার 26 June 2018, ১২ আষাঢ় ১৪২৫, ১১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হালদা নদী ভয়াবহ দূষণের কবলে প্রতিদিন মাছ মরে ভেসে উঠছে

শিল্প বর্জ্যরে দূষণের কবল থেকে চট্টগ্রামের হালদা নদী রক্ষার দাবিতে সচেতন নাগরিক সমাজের মানববন্ধন

হাটহাজারী ও রাউজান (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদী স্মরণকালের ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়ায় গত ১০ দিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠছে। ইতিমধ্যে পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
 গতকাল শনিবার হালদা নদীকে দূষণের কবল থেকে বাঁচাতে হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাটে মানববন্ধনের আয়োজন করে  সচেতন নাগরিক সমাজ।
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা গবেষণা পরীক্ষাগার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল হালদা নদীর ১০টি পয়েন্টে পানির নমুনা পরীক্ষা করেন। প্রাপ্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা অনেকটা কমে গেছে। উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণও। গত  শুক্রবারও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দূষণের শিকার হালদা নদীর সাথে সংযুক্ত শাখা খালগুলো পরিদর্শন করেন এবং হালদা নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা করেন।
জানা যায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া হালদা নদীর দৈর্ঘ্য ১২৩ কিলোমিটার।
এই নদীকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছে আশপাশের প্রায় আড়াই হাজার জেলে। হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার ১ নং পাতাছড়া ইউনিয়নের হালদা ছরা থেকে। সেখান থেকেই এই নদীর উৎপত্তি হয়ে কালুরঘাটের কাছে কর্ণফুলীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। চলতি পথে হালদায় ৩৬ টি ছড়া ও খাল এসে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে খালের সংখ্যা ১৯টি। সাধারণত হালদা নদীর প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা থাকে ৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু হালদা নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা শেষে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ পাওয়া গেছে ২ মিলিগ্রামের চেয়েও কম। এই পরিস্থিতি মাছসহ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রতিকূল। ফলস্বরূপ প্রতিদিন গণহারে মাছ মরে যাচ্ছে। তাছাড়া উজান-ভাটির হালদা নদীর পানির নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে উজানের চেয়ে ভাটি এলাকায় দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাউজানের আজিমের ঘাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলক হারে বেশি।
স্থানীয় লোকজন জানান, হালদা নদীর পশ্চিম পার্শ্বস্থ হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা এবং মহানগরের অক্সিজেন এলাকার বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সংযুক্ত শাখা খাল হয়ে নদীতে এসে পড়ছে। এর সাথে সপ্রতি প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলের ¯্রােতে আবর্জনা এসে পড়েছে হালদায়। এতে নদীর পানি কালো রং ধারণ করেছে। হাটহাজারী উপজেলার খন্দকিয়া, কাটাখালী, শাহ মাদারি, পোড়াকপালি এবং রাউজান উপজেলার কাগতিয়া খাল, সোনাইর মুখ খালের মুখে ও হালদা নদী থেকে হাত জাল দিয়ে প্রচুর মরা ও পচা মাছ সংগ্রহ করেছে স্থানীয়রা। 
হালদা নদীর সাথে সংযুক্ত শাখা হাটহাজারীর শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ, বাথুয়া, হামিদিয়া ও কৃষ্ণখালী খাল এবং মাদার্শা ইউনিয়নের খন্দকিয়া, কাটাখালী, পোড়াকপালি ও শাহ মাদারি খালও দূষণের শিকার। পাশাপাশি রাউজানের কাগতিয়া খাল, সোনাইরমুখ খাল ও চট্টগ্রাম শহরের বামন শাহী খালসহ বিভিন্ন উপ-শাখা খালেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বর্জ্য। দুই বছর ধরে নগরীর বায়েজিদ থেকে কুলগাঁও পর্যন্ত এলাকার শিল্প কারখানা এবং আবাসিক বর্জ্য দুই ইউনিয়নের সাতটি খাল বেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। দূষণের কারণে অনাবাদি হয়ে পড়েছে উত্তর মাদার্শা, দক্ষিণ মাদার্শা, চিকনদন্ডী, শিকারপুর ও বুড়িশ্চর ইউনিয়নসহ আশেপাশের গ্রামের চাষের জমি।
স্থানীয়রা জানান, গত মঙ্গলবার ও বুধবার হালদায় ছোট ছোট মাছ মারা পড়লেও গত বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে প্রচুর বড় বড় মৃত মাছ। এর মধ্যে কার্প জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) মাছও রয়েছে। রাউজানের আজিমের ঘাট এলাকায় হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের মধ্যে ৩ ফুট লম্বা প্রায় ১৮ কেজি ওজনের একটি মৃত মৃগেল মাছ ভেসে উঠে। মাছটি মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে কঙ্কাল সংগ্রহের জন্য। এছাড়া ৭-৮ কেজি ওজনের বেশ কিছু আইড় মাছও মরে ভেসে উঠেছে। ভেসে উঠছে কাতলা, বাইন, টেংরা, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক জানান, হালদায় কেন মাছ মরে যাচ্ছে-এ বিষয়টি আসলে অধিকতর অনুসন্ধান করা দরকার। শিল্প বর্জ্যরে কথা বলা হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে ঈদের ছুটির কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ ছিল। আমরা হালদার দশটি পয়েন্টে পানি পরীক্ষা করে দেখেছি। পানির ডিজল্ভ অক্সিজেন (ডিও) অনেক কমে গেছে। স্থানীয়রা আমাদের জানিয়েছেন, বন্যার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি নামতে না পারার কারণে বিভিন্ন স্থানের আবর্জনা ও আগাছা পচে পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। আসল কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়কারী ড মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘হালদা এখন মারাত্মক দূষণের শিকার হয়েছে। বন্যার পানির কারণে কখনো এভাবে পানি দূষিত হতে পারে না। আমি আগেও অনেকবার হালদার পানি পরীক্ষা করে দেখেছি। কিন্তু এবারের মতো খারাপ অবস্থা আর কখনো দেখিনি। বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য সংযুক্ত শাখা খাল হয়ে হালদা নদীতে পড়ছে। এসব খালের পানি একেবারে কুচকুচে কালো আকার ধারণ করেছে। পানির ডিও এইসব খালে নেমে গিয়ে গেছে মাত্র ১ এ। এছাড়া হালদায় ডিও পাওয়া গেছে মাত্র ২। অথচ হালদায় আমরা কখনো ৫ এর নিচে ডিও পাইনি। এই লেবেলে কোনো জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না। সুতরাং হালদার অবস্থা এখন মারাত্মক খারাপ।
এদিকে  চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম এক বিবৃতিতে হালদা নদী, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলাকে ভয়াবহ দূষণ থেকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ শিল্পবর্জ্যরে কারণে হালদা নদী ও হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর, বুড়িশ্চর, উত্তর ও দক্ষিণ মাদার্শা, চিকনদন্ডী, ফতেপুর, মেখল ও গড়দুয়ারা ইউনিয়নের ফসলের মাঠ, খাল, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় ব্যাপক দূষণের শিকার হয়ে আসছে। এ ব্যাপারে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলাও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রশাসনের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বহুবার দাবি জানানোর পরেও কোন ফল হয়নি। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় এ দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে গিয়ে হালদা নদী, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষাক্ত পানিতে মাছ মরে ভেসে উঠছে এবং দূষিত পানি এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচেছ। কৃষি কাজের জন্য মানুষ জমিতে নামতে পারছেনা। এ অবস্থায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান এবং বলেন অন্যথায় ভূক্তভোগী জনগণ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ঘেরাও করে দাবি আদায় করতে বাধ্য হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ