ঢাকা, বুধবার 27 June 2018, ১৩ আষাঢ় ১৪২৫, ১২ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাহজাদপুরের কাচারি বাড়ি

আবু আফজাল মো: সালেহ : ১৮৯৭ সালে কবির বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি ভাগাভাগি করে দিলে কাকা জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর, বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ এবং কবি নিজে পতিসরের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি আর শাহজাদপুরে আসেন নি। শাহজাদপুরের অংশ চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরে ১৩০৪ সালের ৮ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথ পতিসর যাওয়ার পথে তাঁর প্রিয় শাহজাদপুরে আর একবার এসেছিলেন। সেদিন তাঁর শাহজাদপুরের বিচ্ছেদ স্মরণ করে এখানে বসেই তাঁর বিখ্যাত  কবিতাটি লিখেছিলেন- “ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে-আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে”। শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ বিশেষ রচনার তালিকা- কাব্যের দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, লজ্জা, হৃদয় যমুনা, বৈষ্ণব কবিতা, ব্যর্থ যৌবন, ভরা ভাদরে, প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি, চিত্রা কাব্যের চিত্রা, শীতে ও নগর সঙ্গীত। চৈতালী কাব্যের যাত্রী, তৃণ, ঐশ্বর্য, স্বার্থ, প্রেয়সী, নদীযাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, স্মৃতি, বিলয়, প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, কালিদাসের প্রতি, কুমার সম্ভব গান, মানসলোক, কাব্য, প্রার্থনা, ইছামতি নদী, আশিষ গ্রহণ, বিদায়।“কল্পনা” কাব্যের নর বিবাহ, লজ্জিতা, মানস প্রতিভা, বিদায়, হতভাগ্যের গান, যাচনা, কাল্পনিক, সংকোচ। এখানে তিনি কিছু বিখ্যাত ছোট গল্প রচনা করেছিলেন যেমন- পোস্ট মাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি। এছাড়াও ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি পত্র, নাক বিসর্জন তিনি এখানেই লিখেছেন।
শাহজাদপুরের বাড়িটিকে কাছারি বাড়ি বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনো এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতেন না। জমিদারী দেখাশুনার জন্য শিলাইদহ থেকে মাঝে মাঝে আসতেন এবং সাময়িক ভাবে বসবাস করতেন। তিনি স্থায়ী ভাবে বাস করতেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। সম্ভবত একারণেই কুষ্টিয়ার বাড়িটি কুঠিবাড়ি আর শাহজাদপুরের বাড়িটি কাচারি বাড়ি নামে পরিচিত। এই অঞ্চলটি আগে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারীর অংশ ছিল। এ বাড়িটি এখন মিউজিয়াম। যা প্রবেশ ফি দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।
কাচারি বাড়ির নিচের তিনটি ঘর এবং উপরের চারটি ঘর রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিচের সবগুলো ঘরই আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। প্রথম ঘরে রবীন্দ্রনাথের নিজের এবং তার ও পরিবারেরসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে তার সাক্ষাতের ছবি, তার ব্যবহৃত বোট পদ্মা, গান্ধীর সাথে রবীন্দ্রনাথ, আমার শেষ বেলার ঘরখানি, পদ্মাসনে উপবিষ্ট রবীন্দ্রনাথ, বার্ধক্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। তৃতীয় ঘরটি রবীন্দ্রনাথের আকা বিভিন্ন ছবি দিয়ে সাজানো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বৃক্ষ রাজী, নৈসর্গিক দৃশ্য, উপবিষ্ট চিত্র, মুখ নিরীক্ষা, বিভিন্ন রকমের প্রতিকৃতি। 
দ্বিতীয় তলার ঘরে  কবির ব্যবহৃত পালকি, চিঠি লেখার ডেক্স, কাঠের আলনা, পড়ার টেবিল, দেয়ালে কবির বিভিন্ন সময়ে তোলা আলোকচিত্র ও পান্ডুলিপি, জ্যামিতিক নকশা, ড্রেসিং টেবিল, শ্বেত পাথরের গোল টেবিল, টেবিল বেসিন, কাঠের আলনা, দেবতার আসন, হাতল যুক্ত কাঠের চেয়ার, কবির ব্যবহৃত কাঠের বড় টেবিল, সোফা, হাতল যুক্ত কাঠের চেয়ার, কাঠের গোল টেবিল, বিছানা, হাতল যুক্ত কাঠের চেয়ার, কেরোসিনের বাতি, মোম দানী, অর্গ্যান, চিনামাটির বাসনকোসন, দেয়াল ঘড়ি, ব্রোঞ্জের তৈরি বালতি, রান্নার পাতিল, ঘটি ইত্যাদি। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ছবিসহ  আরও রয়েছে রবীন্দ্রনাথের পান্ডুলিপি, চিত্রাঙ্কনের ছবি। তাঁর ব্যবহৃত খাঁ, সোফা, আলনা, আরাম কেদারা, পালকি, শ্বেত পাথরের বিরাঁ টেবিল, একজোড়া খড়ম, হুঁকো, ফুলদানি, রান্নাঘরে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, হট ওয়াাঁর পট, হট ওয়াাঁর ট্রে, লণ্ঠন ইত্যাদি এখানে রয়েছে । প্রতি বছর ২৫শে বৈশাখ কুটিবাড়িতে রবিন্দ্র মেলার আয়োজন করা হয়। নাচ গান ও নানা আয়োজন চলে দিনভর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত্রে মানুষ এই মেলায় অংশ নেয়। দেশের খ্যাতনামা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীরা এই মেলায় যোগ দেয়।
সময়সূচি : জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সূচি হল মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ১০.০০টা থেকে বিকাল ৬.০০টা পর্যন্ত। মাঝে দুপুর ১.০০ থেকে ১.৩০টা পর্যন্ত বিরতি। শুক্রবার ১২.৩০ থেকে ২.৩০টা পর্যন্ত বিরতি। সোমবার শুধু দুপুর ২.৩০টা থেকে বিকাল ৬.০০টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘর বন্ধ থাকে। টিকিট দেশি পর্যটকের জন্য ১০.০০টাকা আর বিদেশি পর্যটকের জন্য ১০০ টাকা।
কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে শাহজাদপুরের দূরত্ব প্রায় ১৩২ কি.মি । ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে রয়েছে পাবনা যাওয়ার বাস। পাবনার বাসে গেলে আপনি শাহজাদপুর যেতে পারবেন। কারণ এটি ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক দিয়ে শাহজাদপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালে বাম দিকে গেলেই বাজার। সেখান থেকে আপনি সিএনজি চালিত অটোরিক্সাতে বা রিক্সাতে যেতে পারেন।
থাকা-খাওয়া : শাহজাদপুরে থাকা-খাওয়ার বা রাত্রিযাপনের  ভালো ব্যবস্থা নেই। সিরাজগঞ্জ বা পাবনা  থাকা ও খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা আছে। এসব স্থানে বিভিন্ন দামী-মানের হোটেল পেয়ে যাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ