ঢাকা, বুধবার 27 June 2018, ১৩ আষাঢ় ১৪২৫, ১২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চুয়াডাঙ্গায় নদীকে খালে পরিণত করছে মাছের অবৈধ ঘের ॥ অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী মাথাভাঙ্গা

এফ, এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা : সুফলা-সুজলা, শস্য, শ্যামলা সবুজের বুক চিরে বয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী মাথাভাঙ্গা নদী। তবে অবৈধ ঘের ও কোমড় দিয়ে পদ্মা নদীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখা চুয়াডাঙ্গার খরস্রোতা নদী মাথাভাঙ্গার সর্বনাশ ঘটছে। প্রভাবশালী মহল ও অর্থলোভী জেলেরা গাছের ডালপালা দিয়ে এসব অবৈধ ঘের ও কোমড় দিয়ে মাছ ধরে লাখ কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাথাভাঙ্গা ও মাথাভাঙ্গার অববাহিকার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজার হাজার জেলে পরিবার। ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ ও জলজ প্রাণী। মাথাভাঙ্গা নদীর দুই পাড়ে অবৈধ ঘের স্থাপনের কারণে দুই দিকে চর পড়তে পড়তে নদীর প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে নদীর পানি সীমা। মূল স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন মুখী স্রোতের কারণে মাথাভাঙ্গায় ডুবোচরের সৃষ্টি হতে পারে। বিনষ্ট হতে পারে মাথাভাঙ্গার নাব্যতা। মাথাভাঙ্গার পানিও দূষিত হয়ে পড়ছে। খর¯্রােতা এই মাথাভাঙ্গার সুস্বাদু মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু প্রজাতির মাছ।

জানা গেছে, মাথাভাঙ্গা পদ্মা নদীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখা। অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার প্রধান তিনটি নদীর মধ্যে মাথাভাঙ্গা ছিল মুখ্য। মাথাভাঙ্গা নদীয়ার নদী হিসেবেই পরিচিত। এ নদী একসময় খুব স্রোতস্বিনী ছিল। জনশ্রুতি আছে, বহু বছর আগে উৎস্যমুখে মূল নদী পদ্মার সাথে সংযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মাথা বা মুখ ভেঙ্গে যাওয়ায় নদীটির এরূপ নামকরণ হয়েছে। তবে কোনো এক সময় এ নদীটি হাওলিয়া বা হাওলী নামে পরিচিত ছিল। ১৮৬২ সালে তৎকালীন পূর্ববাংলার সাথে কলকাতার রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই মাথাভাঙ্গা নদীপথেই কলকাতার সাথে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ছিল। বড় বড় নৌকায় করে নানরকম পণ্য অনা নেয়া করা হতো। পদ্মা নদী থেকে জলঙ্গী নদীর উৎপত্তি স্থানের প্রায় ১৭ কিলোমিটার ভাটিতে মাথাভাঙ্গা নদীর উৎপত্তি। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া ও হাটুভাঙ্গা গ্রামের মাঝ দিয়ে মাথাভাঙ্গা নদী এ জেলায় প্রবেশ করেছে। প্রবেশ করে কিছুদূর আসার পর এ নদীর একটি শাখা বের হয়ে কুমার নদী নামে পূর্বদিকে বয়ে গেছে। মাথাভাঙ্গা নদী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ২৬টি এবং দামুড়হুদা উপজেলার ১৫টি গ্রাম পেরিয়ে দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম সুলতানপুরের পাশ দিয়ে ভারতের নদীয়া জেলায় প্রবেশ করেছে। ভারতে মাথাভাঙ্গা নদী চুর্ণী নদী নামে পরিচিত। এরপর এ জেলার ১০-১২ টি গ্রাম পেরিয়ে ভাগিরথীর সাথে মিশে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। মুলতঃ গঙ্গা ও পদ্মার প্রবাহের ওপর এতদাঞ্চলের নদীর নাব্যতা নির্ভরশীল। 

সরেজমিন নদীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, মাছ শিকারীরা ঘুণি জাল দিয়ে কোমড় ঘিরে এমনভাবে মাছ শিকার করছে তাতে মাছের ছোটছোট পোনা থেকে ডিম পর্যন্ত উঠে আসছে। এছাড়াও দেখা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী সুলতানপুর, ঝাঝাডাঙ্গা, নাস্তিপুরসহ বেশ কয়েক স্থানে নদীর দু’ধারে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় তার সাথে অনেক জায়গায় এক শ্রেণির মানুষ দুই পাড়ের মাটি কেটে সমান করে সেখানে নানারকম ফসলের আবাদ করছে। ফলে হাতে গোনা কিছু মানুষ উপকৃত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী। 

শুধু তাই নয়, গাছের ডালপালা ও কচুরীপানা আটকে মাছের ঘের স্থাপনের কারণে পানির স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে চর পড়তে শুরু করেছে। মাথাভাঙ্গাকে উৎস করে অববাহিকায় চিল, বাজ, পানকৌড়ি, গাংচিল, মাছরাঙা, ডাহুক, কোরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির বক ইত্যাদি জলচর পাখীদের আনাগোনা ছিল। বসবাস ছিল সাপ, গুইসাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন সরীসৃপ জাতীয় উভচর প্রাণীর। কিন্তু বর্তমানে অবৈধ মাছের ঘেরের কারণে এসব জলচর ও উভচর প্রাণীরা মাথাভাঙ্গার অববাহিকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও অবৈধ ঘেরের আটকে রাখা কচুরীপানা ও ডালপালা পচনের কারণে মাথাভাঙ্গার পানি দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে। চোখের সামনে এসব অবস্থা দেখে অনেকেই নানা সমালোচনা করেন। তবে সচেতন মহল ও নদী প্রেম ভক্তরা, নদীটির অস্তিত্ব রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ