ঢাকা, বুধবার 27 June 2018, ১৩ আষাঢ় ১৪২৫, ১২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এরদোগানের সফলতা ইসলামী বিশ্বের বিজয়-----আনোয়ার ইব্রাহিম

আনোয়ার ইব্রাহিম                  রজব তৈয়ব এরদোগান

 

২৬ জুন, দ্য স্টার অন লাইন, আনাদুলো এজেন্সি : তুরস্কের সাধারণ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের জয়লাভকে স্বাগত জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার পিকেআর পার্টির নেতা দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি এরদোগানের এই জয়কে ‘ইসলামী বিশ্বের বিজয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

গত রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ী এরদোগানকে লেখা একটি চিঠিতে আনোয়ার বলেন, তুরস্কের অগ্রগতি এবং বিশ্বে তার অবস্থান এরদোগানের ‘গতিশীল নেতৃত্বের’ অধীনে আরো বিকশিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আপনার এই বিজয় ইসলামী বিশ্বের জন্যও একটি বিজয়। আমাদের বিশ্বাসের মূল্যবোধ ও মহানবী (সা.) এর মৌলিক শিক্ষার কোনো পরিবর্তন না ইসলামকে একটি আধুনিক এবং প্রগতিশীল রূপ দিতে এই বিজয় প্রয়োজন ছিল।’

এছাড়াও, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তুরস্কের জনগণকেও তিনি অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র রক্ষা, তুর্কি জনগণের ক্রমাগত উন্নতি, শান্তির প্রচার এবং সন্ত্রাস দূর করা ছিল আপনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং দ্বিতীয় মেয়াদে আপনার বিজয় লাভে এটি ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে এবং আশা করি তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবেন।’

২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এরদোগান। ২০১৪ সালেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন। তার প্রধান সমর্থক হচ্ছেন রক্ষণশীল এবং ধার্মিক অপেক্ষাকৃত বয়স্ক তুর্কিরা।

ঐতিহাসিক বিজয়ের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য : তুরস্কে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে এরদোগান ৫২.৫ শতাংশ ভোট ও সংসদ নির্বাচনে একেপি জোট ৬০০ আসনের মধ্যে ৩৪৩ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। এরদোগান তার ১৬ বছর শাসনামলে এই প্রথম শক্তিশালী বিরোধী জোটকে মোকাবেলা করে বিজয়ী হলো।এই নির্বাচনে ৫,৯৩,৫৪,৮৪০ জন ভোটারের মধ্যে ৮৭.৫ শতাংশ জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

যে কারণে এরদোগানের এই বিজয়

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগানের ঐতিহাসিক বিজয় মূলত তার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের প্রতিফলন। নির্বাচনে এরদোগান তার প্রতিপক্ষ মহররেম ইনজের চেয়ে এক কোটি সাড়ে আট লাখ বেশি ভোট পেয়েছেন।

তুরস্কের প্রধান দুই শহর আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে এরদোগান ৫০ শতাংশের ওপর ভোট পেয়েছে। যদিও লাস্ট গণভোটে এরদোগান এই দুই শহরে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। এরদোগান তার সম্মোহনী শক্তির গুণে তার আদর্শিক ভোটের বাইরে সাধারণ জনগণকেও যে কাছে আনতে পারেন তা আবারও প্রমাণ করে দিল।

সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না একে পার্টি : সংসদে জোটবদ্ধভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও দলীয়ভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি একে পার্টি। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর নির্বাচনে ৪৯.৫০ শতাংশ ভোট ও ৫৫০ আসনের মধ্য ৩১৭ আসন পেলেও এই নির্বাচনে একে পার্টি ৪২.৫ শতাংশ ভোট এবং ৬০০ আসনের মধ্য ২৯৩ আসন পেয়েছে। যদিও জোটভুক্ত জাতীয়তাবাদী দল (এমএইচপি) ৫০ আসন পাওয়ায় তারা ৩৪৩ আসন নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তুরস্কের অর্ধেক ভোটার-অধ্যুষিত প্রধান দুই শহর ইস্তানবুল ও আঙ্কারায় একে পার্টি গত নির্বাচনের চেয়ে ৭-৯ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে।দুই শহরে সিরিয়ানদের আচরণ, বিরোধী দল কর্তৃক একেপিকে দায়ী করে সিরিয়া বিরোধী প্রচারণা এবং ফিলিস্তিন ও তুরস্কের নির্বাচন ইস্যুতে হঠাৎ করে তুরস্কের ১২ শতাংশ মদ্রাস্ফীতি মূলত এ জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়।

সিএইচপি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ভালো করলেও দলের ভোট কমেছে সিএইচপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোহররেম ইনজে এরদোগানের চেয়ে এক কোটি সাড়ে আট লাখ ভোট কম পেলেও তার ৩০.৭ শতাংশ ভোট সিএইচপির কয়েক দশকের সবচেয়ে বেশি অর্জিত ভোট। যদিও দল হিসেবে সিএইচপি ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর নির্বাচনে ২৬ শতাংশ ভোট পেলেও এই নির্বাচনে তা কমে ২২.৭ শতাংশ এ এসেছে। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো কুর্দিশ এলাকায় সিএইচপি দলীয় ভোট কুর্দিশ দলকে এবং কুর্দিশ জনগণ প্রেসিডেন্ট ভোট সিএইচপি প্রার্থীকে দিয়েছে। তবে তাদের আসন সংখ্যা ২০১৫ সালে ১৩৪ হলেও এবার তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৬ হয়েছে। তার্কিশ হুরিয়াত পত্রিকার মতে, সাদাত পার্টির ১.৪ শতাংশ ভোট ১১ জেলায় সিএইচপির ভোটে ইফেক্ট পরায় তাদের আসন বৃদ্ধি পেয়েছে।

আসন বেড়েছে জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপির : তুরস্কের জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপি ২০১৫ সালে ১১.৯ শতাংশ ভোট এবং ৪০ আসন পেলেও এই নির্বাচনে ১১.১ শতাংশ ভোট এবং ৫০টি আসন পেয়েছে। তাদের দল ভেঙে যাওয়ার পরেও এমন ফলাফলে দলের নেতারা অনেক খুশি। সেই সঙ্গে তারা আগামী দিনে এরদোগানের সঙ্গে তুরস্কের সরকার পরিচালনায় অংশ নেবে।

নবগঠিত ইয়ি পার্টির অপ্রত্যাশিত বিজয়বাম জোটের অন্যতম শরিক নবগঠিত ইয়ি পার্টির নেত্রী মেরাক আকসেনার মূলত গুলেনের প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পেলেও তার ৪০ আসন এবং ১০ শতাংশ ভোট সব মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সে ৭.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। কুর্দিশ জাতীয়তাবাদী দল এইচডিপির সফলতা: অনেকে ধারণা করেছিল এই নির্বাচনে তারা সংসদে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিএইচপির প্রার্থী মহররেম ইনজের সঙ্গে তাদের চুক্তির পর এই অঞ্চলের ভোটারদের একাংশ প্রেসিডেন্ট পদে সিএইচপি প্রার্থীকে এবং সিএইচপির ভোটাররা দলীয় নির্বাচনে কুর্দিশদের ভোট দেয়ায় তাদের ভোট ১০.৮০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১১.৬ শতাংশ এ উত্তীর্ণ হয়েছে। সেই সঙ্গে তারা ৬৭ আসনে বিজয়ী হয়েছে।

অপ্রত্যাশিত পরাজয় ইসলামী দল সাদাত পার্টির : সাদাত পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যানকে নাজমুদ্দিন আরবাকানের পর সবচেয়ে মেধাবী এবং চৌকস নেতা মনে করা হতো। নির্বাচনের আগে সাদাত পার্টি দলীয়ভাবে তাকে "জ্ঞান সম্রাট" বা তুরস্কের ভাষায় "বিলগি বাষকান" উপাধি দেয়।

তারা মনে করেছিল নির্বাচনে ৫-৭ শতাংশের ওপর ভোট পাবে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী তেমেল কারামুল্লাউলু ০.৯০ শতাংশ ভোট পায়। দলীয়ভাবে সাদাত পার্টি সারা দেশে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪০১ ভোট পায়।ইসলামপন্থী দলের স্বভাব পরিবর্তন করে বামদের সঙ্গে জোট করার কারণে মূলত তাদের এই পরাজয় হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্বাচনে তাদের ভোটে ১১ জেলায় সিএইচপির আসন বাড়লেও তারা দলীয়ভাবে কোনো আসন পায়নি। যদিও প্রেসিডেন্ট এরদোগান নির্বাচনের আগে সাদাত পার্টির প্রধানকে ডেকে তাদের জোটে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাতে সাড়া না দিয়ে বামদের সঙ্গে জোট গড়েছে।

প্রবাসী ভোটে এরদোগানের বিজয়

আমেরিকা, সৌদি আরব, ইউকেসহ অনেক দেশে এরদোগান ও একেপি ব্যর্থ হলেও তার্কিশ জনসংখ্যা-অধ্যুষিত জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াতে বিপুল ভোটে বিজয়ের কারণে অন্যদের সঙ্গে এরদোগান ও দলের ব্যবধান বেড়ে যায়।

ইউরোপের দেশগুলোতে এরদোগানের প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা, পুলিশ প্রটেকশনে বিরোধী দলের প্রচারণা এবং ফ্রান্সে এরদোগান সমর্থিত তার্কিশদের ওপর হামলার কারণে এরদোগানের ভোট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে এরদোগান ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবে। সেই সঙ্গে তুরস্কের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা "ভিষণ ২০২৩" এর দ্বারা তুরস্কের অর্থনৈতিক, সামরিক উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বদরবারে ওসমানিদের মতো তুরস্কের মর্যাদাপূর্ণ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে এরদোগান এবং তার দল একেপি এগিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তুরস্ক আগামী দিনে ইহুদিচক্র এবং আমেরিকার দ্বারা রাশিয়া ও ইরানের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলে ধারণা করছে তুরস্কের সর্বমহল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ